প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ভুলের মাসুল ৪০৫ কোটি !

ডেস্ক রিপোর্ট: ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রেলরুটটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নারায়ণগঞ্জে রাজধানীকেন্দ্রিক অসংখ্য পেশাজীবী মানুষের বসবাস হওয়ায় এ রুটে যাত্রী চাহিদা সর্বাধিক। এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জ হয়ে দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে ট্রেন চলাচলও উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাবে। এসব ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে রুটটি সম্প্রসারণে ২০১৪ সালে একটি প্রকল্প হাতে নেয় বাংলাদেশ রেলওয়ে।

সেই প্রকল্প বাস্তবায়িত হওয়ার কথা ছিল তিন বছরের মধ্যে। যথাসময়ে তা বাস্তবায়িত হয়নি। উপরন্তু প্রকল্প শুরুর পাঁচ বছর পর দেখা গেছে, চলমান প্রকল্পে মারাত্মক ত্রুটি রয়ে গেছে। এটি সংশোধন করতেই হবে অন্যথা ট্রেন চলাচলে সৃষ্টি হবে মারাত্মক জটিলতা। তাই শেষ পর্যন্ত প্রকল্পে ব্যাপক পরিবর্তন আসছে এবং শুরুতেই যে ভুল পরিকল্পনা করা হয়েছিল, তার মাসুল বাবদ দিতে হচ্ছে আরও ৪০৫ কোটি টাকা।

অথচ এ প্রকল্পের মোট ব্যয়ই ধরা হয়েছিল ৩৭৮ কোটি ৬৫ লাখ ৫৮ হাজার টাকা। এটি বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ৭৭৮ কোটি ১৩ লাখ ৮৩ হাজার টাকা। এখানেই শেষ নয়। সেই ভুলের কারণেই বৃদ্ধি পাচ্ছে প্রকল্প বাস্তবায়নের মেয়াদকালও। তিন বছরের কাজের মেয়াদ পঞ্চম দফায় বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়াচ্ছে ১০ বছর।

সম্প্রতি প্রকল্পটিতে নতুন করে ব্যয় ও সময় বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, প্রকল্পের শুরুতে জমি অধিগ্রহণের বিষয়টি বিবেচনায় ছিল না। এখন রেলপথ সম্প্রসারণ করতে গিয়ে দরকার ভূমি। জমি দিতে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন আশ্বাস দিয়ে সিদ্ধান্ত থেকে পরে সরে এসেছে। নতুন করে জমি অধিগ্রহণ ও বিল্ডিংয়ের ক্ষতিপূরণ বাবদ গুনতে হচ্ছে বিপুল পরিমাণ অর্থ। জমি অধিগ্রহণে নতুন নিয়মানুযায়ী বাজারমূল্যের তিনগুণ অর্থ পরিশোধ করতে হবে।

তা ছাড়া বিদ্যমান মিটারগেজ রেলপথটি এখন ডুয়েলগেজ করতে অতিরিক্ত ব্যয় ধরতে হচ্ছে। তাতে করে পিছিয়ে গেল নির্মাণকাজও। ২০১৪ সালের ১ জুলাই নেওয়া এ প্রকল্পটি শেষ করার কথা ছিল ২০১৭ সালের ৩০ জুন। এরপর আরও তিন দফায় মেয়াদ বেড়ে দাঁড়ায় ২০২০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত।

তাতেও কাজের কাক্সিক্ষত অগ্রগতি নেই। আরেক দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত বর্ধিত করেও অগ্রগতি যৎসামান্য। এ প্রকল্পের সর্বশেষ ভৌত অগ্রগতি মাত্র ৬০ শতাংশ। তাই আগামী ২০২৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।

এ বিষয়ে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রেলপথ সম্প্রসারণ প্রকল্প পরিচালক মো. আফজাল হোসেন বলেন, আগে থেকেই চলছে এ প্রকল্পটি। আমি দায়িত্ব পালন করছি বেশি দিন হয়নি। এখন জমি অধিগ্রহণসহ কিছু যৌক্তিক কারণে ব্যয় বাড়বে। আর বিদ্যমান রেললাইনটি মিটারগেজ থেকে ডুয়েলগেজ করতে হচ্ছে। জেনেছি, বেশি খরচ হবে এই বিবেচনায় মূল ডিপিপিতে এটি ছিল না। নতুন প্রস্তাবে ২০২৩ পর্যন্ত সময় ধরা হয়েছে।

প্রকল্প পরিচালক আরও জানান, মূলত জমি অধিগ্রহণ-ক্ষতিপূরণ ও মিটারগেজ থেকে ডুয়েলগেজে রূপান্তর এ দুই খাতে খরচ বাড়ছে। পাওয়ার কনস্ট্রাকশন করপোরেশন অব চায়না প্রকল্পটির নির্মাণকাজ করছে। এর পরামর্শক হিসেবে আছে ডিডিসি।

জানা গেছে, প্রথমে বিদ্যমান মিটারগেজ রেললাইনের সমান্তরালে আরেকটি ডুয়েলগেজ রেলপথ নির্মাণে প্রকল্প নেওয়া হয়। এখন বলা হচ্ছে, ১২ কিলোমিটার মিটারগেজ রেলপথটিকে ডুয়েলগেজে রূপান্তর না করলে ট্রেন চলাচলে জটিলতা হবে। কারণ নতুন ডুয়েলগেজ লাইনটি হবে বর্তমান রেললাইনের চেয়ে অনেক উঁচু। তাই স্টেশন, সেতু ও লেভেল ক্রসিং গেটে নির্মিতব্য ডুয়েলগেজ লাইনের সমান উচ্চতায় স্থাপন করতে হবে। তা না হলে বিদ্যমান মিটারগেজ লাইনের স্ট্রাকচারে অসম ভার্টিকাল লেভেল দেখা দেবে।

এ ছাড়া প্ল্যাটফর্ম ও প্ল্যাটফর্মের শেডের উচ্চতা ভিন্ন করতে হবে। কারণ বিদ্যমান মিটারগেজ রেলপথটি ৩৪.০৩ কেজি ও নির্মাণাধীন রেলপথটি ৬০ কেজিবিশিষ্ট। এতে করে বিদ্যমান রেলপথ থেকে ডাবল লাইনের রেল লেভেল প্রায় ৩৫.২ সেন্টিমিটার ওপরে থাকবে। এ অবস্থায় রাখা হলে অসম অবস্থার সৃষ্টি হবে লেভেল ক্রসিংগেট ও ক্রসওভারগুলোতে। বিদ্যমান মিটারগেজ রেললাইনের প্ল্যাটফরম লেভেলও প্রায় ৩৫.২ সেন্টিমিটার নিচে রাখতে হবে। এ কারণেই বিদ্যমান মিটারগেজ রেলপথটি ডুয়েলগেজ করতে চাইছে রেলওয়ে।

রেলওয়ে এ প্রকল্পের ডিপিপি সংশোধনের বড় কারণ মিটারগেজকে ডুয়েলগেজে রূপান্তর। আরেক কারণ ভূমি অধিগ্রহণ ও এর ক্ষতিপূরণ। ক্ষতিপূরণ বলতে বিল্ডিংসহ স্থাপনার টাকা ভবন মালিককে পরিশোধ। চাষাঢ়া থেকে নারায়ণগঞ্জের মধ্যবর্তী টি১ ও টি২ লেভেল ক্রসিংগেটের মধ্যে ডুয়েলগেজ নির্মাণে প্রায় দশমিক ৫১ একর ভূমি অধিগ্রহণ করতে হবে। কারণ ব্রডগেজ রেলপথের জন্য ৪২ ফুট দরকার। মূল প্রকল্পে অধিগ্রহণের সংস্থান নেই। জটিলতা এড়াতে জমি অধিগ্রহণ ছাড়া ডুয়েলগেজ ডাবল লাইন নির্মাণে সমীক্ষা পরিচালনা করে। এতে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মালিকানাধীন শহীদ সোহরাওয়ার্দী সড়ক থেকে ভূমি রেললাইন নির্মাণের জন্য রেলের বরাবর হস্তান্তরের সুপারিশ করা হয়।

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশননের মেয়র আইভী রহমান প্রাথমিকভাবে এ প্রস্তাবে সম্মত হলেও পরে জমি দিতে অস্বীকৃতি জানান। আবার আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক করে রেলপথ মন্ত্রণালয়। সেখানে অনুরোধ করলে মেয়র জমি দিতে সম্মত হন। সেই অবস্থান থেকে আবার পিছিয়ে যায় নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন। ফলে ওই দশমিক ৫১ একর জমি অধিগ্রহণ করতেই হবে। এজন্য অধিগ্রহণ বাবদ দরকার ৮৩ কোটি ৭ লাখ টাকা। কিন্তু বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ওই অঞ্চলে ৭ তলা ভবনও রয়েছে। ক্ষতিপূরণসহ এ খাতেই ধরতে হচ্ছে ১৩৩ কোটি ৫১ লাখ টাকা।

এ ছাড়া পাগলা, চাষাঢ়া ও নারায়ণগঞ্জে স্টেশন ভবন নির্মাণের সংস্থান থাকলেও শ্যামপুরে একটি স্টেশন ভবন ধরা হয়েছে। এ ছাড়া প্ল্যাটফরম ও শেড পরিমাণ বাড়ছে। তা ছাড়া তিনটি ফুটওভারব্রিজ, একটি দোতলা আরএনবি অফিস কাম ব্যারাক, একটি দোতলা জিআরপি অফিস কাম ব্যারাকের সংস্থান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তা ছাড়া গ্যাং ম্যানদের জন্য ৫টি গ্যাং হাট নির্মাণ করা হবে। এ রকম নানা কারণে ব্যয় যুক্ত করে ডিপিপি সংশোধন করা হচ্ছে। শিগগির প্রস্তাবটি অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হবে।

প্রসঙ্গত, এই প্রকল্পের দরপত্র জমাকালেই ঘটে খোদ রেল ভবনে পিস্তল উঁচিয়ে বাধা দানের ঘটনা। পাওয়ার কনস্ট্রাকশন করপোরেশন অব চায়না নামক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে কয়েকজন চীনা নাগরিক রাজধানীর রেল ভবনে দরপত্র জমা দিতে যান। অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে একদল সন্ত্রাসী পিস্তল উঁচিয়ে তাদের বাধা দেয়। পুলিশে খবর দিলে সন্ত্রাসী পালিয়ে যায়। যদিও পরে কাজটি পায় সেই চীনা নাগরিকের পক্ষের প্রতিষ্ঠান ‘পাওয়ার করপোরেশন অব চায়না’।

 

সর্বাধিক পঠিত