প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ড. খোন্দকার মেহেদী আকরাম: অক্সফোর্ড এবং স্পুটনিক-৫ ভ্যাকসিনের মিশ্র ডোজ ট্রায়াল শুরু হচ্ছে রাশিয়াতে, কেন?

ড. খোন্দকার মেহেদী আকরাম: কয়েকদিন আগেও যুক্তরাজ্য অভিযোগ করেছিলো যে রাশিয়া তাদের অক্সফোর্ড ভ্যাকসিনের তথ্য চুরির উদ্দেশ্যে সাইবার হ্যাকিং চালিয়েছে! তবে গত দুই মাসে অনেক কিছুর পরিবর্তন হয়েছে। গ্যামালিয়া তাদের স্পুটনিক-৫ ভ্যাকসিনটির ফেইজ-৩ ট্রায়ালের অন্তর্বর্তীকালীন ফলাফল প্রকাশ করেছে গত মাসে। তারা দেখিয়েছে তাদের ভ্যাকসিনটি ৯২ শতাংশ কার্যকরী। অন্যদিকে, অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনিকাও দেখিয়েছে যে তাদের ভ্যাকসিনটি কার্যকরী এবং নিরাপদ। দুটো পূর্ণডোজ ভ্যাকসিন প্রয়োগে অক্সফোর্ড ভ্যাকসিনের কার্যকারীতা এসেছে ৬২ শতাংশ। তবে প্রথমে অর্ধেকডোজ এবং পরবর্তীতে পূর্ণডোজ দেয়াতে ভ্যাকসিনটির কার্যকারীতা বেড়ে দাড়ায় ৯০ শতাংশ। তবে এই ৯০ শতাংশ কার্যকারীতার ফলাফলটি এসেছে মাত্র ২,৭০০ জনের উপর করা ট্রায়ালে যেখানে সবার বয়সই ছিলো ৬০ বছরের নিচে। এসব কারণেই আন্তর্জাতিক বাজারে অনুমোদন নিশ্চিত করতে অ্যাস্ট্রাজেনিকা এখন ভ্যাকসিনটির আরও একটি ট্রায়াল করতে চাচ্ছে। এই ট্রায়ালে তারা মূলত অর্ধেকডোজ/পূর্ণডোজ রেজিমেনটি পরীক্ষা করবে। কেন দুটি পূর্ণডোজ দেয়াতে তাদের ভ্যাকসিনটির কার্যকারীতা কমে গেলো, কিন্তু প্রথমে অর্ধেকডোজ এবং পরে পূর্ণডোজ দেয়াতে কার্যকারীতা এতো বেড়ে গেলো, এই প্রশ্নের উত্তর এখনও নিশ্চিত ভাবে জানা যায়নি। তবে ধারণা করা হচ্ছে যে ‘এন্টি-ভেক্টর ইমিউনিটি’র কারণে ভ্যাকসিনের কার্যকারীতায় এমন তারতম্য দেখা দিতে পারে।

অক্সফোর্ডের চ্যাডক্স-১ ভ্যাকসিনটি একটি অ্যাডিনোভাইরাস ভেক্টর ভিত্তিক ভ্যাকসিন। এক্ষেত্রে শিম্পাঞ্জির অ্যাডিনোভাইরাসের ভেতরে করোনাভাইরাসের স্পাইক প্রোটিনের জীন প্রবেশ করিয়ে দেয়া হয়। এখানে জীবিত অ্যাডিনোভাইরাস জীনটির বাহক হিসেবে কাজ করে। ভ্যাকসিন হিসেবে এই রুপান্তরিত অ্যাডিনোভাইরাসকে যখন মাংসপেশিতে ইনজেকশনের মাধ্যমে প্রবেশ করানো হয় তখন ঐ অ্যাডিনোভাইরাস শরীরে গিয়ে স্পাইক প্রোটিন তৈরি করে। পরবর্তীতে যার বিপরীতে আমাদের ইমিউন সিস্টেম প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলে। আর এভাবেই রুপান্তরিত অ্যাডিনোভাইরাস আমাদের ইমিউন সিস্টেমকে করোনাভাইরাসের বিপরীতে ট্রেইন-আপ করে। তবে এক্ষেত্রে আরেকটি ঘটনাও ঘটে সমান্তরালে। আমাদের ইমিউন সিস্টেম ভেক্টর অ্যাডিনোভাইরাসের বিপরীতেও রোগপ্রতিরোধী ব্যবস্থা গড়ে তোলে। একে বলে ‘এন্টি-ভেক্টর ইমিউনিটি’। এই ইমিউনিটি নিরীহ ভেক্টর-ভাইরাসকে খারাপ জীবানু ভেবে ধ্বংস করে ফেলে! আর এতে করে প্রথম ডোজে সমস্যা না হলেও পরবর্তী ডোজে রুপান্তরিত অ্যাডিনোভাইরাসটি অকার্যকর হয়ে পড়তে পারে। একারণেই এন্টি-ভেক্টর ইমিউনিটি এধরনের ভাইরাল ভেক্টর ভিত্তিক ভ্যাকসিনের জন্য একটা বড় অন্তরায়।

এটা একটা ইমিউনোলজিক্যাল সমস্যা, এবং এ বিষয়ে রাশিয়ার গ্যামালিয়া ইন্সটিটিউট আগে থাকতেই অবগত ছিলো কারন তাদের ভ্যাকসিনটিও অ্যাডিনোভাইরাস ভেক্টর ব্যাবহার করে তৈরি করা হয়েছে। অক্সফোর্ড এন্টি-ভেক্টর ইমিউনিটি সমস্যা এড়াতে তাদের ভ্যাকসিনে মানুষের অ্যাডিনোভাইরাস ব্যবহার না করে, ব্যবহার করেছে শিম্পাঞ্জির অ্যাডিনোভাইরাস। কারণ আমাদের শরীরে সাধারনত শিম্পাঞ্জি অ্যাডিনোভাইরাসের বিপরীতে কোন ইমিউনিটি থাকে না। তবে ভ্যাকসিনের মাধ্যমে প্রথম ডোজ অ্যাডিনোভাইরাস প্রবেশ করানোতে আমাদের ইমিউন সিস্টেম এই শিম্পাঞ্জি অ্যাডিনোভাইরাসের বিপরীতেও ইমিউনিটি তৈরি করতে পারে। সেক্ষেত্রে প্রথমে বেশি ডোজের ভাইরাস প্রবেশ করালে শরীরে শক্তিশালী এন্টি-ভেক্টর ইমিউনিটি তৈরি হতে পারে, যা পরবর্তিতে দ্বিতীয় ডোজের ভাইরাসকে নিস্ক্রিয় করে ফেলতে পারে। তবে প্রথমে কম ডোজ দিলে দুর্বল এন্টি-ভেক্টর ইমিউনিটি তৈরি হয় যা হয়তো দ্বিতীয় ডোজের অ্যাডিনোভাইরাস ভেক্টরকে তেমন প্রভাবিত নাও করতে পারে। ল্যানসেট পেপারটিতে (দি ল্যানসেট, ডিসেম্বর ২০২০) এরকম ঘটনা অক্সফোর্ড ভ্যাকসিনের বেলায় ঘটছে বলেই কিছুটা ধারণা দেখা দিয়েছে। এর স্বপক্ষে এখনও অবশ্য কোনো পরীক্ষালব্ধ প্রমাণ নেই।

অন্যদিকে, এন্টি-ভেক্টর ইমিউনিটি সমস্যা এড়াতে রাশিয়া ব্যাবহার করেছে দুটি ভিন্ন ধরনের হিউমেন অ্যাডিনোভাইরাস। প্রথম ডোজে তারা ব্যবহার করেছে বিরল প্রজাতির অ্যাডিনোভাইরাস (অ্যাড-২৬) যার বিপরীতে আমাদের শরীরে ইমিউনিটি খুবই কম। আর দ্বিতীয় ডোজে ব্যবহার করেছে অতিসাধারণ অ্যাডিনোভাইরাস (অ্যাড-৫) ভেক্টর। এতে করে প্রথম ডোজে ভেক্টরের বিপরীতে তৈরি হওয়া ইমিউনিটি দ্বিতীয় ডোজে দেয়া অ্যাডিনোভাইরাসের বিপরীতে কার্যকরী হবে না। আর এর ফলেই এন্টি-ভেক্টর ইমিউনিটি স্পুটনিক-৫ ভ্যাকসিনটির কার্যকরীতায় তেমন কোনো বিরুপ প্রভাব ফেলবে না। এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত ফলাফলও তাই প্রমাণ করে। একই ভেক্টর দুইবার ব্যবহার করাতে অক্সফোর্ড ভ্যাকসিনের কার্যকারীতা এসেছে যেখানে ৬২ শতাংশ সেখানে দুই ধরনের ভেক্টর ব্যবহার করাতে স্পুটনিক-৫ ভ্যাকসিনের কার্যকারীতা এসেছে ৯২ শতাংশ। এখন অ্যাস্ট্রাজেনিকা দেখতে চাচ্ছে যদি প্রথম ডোজে তাদের শিম্পাঞ্জি অ্যাডিনোভাইরাস ভ্যাকসিন এবং দ্বিতীয় ডোজে রাশিয়ার হিউমেন অ্যাডিনোভাইরাস ভ্যাকসিন দেয়া হয় তাহলে টিকার কার্যকারীতা কেমন হবে।

রাশিয়ার ভ্যাকসিনের ফলাফল এবং ইমিউনোলজির প্রাথমিক ভিত্তির উপর নির্ভর করে বলা যায় যে প্রথম ডোজে শিম্পাঞ্জি এবং পরবর্তী ডোজে হিউমেন অ্যাডিনোভাইরাস ভেক্টর ব্যবহার করলে এন্টি-ভেক্টর ইমিউনিটিকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া সম্ভব এবং এতে করে ভ্যাকসিনের কার্কারীতাও বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে। যদি এই ট্রায়ালে দেখা যায় যে এই শিম্পাঞ্জি/হিউমেন মিশ্র ভেক্টরের ভ্যাকসিন ডোজ কার্যকরী তাহলে সেটা হবে একটা দারুন ব্যাপার। কারণ সেক্ষেত্রে ব্রিটেন এবং রাশিয়ার অ্যাডিনোভাইরাস ভেক্টর বেইজড ভ্যাকসিনের প্রাথমিক এবং বুস্টার ডোজের জন্য একই কোম্পানি থেকে ভ্যাকসিন সরবরাহের প্রয়োজন পরবে না। এতে করে গোটা বিশ্বের জন্য বিপুল পরিমাণ ভ্যাকসিন সরবরাহ অপেক্ষাকৃত সহজ হবে। অন্যদিকে দুটি ভিন্ন ধরনের ভেক্টর ব্যবহারে অক্সফোর্ড ভ্যাকসিনটিরও কার্যকারীতা আশানুরূপ হবে। এখন দেখার পালা ব্রিটেন-রাশিয়া ভ্যাকসিন কোলাবরেশন কেমন ভাবে এগোয়। এই কোলাবরেশন করোনা মহামারীকে দমন করার জন্য বেশ বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

লেখক : এমবিবিএস, এমএসসি, পিএইচডি,সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট, শেফিল্ড ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাজ্য।

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত