প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মোস্তফা কামাল: শেখ মুজিব বললেন, দুর্ভিক্ষ চলছে, আমরা খুব খারাপ অবস্থার মধ্যে আছি

মোস্তফা কামাল: নির্ধারিত সময়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিব হাজির হলেন হোয়াইট হাউজে। প্রথমবারের মতো হোয়াইট হাউজে বাংলাদেশের কোনো প্রধানমন্ত্রী পা রাখলেন। তাকে স্বাগত জানালেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ড। তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানিয়ে বললেন, আপনাকে এখানে পেয়ে ভালো লাগছে। এই প্রথম বাংলাদেশের সরকার প্রধানের সঙ্গে একজন মার্কিন প্রেসিডেন্টের দেখা হলো। শেখ মুজিব বললেন, হ্যাঁ। আমার জনগণের বিষয়ে আপনার সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পেয়ে আমিও খুশি। জেরাল্ড ফোর্ড বললেন, সব দেশের জন্যই কিছু করতে পেরে আমরা খুশি। শেখ মুজিব বললেন, আমার দেশের ইতিহাস আপনি জানেন। যুদ্ধের পরের অবস্থা ১৯৪৫ সালের জার্মানির মতোই হয়েছিলো। যে সাহায্য আপনি আমাদের করেছেন তার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ জানাতে চাই। যুদ্ধের আগে ভারত দ্বারা আমরা বিভক্ত ছিলাম। রাজধানী ছিলো পশ্চিমে। ১৯৪৭ সালে বাংলাদেশ এতো খারাপ ছিলো না। সংসদে ৭০ শতাংশ প্রতিনিধিই পশ্চিম থেকে এসেছে। আমিও সংসদে ছিলাম। প্রশাসনের বেশির ভাগই যুদ্ধে ধ্বংস হয়েছে। নয় ভারতে চলে গেছে।
পরে আমরা পশ্চিমাদের থেকে বেরোতে পারিনি। প্রত্যেকেই ভুগছে, প্রথমে যুদ্ধ তারপর খরা, তারপর বন্যা। তবে আপনাদের মতো কিছু দেশের সাহায্যের বদৌলতে কেউ অবশ্য অভুক্ত নেই। সব কিছুই আমাদের আমদানি করতে হচ্ছে। মুদ্রাস্ফীতি, খরা, বন্যা দেখা দেওয়ার আগে অবশ্য আমরা বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনতে শুরু করেছিলাম। বাংলাদেশের সম্পদ আছে। বন্যাটা যদি আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি, ৫ বছরের মধ্যে আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে যাবো। আমরা ধান, পাট, গম ও তামাক উৎপাদন করি। গ্যাসের বিরাট মজুদ আছে। দশ থেকে বিশ ট্রিলিয়ন কিউবিক ফুট। সারে আমরা প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ। তবে আমাদের কারখানাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নিজস্ব গ্যাস আর কারখানাগুলো দিয়ে আমরা সার রপ্তানি করা শুরু করতে পারি। অবশ্য মুদ্রাস্ফীতিটা যদি না থাকে। জেরাল্ড ফোর্ড বললেন, ওপেক দেশগুলোকে আমরা বলে আসছি, আপনাদের মতো ইন্ডাস্ট্রিয়াল দেশগুলোর সমস্যার মূল যদি হয় তাদের উচ্চমূল্য, তাহলে এই উচ্চমূল্য পতন ডেকে আনবে। ওটা কোনো কাজে আসবে না।
জেরাল্ড ফোর্ডের বক্তব্যের সঙ্গে সহমত পোষণ করে শেখ মুজিব বললেন, তেলের মূল্যের কারণে আমরা ভীষণ ভুগছি। ওপেক দেশগুলোকে বুঝতে হবে যে তারা সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দিচ্ছে। জেরাল্ড ফোর্ড যোগ করলেন। শেখ মুজিব বললেন, আমাদের দুর্ভিক্ষ চলছে। আমরা খুব খারাপ অবস্থার মধ্যে আছি। লোকজন যাতে অভুক্ত না থাকে তার জন্য এলাকায় এলাকায় আমি লঙ্গরখানা খুলেছি। জেরাল্ড ফোর্ড বললেন, বাংলাদেশ কনসোর্টিয়ামে কিছু ধনী তেল উৎপাদককে রাখলে ভালো হয় না। তাদের একটা সুযোগ হবে। শেখ মুজিব বললেন, কনসোর্টিয়ামে আবুধাবি ও ইরান যোগ দিয়েছে। মি. প্রেসিডেন্ট শস্য আর খাদ্যে আমার এখনই সংকট চলছে। জেরাল্ড ফোর্ড বললেন, আড়াই লাখ টন খাদ্যশস্য আপনাকে দেওয়া হয়েছে। আমাদের খাদ্য চিত্রটা দেখার পর আর কী করা যায় আমরা দেখবো। আমরা বেশি ফলন আশা করেছিলাম। কিন্তু আমাদের বসন্ত ছিলো সিক্ত। তারপর গেলো খরা। আর এখন চলছে ঠাণ্ডা। ফলে আমাদের ফসল উৎপাদন হতাশাব্যঞ্জক। এখন আমাদের দেখতে হবে আমাদের কী আছে। যা আছে তাই দিয়ে সবচেয়ে ভালো কী করা যায় তা আমরা দেখবো।

(উপন্যাস ১৯৭৫, মোস্তফা কামাল), অন্যপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত হবে ১৬ ডিসেম্বর। ফেসবুক থেকে

সর্বাধিক পঠিত