প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

প্রণোদনার অর্থ বিতরণে হ-য-ব-র-ল

ডেস্ক রিপোর্ট : করোনাভাইরাসের কারণে অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকট মোকাবিলায় সরকার যে ১ লাখ ১১ হাজার ১৩৭ কোটি টাকার ২০টি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে, তা বিতরণে হ-য-ব-র-ল অবস্থা তৈরি হয়েছে। কিছু প্যাকেজ বাস্তবায়িত হচ্ছে ব্যাংক খাতের মাধ্যমে। কিছু হচ্ছে মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মাধ্যমে। আর কিছু প্যাকেজের বাস্তবায়ন শুরুই হয়নি। ব্যাংক খাতের প্যাকেজ থেকে বড় ব্যবসায়ীরা ঋণ নিতে পারলেও ক্ষুদ্র্র, মাঝারি ও ছোট উদ্যোক্তারা খুবই কম পরিমাণ নিতে পারছেন। ফলে নির্ধারিত ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে দুই বার সময় দেয়া হয়েছিল ব্যাংকগুলোকে। কিন্তু সময় বাড়িয়েও লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেকও বিতরণ করা যায়নি। অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র, মাঝারি ও কুটিরশিল্পে ঋণ বিতরণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা মানছে না ব্যাংকগুলো।

এ ছাড়া স্বাস্থ্য খাতে দেয়া প্রণোদনা চলছে ধীরগতিতে। শুরু হয়নি কর্মসৃজন কার্যক্রমের বিপরীতে ঋণ। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ প্যাকেজগুলোর হালনাগাদ চিত্র তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে একটি প্রতিবেদন পাঠিয়েছে, তাতে এসব চিত্র দেখা গেছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, এমন নয় যে ব্যাংকগুলো ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি গ্রাহকদের খুঁজে পাচ্ছে না। বাস্তবতা হচ্ছে- ব্যাংকগুলো এসব ছোট উদ্যোক্তাদের ঋণ দিতে আগ্রহী নয়। তাই খাত দু’টির উদ্যোক্তা গ্রাহকরা বাধ্য হয়ে এখন ব্যাংকের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন।

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, বড়রা সব সময়ই ঋণে আগ্রহী। এর সুফল পাচ্ছে একটি খাত। তবে ক্ষুদ্র ও মাঝারিদের নিয়ে কারও নজর নেই। এদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। কারণ, ক্ষুদ্র ও মাঝারিরাই সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে।

পরিসংখ্যান মতে, ছোট উদ্যোক্তাদের অনেকে ব্যাংকে গিয়ে ঋণ পাচ্ছেন না। আবার একটি অংশ প্রণোদনার ঋণ সম্পর্কে বিস্তারিত জানেও না। কিছু প্রতিষ্ঠান বন্ধও হয়ে গেছে। এসব কারণে ছোট আকারের ঋণ বিতরণ হচ্ছে খুব কম। কুটির, অত্যন্ত ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারিশিল্প (সিএমএসএমই) খাতের জন্য ঘোষিত ২০ হাজার কোটি টাকা থেকে গত অক্টোবর পর্যন্ত বিতরণ হয়েছে মাত্র ৬ হাজার ২৮৭ কোটি টাকা। কৃষক ও নিম্নআয়ের পেশাজীবীদের তহবিল থেকে বিতরণেও তেমন অগ্রগতি নেই।
অন্যদিকে চাহিদা বেশি থাকায় বড় শিল্পের জন্য ঘোষিত তহবিলের আকার এরই মধ্যে দু’দফা ১০ হাজার কোটি টাকা বাড়িয়ে ৪০ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, ২২শে অক্টোবর পর্যন্ত মাত্র ২৮.৩৭ শতাংশ ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংক লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য ব্যাংকগুলোকে ৩০শে নভেম্বর পর্যন্ত আবারো সময় দেয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে, প্রথমে ব্যাংকগুলোকে ৩১শে আগস্ট পর্যন্ত সময় বেঁধে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু ওই সময় পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৯ শতাংশ ঋণ বিতরণ করেছিল ব্যাংকগুলো। এর মধ্যে বিদেশি ব্যাংকসহ প্রায় ২৪টি ব্যাংক এক টাকাও ঋণ বিতরণ করেনি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করছে ঋণ বিতরণে ব্যাংকগুলোর এ ব্যর্থতার ফলে অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র, মাঝারি ও কুটিরশিল্প খাতে কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন ও সেবা প্রসারে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ব্যাংকগুলো বড়দের ঋণ বিতরণে যতটা না আগ্রহী, ছোটদের ঋণ বিতরণে ততটাই অনাগ্রহী। ছোট ঋণ বিতরণে ব্যাংকগুলোর পরিচালন ব্যয় বেশি হওয়ার অজুহাতে ব্যাংকগুলো তাই ছোট ঋণ বিতরণে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। অথচ বড় ঋণের চেয়ে ছোট ঋণে আদায়ের হার অনেক বেশি। কারণ ছোট উদ্যোক্তারা ব্যাংকের টাকা মেরে দেন না। যতটুকু খেলাপি হয় তা প্রকৃত ব্যবসায়ে লোকসানের কারণেই হয়। ব্যাংকগুলো যেন ছোট উদ্যোক্তাদের ঋণ দিতে বাধ্য হয় সে জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংককে আরো কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

করোনাভাইরাসের কারণে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার করতে সরকার ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজের মধ্যে সবচেয়ে বড় হলো ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প ও সেবা খাতের জন্য। এসব প্রতিষ্ঠানের জন্য শুরুর দিকে ৩০ হাজার কোটি টাকা চলতি মূলধন ঘোষণা দেয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তা দাঁড়িয়েছে ৩৩ হাজার কোটি টাকায়।
বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ১ হাজার ৭৮৬টি প্রতিষ্ঠানের ২৩ হাজার ১৭৯ কোটি টাকা ঋণ অনুমোদন হয়েছে। এ প্যাকেজের আওতায় ৯ শতাংশ সুদের মধ্যে ৪.৫ শতাংশ ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠান দেবে, বাকিটা বহন করবে সরকার। গত ৪ঠা মে থেকে এই প্যাকেজ বাস্তবায়ন শুরু হয়। প্রণোদনা প্যাকেজের মধ্যে ২০ হাজার কোটি টাকারটি দ্বিতীয় বৃহত্তম। ক্ষুদ্র (কুটিরশিল্পসহ) ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর চলতি মূলধন দিতে গঠন করা হয়েছে এটি। এর সুদহারও ৯ শতাংশ, তবে গ্রাহকদের সুদের ভাগ ৪ শতাংশ। বাকি ৫ শতাংশের বহনকারী সরকার। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ১৫ই আগস্ট পর্যন্ত তথ্য হচ্ছে, ৬ হাজার ২০০ প্রতিষ্ঠান ঋণ পেয়েছে ১ হাজার ৮৭২ কোটি টাকা। মোট ৫৩ হাজার কোটি টাকার দুই প্যাকেজের এই হলো সংক্ষিপ্ত চিত্র।

রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের শ্রমিক-কর্মচারীদের এপ্রিল-জুন সময়ের বেতন-মজুরি দিতে প্রথম গঠিত এই প্যাকেজ ছিল ৫ হাজার কোটি টাকার। ২ শতাংশ সার্ভিস চার্জের মাধ্যমে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে কারখানার মালিকেরা ঋণ নিয়ে বেতন-মজুরি দিয়েছেন। রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল (ইডিএফ) সুবিধা ৩৫০ কোটি ডলার থেকে ৫০০ কোটি ডলারে উন্নীত করা হয়। বিতরণ করা হয়েছে ৭৬ কোটি ৫২ লাখ ৫০ হাজার ডলার। ১০ টাকা কেজি দরে চাল বিক্রি বাবদ ২৫১ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। এই প্যাকেজের আওতায় করোনাভাইরাসে ক্ষতিগ্রস্ত নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীর মধ্যে ৩ মাসে ৭৪ হাজার ৮০০ টন চাল দেয়ার কাজ শেষ করেছে খাদ্য অধিদপ্তর।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী ‘প্রাক-জাহাজিকরণ ঋণ পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচি’ নামক প্যাকেজে রাখা হয় ৫ হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংককে নতুন এই ঋণ কর্মসূচি চালু করতে বলা হয় ৭ শতাংশ সুদে। এর বাস্তবায়ন শুরু হয় ১৩ই এপ্রিল থেকে। কিন্তু এ থেকে পুনঃঅর্থায়ন নিতে আবেদন জমা পড়েছে মাত্র একটি। অথচ ৩০টি ব্যাংক পুনঃঅর্থায়ন নিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। এদিকে ৫ হাজার কোটি টাকার কৃষি পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচির বাস্তবায়ন চিত্রও ভালো নয়। ৭ই আগস্ট পর্যন্ত ৪৯৭ কোটি টাকা দেয়া হয়েছে।

নিম্নআয়ের পেশাজীবী, কৃষক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য রয়েছে ৩ হাজার কোটি টাকা তহবিল। এ পর্যন্ত ২৬৬ কোটি টাকা দেয়া হয়েছে। তবে কত কৃষক বা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ঋণ পেয়েছেন, সে তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংক অর্থ বিভাগকে জানাতে পারেনি।

এমএফআইগুলোকে ঋণ দেয়ার ব্যাপারে ব্যাংক রক্ষণশীল কিনা, এক ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, মোটেও তা নয়। যোগ্য এমএফআইকে ঋণ দেয়ার জন্য আমরা বসে আছি।
এদিকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ২০২০ সালের এপ্রিল-মে মাসে স্থগিতকৃত ঋণের আংশিক সুদ মওকুফ বাবদ সরকারের ভর্তুকি হিসেবে একটি প্যাকেজ রয়েছে ২ হাজার কোটি টাকার। এ পর্যন্ত ৪৭টি আবেদন জমা পড়লেও কেউ টাকা পায়নি।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত দু’টি প্যাকেজ রয়েছে। একটি হচ্ছে, কোভিড-১৯ এর কারণে সরাসরি কাজে নিয়োজিত সরকারি কর্মচারীদের সংক্রমিত বা মৃত্যুর ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ। এ জন্য প্রণোদনা বাবদ ৭৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

সরাসরি কোভিড-১৯-এর সময়ে কাজের সঙ্গে জড়িত থেকে যেসব সরকারি কর্মচারী সংক্রমিত বা মৃত্যুবরণ করেন, গ্রেড ভেদে তারা আক্রান্তের ক্ষেত্রে ৫ লাখ থেকে ১০ লাখ এবং মারা যাওয়ার ক্ষেত্রে ২৫ লাখ থেকে ৫০ লাখ টাকা পাবেন। এ পর্যন্ত এক কোটি টাকা পেয়েছে দু’টি পরিবার।
চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী যারা চিকিৎসা কাজে সরাসরি নিয়োজিত, তাদের জন্য ১০০ কোটি টাকার একটি প্যাকেজ রয়েছে। বলা হয়েছে, ২ মাসের মূল বেতনের সমান সম্মানী পাবেন। এ থেকে কেউ কোনো টাকা পাননি।

কর্মসৃজন কার্যক্রম শুরুই হয়নি। এই প্যাকেজ ২ হাজার কোটি টাকার। কৃষি, ক্ষুদ্র ব্যবসা, কুটিরশিল্প, বিদেশফেরত শ্রমিকদের ৪টি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ঋণ দেয়া হবে। ৫০০ কোটি টাকা করে পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক, প্রবাসীকল্যাণ ব্যাংক, কর্মসংস্থান ব্যাংক এবং পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশনকে (পিকেএসএফ) টাকা দেবে সরকার। তারা স্বল্প সুদে গ্রাহকদের ঋণ দেবে। পিকেএসএফ ও অন্য তিন ব্যাংক ২৫০ কোটি করে ১ হাজার কোটি টাকা পেয়েছে। প্রতিবেদন বলছে, এ থেকে বিতরণ কার্যক্রম এখনো শুরু হয়নি।

এদিকে ৫০ লাখ দরিদ্র পরিবারকে আড়াই হাজার টাকা করে দিতে ১ হাজার ২৫৮ কোটি টাকার প্যাকেজ রয়েছে। ১৫ লাখ পরিবার এখনো টাকা পায়নি। বিনা মূল্যে খাদ্যসামগ্রী বিতরণের জন্য ২ হাজার ৫০৩ কোটি টাকার একটি প্যাকেজ রয়েছে, যা থেকে ৯৪৪ কোটি টাকার চাল, ৯৫ কোটি টাকার নগদ এবং ২৭ কোটি টাকার শিশুখাদ্য বিতরণ করা হয়েছে।

কৃষকের উৎপাদিত ধান-চালের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে এবং বাজারে চালের দাম স্থিতিশীল রাখতে সরকারি সংগ্রহ ও বিতরণ লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হয়েছে ২ লাখ টন। এতে ৮৬০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১ লাখ ৭০ হাজার টন কেনা হয়েছে বলে অর্থ বিভাগের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি আবুল কাসেম খান বলেন, করোনার কারণে অনেকেই উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে, সবাই খরচ সমন্বয়ের চেষ্টা করছে। এ কারণে বড়দের আরো সহায়তা লাগবে। আর এসএমই খাত ও ক্ষুদ্রদের জন্য যে প্রণোদনা দেয়া হয়েছে, তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না। এ জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংককে তদারকি বাড়াতে হবে। মানবজমিন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত