প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

পাঁচ মাসে ২৩% কমেছে বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্য

বণিক বার্তা: ভারত বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহৎ বাণিজ্যিক অংশীদার। প্রতিবেশী এ দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের বার্ষিক আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের আকার প্রায় হাজার কোটি ডলার, যার ৯০ শতাংশই আবার বাংলাদেশের আমদানি। কিন্তু বৈশ্বিক মহামারী কভিড-১৯ দুই দেশের মধ্যকার এ বাণিজ্যে দীর্ঘমেয়াদি গতিহীনতা নিয়ে এসেছে। ভারতের শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বাণিজ্য পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের এপ্রিল-আগস্ট পাঁচ মাসে দুই দেশের মোট বাণিজ্য কমেছে ২৩ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ।

দেশে নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে চলতি বছরের ২৬ মার্চ থেকে সাধারণ ছুটি শুরু হলে সব ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থমকে যায়। প্রায় বন্ধ হয়ে যায় স্থলবন্দরগুলো দিয়ে আমদানি-রফতানি বাণিজ্য। এর পেছনে বড় কারণ ছিল ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের কড়া লকডাউন।

ভারতের শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বাণিজ্য পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছর এপ্রিল-আগস্ট সময়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ২৭৩ কোটি ৫০ লাখ ২০ হাজার ডলারের বাণিজ্য হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ৩৫৫ কোটি ৩৮ লাখ ২০ হাজার ডলার। এ হিসেবে দুই দেশের মোট বাণিজ্য কমেছে ২৩ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ। এ পাঁচ মাসে বাংলাদেশ থেকে ভারতে আমদানি বা দেশটিতে বাংলাদেশের রফতানি কমেছে ৪৬ দশমিক ৮৬ শতাংশ। অন্যদিকে ভারত থেকে বাংলাদেশে রফতানি বা বাংলাদেশের আমদানি কমেছে ১৯ দশমিক ৬৮ শতাংশ।

ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক রয়েছে বাংলাদেশের এমন ব্যবসায়ীরা বলছেন, প্রতিবেশী দেশটির সঙ্গে বাণিজ্য কমে যাওয়ার মূল কারণ করোনার আঘাত। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে করোনার প্রকোপ কমেনি। তাই তারা আগের মতো বাংলাদেশে পণ্য পাঠাতে কিংবা বাংলাদেশ থেকে পণ্য নিতে দ্বিধা-জড়তা পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি। শুধু তা-ই নয়, ভারতের অন্যান্য রাজ্যের সঙ্গেও যোগাযোগ কার্যত বন্ধ রেখেছে পশ্চিমবঙ্গ।

ভারত-বাংলাদেশ বাণিজ্যের ৮০ থেকে ৯০ ভাগই হয়ে থাকে পশ্চিমবঙ্গ দিয়ে। আমদানি ও রফতানি বাণিজ্য পরিচালনায় বাংলাদেশ-ভারত ঘোষিত স্থলবন্দরের সংখ্যা ২৩টি। এর মধ্যে বর্তমানে চালু আছে ১১টি। চালু এসব স্থলবন্দরের ছয়টিই পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে। বন্দরগুলো হচ্ছে বেনাপোল, হিলি, ভোমরা, বুড়িমারী, সোনামসজিদ ও বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর। করোনা পরিস্থিতির কারণে এসব বন্দর দিয়ে আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের গতি অনেক কমে গিয়েছে বলে জানিয়েছেন ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (আইবিসিসিআই) সদস্যরা।

আইবিসিসিআই ভাইস প্রেসিডেন্ট শোয়েব চৌধুরী বলেন, প্রধান স্থলবন্দরগুলো এখন খোলা। ওইদিকের লোকজন আমাদের তুলনায় বেশি আক্রান্ত। তাই ভারতীয়দের ক্ষেত্রে জড়তা, ভয়ভীতি, প্যানিক আছে। এসবের কারণে তারা এখনো ধীরগতিতে চলছে।

আইবিসিসিআই সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশে কভিড-১৯ মহামারীর শুরু থেকে গত জুন পর্যন্ত বেনাপোল বন্দরের বনগাঁও পৌরসভায় পার্কিং সিন্ডিকেটের কারণে মারাত্মক হয়রানির শিকার হতে হয়েছে বাংলাদেশের ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের। ওই সময়ে বনগাঁওয়ে প্রায় তিন হাজার ট্রাক আটকে ছিল। পরে রেল কার্গো ব্যবহার করে আমদানি পুনরায় শুরু হওয়ায় পণ্য আটকে থাকার সময় ৯ থেকে ১০ দিনে নেমে এসেছে। বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে ভারতে রফতানি বেড়েছে, আরো বাড়বে এমন আভাসই পাওয়া যাচ্ছে। প্রতিদিন গড়ে রফতানির পণ্য ভর্তি ২০০ ট্রাক বাংলাদেশ থেকে ভারতে প্রবেশ করছে।

বাংলাদেশ ভারতে রফতানি করে এমন পণ্যের মধ্যে আছে পোশাক শিল্পের ওভেন ও নিটওয়্যার, হোম টেক্সটাইল, কৃষিপণ্য, হিমায়িত খাদ্য, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, ফুটওয়্যার, কাঁচা পাট, পাটজাত পণ্য ও বাইসাইকেল। অন্যদিকে বাংলাদেশ ভারত থেকে আমদানি করে এমন পণ্যের মধ্যে আছে পেঁয়াজসহ মসলাজাতীয় পণ্য, তুলা, সুতা, সিরিয়াল, যানবাহন, সবজি, প্লাস্টিক, লবণ, বৈদ্যুতিক পণ্য, দুগ্ধজাত পণ্য, ফল ও কাগজসহ আরো অনেক পণ্য।

আইবিসিসিআই জানিয়েছে, ২০১৭-১৮ থেকে ২০১৯-২০ অর্থবছর পর্যন্ত বেনাপোল বন্দর দিয়ে ৬৮ লাখ টন পণ্য ভারত থেকে আমদানি করেছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশী মুদ্রায় আমদানি হয়েছে ৬৫ হাজার কোটি টাকার পণ্য। অন্যদিকে একই সময়ে বাংলাদেশ থেকে ভারতে রফতানি হয়েছে ১১ লাখ টন পণ্য। বাংলাদেশী মুদ্রায় রফতানি হয়েছে ১৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকার পণ্য।

আইবিসিসিআই অবৈতনিক জয়েন্ট সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল ওয়াহেদ বণিক বার্তাকে বলেন, দুই দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য এখনো স্বাভাবিক হয়নি, মোটামুটি চলছে। আমাদের আমদানি বেশি হচ্ছে, রফতানি কমে গেছে। পণ্য নিতে ভারতীয়দের দ্বিধা যেমন আছে, তেমনি ভারতে বিশেষ করে কলকাতা থেকে আন্তঃজেলা যোগাযোগ এখনো বন্ধ আছে। ফলে এখনো পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি, বরং খারাপের দিকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। করোনাকালে তাই বাণিজ্য কমাই স্বাভাবিক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে জুন সময়ে ভারতে পণ্য রফতানির বিপরীতে বাংলাদেশে এক্সপোর্ট রিসিপ্ট বা অর্থ এসেছে ৪৭ কোটি ৩০ লাখ ডলার। ২০২০ সালের একই সময়সীমায় ভারতে রফতানির বিপরীতে বাংলাদেশে অর্থ এসেছে ৩৫ কোটি ৭০ লাখ ডলার। এ হিসেবে চলতি বছরের প্রথমার্ধে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ভারতে পণ্য রফতানি করে বাংলাদেশের আয় কমেছে ২৪ শতাংশ।

বাংলাদেশের মোট আমদানির প্রায় ১৪ শতাংশের উৎস দেশ প্রতিবেশী ভারত। বাংলাদেশ ব্যাংকের আমদানি তথ্যে এক্ষেত্রেও নেতিবাচক ধারা প্রকাশ পাচ্ছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ সময়ে ভারত থেকে পণ্য আমদানির বিপরীতে বাংলাদেশের ১৭১ কোটি ৮ লাখ ডলার অর্থ ব্যয় হয়েছে। এর পরের প্রান্তিক এপ্রিল থেকে জুনে আমদানির বিপরীতে অর্থ ব্যয় হয়েছে ৮৮ কোটি ৫২ লাখ ডলার, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ১৮৩ কোটি ৪৬ লাখ ডলার। সে হিসেবে এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে ভারত থেকে আমদানি ৫১ শতাংশ কমেছে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত