প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আবু হাসান শাহরিয়ার: বিষয়, ধর্ষণ অথবা সংবিধানের উনিশ

আবু হাসান শাহরিয়ার: যখন আমি ‘আমাদের সময়’-এর সম্পাদক, মাসে এক-দুবার ‘বিকল্প সম্পাদকীয়’ নামে স্বদেশ-সমকাল বিষয়ক গদ্য লিখতাম দৈনিকটিতে। ছাপা হতো প্রথম পৃষ্ঠায়। দীক্ষিত পাঠকের অনুরোধে পরে একটি অনলাইল নিউজ পোর্টালেও লিখেছি। ফেসবুকে আজই প্রথম। আজকের লেখার শিরোনাম— ‘বিষয় : ধর্ষণ অথবা সংবিধানের উনিশ’।

** বিষয় : ধর্ষণ অথবা সংবিধানের উনিশ

থানায় থানায় ওসি প্রদীপের মতো বর্বরদের বহাল রেখে মৃত্যুদণ্ডের চেয়ে বড়ো কোনও দণ্ডযুক্ত আইন পাশ হলেও দেশ ধর্ষকমুক্ত হবে না। শিশুশ্রমও তো নিষিদ্ধ;— সমাজ থেকে এই অমানবিকতা দূর হয়েছে কি? তথাকথিত সুশীলদের দ্বারা গৃহশিশুকর্মী নির্যাতনের ঘটনা কি ধর্ষণের চেয়ে কম মর্মান্তিক? প্রায়ই কি আমরা এ জাতীয় খবরও পড়ি না, দেখি না? আইন কার্যকরে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানগুলোয় সততা ও স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠিত না-হলে কিংবা নারীকে তেঁতুলের সঙ্গে তুলনাকারী ধর্মান্ধরা ‘স্পর্শকাতরতা’ নামক উদ্ভট-একরৈখিক আব্দারে বার বার ছাড় পেলে যত উঁচুই হোক কারাগারের পাঁচিল, ৯৫% ধর্ষক ওই পাঁচিলের বাইরেই থেকে যাবে।

একতরফা সব সঙ্গমই ধর্ষণ (ধর্ষকের কাছে যদি কাগুজে বৈধতাও থাকে)। চিন্তাপ্রতিবন্ধী পুরুষতান্ত্রিক সমাজে প্রতিদিনই ঘরে ঘরে ধর্ষিত হচ্ছে নারীরা। শুধু বিষমকামে নয়, একপক্ষের ইচ্ছেয় বলপূর্বক সংঘটিত সমকামও ধর্ষণ। মিডিয়াসূত্রে সবারই জানা— মাদ্রাসাগুলোয় সমকামী ধর্ষণ একটি নৈমত্তিক ঘটনা। নারীদের ক্ষেত্রে পোশাকের কুতর্ক করলেও এ ব্যাপারে ধর্মান্ধ মোল্লাদের কানে তুলো, মুখে কুলুপ।তথাপ্রগতিশীলদের মতো শুধু মাদ্রাসাকেই দোষ দেব না; একসময় ক্যাডেট কলেজগুলোরও এই বদনাম ছিল। গণমানসিকতার পরিবর্তন না-ঘটলে প্রদীপের মতো উর্দিধারীরা গুমখুনের মতো প্রাণঘাতী ধর্ষণ-মামলারও ভয় দেখিয়ে অবৈধ অর্থ-উপার্জনের পথে হাঁটবে। অস্বীকার করার জো নেই, থানায় থানায় প্রদীপের মতো অনৈতিক পুলিশের সংখ্যা অনেক। বাহ্যত এ দায় পুলিশের একার মনে হলেও কার্যত এর জন্য আমাদের নষ্ট রাজনীতি দায়ী। যখন যারা শাসক, তখন তারা শঙ্খ ঘোষের কবিতার সেই কালজয়ী পঙ্‌ক্তিটির সত্যতায় ‘পুলিশ কখনো কোনো অন্যায় করে না, তারা যতক্ষণ আমার পুলিশ’ মর্মে পুলিশকে চরদখলের লাঠিয়ালের মতো ব্যবহার করে আসছে যুগ যুগ ধরে। ফলত, মূঢ়জনপদে জননিরাপত্তা নয়, শাসককে নৈতিক-অনৈতিক বিবিধ সুরক্ষা দেওয়াই পুলিশের প্রধান কাজ। ‘মহাপৃথিবী’র ‘আদিম দেবতারা’ কবিতায় জীবনানন্দ দাশ এই সামাজিক ব্যাধির চরিত্রচিত্রণ করে গেছেন— “স্থূল হাতে ব্যবহৃত হয়ে— ব্যবহৃত— ব্যবহৃত— ব্যবহৃত— ব্যবহৃত হয়ে/ব্যবহৃত— ব্যবহৃত—… /ব্যবহৃত হয়ে শুয়োরের মাংস হয়ে যায়।”

আইনশৃঙ্খলার সঙ্গে জড়িত লোকজনের সততা ও নৈতিকতার মানোন্নয়ন ছাড়া ধর্ষকের মৃত্যদণ্ড আইনি বৈধতা পেলে ধর্ষণ হ্রাস তো হবেই না, ‘ভিক্টিম’দের ধর্ষণোত্তর নিহত হওয়ার ঝুঁকি বাড়বে।

চিরদিনের সত্য এই যে, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য সব অপরাধের বীজতলা। ধর্ষণেরও। সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের সংবিধান ১৯ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রকে মানুষে মানুষে সামাজিক ও অর্থনতিক বৈষম্য বিলোপ করার নির্দেশ দিয়েছে। ‘হ্রাস’ নয়;— ‘বিলোপ’। পঞ্চাশ বছর হতে চলল দেশ স্বাধীন হয়েছে;— কিন্তু, এই দীর্ঘ কালখণ্ডে কতিপয়ের সঙ্গে সিংহভাগের অর্থনৈতিক বৈষম্য পাঁচগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। হত্যা, ধর্ষণ, ঘুষ, দুর্নীতিসহ বহুরৈখিক অপরাধ প্রথায় পরিণত হওয়ার মূল কারণ এটাই। বাঙালির অবিসংবাদী নেতা মহান মুজিব ও তার নিকট সহযোদ্ধারা ছাড়া আজতক কোনও শাসককে ওই উনিশ অনুচ্ছেদমর্মে একটি কথাও বলতে শুনলাম না। মানুষে মানুষে বৈষম্য দূর করতে বঙ্গবন্ধু ‘বাকশাল’ গঠন করেছিলেন। ওই স্বপ্নযাত্রায় তিনি দুই কদম না-হাঁটতেই, কতিপয় উর্দিপরা কৃতঘ্ন বাঙালি তাকে ঘুমরাতে সপরিবারে হত্যা করেছে। কারাগারে ঢুকে আরও চার জাতীয় নেতাকে খুন করতেও কুণ্ঠিত হয়নি কুলাঙ্গাররা। খুনকে বৈধতা দিয়ে ইনডেমনিটি বিলও পাশ করিয়ে নিয়েছিল খুনিচক্র। আজকের বাংলাদেশ সেই কৃতঘ্নতারই অনিবার্য ধারাবাহিকতা। জীবনানন্দ দাশের কবিতাভাষ্যমতে, গত শতকের সাল একাত্তরে পৃথিবী যাদের ‘বীর বাঙালি’ জেনেছিল, তারা আজ খুনে-ধর্ষণে ‘শুয়োরের মাংস’ হিসেবে পরিচিতি ‘অর্জন’ করেছে। মাতৃভূমিকে হানাদারমুক্ত করতে সেদিন যে-বাঙালি ছিল অস্ত্রধর মুক্তির প্রতীক, আজ তারা শিশ্নধর ধর্ষক। শুধু শারীরিক যৌনাচারে নয়;— সবক্ষেত্রে। কেবল আইন পাশ করে এই অধঃপতন থেকে পরিত্রাণ মিলবে না। উদ্ধারের একমাত্র উপায়— বৈষম্যমোচক ও ধর্মনির্লিপ্ত সাংস্কৃতিক বিপ্লব। ‘কওমিমাতা’ (ওই মা তারা মুখেই বলেছে; কাজে তার প্রমাণ মেলে না) বা ছাত্রলীগের (একদা গৌরবজনক ভূমিকা থাকলেও আজ সংগঠনটির নেতা-কর্মীদের একটি বড়ো অংশ অর্থগৃধ্নু জননিপীড়ক) অভিভাবক হিসেবে নয়, মহান মুজিবের জন্মশতবর্ষে মুজিবকন্যাকে পিতার মহানুভবতায় দেখতে চাই। সাম্প্রতিক ঘটনাবলি বলছে, মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তি লন্ডনের পিশাচ-ইশারায় নতুন প্রকরণে জোট বাঁধছে। স্বপ্নবান তরুণদের ভুল পথে পরিচালিত করছে তারা। যৌবনবিনাশী এ দায় মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগেরও আছে। ছাত্রলীগ-যুবলীগের বিপথগামীরা অশভ শক্তিদের জোট বাঁধার সুযোগ করে দিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে অশুভ শক্তিকে শক্ত হাতে দমন করার পাশাপাশি রাজপথে নেমে আসা স্বপ্নবান তরুণদের মন বুঝতে না পারলে আওয়ামী লীগের জন্য ঘোরতর দুঃসময় অপেক্ষা করছে। বিষয়টি ধর্মীয় স্পর্শকাতরতার চেয়ে কোনও অংশে কম স্পর্শকাতর নয়। এই বর্তমানে সেই দুঃসময়মোচন শুধু মুজিবকন্যার পক্ষেই সম্ভব। তবে, তার আগে নিজেকে ঘিরে রচিত চাটুকারদের উজিয়ে চোখ-কান-মন প্রান্তিকের জনমন অবধি নিয়ে যেতে হবে। এক্ষেত্রেও বৈষম্য অবাঞ্ছিত। কেননা জনমন একটি দাহ্য প্রবৃত্তি এবং ক্ষমতাকালের সঙ্গে অক্ষমতাকালের বৈষম্য বেশি হয়ে গেলে অকষ্মাৎ দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে। সেই পাঠ ভারতচন্দ্রের কবিতায় আছে— “নগর পুড়িলে দেবালয় কি এড়ায়?” জনমন পুড়লেও একই কথা। ফেসবুক থেকে

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত