প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে হেফাজতে বিভাজন

ডেস্ক রিপোর্ট: সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বহুল আলোচিত অরাজনৈতিক ধর্মীয় সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ এখন নিষ্ক্রিয়। কওমি মাদরাসাভিত্তিক এই সংগঠনটির আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফী ও মহাসচিব আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর মধ্যে বনিবনা না হওয়ার বিষয়টি আর গোপন নেই। এর জেরে সংগঠনের নেতাকর্মীরা বিভক্ত হয়ে পড়লেও বিষয়টি নিয়ে অবশ্য প্রকাশ্যে শীর্ষ পর্যায়ের কেউ সেভাবে মুখ খুলছেন না।

অসুস্থতার কারণে অনেক দিন ধরেই অনেকটা ঘরবন্দি সময় পার করছেন আল্লামা শফী। তাঁর অনুপস্থিতিতে কে এই পদে আসীন হবেন, তা নিয়ে সংগঠনটিতে চলছে জোর আলোচনা। সম্প্রতি আল্লামা শফী হেফাজতের নতুন আমিরের নাম প্রস্তাব করলেও শুরা সদস্যদের আপত্তির মুখে তা বাস্তবায়িত হয়নি। মহাসচিব জুনায়েদ বাবুনগরীর বিরুদ্ধে জামায়াত-সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলে তাঁকে সরাতে তৎপর একটি পক্ষ। হেফাজত স্বকীয়তা হারিয়েছে দাবি করে সংগঠনটির একটি অংশ ‘বিকল্প হেফাজত’ গঠনে তৎপরতা চালাচ্ছে।

সব মিলিয়ে হেফাজতের মধ্যে চলা এই অস্থিরতার ইঙ্গিত পাওয়া যায় গত ৭ জুলাই আল্লামা শফীর দেওয়া এক বিবৃতিতে। সেখানে তিনি বলেন, হেফাজতে ইসলামের বিরুদ্ধে কোনো দুষ্টচক্রের ষড়যন্ত্র বরদাশত করা হবে না। একটি চক্র হেফাজতকে বিরোধী দলের ভূমিকায় নিয়ে যেতে চায়, যা হেফাজতের লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

কওমি মাদরাসাসংশ্লিষ্টদের নিয়ে ২০১০ সালের ১৯ জানুয়ারি গঠিত হয় হেফাজতে ইসলাম। হাটহাজারী দারুল উলুম মাদরাসার প্রধান পরিচালক ও কওমি মাদরাসা বোর্ড—বেফাকের সভাপতি আল্লামা শফী এর প্রতিষ্ঠাতা আমির। সরকার প্রণীত শিক্ষানীতির বিরোধিতার মধ্য দিয়ে সংগঠনটি আত্মপ্রকাশ করলেও দেশজুড়ে আলোচনায় আসে ১৩ দফা দাবি আদায়ের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে।

এই দাবি আদায়ের লক্ষ্যে ২০১৩ সালের ৫ মে ঢাকা অভিমুখে লংমার্চ ও মতিঝিল শাপলা চত্বরে সমাবেশ করে তারা। তবে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের মুখে তারা পিছু হটতে বাধ্য হয়। এই আন্দোলনে হেফাজতের সঙ্গে বিএনপি-জামায়াতের সংশ্লিষ্টতা ও ইন্ধন ছিল বলে অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সারা দেশে সংগঠনটির অনেক নেতাকর্মীর নামে মামলা হয় এবং অনেকে গ্রেপ্তার হন। এই অবস্থায় অনেকটা ঝিমিয়ে পড়ে সংগঠনটি।

২০১৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর সংগঠনটির সঙ্গে তাদের যোগাযোগ বাড়ে। কওমি মাদরাসার দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্স সমমানের স্বীকৃতি দেয় সরকার। এ জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করতে ২০১৮ সালের ৪ নভেম্বর ঢাকায় শোকরানা মাহফিলের আয়োজন করা হয়। সেখানে শেখ হাসিনাকে ‘কওমি জননী’ উপাধি দেওয়া হয়।

এর পাশাপাশি ক্রমে মাঠে তৎপরতা কমতে থাকে হেফাজতের। শাপলা চত্বর ঘটনার প্রথম বছরপূর্তিতে ২০১৪ সালের ৫ মে হাটহাজারীতে দোয়া মাহফিল হয়েছিল। এরপর গেল ছয় বছরে দিনটিতে কোনো কর্মসূচি পালন করা হয়নি। বর্তমানে প্রতিবছর হেফাজতে ইসলাম চট্টগ্রাম মহানগরীর উদ্যোগে চট্টগ্রাম লালদিঘির পারে শাসে রেসালত সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এর বাইরে উল্লেখ করার মতো কোনো কর্মসূচি নেই তাদের।

তবে ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নির্বাচন এবং সংগঠনে প্রভাব বিস্তার প্রশ্নে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব চলে আসছে অনেক দিন ধরে। একদিকে হেফাজতের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে আল্লামা শফীর ছেলে আনাস মাদানী সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন। এর বিপরীতে মহাসচিব জুনায়েদ বাবুনগরীর অনুসারী হিসেবে পরিচিত হেফাজতের সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী ও হাটহাজারী উপজেলা হেফাজতের সাধারণ সম্পাদক মাওলানা জাকারিয়া নোমান ফয়েজিসহ কয়েকজনও তৎপরতা চালাচ্ছেন।

জানা গেছে, গত ১৭ জুন চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদরাসার মজলিসে শুরার বৈঠকে মাদরাসার সিনিয়র মুহাদ্দিস আল্লামা শেখ আহমদকে হেফাজতের নতুন আমির হিসেবে ঘোষণা দিতে চেয়েছিলেন আল্লামা শফী। কিন্তু শুরা সদস্যরা এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করেন। হেফাজতের আমির নির্বাচনের সঙ্গে হাটহাজারী মাদরাসার সম্পর্ক নেই জানিয়ে শুরা কমিটির সদস্যরা এই বিষয়ে সাংগঠনিক কমিটি সিদ্ধান্ত নেবে বলে জানিয়ে দেন।

হেফাজত নেতাদের অনেকে মনে করেন, হাটহাজারী দারুল উলুম মাদরাসার নতুন প্রধান পরিচালক যিনি হবেন তিনিই পদাধিকার বলে হেফাজতের আমির হবেন। কিন্তু মাদরাসার শুরা কমিটির বৈঠকে আহমদ শফীর নতুন আমির নির্বাচনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান হওয়ার পর প্র্রশ্ন দেখা দিয়েছে, হেফাজতের নতুন আমির কিভাবে নির্বাচিত হবে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে হেফাজতের একজন কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, হাটহাজারী মাদরাসার শুরা কমিটি এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত না নেওয়ায় হেফাজতের নতুন আমির নির্বাচন নিয়ে জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। কারণ হেফাজতের গঠনতন্ত্র নেই। সাংগঠনিক কমিটির সভায় এ নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে গেলে মতবিরোধ হবে।

হাটহাজারী মাদরাসার শুরা কমিটি নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে হেফাজত আমিরের ছেলে আনাস মাদানীসহ সংগঠনের আরো কয়েকজন নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন আপত্তিকর পোস্ট ভাইরাল হয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। এর দায় স্বাভাবিকভাবেই বাবুনগরীর ওপরে বর্তায়। মাদরাসার নায়েবে আমির নির্বাচন নিয়েও দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। একটি পক্ষ তখন প্রকাশ্যে প্রতিবাদ-সমাবেশ করে মাদরাসা প্রাঙ্গণে। এই উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যে বাবুনগরীর পক্ষের পরিচিত কিছু নেতাকর্মী মামলায় জড়িয়ে যান।

জানতে চাইলে হেফাজত আমিরের অনুসারী হিসেবে পরিচিত হেফাজত ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মাঈনুদ্দিন রুহি গত বুধবার সন্ধ্যায় বলেন, হেফাজতের কার্যক্রম আগের মতোই রয়েছে। ১৩ দফা দাবির সব পূরণ হয়নি, তাই তা আদায়ে হেফাজতের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। তিনি বলেন, হেফাজত কোনো রাজনৈতিক সংগঠন নয়। যেহেতু এটি ইমানি আন্দোলনের লক্ষ্যে গঠিত, তাই যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক না কেন হেফাজতের আন্দোলন বহাল থাকবে। এক প্রশ্নের জবাবে সংগঠনের আমির ও মহাসচিবের মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব নেই দাবি করে মাঈনুদ্দিন রুহি বলেন, ‘একটি চিহ্নিত গোষ্ঠী কওমিদের মধ্যে ভাঙন ধরানোর জন্য অপপ্রচার চালাচ্ছে।’

মহাসচিবের অনুসারী হিসেবে পরিচিত হেফাজতের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদীও প্রায় একই কথা বলেন। করোনাভাইরাস পরিস্থিতি বিবেচনায় সাংগঠনিক তৎপরতা নেই দাবি করে তিনি বলেন, ‘আমাদের ১৩ দফা দাবি বহাল রয়েছে।’

আজিজুল হক বলেন, আমির ও মহাসচিবের মধ্যে দূরত্বের কথা সত্য নয়। কিছু বিশেষ মহলের প্ররোচনায় সোশ্যাল মিডিয়ায় এ নিয়ে বিভ্রান্তিমূলক যে প্রচারণা ছিল, তাঁরা যৌথভাবে ভিডিও বক্তব্যের মাধ্যমে সম্প্রতি তা জাতির সামনে পরিষ্কার করে দিয়েছেন।

বিকল্প হেফাজত গঠনের তৎপরতা : নতুন প্ল্যাটফরম গঠনের তৎপরতায় যুক্ত একাধিক নেতা বলেন, হেফাজতে ইসলাম স্বকীয়তা হারিয়েছে। এর অবস্থা ভঙ্গুর। তাই বিকল্প চিন্তা-ভাবনা করছেন হেফাজতের ত্যাগী ও সংস্কারের পক্ষের নেতারা। জানা গেছে, গত ২২ জুন ঢাকার খিলগাঁওয়ের এক আলেমের বাসায় বৈঠকের মাধ্যমে এই প্ল্যাটফর্মের আনুষ্ঠানিক তৎপরতা শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি বৈঠকও করেছেন তাঁরা। কেউ কেউ নতুন এ সংগঠনের নাম ‘হেফাজতে ঈমান বাংলাদেশ’ রাখার প্রস্তাব দিয়েছেন বলে জানা গেছে।কালের কণ্ঠ

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত