প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

লুৎফর রহমান হিমেল: কোনো কিছুতে ডুবে গেলে, আমি পৃথিবী ভুলে যাই

লুৎফর রহমান হিমেল: আমার নেশা আছে! অবশ্য সেই নেশা মাদকের নেশা নয়। কোনো কিছুতে ডুবে গেলে তার তল পর্যন্ত না দেখে ভেসে উঠতে পারি না। একবার শৈশবে মধুপুরের পাহাড়ি এলাকায় আমাদের এক আত্মীয়ের বাড়ি গেছি। সেখানে জুটল স্থানীয় কিছু কিশোর বন্ধু। তাদের সাথে গেলাম পুকুরে গোসল করতে। সেই বয়েসে যা হয় আরকি, পুকুরে নেমে কয়েকজন বাজি ধরলো, কে পুকুরের তলা থেকে কাদামাটি তুলে আনতে পারবে। দু-একজন বাদে আর কেউ বাজিতে জিততে পারলো না। তারপরও বাজিতে রাজি হলাম। পাহাড়ি পুকুরগুলো যে খুবই গভীর হয়, এটা আমার জানা ছিলো না। আমি ভরদেশ মানে সমতল এলাকার মানুষ। এলো আমার পালা। আমি ডুব দিলাম। আমি দ্রুততায় নিচের দিকে যাচ্ছি। উপরের গরম পানির স্তর ছাড়িয়ে এল ঠাণ্ডা পানির স্তর। এরপর আরও গভীরে আরও ঠাণ্ডা পানির স্তর। এভাবে যেতে থাকলাম। কিন্তু একি। এই পুকুরের তলা কই। দম প্রায় শেষ হয়ে এল তবুও তলার খবর নেই। ভয় পেয়ে গেলাম। পুকুরের তলা কই আর ফিরে যে আসবো, সেই দম কোথায় আমার? দোটানায় পড়ে গেলাম, ফিরে যাবো, নাকি লক্ষ্যে পৌঁছাবো? হাল ছাড়তেও ইচ্ছে করলো না। শরীরের সকল শক্তি খাটিয়ে আরও কয়েক ধাপ নীচে যাওয়ার পর মাটির দেখা পেলাম। খামচা দিয়ে এক মুঠো কাদামাটি নিয়েই উপরে উঠতে থাকলাম রকেট গতিতে। মনে হলো, আমি কয়েকশ বছর ধরে পানির তলা থেকে উপরের দিকে তারার মতো ছুটে চলেছি। অতলের পথ আর শেষ হয় না। মনকে বুঝাতে লাগলাম, হাল ছাড়িস না। তাহলে কিন্তু সব শেষ। এক পর্যায়ে পানির উপরে ভেসে উঠলাম। ঘন ঘন দীর্ঘ দম নিতে থাকলাম।

এরপরই সাথে সাথে বিজয়ীর বেশে ডান হাতটা উঁচু করে তুলে ধরলাম। সেই হাতে একমুঠো পাহাড়ি লাল কাদামাটি ধরা। এ যেন কাদামাটি নয়, সাঁতারে অলিম্পিকের গোল্ড মেডেল উঁচিয়ে ধরে রাখা। অথচ একটু আগেই যে জীবন বিপন্ন হতে বসেছিলো, বিজয়ের আনন্দে সে কথা এক মুহূর্তের জন্যও আর মনে এলো না। সাথের সবাই হাততালি দিয়ে আমাকে সাধুবাদ জানালো। পড়াশোনার ব্যাপারেও এভাবে আমি ডুব দিতাম। ক্লাস এইটে সম্ভবত পড়ি তখন, একবার আমাদের গ্রামে আমাদের প্রতিবেশী দুঃসম্পর্কের কাশেম নানার বাড়িতে আগুন লাগলো। পাড়ার মানুষ সাহায্যের জন্য পানি-বালি-কলাগাছ নিয়ে ভেঙে পড়লো সেই বাড়িতে। বেশির ভাগ মানুষ চিৎকার করতে করতে গেছে আমাদের বাড়ির সামনে দিয়েই। ঘণ্টা তিনেকের চেষ্টায় সেই আগুন নেভানো গেলো। ওই সময়টায় চিৎকার চেচামেচিতে মহা হুলুস্থুল কাণ্ড হলো গোটা গ্রামে। অথচ আমি তখন আমাদের টিনের ঘরে বসে পড়ছিলাম। আম্মা ঘরে ঢুকে মনে করেছিলেন, আমি আগুন নেভাতে গেছি। আমাকে দেখে তিনি আশ্চর্য হয়ে গেলেন। বললেন, গোটা গ্রাম, আশপাশের গ্রামের লোকজনও এসেছিলো আগুন নেভাতে। তুই এখানে বসে বসে পড়ছিস। তুই হাউকাউ চিৎকার শুনিসনি। আমি বললাম, আমি তো কোনো শব্দ পাইনি। জানলে তো সবার আগে আমিই সেখানে ছুটতাম। কোনো কিছুতে ডুবে গেলে, আমি পৃথিবী ভুলে যাই। এই গভীরে ডুবে যাবার নেশাটা এখনও আছে। শুধু ফর্মেট বদলেছে এখন। গত আঠার দিন ধরে একটা কাজে আবার ডুব দিয়েছি। গভীর ডুব। ফেসবুক থেকে

সর্বাধিক পঠিত