প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

হায়রে রাজনীতি !!!

নাসির উদ্দিনের ফেসবুক থেকে : জন্মলগ্ন থেকেই পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সাথে রাজনীতিকদের দ্বন্দ্ব চলছে। ঔপনিবেশিকোত্তর এ রাষ্ট্রটিতে বিত্তশালী ও উঁচু বংশের শিক্ষিতরা সেনাবাহিনীতে সুযোগ পেয়ে থাকে। ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত এসব তরুন সর্বদা নিজেদেরকে এলিট শ্রেনীর ভাবতে পছন্দ করে। এই ভাবনা সেনাবাহিনীতে এখনো লালিত হচ্ছে। আমাদের দেশও সে ঐতিহ্যের ধারণাতেই হৃষ্টপুষ্ট।

সামরিক অ্যাকাডেমিতে প্রশিক্ষণকালে তাঁদের মনোজগতে এ ভাবনা গেঁথে দেয়া হয় যে, সমাজের অন্যান্য অংশের চেয়ে তাঁরা হলেন সুপিরিয়র। তাঁদের এ ভাবনার কারণে সাধারণ জনগণকে নিচু চোখে দেখার প্রবনতা সেনা সদস্যদের মধ্যে জন্ম নেয়। ফলে সাধারণ মানুষ ও পরিবার থেকে উঠে আসা রাজনীতিবিদদের নেতৃত্ব, মিলিটারি এলিটরা মানসিকভাবে কখনোই মেনে নিতে পারেন না। আমাদের দেশেও এ ধারণার অবধি কম নয়।

আর এই মানতে না পারার ফলেই তাঁরা বারবার রাষ্ট্র পরিচালনায় সরাসরি হস্তক্ষেপ করে। আর যখন সরাসরি ক্ষমতায় থাকে না, রাষ্ট্রের অন্যান্য স্টেক হোল্ডারদের তুলনায় গ্রুপ হিসাবে শক্তিশালী অবস্থানে থাকায়, তাঁরা রাষ্ট্রের পিছন থেকে কলকাঠি নাড়তে সচেষ্ট থাকে। তাঁদের কাজে যখনই ক্ষমতাসীন দল অসহযোগিতা করে, তখনই সেনাবাহিনী সরাসরি অথবা পরোক্ষ ভাবে তাঁদেরকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়। রাষ্ট্রের উপর এই হস্তক্ষেপ পাকিস্তান সেনাবাহিনী রপ্ত করেছে তুরস্কের সেনাবাহিনী থেকে।

তবে তুরস্কের সেনাবাহিনীকে রাষ্ট্র পরিচালনায় অবৈধ হস্তক্ষেপ করতে হয় না, এটি তাঁদের সাংবিধানিক অধিকার। কামাল আতাতুর্ক একশো বছর আগে তুরস্কের সেনাবাহিনীকে এই অধিকার দিয়ে গেছেন। যা এখনো দেশটির সংবিধানের অংশ। কামাল আতাতুর্কের সেক্যুলার আদর্শ থেকে বিচ্যুত হলে সেনাবাহিনী সেই সরকারকে উৎখাত করতে পারে, সংবিধান ব্যবহার করে। এজন্য তুরস্কে ঘনঘন অভ্যূত্থানের ইতিহাস আমরা দেখে থাকি।

এই দুটি দেশে রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে হামেশাই দূর্ণীতির অভিযোগ উঠে। এই অভিযোগ তুলে দেশ দুটির সেনাবাহিনী। ২০১৬ সালে এরদোগানের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগে অভ্যূত্থান হয়েছিল। পাল্টা অভ্যূত্থানে যা ব্যর্থ হয়। পাকিস্তানের অপেক্ষাকৃত জনপ্রিয় শাসক নওয়াজ শরিফের বিরুদ্ধেও দুর্ণীতির অভিযোগ এনে তাকে সড়ানো হয়। কোর্টকেও বাধ্য করা হয় নওয়াজের বিরুদ্ধে রায় দিতে। পরে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে দেশত্যাগ করার চেষ্টা করা হয়। তিনি রাজি না হওয়ায় তাঁকে ১০ বছরের জেল এবং রাজনীতি থেকে আজীবন নিষিদ্ধ করা হয়।
রাজনীতি বিশ্লেষকরা সেনাবাহিনীর এই হস্তক্ষেপকে ‘রাষ্ট্রের মধ্যে রাষ্ট্র’ হিসেবে বর্ণনা করে থাকেন। নওয়াজ শরিফ কারাগারে যাওয়ার আগে তাঁর শেষবারের ক্ষমতার অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে গিয়ে বলেছিলেন, আগে ছিল ‘রাষ্ট্রের মধ্যে রাষ্ট্র’ এখন হয়েছে রাষ্ট্রের উপর রাষ্ট্র’। অর্থাৎ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন সেনাবাহিনীর হাতের পুতুল।

অথচ রাজনীতিবিদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ করা সেনাবাহিনীই হচ্ছে পাকিস্তানের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠান। ইতিহাস স্বাক্ষী ১৯৫৮ সাল থেকে পাকিস্তানের সামরিক, বেসামরিক সব সরকারই সেনাবাহিনীকে নানা সুবিধা দিয়েছে। ফলশ্রুতিতে পাকিস্তানের বিভিন্ন সরকারি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মূলপদে বসে আছেন সেনা অফিসাররা।

বিভিন্ন হাসপাতাল, কর্পোরেশন এবং কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বেসামরিক ব্যক্তিদের জায়গায় দায়িত্ব দেয়া হয়েছে সেনা অফিসারদের। সেনা কল্যাণ ট্রাস্টের ব্যানারে সেনাবাহিনীকে দেয়া হয়েছে বিভিন্ন ব্যবসা বাণিজ্য ও তারকাখচিত হোটেল পরিচালনার দায়িত্ব।
এসব প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতে গিয়ে দেশটির সেনাবাহিনী এখন বড় একটি কর্পোরেট বাহিনীতে পরিণত হয়েছে। আর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দেয়া হয়েছে লক্ষ লক্ষ হেক্টর মূল্যবান জমি। বাহিনীর অনেক কর্মকর্তা সরকারি, বেসরকারি নানা প্রতিষ্ঠানে পদায়িত হয়ে ব্যক্তি জীবনে ব্যাপক দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন।

এছাড়া সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করে বৈধ অবৈধ পন্থায় সেনাবাহিনী নিজেদের আর্থিক লাভের বিষয়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে থাকে। যেমন গত নির্বাচনে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করে ৯শ কোটি রুপি পারিশ্রমিক নিয়েছে তাঁরা। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর লক্ষ্য হচ্ছে রাষ্ট্র ক্ষমতার উপর আধিপত্য করা এবং ব্যবসা, বাণিজ্য, সরকারি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে আসা অর্থনৈতিক সুবিধা নিশ্চিত রাখা। বিনা প্রশ্নে, যে তাঁদের এই স্বার্থ রক্ষা করবে তাকেই তাঁরা ক্ষমতায় বসায়।

আর দেশটির রাজনীতিবিদদের লক্ষ্য থাকে সেনাবাহিনীর সুনজরে আসা। এজন্য জনসমর্থন বৃদ্ধি করতে তাঁরা রাজনীতিতে ইসলাম ধর্মকে ব্যবহার করে। জনমনে ধর্মীয় সেন্টিমেন্ট গ্রো করে জনসমর্থন বাড়াতে পারলে সেনাবাহিনীর উপর চাপ তৈরি সম্ভব। তবে পাকিস্তানের মানুষ কখনো শরিয়াভিত্তিক ‘ইসলামপন্থী’ দলগুলোকে নির্বাচিত করেনি। তাঁরা নির্বাচিত করেছে ইমরান খান, নওয়াজ শরীফ ও জুলফিকার আলি ভুট্টোর মতো নেতৃত্বকে। যারা ক্ষমতার জন্য ইসলামকে শুধু ‘লিপ সার্ভিস’ বা মুখের কথায় এবং কিছু কাগুজে আইনে সীমাবদ্ধ রেখে জনসমর্থন ধরে রাখার কৌশল নিয়েছে। যেমন ইমরান খানের ব্লাসফেমি আইনকে সমর্থন করা, নারী অধিকারের বিপক্ষে কথা বলা, তালেবানদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা এবং বক্তৃতায়, আলোচনায় ইসলামি পরিশব্দ ব্যবহার করার মতো বিষয়গুলো শুধুমাত্র ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করতে দেখি।

আমাদের দেশেও ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ও বিসমিল্লাহকে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কওমী মাদ্রাসার শিক্ষাকে স্বীকৃতি ও সনদের ব্যবস্থা করা হয়েছে। জেলা উপজেলায় এখন কেন্দ্রীয় মসজিদ করা হচ্ছে রাজনৈতিক প্রণোদনা হিসেবে। এসবই শুধুমাত্র সস্তা জনসমর্থনের জন্য। এইসব বিবেচনায়, বাংলাদেশের বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক মননের সাথে পাকিস্তানি জনগণের রাজনৈতিক মননের প্রচুর মিল রয়েছে। লিপ সার্ভিস ছাড়াও মিল রয়েছে আরও অনেক ক্ষেত্রেই। আমাদের দেশেও যে রাষ্ট্রের মধ্যে রাষ্ট্র আছে সেটা কি আমরা দেখি?

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৭১ সালে এদেশের মানুষ ভৌগোলিক এবং রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন করেছিলো। কিন্তু ৭৫ এর ১৫ আগস্টের নৃশংস হত্যাকান্ডের মধ্যদিয়ে আমরা রাজনৈতিক স্বাধীনতার মঞ্চটিকে হারিয়েছি। বঙ্গবন্ধুর মতো একটি অন্তঃ প্রাণ রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও পরিবারকে মিথ্যা দুর্ণীতির অভিযোগ দিয়ে শুরু হয় রাজনীতিকে কলুষিত করার কাজ। এখনো রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধেই দূর্ণীতির যত অভিযোগ। অথচ দেশের মিলিত অভিভাবক শ্রেনী সাগর লুট করছে। এ নিয়ে প্রোপাগাণ্ডাও খুবই সামান্য। এটি যে রাজনীতির বিরুদ্ধে গভীর ও সুদূরপ্রসারী চক্রান্ত এই ছোট্ট কথাটিও এদেশের রাজনীতিক, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিকরা অনুধাবন করছেন না। এতে করে অভিভাবক শ্রেনীর একচেটিয়া কর্তৃত্বই কেবল পাকাপোক্ত হয়নি, আমাদের রাজনৈতিক মঞ্চটিও অভিভাবক শ্রেণীর দখলে চলে গিয়েছে।

৭৫ এর ১৫ আগস্টের পর থেকে সামরিক ও বেসামরিক নেতৃত্বকে আমরা মঞ্চে দেখেছি এবং দেখছি। কিন্তু সবসময়ই মঞ্চের নির্দেশনা, প্রযোজনা ও পরিচালনায় রয়েছে সেই অভিভাবক শ্রেনীই। দেশে ওয়ান ইলেভেনের সময় এর কুশীলবদের বহুল প্রচলিত একটি ঘোষণা ও কর্মসূচি ছিল। সেই কর্মসূচির বাস্তবায়ন রাজনৈতিক অন্ধরাই শুধু দেখতে পায় না। ফলে রাজনীতিকরা নিজেরাই নিজেদের গায়ে থুথু ছিটাচ্ছে। একদল অন্যদলের গায়ে বিড়াল ছুড়ে মারছে। আর ঘুঘু মনের আনন্দে, বহু রক্তে অর্জিত, কক্ষচ্যুত সেই রাজনৈতিক মঞ্চে সাজানো নাটক মঞ্চায়ন করে যাচ্ছে। রাজনৈতিকরা তাদের হারানো মঞ্চটিকে চিনতে পারছে না। এই রাজনীতিকদের দিয়ে কি সেই মঞ্চ আর উদ্ধার হবে?

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত