প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

[১] করোনায় আড়াই কোটি নিম্ন থেকে উচ্চ মধ্য বিত্তের বড় অংশ চাকরি ঝুঁকিতে আছেন

সুজন কৈরী : [২] বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মরতদের অনেকে বেতন পাচ্ছেন না। সঞ্চিত অর্থও শেষের পথে। আছেন চাকরি হারানোর শঙ্কায়। সরকারের কোনো প্রণোদনার মধ্যেও নেই তারা। ফলে চলমান লকডাউনের মধ্যে মহাসংকটে পড়েছেন বাংলাদেশে গৃহবন্দি কয়েক কোটি মধ্যবিত্ত। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন এইসব পরিবারের অনেকেই এখন নিম্নবিত্তের স্তরে নেমে আসছেন।

[৩] সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘বাংলাদেশে ১৬ কোটি মানুষের চার কোটি পরিবার আছে। এর মধ্যে নিম্নবিত্ত ২০ ভাগ আর উচ্চবিত্ত ২০ ভাগ। মাঝের যে ৬০ ভাগ এরা নিম্ন, মধ্য ও উচ্চ মধ্যবিত্ত। এই সংখ্যা আড়াই কোটি পরিবার হবে। এর মধ্যে সরকারি চাকরিজীবী, মাল্টিন্যাশনাল ও বড় কোম্পানিতে কাজ করা কিছু মানুষ বাদে অন্যরা সবাই সংকটে আছেন। এদের মধ্যে বড় একটা অংশ চাকরি ঝুঁকিতে আছেন। অনেকেরই বেতন হয়নি, অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। ফলে তারা বেতন তো পাননি, উল্টো চাকরি ঝুঁকিতে আছেন। এই মানুষগুলো সরকারি কোনো কর্মসূচির মধ্যেও নেই। তবে সরকার এসএমই ঋণ দিয়ে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্তদের বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করলেও এই সংখ্যাও খুব বেশি না। বিপুল জনগোষ্ঠী এখনও সহায়তার বাইরে’।

[৪] অনেকের ঘরে খাবার নেই : আবু জাফর মিরপুরের কাজীপাড়ায় স্যানিটারি সামগ্রী বিক্রি করেন। তার দোকানে দুইজন কর্মচারি। ২৫ মার্চ দোকান বন্ধের আগে হাতে যে টাকা ছিল তা দিয়ে কর্মচারিদের মার্চ মাসের বেতন দিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছেন। সামান্য টাকা রেখেছিলেন নিজ পরিবারের খরচ মেটাতে। যা ইতিমধ্যে শেষ। রোজগারের জন্য দোকান খুলতে পারছেন না। ডয়চে ভেলের সঙ্গে আলাপকালে জাফর বলেন, ‘আমি কোনো ভাবেই কর্মচারিদের এপ্রিল মাসের বেতন দিতে পারব না। নিজেই খাওয়ার জন্য এক আত্মীয়ের কাছ থেকে কিছু টাকা ধার করেছি। এখনও বাড়ি ভাড়া দিতে পারিনি। মালিক চাপ দিচ্ছে। চার সদস্যের পরিবার নিয়ে খুবই সংকটে আছি। এই অবস্থা আর ১৫ দিন থাকলে আমাকে পথেই নামতে হবে।’

[৫] আফরোজা আক্তার দর্জির কাজ করেন। স্বামী একটি দোকানের কর্মচারি। তিন মেয়ে নিয়ে কোনোমতে সংসার চলে তাদের। করোনায় স্বামী-স্ত্রীর কোনো কাজ না থাকায় তীব্র খাবার সংকটে পড়েছেন এই দম্পতি। আফরোজা বলেন, নিরুপায় হয়ে তিনি স্থানীয় থানার ওসিকে ফোন দিয়েছিলেন। ওসি অপারগতা প্রকাশ করেন। পরে ওই এলাকার কাউন্সিলর কিছু সাহায্যের আশ্বাস দিলেও চারদিনেও কিছু পাননি। পরে একটি বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন তাদের কিছু সাহায্য দিয়েছে।

[৬] তবে মধ্যবিত্তদের অনেকেই চক্ষুলজ্জায় মানুষের কাছে সাহায্য চাইতে পারছেন না। নিজেদের পরিস্থিতি বাইরের কাউকে তারা জানাতেও পারছেন না।

[৭] সঞ্চয় ভেঙে খাচ্ছে মধ্যবিত্ত : এমন পরিস্থিতিতে কিভাবে চলছেন দেশের কয়েক কোটি মধ্যবিত্ত? পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘মধ্যবিত্তের কিছু সঞ্চয় থাকে। গেল এক মাসের লকডাউনে তারা সেই সঞ্চয় ভেঙে খাচ্ছে। এভাবে আরেকমাস চললে সেই সঞ্চয়ও শেষ হয়ে যাবে। তখন কি পরিস্থিতি দাঁড়াবে? বিপুল সংখ্যক মধ্যবিত্ত এই পরিস্থিতিতে নিম্নবিত্তে পরিণত হবেন। সবচেয়ে বড় সংকট হবে যখন সবকিছু স্বাভাবিক হবে তখন তো বিপুল সংখ্যক মানুষ চাকরি হারাবেন। উন্নত দেশে তো বেকার ভাতা দেয়া হয়। এখানে সেই ব্যবস্থা নেই। তাহলে এই মধ্যবিত্ত বেকার শ্রেণী কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? সরকারের যে প্রনোদনা সেখানেও কিছু মধ্যবিত্তের কোনো অবস্থান নেই। আবার আমাদের যে ব্যবস্থা সেখানে সরকার চাইলেও মধ্যবিত্তকে কিছু করতে পারে না। আসলেই বাংলাদেশে মধ্যবিত্তরা ভয়াবহ সংকটে আছেন।’

[৮] মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এই কারণেই আমরা নগদ প্রনদোনার কথা বলেছিলাম। আমাদের দেশে ছয় কোটি ১০ লাখ শ্রমিক আছেন। এর মধ্যে এক কোটি শ্রমিক দিন এনে দিন খায়। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কর্মসংস্থান যারা করেন তাদের সংখ্যা দুই কোটি ২০ লাখ। আমরা সরকারকে বলেছি, একটি পরিবারে চারজন আছেন এমন একটি পরিবারকে মাসে আট হাজার টাকা হিসেবে দুই মাসের ১৬ হাজার টাকা দিতে। তাতে সরকারের ২৭ হাজার কোটি টাকা লাগবে, যা জিডিপির এক শতাংশ। এভাবেই এই ক্ষতিগ্রস্থ মানুষদের সহায়তা করা যেতে পারে।

[৯] চাকরি হারানোর শঙ্কায় অনেকে : মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা আমিনুল ইসলাম ও ফাতেমা আক্তার দম্পত্তি। একটি ল্যান্ড ডেভেলপমেন্ট কোম্পানিতে চাকরিরত আমিনুল। তার স্ত্রী একটি বেসরকারি স্কুলে চাকরি এবং টিউশন করে সংসার চালান। কিন্তু করোনার কারণে তিনি বেতন পাচ্ছেন না। আমিনুল অর্ধেক বেতন পেয়েছেন। কোনোমতে চলছে সংসার, কিন্তু এখনো বাসাভাড়া মেটাতে পারেননি। আমিনুল জানান, সামনের মাসে বেতন দিতে পারবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে তার চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠান। এমনকি চাকরি থাকবে কি না তা নিয়েও রয়েছে অনিশ্চয়তা। চলতি এপ্রিল মাসে বেতন না পেলে ঢাকা ছেড়ে গ্রামে চলে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই পরিবারটির। তাদের মতো অনেকেই আছেন চাকরি হারানোর এমন আতঙ্কে।

[১০] মধ্যবিত্তদের পাশে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন : মধ্যবিত্তদের পাশে দাঁড়িয়েছে অনেক বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের অ্যাসিট্যান্ট জেনারেল ম্যানেজার জসিম উদ্দিন খান ও প্রেস ইনস্টিটিউটের সহকারি প্রশিক্ষক বারেক কায়সারসহ আরো কয়েকজন মিলে গড়ে তুলেছেন সঙ্গে আছি নামক একটি সংগঠন। এই সংগঠনের উদ্যোগে শনিবার পর্যন্ত পাঁচ হাজার পরিবারের কাছে খাবার পৌঁছে দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে দুই হাজার মধ্যবিত্ত পরিবার। তারা মূলত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষকে চাল-ডালসহ নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস পৌঁছে দিচ্ছেন। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক বারেক কায়সার ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘সবচেয়ে কষ্টে আছে মধ্যবিত্ত। তারা হাত পাততে পারে না, আবার ঘরে খাবার নেই। ফলে তাদের কাছে যারা ফোন করছেন তাদের বাসায় গিয়ে এগুলো পৌঁছে দেয়া হচ্ছে। তাদের সংগঠনকে যারা সহায়তা দিচ্ছেন বা যারা তাদের কাছ থেকে সহায়তা নিচ্ছেন তাদের কারো নাম প্রকাশ করা হচ্ছে না।’

[১১] অপর সংগঠন ‘সহমর্মিতা ফাউন্ডেশন’। যাদের ত্রাণ দেয়া হচ্ছে, তাদের ছবি তো দূরের কথা, পরিচয়ও প্রকাশ করছে না কর্তৃপক্ষ। সহমর্মিতা ফাউন্ডেশনের পরিচালক পারভেজ হাসান বলেন, ‘একজন মধ্যবিত্ত কোনো অবস্থাতেও তার খারাপ অবস্থার কথা কাউকে জানতে রাজি হয় না। কারণ তাদের ক্ষুধার ভয় থেকে চক্ষুলজ্জার ভয় বেশি থাকে। তাদের হেল্পলাইনে কেউ ফোন করলে গোপনে গিয়ে তাদের খাবার পৌঁছে দেয়া হচ্ছে।’

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত