প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মানুষ কোনোক্রমেই অসীম ক্ষমতার অধিকারী নয়

এ কে এম শাহনাওয়াজ : করোনাভাইরাস, সৃষ্টিজগতে মানুষের মেধা, সৃজনশীলতা আর ‘অসীম’ ক্ষমতা তাকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছে। যখন মিসরের পিরামিডের দিকে তাকাই, তখন বিস্মিত হতে হয়। হাজার হাজার বছর আগে মরুভূমির বুকে এমন বিশাল পিরামিড কী করে বানাল সে যুগের মানুষ! স্থাপত্যকলার এমন বৈজ্ঞানিক জ্ঞান কেমন করে পেয়েছিল!

কেমন করে গাণিতিক আর জ্যামিতিক হিসাব-নিকাশ সুদক্ষভাবে সম্পন্ন করে নির্মাণ করেছিল পিরামিড, যা এত বছর পরও সদম্ভে দাঁড়িয়ে আছে! নীল নদের ওপাড়ে নুবিয়ার পাহাড় থেকে বিশাল বিশাল পাথর কেটে কেমন করে নিয়ে এসেছিল মরুভূমিতে!

পাথরের পর পাথর বসিয়ে সঠিক হিসাবে কেমন করে সম্ভব হয়েছে সুবিশাল ত্রিকোণ ইমারত নির্মাণ করা! তখন তো আধুনিক যন্ত্রপাতিও ছিল না স্থপতিদের হাতে। মানুষের অমন ক্ষমতা দেখে বিস্মিত হতে হয়। ১৯৮২ সালে আমি প্রথমবারের মতো গিয়েছিলাম আগ্রায় তাজমহল দেখতে। উপরে উঠে সমাধির ওপর চোখ পড়ল। লাল-সবুজ নানা রঙের ফুলের নকশাকাটা।

ফুল, পাতা এত ঝলমল করছিল, মনে হচ্ছিল এই মাত্র বোধহয় সংস্কার করা হয়েছে। টাটকা রং হাতে লেগে যাবে। একবার আঙুলে ছোঁয়া লাগিয়ে দিলাম। না, হাতে তো রং লাগল না! ভুল ভাঙল আমার, এ তো রং নয়! রঙিন পাথর কেটে মিনা করা হয়েছে। চারশ’ বছর ধরে এমনই জ্বলজ্বল করছে। তখনও বিস্মিত হয়েছিলাম মানুষের প্রতিভার কথা ভেবে।

আধুনিক যুগে মানুষ বিস্ময়কর প্রতিভার প্রকাশ দেখাচ্ছে। পারমাণবিক অস্ত্রসহ নানা ভয়ংকর মারণাস্ত্র বানাচ্ছে। তা দিয়ে ক্ষমতাবানরা জীবন ও সভ্যতা সংহার করছে। বিশ্বের নানা দেশের ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করছে। মহাকাশযান আর আধুনিক যন্ত্রকৌশলে মহাকাশে মানুষের বিকল্প বসতি খুঁজে বেড়াচ্ছে।

আমরা মহামারীর মতো মহাবিপর্যয়ে পড়লে কিছু সময়ের জন্য হলেও থমকে যাই। এ মানুষেরই শক্তিকে ভীষণ সীমাবদ্ধ মনে হয় তখন। দাপুটে দেশের শক্তিমানরাও কেমন চুপসে যান। কণ্ঠের দৃঢ়তা হারিয়ে ফেলেন। কোনো কূটনৈতিক সমঝোতা ছাড়াই এখন মার্কিন ও তুর্কি বিমান সিরিয়ায় আর বোমা ফেলছে না।

সংঘাত বন্ধ করে আরব-ইসরাইল সুপ্রতিবেশীর মতো বসবাস করছে। ভারত আর দাঙ্গাবাজ কাউকে মাঠে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়েও আলোচনা-পর্যালোচনা থেমে আছে। উপনির্বাচনে পাঁচ শতাংশ ভোট পাওয়া নিয়েও তেমন উচ্চবাচ্য নেই। এটি অনেকটা দীর্ঘ গরমে হাঁসফাঁস প্রকৃতির দশার মতো।

বড় বড় এসি দিয়ে ঘর ঠাণ্ডা হলেও প্রকৃতি ঠাণ্ডা করার উপায় নেই; কিন্তু যখন আকাশ অন্ধকার করে ঝড়-বৃষ্টি নামে, তখন আধঘণ্টায় পুরো প্রকৃতি শীতল হয়ে যায়। মুহূর্তে প্রকৃতি শীতল করার মতো তেমন এসি বিজ্ঞানীরা বানাতে পারেননি। এসব দেখে মনে হয় মানুষের ক্ষমতা কত সীমাবদ্ধ!

মানুষের যুগের আগেও কত সরীসৃপের যুগ লক্ষ লক্ষ বছর অতিক্রম করেছে। তারপর নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। মানুষের সাক্ষাৎ পূর্বসূরি প্রাইমেটরাও লক্ষ বছর চষে বেড়িয়েছে পৃথিবী। তারপর হারিয়ে গেছে পৃথিবী থেকে। একই ধারাবাহিকতায় প্রাকৃতিক দুর্বিপাক মানুষ আর মানবসভ্যতাকে যদি ধ্বংস করে দিতে চায়, তবে কী অস্ত্র আছে মানুষের যে তা রোধ করবে!

অনেক সময় শক্তির দম্ভে মানুষ মানতে চায় না তার চেয়ে বড় স্রষ্টা আর কেউ আছে; কিন্তু বিপদে বিপন্ন অবস্থায় পৌঁছে গেলে প্রকৃতি বলি আর আস্তিক মানুষের ধর্মীয় দৃষ্টিতে ঈশ্বরই বলি- এর শক্তির কাছে মানুষের ক্ষমতা ক্ষুদ্র বালিকণার মতোই মনে হবে।

কী এমন করোনাভাইরাস- ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র! অণুবীক্ষণ যন্ত্র ছাড়া চোখে পড়ে না। এর কী ক্ষমতা! চীন থেকে যাত্রা শুরুর পর হাজার হাজার কিলোমিটার মুহূর্তে অতিক্রম করে পৃথিবীজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল মানুষের দেহে। এ আক্রমণ রোধ করা কঠিন হয়ে পড়ল পৃথিবীর তাবৎ শক্তিমান বিজ্ঞানীদের পক্ষে। একদিন হয়তো মানুষ ভ্যাকসিন আবিষ্কার করবে। নিয়ন্ত্রণে আসবে করোনাভাইরাস।

আবার কিছুদিন ভালো থাকবে টিকে থাকা পৃথিবীর মানুষ। একসময় কষ্টের স্মৃতি ভুলে যাবে। দম্ভ দেখিয়ে আবার মানবতার কণ্ঠনালি চেপে ধরবে। হিংসার বিষবাষ্প ছড়িয়ে দেবে পৃথিবীতে। অন্যায়ের ষোলোকলা পূর্ণ হলে আবার রুষ্ট হবে প্রকৃতি অথবা আস্তিকের বিচারে ঈশ্বর। ছড়িয়ে দেবে করোনার মতো কোনো শাস্তি। আবার আমরা দাম্ভিকরা চুপসে যাব।

করোনাভাইরাসে আতঙ্কিত সময়ে ফেসবুকে দুজনের পোস্ট আমার দৃষ্টি কেড়েছে। একটির লেখক কোনো এক নারী। তার পোস্ট পড়ে জানলাম তিনি একজন লেখিকা। আর বুঝলাম তিনি ঈশ্বর-ধর্মে তেমন আস্থাশীল নন। অবশ্য এটি তার ব্যক্তিগত বিষয়। এ দেশের অনেক প্রগতিবাদীর যে কমন সংকট তা এ লেখিকার মধ্যেও আছে। তিনি আস্তিক বলতে ইসলাম ধর্মবিশ্বসীদের বোঝাতে চেয়েছেন। এন্তার সমালোচনা করেছেন তাদের। আরেকটি অডিওতে কণ্ঠ দিয়ে বক্তব্য রাখছেন একজন তরুণ (কণ্ঠ শুনে তরুণ মনে হল)।

বক্তব্য শুনে ধারণা হল তিনি জামায়াত, হেফাজতি বা জঙ্গি সমর্থক কেউ হবেন। এ ভদ্রলোক ছবিসহ বাংলাদেশের বরেণ্য ১০ ব্যক্তিত্বের সঙ্গে সবাইকে পরিচিত করিয়েছেন। তার ভাষায় এরা সবাই নাস্তিক। প্রমাণ হিসেবে তাদের দু-একটি বক্তব্যও তুলে ধরেছেন। বিষোদ্গারও করেছেন। আমি বুঝলাম না কে আস্তিক আর কে নাস্তিক- এ খোঁজ তাকে কে রাখতে বলেছে! কে ঈশ্বরে বিশ্বাসী আর কে বিশ্বাসী নন- এসব তার ব্যক্তিগত বিষয়। যে ধর্মে তরুণটি বিশ্বাসী, সে ধর্ম কি তাকে দায়িত্ব দিয়েছে এসব তদারকির?

কথায় মনে হল তিনি ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী। মুশকিল হল, যারা ধর্মে বিশ্বাসী নন আর যারা অতিবিশ্বাসী, তাদের মধ্যে কিছু সংখ্যক মানুষ থাকেন যারা নিজেদের এখতিয়ারের বাইরে গিয়ে বিষবাষ্প ছড়ান। মানবতার বড় ক্ষতি করেন। কয়েকজন প্রাজ্ঞ মানুষকে নাস্তিক বলে যিনি জনমনে বিভ্রান্তি ছড়াতে চাইছেন আমি জানি না নিজ ধর্ম সম্পর্কে তার চর্চা কতটুকু আছে। বোখারি শরিফের ৬৮৩৬ নম্বর হাদিসটি তাদের পড়ে দেখতে অনুরোধ করব। এখানে মহানবীর মাধ্যমে আল্লাহ বান্দাকে শিক্ষা দিয়েছেন।

বুঝিয়েছেন কে পাপী আর কে পুণ্যবান- এ বিচারের দায়িত্ব তিনি মহানবীকেও দেননি। বলেছেন আল্লাহ কাকে শাস্তি দেবেন আর কাকে মুক্তি দেবেন, তা একান্তই তাঁর এখতিয়ার। এ বিচারে আমাদের ফেসবুকের তরুণ যিনি নাস্তিক সাব্যস্ত করে যাদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ালেন, এতে কি তিনি ইসলামী দর্শন অনুযায়ী শিরক করলেন না! অর্থাৎ যা সিদ্ধান্ত নেয়ার কথা আল্লাহর, সেই সিদ্ধান্ত তিনিই দিয়ে দিচ্ছেন। আবার যারা ধর্মকে তুচ্ছ করে দেখছেন, ধর্মকে প্রগতিবিরোধী বলে ভাবছেন, তারা কতটা তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব চর্চা করে সিদ্ধান্তে এসেছেন তা এক বড় প্রশ্ন।

সভ্যতার ইতিহাসের ছাত্রমাত্রই জানেন ধর্ম প্রগতিবিরোধী নয়- বরং প্রগতির উদ্দীপক। ধর্মীয় প্রণোদনা ছাড়া কোনো সভ্যতারই অগ্রগতি হতো না। প্রাচীন মিসরীয় সভ্যতাকেই ধরি। পরকালের ধারণা এ সভ্যতায় ছিল। পাপ-পুণ্যের বিচারের কথা ছিল। মিসরীয় রাজা ফারাওদের পরকালেও রাজত্ব করার কথাও ছিল। আর এসব উপজীব্য করতে গিয়ে বৈজ্ঞানিক উন্নয়ন করতে হয়েছে মিসরীয়দের। মৃত ফারাওয়ের দেহ অবিকৃত রাখার প্রয়োজনে মমি বানানোর কৌশল আয়ত্ত করতে হয়েছে।

ফারাওয়ের মৃতদেহ পরকাল পর্যন্ত নিরাপদ রাখতে গিয়ে স্থাপত্যকলার বিকাশ ঘটাতে হয়েছে। নির্মিত হয়েছে পিরামিড। পরকালের নানা ঘটনা পিরামিডের দেয়ালে চিত্রিত করতে গিয়ে চিত্রকলার বিকাশ ঘটেছে। আর এসব ধর্মকথা লিপিবদ্ধ করার তাগিদেই লিখন পদ্ধতির উদ্ভব ঘটেছে। আমরা পেয়েছি মিসরীয় হায়ারোগ্লিফিক। আসলে প্রগতিবাদীদের মধ্যে ধর্ম সম্পর্কে যে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে, আমার ধারণা, চর্চার অভাবে তারা সত্যটিকে বুঝতে পারেন না।

এর দায় ধর্মের নয়, ধর্মের অপব্যাখ্যায় নিজ সুবিধাবাদকে প্রতিষ্ঠিত করতে এগিয়ে আসা তথাকথিত ধর্মবণিকদের। এরা ধর্মের প্রকৃত দর্শন সবসময়ই আড়াল করে একটি বিকৃত ছবি উপস্থাপন করে। এসব দেখেও কিন্তু মনে হয় মানুষের ক্ষমতা কতটা সীমাবদ্ধ।

আমাদের দেশের একজন প্রতিথযশা চিত্রশিল্পী এবং অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক একবার ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় বলেছিলেন, ‘দেখুন প্রকৃতি বলুন আর ঈশ্বর বলুন, তার ক্ষমতার কাছে আমরা শিশু। আমি একজন চিত্রশিল্পী হিসেবেই বলছি আমাদের ক্ষমতা নেই এমন সুনিপুণ এবং ভারসাম্যমূলক রঙের ব্যবহার করা।

আপনি সমুদ্র আর নদীর বিচিত্র রঙের মাছ, নানা জাতের পাখির পালক, ডানা, পা, ঠোঁটের রং গভীর মনোযোগে দেখুন, এত বিচিত্র রঙের ব্যবহার, পরিমিতি বোধ, ভারসাম্য মানবজগতের কোনো শিল্পীর পক্ষে সম্ভব নয়।’

আজ বিশ্বের তাবৎ শক্তিমান দেশগুলো যেভাবে করোনাভাইরাসের আক্রমণে পর্যুদস্ত, তাতে বোঝা যায় মানবজগতের পাণ্ডা হয়ে যতই দম্ভ প্রকাশ করি না কেন, আসলে মানুষের ক্ষমতা বড়ই সীমাবব্ধ। করোনার বিরুদ্ধে আমরা যুদ্ধে নেমেছি ঠিকই, তবে যুদ্ধের ময়দানে গিয়ে নয়। এ অদেখা শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছি আত্মগোপন করে।

ঘরে আবদ্ধ থেকে, মাস্ক পরে, বারবার হাত ধুয়ে, প্রিয় বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজনের সংস্পর্শ এড়িয়ে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখে, অফিস-আদালত ছুটি দিয়ে, গাড়ির চাকা বন্ধ করে। অর্থাৎ প্রকৃতির ক্ষমতার কাছে আত্মসমর্পণ করে আত্মরক্ষায় ব্যস্ত থাকছি।

একই সংকটে মানুষ বহুবার পড়েছে। প্রকৃতি বা ঈশ্বরের শক্তিকে শেষ পর্যন্ত অস্বীকার করতে পারেনি; কিন্তু স্বভাব দোষে মানুষ সুদিন ফিরলে আবার অবিশ্বাসী হয়েছে। অদৃশ্য প্রকৃতির শক্তিকে অস্বীকার করেছে; কিন্তু প্রায় অদৃশ্য ভাইরাসকে অস্বীকার করতে পারেনি। অবশ্য ঈশ্বর, পরকাল, পাপ-পুণ্যের বিচার এসব নিয়ে বিভিন্ন ধর্মের বিশ্বাসীরা ভাববেন।

পাশাপাশি সবারই ভাবা উচিত বৈজ্ঞানিক উন্নয়নের নামে পরিবেশ-প্রতিবেশের শৃঙ্খলা নষ্ট করে যথেচ্ছচার করা, অস্ত্রবাজদের মানবজীবন ধ্বংসকারী অস্ত্রের প্রয়োগ, পরিবেশের বিপর্যয় ঘটানো- সবকিছুর যোগফলই কিন্তু মহামারীর মতো মহাদানবের বারবার ফিরে আসা।

এই যে অদৃশ্য ভাইরাস বিশ্ববাসীকে ঘরবন্দি করে রেখেছে, সে অন্যায় আর অসদাচরণ করার সুযোগ পাচ্ছে না। করছে না পরিবেশদূষণ। মানবমুক্ত হওয়ার কারণে কক্সবাজারের সমুদ্রে বা ভেনিসের গ্রেট ক্যানেলে আবার ডলফিন সাঁতরে বেড়াচ্ছে।

বিশ্বের নানা দেশে নদীর পানিতে দূষণের মাত্রা কমে যাচ্ছে। দানব আচরণের মানবজাতিকে বোধহয় আবার মানুষ হওয়ার পথ দেখাচ্ছে। তাই বলছি,করোনা তাড়াতে সীমাবদ্ধ ক্ষমতার মানুষকে শুদ্ধ হতে হবে। মানবিক আচরণ ও মানবতাকে সম্মান করার মতো শুদ্ধাচারের চেয়ে বড় ভ্যাকসিন আর কিছু নেই।

ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

সূত্র : যুগান্তর

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত