প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

[১] করোনাভাইরাস আতঙ্ক: জ্বর-কাশির রোগীদের স্পর্শ করছেন না ডাক্তার

ডেস্ক রিপোর্ট : [২] দেশের বেশির ভাগ সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকরা করোনাভাইরাসের কারণে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। ঠাণ্ডা-সর্দি, জ্বর-কাশির কোনো রোগীকে তারা স্পর্শ করছেন না। সংক্রমিত নয়; কিন্তু জ্বর, সর্দি বা কাশির সমস্যায় ভুগছেন- এমন রোগীকেও চিকিৎসা দিতে অনীহা প্রকাশ করছেন। যুগান্তর

[৩] কোনো কোনো ডাক্তার জ্বরে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা দেবেন না বলেও লিখে রেখেছন। বিভিন্ন ধরনের ইনফেকশনের কারণে জ্বর বা শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত অনেক রোগী ফিরিয়ে দিচ্ছেন। বেসরকারি হাসপাতালগুলো এসব রোগী সরকারি হাসপাতালে রেফার করছে। এতে অনেক রোগী বিনা চিকিৎসায় আরও মুমূর্ষু হয়ে পড়ছেন। নিরাপত্তাজনিত কারণে তারা চিকিৎসা করছেন না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

[৪] এদিকে চীনে প্রথম করোনাভাইরাস শনাক্তের পর প্রায় সাড়ে তিন মাস অতিবাহিত হলেও বাংলাদেশ প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে ব্যর্থ হয়েছে। ইতিমধ্যে রোগটি দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়েছে। একটি উপজেলার কিছু অংশ একপ্রকার লকডাউন করতে হয়েছে।

তিন মাস ধরে পৃথিবীর যত দেশে করোনাভাইরাস স্থানীয়ভাবে সক্রমণ ঘটিয়েছে, সেসব দেশের মানুষকে অবাধে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দেয়া হয়েছে। নেই প্রয়োজনীয় হাসপাতাল সাপোর্ট, মুমূর্ষু রোগীদের জন্য আইসিইউ সাপোর্টও অপ্রতুল। পরিস্থিতি যেদিকে এগিয়ে যাচ্ছে তাতে অচিরেই দেশের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে বলে শঙ্কা বিশেষজ্ঞদের।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ  বলেন, বর্তমানে করোনাভাইরাস প্রতিরোধে সরকারের প্রস্তুতির যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। যদিও তারা বলছে, সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে। কিন্তু আমরা প্রস্তুতির ঘাটতি দেখতে পাচ্ছি। তিনশ রোগী পরীক্ষা করে ১৭ জনের মধ্যে সংক্রমণ ধরা পড়েছে।

যদি আক্রান্ত দেশ থেকে আসা সাড়ে ৬ লাখ মানুষকেই পরীক্ষা করা হতো, তাহলে প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা জানা যেত। তিনি বলেন, দেশ করোনামুক্ত রাখতে প্রবাস ফেরত সবাইকে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনে রাখা প্রয়োজন ছিল।

কারণ এরা কেউই সঠিকভাবে হোম কোয়ারেন্টিন মানছেন না। ফলে আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে এ রোগের পিক হতে পারে। সেটি হলে জ্যামেতিক হারে বাড়বে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। তখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।

বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন-বিএমএ মহাসচিব ড. এহতেশামুল হক চৌধুরী দুলাল  বলেছেন, করোনাভাইরাস মোকাবেলায় সরকারের সক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে। রোগী বাড়লে তাদের প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করা, পর্যাপ্ত পরীক্ষার কিট মজুদ রাখা, সংকট কাটানোর সক্ষমতা অর্জন- এসব ক্ষেত্রে কোনো প্রস্তুতি নেই স্বাস্থ্য খাতের।

এখন রোগী আছে ১৪ জন। পাঁচদিন পরে যে এক হাজার হবে না, এই নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারে না। তিনি দক্ষিণ কোরিয়ার উদাহরণ দিয়ে বলেন, সেখানে ৯৬টি স্থানে করোনাভাইরাস পরীক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে, অথচ আমাদের মাত্র একটি স্থানেই পরীক্ষা করা হচ্ছে। দেশে ব্যাপক হারে রোগটি ছড়িয়ে পড়লে তখন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।

তিনি বলেন, কমপক্ষে প্রতিটি বিভাগীয় শহরে জরুরি ভিত্তিতে করোনাভাইরাস শনাক্ত করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। স্বাস্থ্য বিভাগের সমালোচনা করে তিনি বলেন, তারা বলছে পর্যাপ্ত পিপি আছে, কিট মজুদ আছে। কিন্তু পরিমাণটা তারা বলতে পারছে না। তাদের এ ধরনের আচরণ সন্দেহজনক। করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণে কী কী প্রয়োজন আর কতটা ঘাটতি আছে, সেগুলো পরিষ্কার করতে হবে।

সরেজমিন রাজধানীর এবং দেশের জেলা পর্যায়ে বিভিন্ন হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, চিকিৎসকরা রোগীদের সেবা দিতে অনীহা প্রকাশ করছেন। মিরপুরের ইসলামী ব্যাংক হাসপাতাল, আলোক হাসপাতাল, কিংস্টোন হাসপাতাল, ডা. আজমল হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, জ্বর, সর্দি, কাশি নিয়ে কোনো রোগী এলে সরকারি হাসপাতালে রেফার করা হয়।

মিরপুর ১২ নম্বর কিংস্টোন হাসপাতালের কাস্টমার কেয়ার ম্যানেজার মো. শহীদুল ইসলাম বলেন, আমাদের ইমার্জেন্সি ডাক্তারদের বলা আছে- জ্বর, সর্দি, কাশি ও হাঁচি নিয়ে কোনো রোগী এলে সরকারি কুর্মিটোলা হাসপাতালে যেন রেফার করা হয়।

ডা. আজমল হাসপাতালের ইমার্জেন্সি ডা. রকিবুল হাসান বলেন, যদি এ ধরনের উপসর্গ নিয়ে কেউ আসে, কাউন্সেলিং করে পর্যাপ্ত মেডিসিন দিয়ে সরকারি হাসপাতালে পাঠানো হয়। যেহেতু করোনাভাইরাস শনাক্তের কোনো ব্যবস্থা এখানে নেই, তাই আমারা রিস্ক নিই না।

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল : করোনা হোক বা না হোক সর্দি, কাশি কিংবা জ্বর নিয়ে চিকিৎসা নিতে গেলে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা না দিয়েই রোগীকে ফিরিয়ে দেয়ার অভিযোগ উঠেছে।

এসব উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে এলে সন্দেহ হলেই রোগীকে অন্য হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে। কয়েকদিন ধরে জ্বর ও কাশিতে আক্রান্ত হাবিব নামে মিরপুরের এক রোগী জানান, জ্বর, সর্দি থাকায় চিকিৎসা নিতে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আসেন। কিন্তু ডাক্তাররা তাকে পরীক্ষা না করেই করোনা রোগী বলে ফিরিয়ে দেন। তাদের এমন মন্তব্য শোনার পর রোগীর মধ্যে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়।

এ বিষয়ে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাজমুল হাসান  জানান, আমাদের এখানে একটি কর্নার করা হয়েছে যেখানে রোগীকে প্রাথমিকভাবে দেখে যদি মনে হয় করোনা তাহলে অন্য জায়গায় রেফার করি। এখানে কর্মরত ডাক্তার, নার্স ও অন্যান্য কর্মীদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করেই এটা করা হয়।

তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাসপাতালের আরেক চিকিৎসক বলেন, তাদের ব্যক্তিগত সুরক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত না হলে তারা এসব রোগীকে চিকিৎসা দেবেন না।

মুগদা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল : রাজধানীর মুগদা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের ফিরিয়ে দেয়া হচ্ছে। কাউকে আইইডিসিআর’র হটলাইন নম্বর দেখিয়ে বিদায় করা হচ্ছে। বৃহস্পতিবার হাসপাতাল প্রাঙ্গণে অন্তত ৬-৭ জন রোগীর স্বজন এমন অভিযোগ করেন।

এ সময় হাসপাতালের ভেতরে জরুরি বিভাগের রিসেপশনিস্টের চেয়ারে বসা পারভেজ ও সাইমন রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করার কথাও বলেন রোগী ও স্বজনরা। হামিদুল তার সাড়ে ৩ বছরের শিশু ছেলে হোসাইন ও আরেক শিশুর পিতা হাসিজুম শেখ তার ৫ বছরের শিশু মেয়ে হাবিবাকে কোলে নিয়ে মুগদা জেনারেল কলেজ ও হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যান।

রিসেপশনিস্টের কাছে যাওয়ামাত্রই বলেন, আজকে চলে যান, শনিবার আসবেন। এ সময় শিশুর দুই পিতা শিশুদের খুব ঠাণ্ডা, কাশি, জ্বর- এ কয়েকদিন কি করব। শিশু রোগীর পিতা হামিদুল বলেন, আমার বাচ্চাটার ঠাণ্ডা ও জ্বরের কারণে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে রামপুরা বনশ্রী থেকে আসলাম। চিকিৎসাসেবা না পেয়ে চলে যেতে হচ্ছে।

প্রতিনিধি হাসপাতালের জরুরি বিভাগে রিসেপশনিস্ট পারভেজকে রোগী ফিরিয়ে দেয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, করোনাভাইরাস রোগীদের হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে না। ঠাণ্ডা, কাশি, গায়ে ব্যথা রোগীর এমন উপসর্গ থাকলে ভর্তি নিচ্ছি না। চট্টগ্রামের পরিস্থিতি : চট্টগ্রামে করোনাভাইরাস ঝুঁকিতে হাসপাতালে গিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়ছেন সাধারণ জ্বর ও সর্দি-কাশির রোগীরা। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন হাসপাতাল এমনকি প্রাইভেট প্র্যাকটিশনার-চিকিৎসকরাও করোনার উপসর্গ মনে করে এসব রোগী থেকে দূরে থাকছে।

ক্ষেত্রবিশেষ জ্বর হলেই ‘করোনা সাসপেকটেড’ লিখে জেলার সীতাকুণ্ড থানায় অবস্থিত ফৌজদারহাটের বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব ট্রপিক্যাল অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিস (বিআইটিআইডি)-এ পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে। আবার সেখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে পাঠানো হচ্ছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে।

কিন্তু চমেক হাসপাতালে গিয়েও এসব রোগীকে নিয়ে পদে পদে বিড়ম্বনার শিকার হতে হচ্ছে। চমেক হাসপাতালটির জরুরি বিভাগে জ্বর ও সর্দি-কাশির রোগী দেখার জন্য পৃথক একটি কক্ষ চালু হয়েছে। কিন্তু জরুরি চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের কক্ষে ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না। জরুরি বিভাগের মেডিকেল অফিসার (ইএমও) কক্ষের দরজায় রোগী শয্যা রেখে আটকে দেয়া হয়।

দরজার সামনে থেকেই রোগীর সঙ্গে কেবল কথা বলে ‘অনুমাননির্ভর’ চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে রোগীকে- এমন অভিযোগ করেছেন অনেকে। কিছু চিকিৎসকের ব্যক্তিগত চেম্বার লিখে রেখেছেন- ‘এখানে জ্বর-সর্দি-কাশির রোগী দেখা হয় না।’

দায়িত্বরত মেডিকেল অফিসার ডা. ফয়সাল কবির  বলেন, ‘জরুরি বিভাগে আসা রোগীদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। করোনা প্রতিরোধে সচেতনতা হিসেবে রোগীর কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রাখা হচ্ছে।’ এর আগে বুধবার চমেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগে এক নারীর জ্বর ও শ্বাসকষ্টজনিত রোগ নিয়ে চিকিৎসাসেবা পেতে ভোগান্তিতে পড়েন।

করোনা সন্দেহে ওই নারীর চিকিৎসা দেয়া যাবে না বলে স্বজনদের জানানো হয়। চিকিৎসা না পেয়ে সেখান থেকে রাতেই নগরীর বেসরকারি একটি হসপিটালে ভর্তি করায় স্বজনরা।

খুলনা ব্যুরো : খুলনার দুটি সরকারি হাসপাতালে সর্দি-কাশি-জ্বরের কোনো রোগী ভর্তি করছে না চিকিৎসকরা। করোনা সন্দেহে এমন অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। খুলনা জেনারেল হাসপাতালে ১৫ তারিখের পর থেকে কোনো সর্দি-কাশি এবং জ্বরের রোগী ভর্তি করা হয়নি। শুধু হাঁপানি রোগে আক্রান্তদের ভর্তি করা হচ্ছে। খুলনার সিভিল সার্জন ডা. সুজাত আহমেদ বলেন, যাদের ভর্তি করার প্রয়োজন মনে করছে কর্তব্যরত চিকিৎসক শুধু তাদেরই ভর্তি করা হচ্ছে।

সিলেট ব্যুরো : করোনা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ার পর এখন সর্দি-কাশির রোগীদের এড়িয়ে যাচ্ছেন চিকিৎসকরা। ফলে চিকিৎসাবঞ্চিত সাধারণ রোগীরাও দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৮টায় সিলেটের ডা. শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে যান জিয়াদুর রহমান সুমন নামের এক তরুণ।

সেখানে ডিউটিতে থাকা চিকিৎসক সুমনকে চিকিৎসক নেই বলে ফিরিয়ে দেন। এরপর সুমন চলে যান সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে বহির্বিভাগের টিকিট নিতে চাইলে টিকিট দেয়া হয়নি। কাউন্টারে থাকা মেডিকেল স্টাফ বলেন, টিকিট নেয়ার আগে জরুরি বিভাগের চিকিৎসকের সঙ্গে আলাপ করতে। জরুরি বিভাগে গেলে দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক সমস্যা কি জানতে চান। সুমন হাঁচি, কাশি ও জ্বরের কথা বললে ডিউটিতে থাকা চিকিৎসক সুমনকে দ্রুত বাইরে যেতে বলেন।

করোনা আতঙ্কে রোগীকে চিকিৎসা না দিয়ে ফিরিয়ে দিয়েছে বারডেম হাসপাতাল। রাজধানীর মিরপুরের বাসিন্দা অ্যাজমা রোগী খোদেজা বেগম (৮০) দীর্ঘদিন বারডেমে নিয়মিত চিকিৎসা করতেন। সম্প্রতি তিনি বারডেমে তিনবার ভর্তি ছিলেন। খোদেজা বেগমের মেয়ে সুফিয়া বেগম বলেন, তার মা সম্প্রতি ওমরাহ পালন করে আসার পর তার শ্বাসকষ্ট বাড়ে।

চিকিৎসার জন্য মঙ্গলবার বারডেমে মাকে ভর্তি করতে নিয়ে যান। কিন্তু বারডেম কর্তৃপক্ষ তার করোনা হয়েছে বলে চিকিৎসা না দিয়ে ফিরিয়ে দেয়। পরে খোদেজা বেগমকে নিয়ে কুর্মিটোলা হাসপাতালে গেলে বিভিন্ন পরীক্ষা করে তিনি করোনা আক্রান্ত নন।

এরপর বুধবার পুনরায় বারডেম হাসপাতালে গেলে চিকিৎসক মো. সেলিম জানিয়ে দেন রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইন্সটিউটিউট-আইইডিসিআর থেকে যদি রিপোর্ট দেয় তিনি করোনা আক্রান্ত নন তবেই চিকিৎসা হবে। সুফিয়া জানান, আইইডিসিআরে খোদেজা বিবির পরীক্ষা হয়েছে। দু’দিন পরে রিপোর্ট দেবে বলে জানিয়েছে।

করোনাভাইরাস মোকাবেলায় দেশের সব চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছে চিকিৎসকদের সংগঠন ফাউন্ডেশন ফর ডক্টরস সেফটি রাইটস অ্যান্ড রেসপন্সিবিলিটি (এফডিআরএস)। সংগঠনের চেয়ারম্যান ড. আবুল হাসানাত মিল্টন এবং মহাসচিব ডা. শেখ আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, কয়েকদিন আগে উপজেলা হাসপাতালে কর্মরত একজন ডাক্তার খুব ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে জানালেন, নভেল করোনা ভাইরাস নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন।

প্রতিদিন বহির্বিভাগে অনেক জ্বরের রোগী দেখতে হয়। এর মধ্যে কারও শরীরে করোনাভাইরাস আছে কিনা তা নিশ্চিত নয়। নিজেদের প্রতিরক্ষায় মাস্ক, গ্লাভস বা কোনো পোশাকও নেই। ঢাকা থেকে একজন ডাক্তার জানালেন, ডাক্তারদের কাছে জ্বরসহ নিউমোনিয়ার রোগী বাড়ছে।

রোগের ল্যাবরেটরি টেস্ট করার সুযোগও সীমিত। হাতেগোনা কয়েকটা ল্যাবরেটরিতে এই কনফার্মেটরি টেস্ট করা যায়। সরকার যতই দু-তিনজনের হিসাব দিক না কেন, পর্যাপ্ত টেস্ট করার সুযোগ না থাকার কারণে দেশে নতুন করোনাভাইরাসের প্রকৃত অবস্থা জানা অম্ভব।

এই দুই চিকিৎসক নেতা বলেন, করোনার প্রাদুর্ভাবে সবকিছু বন্ধ করা হলেও হাসপাতাল বন্ধ করা যাবে না। ডাক্তারসহ স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী সবাইকেই হাসপাতালে রোগী দেখতেই হবে। জনস্বার্থে সরকারকে দ্রুত স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের শারীরিক ও মানসিক নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গেই ভাবতে হবে।

বাংলাদেশে করোনা রোগীদের চিকিৎসার্থে একটা প্রটোকল তৈরি করে অবিলম্বে সব ডাক্তারের কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে হবে। স্বাস্থ্য খাতের বিদ্যমান বাস্তবতায় সন্দেহজনক রোগী (সাসপেক্ট কেস) আর নিশ্চিত রোগী (কনফার্মড কেস) কিভাবে চিহ্নিত করবেন সে ব্যাপারে গাইডলাইন থাকতে হবে।

এসব রোগীর চিকিৎসার্থে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ইতিমধ্যে গাইডলাইন তৈরি করেছে। এই গাইডলাইনের আলোকে বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞ কর্তৃক চিকিৎসকদের জন্য একটা ট্রিটমেন্ট প্রটোকল তৈরি সময়ের দাবি।

এসব বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ  বলেন, এখনও আমাদের দেশে যারা আক্রান্ত হয়েছেন তারা পারিবারিকভাবে সংক্রমিত। সামাজিক সংক্রমণ এখনও শুরু হয়নি। আমরা যখন যতটা প্রস্তুতি নেয়া দরকার সেটা নিয়েছি।

বরিশাল বিভাগ ছাড়া দেশের সব বিভাগেরই করোনাভাইরাস পরীক্ষার ল্যাব প্রস্তুত করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে ৭টি পিসিআর মেশিন সংগ্রহ করা হয়েছে। আরও ৯টি মেশিন সংগ্রহের চেষ্টা করা হচ্ছে। সারা দেশের হাসপাতাল প্রস্তুত আছে। রাজধানীর মিরপুরে আরও একটি হাসপাতাল প্রস্তুত করা হয়েছে।

ইজতেমা মাঠ প্রস্তুত করা হচ্ছে। সেখানে চীনের মতো অনেক মানুষ একসঙ্গে কোয়ারেন্টিনে রাখা যাবে। চিকিৎসক-নার্সদের উদ্দেশে বলেন, চিকিৎসক ভাইবোনদের অনুরোধ করব- এটা জাতীয় দুর্যোগ। জাতির স্বার্থে মানবতার স্বার্থে সেবা কাজ থেকে বিরত থাকবেন না। চিকিৎসক-নার্সদের সুরক্ষার সব ধরনের ব্যবস্থা অধিদফতর নিয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী সব ধরনের সরঞ্জাম সরবরাহ করা হচ্ছে।

সারা দেশের চিত্র : রাঙ্গামাটি : রাঙ্গামাটি জেনারেল হাসপাতালে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত বা সন্দেহজনক রোগী চিকিৎসায় পর্যাপ্ত পদক্ষেপ এখনও নেই। হাসপাতালে চালু হয়নি হাঁচি-কাশি, সর্দি-জ্বরের রোগীদের জন্য আলাদা চিকিৎসাসেবা ও নিরীক্ষা কক্ষ। যদিও সিভিল সার্জন বিপাশ খীসা দাবি করেন, এসব রোগীর চিকিৎসায় ২ দিন আগে আলাদা সেবাকক্ষ খোলা হয়েছে। তবে জরুরি বিভাগে কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. এন্টনি চাকমা বলেন, হাঁচি-কাশি, সর্দি-জ্বরের রোগীদের চিকিৎসায় আলাদা সেবা ও নিরীক্ষা কক্ষ এখনও চালু করা হয়নি।

সুনামগঞ্জ : প্রাইভেট চেম্বারের সামনে সর্দি-কাশির চিকিৎসা হয় না এমন নোটিশ ঝুলিয়ে দিয়েছেন কয়েক চিকিৎসক। নোটিশে লেখা আছে ‘হাঁচি-কাশি, নিউমোনিয়া, সর্দি-জ্বরে আক্রান্তরা মোবাইল ফোনে রোগের লক্ষণ জানিয়ে ব্যবস্থাপত্র গ্রহণ করতে পারবেন।’

মৌলভীবাজার : সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা হাঁচি-কাশির সাধারণ রোগীরা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। করোনার ভয়ে জেলার উপজেলার হাসপাতালগুলোতে জ্বর, কাশি ও ব্যথা নিয়ে এলে তাদের আগের মতো চিকিৎসা না দেয়ার অভিযোগ উঠেছে।

বরিশাল ব্যুরো : সর্দি, কাশি এবং জ্বরের রোগীদের চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ পাওয়া গেছে বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে। বরিশাল শেবাচিম হাসপাতালের বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা হাফিজুর রহমান জানান, কয়েকদিন ধরে সর্দি ও কাশি হচ্ছে।

তাই ডাক্তার দেখাতে এসেছি। আমাকে এড়িয়ে চলছেন সবাই। আরেক রোগী হাফসা সুলতানা বলেন, এখানে সর্দি বা কাশি নিয়ে যারাই আসছেন তাদেরই করোনা রোগী ভাবা হচ্ছে। সবাই আমাদের কাছ থেকে দূরে দূরে রয়েছেন। বরগুনা ও ঝালকাঠি থেকেও মিলেছে একই খবর।

কুমিল্লা ব্যুরো : জ্বর কিংবা হাঁচি-কাশি নিয়ে হাসপাতালে দ্বারে দ্বারে ঘুরেও মিলছে না চিকিৎসা সেবা। প্রাথমিক চিকিৎসায় ব্যবহৃত সব ধরনের ওষুধ সংকট দেখা দিয়েছে। প্যারাসিটামল, এন্টিহিস্টামিন এবং এলাট্রল জাতীয় ওষুধের সংকট দেখা দিয়েছে বলে অভিযোগ ক্রেতাদের।

বগুড়া : সর্দি-কাশি নিয়ে আসা কোনো রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করা হচ্ছে না। যদিও শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের প্রধান ডা. জাকির হোসেন বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। তিনি জানান, সর্দি-কাশি কোনো রোগ নয়। সর্দি-কাশি নিয়ে আসা কোনো রোগীকে ভর্তি নেয়া হচ্ছে না এমন অভিযোগ সঠিক নয়।

জয়পুরহাট : গত এক সপ্তাহে জ্বর ও সর্দি-কাশিতে আক্রান্ত একজন রোগীও জয়পুরহাট আধুনিক জেলা হাসপাতালে ভর্তি হননি। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন জয়পুরহাট আধুনিক জেলা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. রাশেদ মোবারক সরদার জুয়েল।

দিনাজপুর : দিনাজপুরে তেমন সুরক্ষা ব্যবস্থা না থাকায় ঝুঁকির মধ্যে দায়িত্ব পালন করছেন একটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ ১৪টি সরকারি হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক, নার্সসহ অন্যান্য দায়িত্বরতরা। তাদের মুখে নেই তেমন কোনো সুরক্ষা সংবলিত মাস্ক, শরীরে নেই কোনো ভাইরাস প্রটেক্টেড অ্যাপ্রোন।

ঝিনাইদহ : সদর হাসপাতালে ঠাণ্ডা, জ্বর কিংবা কাশিতে আক্রান্ত কাউকে ভর্তি করা হচ্ছে না। বাড়িতে অবস্থান করে মোবাইল ফোনে চিকিৎসা সেবা নেয়ার জন্য বলা হচ্ছে তাদের। আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. অপূর্ব কুমার সাহা এ তথ্য জানিয়েছেন। তিনি আরও জানিয়েছেন ব্যক্তিগত নিরাপত্তা সরঞ্জাম (পারসোনাল প্রকেটশন ইকুইপমেন্ট) না থাকায় কর্তব্যরত ডাক্তার-নার্সদের মধ্যে অজানা ভীতি কাজ করছে।

টাঙ্গাইল : টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালসহ বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জ্বর, সর্দি-কাশির রোগীদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয় না। গত এক সপ্তাহে টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে প্রায় ২৫০ জন জ্বর ও সর্দি, কাশির রোগীর বহির্বিভাগে চিকিৎসা দিয়ে তাদের বাসা থেকে চিকিৎসা নেয়ার পরামর্শ দেয়া হয়।

টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডা. জাহাঙ্গীর হোসেন বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, এর আগেও জ্বর ও সর্দি-কাশি নিয়ে যারা হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন তারাও হাসপাতাল থেকে চলে গিয়ে বাড়িতে বসে চিকিৎসা নিচ্ছেন।

রাজশাহী ব্যুরো : করোনা আতঙ্কে রাজশাহী মহানগরীর ক্লিনিকগুলোতে চিকিৎসক সংকট দেখা দিয়েছে। অধিকাংশ ক্লিনিকে চিকিৎসকরা যাচ্ছেন না। এ কারণে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে বেড়েছে সর্দি ও কাশিসহ অন্য রোগীর চাপ। বাস্তবে এ ধরনের অবস্থা বিরাজ করলেও সংশ্লিষ্টরা বিষয়টি স্বীকার করছেন না।

রাজশাহী মহানগরীর বড় ক্লিনিকগুলোর মধ্যে পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ল্যাবএইড, মেডিপ্যাথ, মাইক্রোপ্যাথ, রয়েল হাসপাতালসহ অধিকাংশ ক্লিনিকগুলোতে ডাক্তার সংকট দেখা দিয়েছে। এ কারণে রামেক হাসপাতালে বেড়েছে সর্দি ও কাশিসহ অন্য রোগীর সংখ্যা। এ ব্যাপারে হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. সাইফুল ফেরদৌস বলেন, হাসাপাতালের বহির্বিভাগে রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। আমরা যথাসাধ্য চিকিৎসাসেবা দেয়ার চেষ্টা করছি।

চাঁদপুর : সিভিল সার্জন ডা. সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন চাঁদপুর ২৫০ শয্যা হাসপাতালে ইতিমধ্যে আলাদাভাবে ফ্লু কর্ণার চালু করা হয়েছে। এখানে সাধারণ জ্বর, সর্দি, কাশি নিয়ে যারা আসছেন তাদের চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। ওই হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায় চিকিৎসকদের মাঝেও কিছুটা আতঙ্ক বিরাজ করছে। সিনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. সালেহ আহম্মদ বলেন, ফ্লু কর্নারে না গিয়ে সরাসরি যারা আসছেন তাদেরও তারা চিকিৎসা দিচ্ছেন।

পাকুন্দিয়া : হাসপাতালে চিকিৎসক ও নার্সদের নিরপত্তা বা সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় মেডিকেল মাস্ক ও সুরক্ষা ইউনিফর্ম নেই। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক কর্মকর্তা ডা. মো. রেজাউল করিম বলেন, আমরা আলাদা আইসোলেশন রুম প্রস্তুত রেখেছি। উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জমির মোহাম্মদ হাসিবুস ছাত্তার বলেন, ভাইরাস শনাক্তের জন্য প্রয়োজনীয় কোনো মেশিন বা কিটস হাসপাতালে নেই।

সাতক্ষীরা : রোগীদের অভিযোগ সর্দি-কাশি হলেই হাসপাতাল থেকে তাদের ফিরিয়ে দেয়া হচ্ছে। বাড়িতে থাকার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। যদিও সদর হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডা. জয়ন্ত কুমার বলেন, সর্দি-কাশি নিয়ে কেউ আসেননি তাই ভর্তিও হননি। এমনকি আগে ভর্তি হয়েছেন এমন রোগীও নেই।

গোপালগঞ্জ : সর্দি-কাশিতে আক্রান্তদের আউটডোরে চিকিৎসা দিয়ে বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। তাদের কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়নি।

শরীয়তপুর : শরীয়তপুর সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. সুমন কুমার পোদ্দার বলেন, সর্দি-কাশি বা জ্বর হলে হোম কোয়ারেন্টিনে থাকার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।

ঠাকুরগাঁও : করোনাভাইরাস প্রতিরোধে ঠাকুরগাঁওয়ে জ্বর, সর্দি-কাশিতে আক্রান্তদের হাসপাতালে ভর্তি করা হচ্ছে না। তাদের বাড়িতে থাকার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। সদর হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সিনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. তোজাম্মেল হোসেন বলেন, সর্দি-কাশিতে আক্রান্ত রোগীরা বাড়িতে থেকে নিয়ম মেনে চললে আরোগ্য লাভ করবেন।

সর্বাধিক পঠিত