প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

“মেকআপ শেষে তিলটা সবসময় নিজেই আঁকতেন”…মহানায়িকা সুচিত্রা

রাশিদ রিয়াজ : ৬ বছর আগে ২০১৪ সালে নিজেকে অন্তরালে রাখা বাঙালির মহানায়িকা চিরবিদায় নিয়েছিলেন পৃথিবী থেকে। তবে তাঁকে নিয়ে বাঙালির আবেগ, তাঁকে নিয়ে বাঙালির গর্ব আজও অটুট রয়েছে। তিনি যেন বাঙালির নস্টালজিয়া। প্রধানত সাদাকালো যুগের নায়িকা হলেও তিনি বাঙালি মনে এখনও রঙিন। তাঁর গ্ল্যামার, তাঁর সাজ-পোশাক,তাঁর সৌন্দর্য, তাঁর ব্যক্তিত্বের ধারেকাছেও যেতে যেতে পারেন নি অনেকেই, এমনই আবেগ তাঁকে নিয়ে বাঙালির। ১৯৫২ সাল থেকে শুরু করেছিলেন রূপোলি পর্দা জীবন। কিন্তু তাঁর সাজ-পোশাক, ব্যক্তিত্ব সবকিছুই সময়ের থেকে এতটাই এগিয়ে ছিল যে আজও বাঙালি মনে তাঁকে নিয়ে যে শ্রদ্ধা , যে ভালোবাসার বন্ধন তাতে চিড় ধরেনি এতটুকু, ঠিক যেন “সাত পাকে বাঁধা।”

তিনি ছিলেন পাবনার মেয়ে তাঁর কথাবার্তায় একটা টানও ছিল শুরুর দিকে। কিন্তু ধাপে ধাপে নিজেকে এমন ভাবে তৈরি করেছিলেন যে তাঁর ব্যক্তিত্বের দ্যুতির ছটা, এখনও অনেক বাঙালি নায়িকা এমনকী মেয়েদেরও দিশা দেখায়। বাড়ি থেকে এসে যখন মেকাপরুমে প্রবেশ করতেন, কীভাবে নিজেকে সাজাতেন মহানায়িকা একথা জানতে কে না চায়! সে সময় একের পর এক হিট ছবিতে কাজ করছেন বিখ্যাত মেকআপ আর্টিস্ট শেখ বশির আহমেদ। তখনই নবাগতা সুচিত্রার আবির্ভাব হয় রূপোলি পর্দায়। যুগটা ছিল সাদাকালোর, মেকআপ কারেকশন করার সুযোগ অনেক কম ছিল। এত বিদেশি প্রোডাক্ট, এত নানান ধরনের রঙের সমাহার মেকআপে ব্যবহার করার সুযোগ সেই সময় ছিল না। কিন্তু বশির আহমেদ এমনই একজন মেকআপ আর্টিস্ট ছিলেন, যিনি বাড়িতে বানানো জিনিস দিয়েও, নিজের হাতের জাদু আর তুলির টানে শিল্পীকে চরিত্রের উপযোগী মেকআপ করে দিতে পারতেন।

ইন্ডাস্ট্রিতে তাঁকে বলা হতো “মাস্টারপিস।” আর তাই মহানায়িকা সুচিত্রা সেন এর সবথেকে পছন্দের মেকআপ আর্টিস্ট ছিলেন শেখ বশির আহমেদ। যাঁকে তিনি ডাকতেন বশির মিঞা বলে। মেকাপের ব্যাপারে খুবই খুঁতখুঁতে ছিলেন তিনি । যেকোন চরিত্রে অভিনয় করার আগে ,ফ্লোরে যাওয়ার আগে, মেকআপ যতক্ষণ না পর্যন্ত পুরোপুরি ঠিকঠাক হত মানে তাঁর নিজের পছন্দ হত, ততক্ষণ পর্যন্ত ফ্লোরে যেতেন না। পুরো মেকআপ হয়ে যাওয়ার পর নিজের হাতে “বিউটি স্পট অর্থাৎ সেই তিল” যার প্রেমে একসময় বাঙালি ছেলেরা প্রায় উন্মাদ ছিলেন, সেই তিলটি আঁকতেন নিজে হাতে। কোনও মেকাপম্যানকে দিয়ে কখনই তিনি ওই তিলটি আঁকাতেন না।

সেই সময় মেকাপম্যানদের সঙ্গে আর্টিস্টদের সম্পর্কটা অনেকটাই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল।ভরসার সম্পর্ক ছিল।একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা ছিল প্রগাঢ়। বশির মিঞা তাঁর প্রিয় নায়িকার জন্য বাড়িতেই নানা রকম রং তৈরি করতেন, কোন রঙের সঙ্গে কতটা মেশালে, ঠিক কী ধরনের রং তৈরি হবে, যা তাঁর মহানায়িকা পছন্দ করবেন সেটা একমাত্র জানতেন বশির মিঞা। আর তাই বশির মিঞাকে ভীষণ পছন্দ করতেন, বিশ্বাস করতেন সুচিত্রা সেন।

তিনি ছিলেন “ইন্ডাস্ট্রির ম্যাডাম।” সেই সময়ে ইন্ডাস্ট্রিতে আর কাউকেই ম্যাডাম নামে ডাকা হতো না। নিজের লুক’ সম্পর্কে খুবই সচেতন ছিলেন সুচিত্রা সেন। সঠিক সময়ে স্টুডিওতে আসতেন সব সময। মেকআপের জন্য তাঁর সময় একটু বেশি লাগতো। সেসময় চড়া মেকাপের যুগ ছিল। সাদা-কালো যুগে চোখ ঠোঁট এই সমস্ত ফুটিয়ে তোলাও যথেষ্ট চ্যালেঞ্জিং ছিল।কিন্তু বশিরের ওপর ভরসা করতেন মহানায়িকা। বিশেষ বিশেষ চরিত্রে অভিনয় করার সময়, নির্দিষ্ট করে বলে দিতেন, “আমার মেকআপ বশির মিঞা করবে।” আয়নার সামনে তাকিয়ে চুপ করে বসে থাকতেন, বশির মিঞা থাকলে। একবার অগ্নিপরীক্ষা ছবিতে তার লুক এতটাই প্রশংসা পেয়েছিল বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় যে, সেসময় এই নিয়ে লেখালিখিও হয়েছিল খুবই। খুশি হয়েছিলেন মহানায়িকা আর তাই সোজা পৌঁছে গিয়েছিলেন তাঁর বশির মিঞার বাড়িতে। সঙ্গে একটি শাড়ি ।সেই শাড়িটি উপহার হিসাবে দিয়েছিলেন বশির মিঞার স্ত্রীকে।খানিকটা মডার্ন সাজে সজ্জিত হতে ভালোবাসতেন সুচিত্রা সেন।, তাঁর মেকআপ,তাঁর চোখ আঁকা, তাঁর চুলের স্টাইল, তাঁর জুয়েলারি কালেকশন, সবকিছুই সময়ের থেকে অনেকটাই এগিয়ে ছিল।

ভীষণ কোপারেটিভ ছিলেন তিনি ।সবার সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করতে ভালোবাসতেন, জানালেন বশির আহমেদের ছেলে বিখ্যাত মেকআপ আর্টিস্ট শেখ আজাদ আহমেদ। বশির মিঞার সঙ্গে সুচিত্রা সেনের সম্পর্কটা ছিল পারিবারিক। অভিনয় জগৎ ছাড়ার পর সুচিত্রা নিজেকে অন্তরালে নিয়ে চলে গিয়েছিলেন। লোকচক্ষুর সামনে কখনোই আসতেন না তিনি। সে সময় বশির আর নেই। কিন্তু তাঁর ছোট ছেলে আজাদের বিয়েতে নিমন্ত্রণ করার জন্য গিয়েছিলেন বশিরের বড় ছেলে বেচু আহমেদ যিনিও একজন বিখ্যাত মেকআপ আর্টিস্ট। সবার জন্য দরজা বন্ধ থাকলেও নিজের প্রিয় মেকআপ আর্টিস্ট বশিরের ছেলের হাত থেকে দরজার আড়ালে থেকেও নিমন্ত্রণ পত্র নিয়েছিলেন আর বলেছিলেন, “আমি তো কখনও বাইরে যাব না, কিন্তু বশির মিঞার ছেলে, তার বিয়ে বলে কথা! আমার তরফ থেকে অনেক আশীর্বাদ রইল়। ভালো থেকো তোমরা।” এমনই ছিল সম্পর্ক । এমনই ছিল অন্যের প্রতি সম্মান।

যখন বাড়ি থেকে আসতেন মহানায়িকা বেশিরভাগ সময়ই গাউন পরে আসতেন। আসলে গাউন ছিল তা খুব পছন্দের পোশাক। আর বেশিরভাগ সময় ছবি শেষ হয়ে গেলে মেকআপ করেই বাড়ি ফিরতেন তিনি। সব সময় বাইরে বেরোলে কালো চশমা পরতেন, আজাদ আহমেদ যিনি বশির আহমেদের ছেলে, জানালেন,” বাবা বলতেন, তিনি যা দেখতে চান তা ওই কালো চশমার ভেতর দিয়ে দেখতেন কিন্তু তাঁর চোখে তিনি কাকে দেখছেন তা কাউকে দেখাতে তিনি চাইতেন না।” নিজের কাজ সম্পর্কে খুবই সিরিয়াস ছিলেন তিনি, ফ্লোরে যাওয়ার আগে ডায়লগ পড়তেন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে। নিজের পাঠ বলতেন আর তাঁর প্রিয় বশির মিঞার জন্য বরাদ্দ করে দিতেন বিপরীত চরিত্রের ডায়লগ টুকু। ম্যাডামের আদেশ অগত্যা বশির মিঞা ও তাই করতেন। উত্তমকুমার আর সুচিত্রা সেন, একে অন্যের পরিপূরক, রুপোলি পর্দায় যাদের জুটির ম্যাজিক এখনও ততটাই আকর্ষণীয়। সেই জুটি যখন ফ্লোরে যেত তখন কিন্তু বদলে যেতেন দুজন! কাজের মানুষ একে অপরকে টেক্কা দেওয়ার লড়াই চলত দুজনের মধ্যে, তবে অবশ্যই কাজের মাধ্যমে। দুজনের কাজে যাতে কোনও সমস্যা না হয়,কে ছোটো,কে বড় এই ব্যাপারটি মাঝখানে না আসে তার জন্য দুজনের মেকআপ রুমে দুজন সহকারী পরিচালক দাঁড়িয়ে থাকতেন। যে দুজন জানিয়ে দিতেন ম্যাডাম বেরিয়েছেন মেকআপ রুম থেকে। আর ওদিকে উত্তমদা বেরিয়ে গেছেন মেকআপ রুম থেকে বার্তা পৌঁছতে অভিনেতাদের কাছে । আর তারপরেই দুই অভিনেতা ফ্লোরে হাজির হতেন। আর সেই ম্যাজিক, সেই অন স্ক্রিন কেমিস্ট্রি দিয়ে একের পর এক হিট ছবি দিতেন বাংলার মহানায়ক, মহানায়িকা উত্তম সুচিত্রা।বহু ছবিতে মেকআপের কাজ করেছিলেন বশির আহমেদ। সপ্তপদী, অগ্নিপরীক্ষা, শাপমোচন তার মধ্যে অন্যতম। সুচিত্রা সেনের গাড়ির কাঁচ সব সময় কালো থাকতো। শোনা যায় ছবির বাইরের জগৎ সম্পর্কে কাউকেই কিছু দেখা কিছু দেখাতে বা জানাতে একেবারেই পছন্দ করতেন না বাঙালির মহানায়িকা। আজ থেকে ছয় বছর আগে পৃথিবীকে চিরবিদায় জানান তিনি। সুচিত্রা সেনের মেকআপ বা তাঁর সম্পর্কে এই নানান অজানা বিষয় জানিয়েছেন সুচিত্রা সেনের মেকআপ আর্টিস্ট শেখ বশির আহমেদের ছেলে বিখ্যাত মেকআপ আর্টিস্ট শেখ আজাদ আহমেদ। টেলিফোনিক সাক্ষাৎকারটি এনডিটিভি বাংলার তরফ থেকে নিয়েছেন রেনেসাঁ চক্রবর্তী। এনডিটিভি থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত