প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ভুটান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়ার ৪ দিন আগেই আমরা জানতে পেরেছিলাম

প্রিয়াংকা আচার্য্য : ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদান অনস্বীকার্য। রাজনীতিক থেকে মাঠ পর্যায়ের মানুষ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে এ যুদ্ধে বাংলাদেশিদের অকুণ্ঠ সমর্থন প্রদান করেছেন। বিশেষ করে এ দেশের সীমান্তবর্তী ভারতের সাধারণ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সেই সব ঘোর অমানিষায় নানাভাবে আমাদের পাশে ছিলেন।

তাদেরই একজন বিমান ধর। ত্রিপুরার উদয়পুরের বাসিন্দা ছিলেন একাত্তরে। সাংবাদিকতা করতেন রাজ্যের বিখ্যাত পত্রিকা দৈনিক সংবাদে। পত্রিকাটির সম্পাদক ভূপেন দত্ত ভৌমিক বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে রেখেছিলেন অনন্য অবদান। এরই ফলে তিনিও জড়িয়ে গিয়েছিলেন অন্তরঙ্গভাবেই। কাজ করেছেন ভারতের সরকারি বেতার কেন্দ্র আকাশ বাণীতেও। বর্তমানে ছেলের সঙ্গে আগরতলায় থাকেন। কলামিস্ট হিসেবে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় লিখছেন। গত ২৭ নভেম্বর মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে জানলাম তার মতামত ও অভিজ্ঞতা।

তখন রাত হলেই ত্রিপুরার অধিকাংশ মানুষ ভয়ে থাকতো। কারণ এখানে পাকিস্তানিরা সেল ফেলতো। আর বিমানের শব্দ শুনে বোঝা যেতো না সেটি শত্রু পক্ষের কিনা। তবে দিনের আলো ফোটার সাথে সাথেই সবার উদ্বিঘœতা মুছে যেতো। মানুষ আবার রাস্তায় নামতো। যার যার কাজ করতো।’

‘আমি তখন উদয়পুর থাকতাম। এটা ত্রিপুরার একমাত্র সাবডিভিশন যার সঙ্গে বাংলাদেশের বর্ডার সংযোগ নেই। তাই সরাসরি যুদ্ধ দেখার কোনও স্মৃতি না থাকলেও একটা ঘটনার কথা বলি। আমার বাড়ির পেছনে একটা অ্যান্টি এয়ার ক্রাফট গানের ইন্সটলেশন ছিল। একদিন দুইটা উড়ন্ত প্লেনকে টার্গেট করে সেখান থেকে ফায়ার করে ধরাসায়ী করা হয়। আমরা বুঝতে পারলাম সেগুলো পাকিস্তানি প্লেন তাই এই বিশাল সাকসেসে এলাকার সবাই ভীষণ উল্লসিত হয়ে পড়ি।’

‘যুদ্ধ নিয়ে ত্রিপুরার সবারই কম-বেশি উত্তেজনা ছিল। এমনই একজন ছিলেন এস কে নাগের ছেলে অমল নাগ। এয়ার ফোর্সে কাজ করতো। ছুটিতে তখন বাড়ি এসেছিল। সে এতো উদ্দীপ্ত ও উত্তেজিত ছিল যে মুহুরী চরের উল্টো দিক দিয়ে ফেনী নদী পার হয়ে বাংলাদেশের একদম ভেতরে চলে যায়। আর ফিরে আসেনি। পাকিস্তানিরা তাকে হত্যা করেছিল।’

‘যুদ্ধ চলাকালে আমরা একবার চট্টগ্রামের আটহাজারি পর্যন্ত গাড়ি নিয়ে গিয়েছি। ফেরার পথে রামগড় থানায় যাই। ওসি জানালেন তাদের কাছে কোনও জ¦ালানী তেল নেই। তখন আমাদের গাড়িতে ২০০ লিটারের এক ড্রাম পেট্রোল ছিল। আমরা তাদের সেই ড্রামটা দিয়ে দিলাম। থানা থেকে বের হওয়ার সময় ওসি তার এক পরিচিতজনকে আগরতলার এমএলএ হোস্টেলে পৌঁছে দিতে অনুরোধ করলেন। দেখলাম চল্লিশোর্ধ্ব এক দীর্ঘ সুঠাম সুন্দর স্বাস্থ্যের লোক। কিন্তু তার পায়ে কোনও জুতা বা স্যান্ডেল নেই। খালি পায়ে তিনি ফেনী নদী পার হয়ে আমাদের সঙ্গে গাড়িতে উঠলেন। একরাত আমার বাড়িতে রাখার পর তাকে গন্তব্যে পৌঁছে দিলাম।’

‘উনি মোফাজ্জল হোসেন বারী। ত্রিপুরার দক্ষিণের শরণার্থী শিবিরগুলোতে কাজ করা শুরু করলেন। তাকে একদিন এখানকার প্রিজাইডিং অফিসার ক্যাপ্টেন চারু সাহার কাছে নিয়ে দেখলাম তারা পূর্বপরিচিত। দেখা হওয়ার সাথে সাথেই পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে সৌহার্দ বিনিময় করলেন। এরপর থেকে চারু বাবুর সঙ্গে মোফাজ্জল হোসেন বারী ও আমি অনেক ক্যাম্পে গিয়েছি। দক্ষিণের ক্যাম্পগুলোতে দেখতাম অনেকেই বারী সাহেবকে চিনতেন ও যথেস্ট আপ্যায়িত করতে চেষ্টা করতেন। আমরা বুঝতে পারতাম উনি খুব পরিচিত কেউ।’

‘উনার গুরুত্ব আরও অনেক পরে বুঝতে পারি। উনি আমার বাড়িতে বসে ৪ দিন আগে জানিয়েছিলেন যে, ভুটান বাংলাদেশকে সবার আগে স্বাধীন দেশের স্বীকৃতি দেবে। সেই সময়ে এই খবরটা যদি আমি স্কুপ করতাম তাহলে সারা বিশে^ সাড়া পরে যেত। কিন্তু তখন বয়স কম ছিল। ঘটনার গুরুত্বটা বুঝতে পারিনি।’
‘স্বাধীনতাযুদ্ধে ত্রিপুরা থাকার জন্য শুধু ভূমিই দেয়নি স্থানীয়রা বাংলাদেশের অসহায় মানুষদের পাশে থেকে উদ্দীপ্তও করে গেছে। ক্যাম্পবাসীদের সঙ্গে স্থানীয়রা যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছিল। দুদেশের মধ্যে একটা আত্মীয়তা গড়ে উঠেছিল, যেটা পৃথিবীর বুকে বিরল দৃষ্টান্ত।’

‘ভারত সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে পাকিস্তানের করা অন্যায়-অত্যাচারের শিকার বাংলাদেশকে তারা সহায়তা করবে। তবে ভারতের সাধারণ জনগণ যদি সেই সিদ্ধান্ত না মানতো তাহলে প্রশাসনের চাপ থাকা স্বত্ত্বেও বাংলাদেশের পাশে থাকা অসম্ভব হতো। কিন্তু এখানকার সাধারণ মানুষ সাবলীলভাবে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান থেকে আসা বাঙালিদের আশ্রয় দিয়েছে।’
‘সেইসাথে ত্রিপুরার বুদ্ধিজীবী ও সাংবাদিকরা প্রচুর লেখালিখি করেছেন। বড় পত্রিকা থেকে ছোট কাগজ সব জায়গাতেই বাংলাদেশ মুভমেন্টের পক্ষে লেখা হয়েছে। এখানে বিশেষ করে ভূপেন দত্ত ভৌমিক ও বিকচ চৌধুরীর নাম উল্লেখ করতে হয়। বিকচ ত্রিপুরার একমাত্র সাংবাদিক যিনি ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানের সারেনন্ডারের দিন রেসকোর্সে উপস্থিত ছিলেন।

আর ভূপেন দত্ত ভৌমিকের দৈনিক সংবাদ অফিসে তখন মুক্তিযুদ্ধের সকল সংবাদ পাওয়া যেত। অফিসটি তখন মুক্তিযুদ্ধের তথ্যকেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। তিনি এ যুদ্ধের সাথে জড়িয়েছিলেন আবেগ ও দায়িত্ব নিয়ে। ভারতের অনেক বড় বড় সাংবাদিক- দেবদুলাল বন্দোপাধ্যায় (আকাশবাণী), মানস ঘোষ স্টেট্সম্যান, বরুণ সেনগুপ্ত (আনন্দবাজার) সহ সবাই জড়ো হয়েছিলেন এখানে। বিদেশি সাংবাদিকরাও এখানে বসেই মুক্তিযুদ্ধের তথ্য পেতেন।’

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত