প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

প্রাচ্য-প্রতীচীর পথে প্রান্তরেঃ ফুজি পর্বতারোহণ

ডঃ শোয়েব সাঈদ, স্কুলে আগ্নেয়গিরি সম্পর্কে স্যাররা যখন পড়াতেন, মাউন্ট ফুজি আর ভিসুভিয়াস বরাবরই ছিল আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। পম্পেই নগরীর লাভা স্রোতে হারিয়ে যাবার ইতিহাস পড়বার সময় একটা আকাংখা কাজ করত আহা আগ্নেয়গিরিগুলো যদি দেখতে পারতাম। জীবনচক্রের চক্করে অপূর্ণ আকাংখার পাশাপাশি আবার অনেক আকাংখাই থাকে যেগুলি নীরবেই পূর্ণ হয়ে যায়। মাউন্ট ফুজির জ্বালামুখ পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়া স্বপ্ন পূরণের মতই একটি আকাংখার সফল বাস্তবায়ন। উচ্চশিক্ষা, চাকুরী সব মিলিয়ে জাপানে বসবাস করতে হয়েছে দেড় যুগের মত; জীবনের সোনালী অধ্যায়ের এক বিশাল অংশ। ১৯৯৯ সালের দিকে জাপানের নাগানো প্রিফেকচারের শিনশু বিশ্ববিদ্যালয়ে জাপান সরকারের জেএসপিএস পোস্ট ডক্টরাল ফেলোশিপে গবেষক হিসেবে কাজ করছিলাম। শীত, তুষার, পাহাড়, লেক আর শীতকালীন অলিম্পিক খ্যাত জাপানের নাগানো প্রিফেকচারকে বলা যায় প্রকৃতির নন্দনকানন। মাউন্ট ফুজি (৩৭৭৬ মিটার) বাদে জাপানের ১০টি বড় পাহাড়ের অধিকাংশই এই নাগানো বা নাগানো সংলগ্ন এলাকায় অবস্থিত যাদের উচ্চতা ৯০০০ ফুটের বেশী। সাতটি বছর কাটিয়েছি মায়াবী প্রকৃতির দৃষ্টিনন্দ এই দৃশ্যপটে। নাগানোতে ঘরের জানালা খুললে প্রথম দৃষ্টিটা যেন জাতীয় কবি নজরুলের গানের অনুরণন “আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায় ওই”। সারি সারি উঁচু পাহাড়ের প্রিফেকচার নাগানোর পাহাড় প্রিয় সমাজে ছাত্র আর গবেষক হিসেবে কয়েক বছরের অবস্থানের সুযোগে ছোট খাট পাহাড়, পর্বত আরোহণ করার একটা অভ্যাস তৈরি হয়ে গিয়েছিল। ১৯৯৯ সালের গ্রীষ্মে ভাবলাম পাহাড়-পর্বতে উঠার সখ পূরণে আমার এই সৌখিন স্তরে পর্বতারোহণের অভ্যাসটির পূর্ণতা দিতে হলে মাউন্ট ফুজির মত জনপ্রিয় পর্বতে চড়া চাই। সেই মতে শিনশু বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণারত কয়েকজন বাংলাদেশী আর ভারতীয়দের সমন্বয়ে একটা দল তৈরি হয়ে ফেললাম। আগস্টের মাঝামাঝিতে জাপানের ওবন (প্রয়াতদের আত্মার সাময়িক মুক্তি আর পৃথিবীতে বছরে একবার ফিরে আসার মিথ ভিত্তিক আচারানুষ্ঠান) ছুটির সময় সিদ্ধান্ত নিলাম ফুজি পর্বতারোহণের। ফুজি পর্বতারোহণ নিয়ে লেখার ইচ্ছে ছিল অনেক দিনের। জীবন চক্রের বহমানতায় দেখা গেল আমার চড়ার দেড় যুগ পর আমার ছেলে আসাহী উঠে গেল ফুজির চূড়ায়। পিতা-পুত্রের ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ফুজি আরোহণের ঘটনাটি উৎসাহিত করল ফুজি নিয়ে লিখবার। যাক, মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসি। ফুজি পর্বতের অবস্থান নাগানোর অনতিদূরে; নাগানোর পাশের দুটো প্রিফেকচার শিজুওকা আর ইয়ামানাশি জুড়ে ফুজির অবস্থান। ফুজিতে উঠতে হলে বেশ কয়েকটি পথ আছে যা ট্রেইল নামে অধিক বোধগম্য। তারমধ্যে দুটো ট্রেইল বেশী জনপ্রিয়; একটি ইয়ামানাশির দিক থেকে অন্যটি শিজুওকা থেকে। আমরা ইয়ামানাশি প্রান্ত থেকে উঠার সিদ্ধান্ত নিলাম। আমার বাসস্থান নাগানো প্রিফেকচারের ইনা শহর থেকে আমি আর আমার ভারতীয় বন্ধু ডঃ রাজা সহ ড্রাইভ করে চলে গেলাম ইয়ামানাশির যে প্রান্ত থেকে ফুজিতে উঠতে হয় সেখানে। পথিমধ্যে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং এর ছাত্র হামিদ সহ দুজন বাংলাদেশীকে রেল স্টেশন থেকে তুলে নিলাম।

মাউন্ট ফুজি, জাপানীদের প্রিয় “ফুজি সান” সুমাত্রার কেরিঞ্চি’র পর এশিয়ার দ্বিতীয় উচু আগ্নেয়গিরি। ঘুমন্ত এই আগ্নেয়গিরিটির সর্বশেষ উদ্গীরন ১৭০৭-৮ সালের দিকে। টোকিও থেকে ১০০ কিমি দক্ষিণ পশ্চিমে অবস্থিত ফুজি সানের চূড়াটি বছরের অধিকাংশ সময় বরফে ঢেকে থাকে তাই টুরিস্টদের জন্যে আরোহণের সময়টি গ্রীষ্মকাল। ধর্মীয় পবিত্রতা, শিল্প, সাহিত্য আর সংস্কৃতির জাপানী ঐতিহ্যে ফুজি সানের অবস্থান জাপানীদের মননে অন্যরকম উচ্চতায়। এটি ২০১৩ সাল থেকে ইউনেস্কো’র বিশ্ব হেরিটেজ সাইট। বিচ্ছিন্ন কিছু তথ্যে জানা যায় ফুজি পর্বতে প্রথম বিদেশী মহিলা পর্বতারোহী হচ্ছেন টোকিওতে নিযুক্ত ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূতের স্ত্রী, ১৮৬৯ সালে। ১৯৬৬ সালে পাহাড় থেকে ঊর্ধ্বমুখী বাতাস চক্রে পরিস্কার আকাশে টারবুল্যান্সে ১১৩ জন যাত্রী আর ১৩জন স্টাফ নিয়ে বোয়িং ৭০৭ এর একটি ফ্লাইট বিধ্বস্ত হয় ফুজির পাদদেশে। গোতেম্বার দিক থেক ফুজিতে উঠার সময় পঞ্চম স্টেশনে বিমান দুর্ঘটনায় নিহতদের স্মরণে একটি মেমোরিয়াল আছে। জাপানী প্রবাদ আছে বুদ্ধিমান মানুষের জীবনে একবার ফুজিতে না উঠলেই নয়, শুধু বোকারা উঠে দুবার। ফুজির চূড়ায় ছিল টাইফুন সহ আবহাওয়ার গতিবিধি দেখভালের জন্যে মনুষ্য পরিচালিত আবহাওয়া স্টেশন যা ২০০৪ সালে বন্ধ করে দেওয়া হয়। এখন এটি মনুষ্যবিহীন স্বয়ংক্রিয় আবহাওয়া সিস্টেমের অধীনে। ফুজি পর্বতকে ঘিরে আছে চারটি শহর; উত্তরে ফুজি ইয়োশিদা, পূর্বে গোতেম্বা, দক্ষিণ-পশ্চিমে ফুজিনোমিয়া আর দক্ষিণে ফুজি শহর। আমরা উত্তরের ইয়ামানাশি প্রিফেকচারের ফুজি ইয়োশিদা থেকে ফুজিতে উঠার পথটি ব্যবহার করি। গো কো অর্থাৎ পাঁচটি চমৎকার লেক ফুজির চারপাশের নৈসর্গিক নান্দনিকতায় সংযোজন করেছে অন্য রকম ভাল লাগার তুলনাবিহীন এক ল্যান্ডস্কেপ। লেক কাওয়াগুচি, ইয়ামানাকা, সাই, মোতোসু, শুযি না দেখলে ফুজি দর্শন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। পরিবার আর অতিথিদের নিয়ে ঘুরবার জায়গা হচ্ছে ফুজির চারপাশের এই লেকগুলো।

ফুজি আরোহণের অনেকগুলি স্তর আছে। সাধারণত স্তর পাঁচ বা পঞ্চম স্টেশন পর্যন্ত গাড়ী নিয়ে যাওয়া যায়। ইয়ামানাশি প্রিফেকচারের ফুজি ইয়োশিদা ট্রেইলের পঞ্চম স্টেশনের উচ্চতা ২৩০০ মিটার অর্থাৎ ঐ পর্যন্ত গাড়ী দিয়ে যাওয়া যায়। শিজুওকা প্রিফেকচারের সুবাশিরি ট্রেইলের পঞ্চম স্টেশনের উচ্চতা ২০০০ মিটার। শিজুওকা প্রিফেকচারের গোতেম্বা ট্রেইলের পঞ্চম স্টেশনের উচ্চতা ১৪০০ মিটার। শিযুওকা প্রিফেকচারের ফুজিনোমিয়ার ট্রেইলের পঞ্চম স্টেশনের উচ্চতা ২৪০০ মিটার।

বিশ্বব্যাপী আগ্নেয়গিরির চরিত্র বিন্যাসে ফুজিকে তুলনা করা হয় ভিসুভিয়াসের সাথে। ফুজি কৌনিক আকৃতির আগ্নেয়গিরি এবং প্রায় ৫০০০ বছর যাবৎ একই আকৃতির। ফুজি পর্বত হচ্ছে বাসল্টিক স্ট্রাটো ভল্কানো এবং এর দৃষ্টিনন্দ কৌণিক আকৃতিটি মূলত দুই পর্বের আগ্নেয় কার্যক্রমে পুরাতন ফুজি পর্বত থেকে বর্তমানের ফুজি পর্বতে রুপান্তরনের ফলাফল। তিনটি ভিন্ন আগ্নেয়গিরি; কোমিটাকে, কো ফুজি আর ফুজি নিয়ে ফুজি ভলকানো গঠিত। অপরদিকে মাউন্ট ভিসুভিয়াস ইতালীর নেপলসে। মাত্র ১২৭৭ মিটার উচু এই আগ্নেয়গিরি ১৭ হাজার বছরের এবং এখনো সক্রিয়। এর উদ্গীরনে হাজার হাজার মানুষ মারা যায়, বিধ্বস্ত হয়ে যায় পম্পেই নগরী। ফুজি তুলনামুলকভাবে নবীন। ফিলিপাইন সী প্লেট, ইউরেশিয়ান প্লেট এবং উত্তর আমেরিকান প্লেটের মিলনস্থলে ফুজি পর্বত অবস্থিত। এই তিনটি প্লেট পশ্চিম জাপান, পূর্ব জাপান আর ইযু পেনিনসুলা গঠন করে। তিন প্লেটের নীচে অবস্থিত প্যাসিফিক প্লেটের অবস্থানের পরিবর্তন ফুজির উদ্গীরনের কারণ। ভিসুভিয়াসের ক্ষেত্রে আফ্রিকান আর ইউরেশিয়ান প্লেটের সংঘর্ষ অগ্নুৎপাতের কারণ। ফুজি আকারে ভিসুভিয়াসের চাইতে বড় হলেও ধ্বংসযজ্ঞে ভিসুভিয়াস অনেক আগ্রাসী।

যাক এবার আমাদের আরোহণের গল্পে ফিরে আসি। ইনা শহর থেকে হাইওয়ে আর স্থানীয় সড়ক ধরে কয়েক ঘণ্টার ড্রাইভে পৌঁছে গেলাম ইয়ামানাশি প্রিফেকচারের ফুজি ইয়োশিদা ট্রেইলের পঞ্চম স্টেশনে। আমরা সন্ধ্যার আগেই বাসা থেকে বের হই। উদ্দেশ্য ছিল মাঝরাত থেকে আরোহণ শুরু করে মেঘের উপরে উঠে গিয়ে সূর্যোদয় দেখব। আবহাওয়ার সুপ্রসন্নতা এখানে নিয়ামক এবং আমাদের ক্ষেত্রে এই সুপ্রসন্নতা ছিল চমৎকার, ফলে পরিষ্কার আকাশে সূর্যোদয় দেখার সুযোগ জুটে গিয়েছিল। ফুজি ইয়োশিদা ট্রেইলের স্টেশন পাঁচের পার্কিং লটটি আয়তনে বড় হবার জন্যে অসংখ্য গাড়ী আর বাসের সংস্থান হয় ফলে অনেক জনপ্রিয়। বাস বা গাড়ী ঐ লটে রেখে ওখান থেকে অর্থাৎ ২৩০০ মিটার উচ্চতা থেকে হাঁটা শুরু করতে হয়। গাড়ী রেখে আরোহণের প্রস্তুতি নিতে মাঝরাত হয়ে যায়। আমরা রাত বারোটায় হাঁটা শুরু করি। হাঁটার শুরুতে কিছু জাপানী সহযাত্রী জুটে যায় এবং সবাই দলবেধে ফুজির চূড়ায় উঠার রাস্তা দিয়ে এগুতে শুরু করি। টর্চ লাইট, গাছের ডাল দিয়ে তৈরি লাঠি, রেইন কোর্ট, হ্যান্ডি অক্সিজেন সিলিন্ডার, কিছু খাবার ছিল আমাদের মিশনের অংশ।

পঞ্চম স্টেশন থেকে ১০০ মিটার উচুতে উঠলেই ষষ্ঠ স্টেশন। মূলত ষষ্ঠ স্টেশন অর্থাৎ ২৪০০ মিটার পর্যন্তই গাছপালার দেখা মিলবে। ফুজির উত্তর পশ্চিম প্রান্তে নীচের দিকের জঙ্গলকে বলা হয় আওকিগাহারা বা সবুজ মাঠ। ভূত, প্রেত্‌, পেত্নি, ইত্যাদি ভৌতিক কল্পকাহিনীর জঙ্গল হচ্ছে আওকিগাহারা। আওকিগাহারার কুখ্যাতি বিশ্বব্যাপী আত্মহননের জঙ্গল রূপে। সানফ্রান্সিস্কোর গোল্ডেন গেট ব্রিজ, চীনের নাঞ্জিং ব্রিজের পর বিশ্বের তৃতীয় জনপ্রিয় সুইসাইড জোন হচ্ছে আওকিগাহারা। ১৯৫০ সাল থেকে এপর্যন্ত ৫০০ জনের আত্মহনন হয়েছে এখানে। গড়পড়তা বছরে ৩০ জনের আত্মহত্যার ঘটনা ঘটলেও ৮০ জনের মৃতদেহ পাবার রেকর্ড ছিল ২০০২ সালে। সুইসাইডকে নিরুৎসাহিত করতে অনেক সাইনবোর্ড লাগানো আছে আওকিগাহারায়। প্রচলিত আছে অনেকে আত্মহত্যার প্রস্তুতি হিসেবে খাবার-দাবার নিয়ে তাবু খাটিয়ে অবস্থান নেয়। মন পরিবর্তন হলে অনেকে ফিরে যায়, না হলে শেষ যাত্রায় মূলত গাছে ঝুলে পড়ে। এই জঙ্গলে হাঁটতে গিয়ে মৃতদেহের সাথে দেখা মেলা খুব বিরল নয়। বাংলাদেশে জনপ্রিয় জাপানী সিরিজ অশীন যারা দেখেছেন তাদের মনে থাকবার কথা খাবারের অভাবে জাপানীদের একটা সময় বৃদ্ধদের জঙ্গলে রেখে আসবার করুণ উপাখ্যানের কথা। গরীব পরিবারের বৃদ্ধ, বৃদ্ধাদের এমনকি বাচ্চাদের এই আওকিগাহারায় জঙ্গলে ফেলে আসবার অনেক করুণ কাহিনী রয়েছে।

ফুজির চারপাশে আল্পাইন ফরেস্ট লাইন নামে পরিচিত গাছপালার সমাহার মুলত ৭০০ থেকে ২৪০০ মিটার পর্যন্ত। ফুজি পর্বতের রয়েছে বিভিন্ন ধরনের গাছপালার অপরূপ সমাহার। উপরের দিকে যতই উঠবেন গাছপালা ক্রমশ কমবে। প্রতি ১০০ মিটার উচ্চতায় ০.৬ সেন্টিগ্রেড ডিগ্রী তাপমাত্রা কমতে থাকবে। স্টেশন ৬ এর পর শুধু মাটির সমাহার। ফুজি পর্বতের উপরের দিকে লাল মাটির কারণ হচ্ছে অক্সিডেশন বা অক্সিজেনের স্পর্শে জারিত হয়ে লাল হয়ে যাওয়া। ব্যাসাল্ট লাভা হচ্ছে কম ভিস্কোসিটি বা সান্দ্রতার, ফলে বিরাট এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে গিয়ে ইউনিক ল্যান্ডস্কেপ তৈরি করে। এই ষষ্ট স্টেশন থেকে একটি রাস্তা উপরে দিকে চূড়ায় চলে গেছে এবং ভিন্ন দিক দিয়ে চূড়া থেকে নীচে নামার আরেকটি রাস্তা এসে মিলিত হয়েছে। সাথীদের কেউ উপরের দিকে যেতে সাহস না পেলে এই স্টেশনে থেকে যাওয়া উত্তম, অন্যরা ফেরার পথে এই স্টেশনে মিলিত হয়ে তাঁদের সাথে করে নিয়ে ফিরতে পারে। এখানে দোকান,, টয়লেটসহ বিশ্রামের জায়গা রয়েছে। পর্বতারোহণ তো খাড়াভাবে নয়, মূলত প্যাঁচানো রাস্তা ধরে উঠতে হয়। আমাদের সহযাত্রীদের একজনকে চূড়ায় যাবার সাহস না করায় এই স্টেশনে রেখে যেতে হয়েছিল। ষষ্ঠ স্টেশনের নীচে গাছপালা আর উপরের দিকে তাকালে লাল মাটির ফুজি পর্বতের খাড়া হয়ে উঠা কৌণিক আকৃতির বিশালতা দেখে অনেক আরোহী এখানে এসে ঘাবড়িয়ে যায়, উঠতে সাহস পায় না। ষষ্ঠ স্টেশনে নিরাপদে ফুজি আরোহণের নির্দেশনা কেন্দ্র রয়েছে। অর্থাৎ ষষ্ঠ স্টেশনটি একটা সার্ভিস কেন্দ্র।

ষষ্ঠ স্টেশন থেকে আমরা উঠে গেলাম ২৭০০ মিটার উচ্চতায় সপ্তম স্টেশনে। সপ্তম স্টেশনে উঠতে কয়েক ঘণ্টা লেগে গেল। ইচ্ছে ছিল ৩৪০০ মিটার উচ্চতার অষ্টম স্টেশনে উঠে সূর্যোদয় দেখব। অনাভ্যাসের কারণে আমাদের আরোহণের গতি ছিল ধীর, ফলে সপ্তম স্টেশনে উঠতেই ভোর হতে শুরু করে। সপ্তম স্টেশনে ইতিমধ্যেই আমাদের অবস্থান ছিল মেঘের উপরে, তবে পূর্ব প্রান্তে কোন মেঘ ছিল না। সূর্যোদয় দেখতে হলে কোন একটা স্টেশন থেকে দেখতে হবে, আরোহণরত অবস্থায় দেখা মুশকিল। সিদ্ধান্ত নিলাম সপ্তম স্টেশনে অপেক্ষা করে সূর্যোদয় দেখব। কারণ সূর্যোদয়টা ঘটে হঠাৎ করেই, সেকেন্ডের মধ্যে সূর্য উঠে যায়, তাই দেখতে হলে দৃষ্টিটা নির্দিষ্ট করে রাখতে হয়। সূর্যোদয়ের সময়টায় ফর্সা হয়ে আসাটাকে জাপানীতে বলে গোরাইকো অর্থাৎ আলোর আগমন। সুবহে সাদিক বা ধল প্রহরের পর অন্ধকার হয়ে আবার ফর্সা হবার সময়টা হচ্ছে গোরাইকো। গোরাইকো থেকে সূর্য উঠা পর্যন্ত আমরা সপ্তম স্টেশনে ছিলাম।

সূর্যোদয় দেখে রওয়ানা হলাম অষ্টম স্টেশনের উদ্দেশ্যে। আরোহণের এই পর্যায়ে অনেক সময় খাড়া পথে উঠতে হয় এবং উঠার জায়গায় লোহার চেইনের টানা খুঁটি থাকে যাতে ধরে উপরে উঠতে হয়। ৩৪০০ মিটারের অষ্টম স্টেশন, ৩৪৮০ মিটারের সাড়ে আট স্টেশন, ৩৫৮০ মিটারের নবম স্টেশনে উঠার সময় হঠাৎ বৃষ্টিতে ভিজে যাবার সম্ভাবনা থাকে কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে তা হয়নি। কখনো কখনো মেঘে ঢেকে গিয়ে আরোহণের গতি হ্রাস পেয়েছে বটে কিন্তু ভিজতে হয়নি। আরোহণের এই পর্যায়ে প্রচুর দমের প্রয়োজন এবং আমাদের মত সখের আরোহীদের জন্যে মোটেই সহজ নয়। নবম স্টেশনে পৌছতেই সকাল নয়টা বেজে যায় অর্থাৎ ঐ পর্যন্ত উঠতেই নয় ঘণ্টা লেগে গিয়েছিল। এই উচ্চতায় অনেকের ক্ষেত্রে অক্সিজেনের প্রয়োজন পড়লে সাথে থাকা হ্যান্ডি অক্সিজেন সিলিন্ডার ব্যবহার করতে হয়, আমার অবশ্য দরকার হয়নি। নবম স্টেশনে আমরা অনেক হেলিকপ্টার উড়তে দেখি। ফুজির চূড়ায় দোকানপাট আছে, সেখানে পন্যপরিবহনের কাজে হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হয়। তাছাড়া জরুরী প্রয়োজনেও হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হয়। নবম স্টেশন থেকে চূড়ায় উঠার পালা। দশম স্টেশন অর্থাৎ ৩৭৭৫ মিটার উচুতে ফুজির চূড়া। প্রায় ২০০ মিটার উঠলেই আমাদের কাংখিত অর্জন।

সকাল সাড়ে দশটা নাগাদ উঠে গেলাম চূড়ায়। শেষ ধাপে পুকুরের সিঁড়ির মত কয়েকটা ধাপ পেরোলেই স্বাগত তোরণ; ক্লান্ত দেহে লক্ষ্যে পৌঁছার সন্তুষ্টিতে বসে পরলাম তোরণের নীচে। মূর্তি সহ কিছু স্থাপনা,দোকানপাট আর দিঘীর আকৃতির জ্বালামুখ চূড়ার মূল আকর্ষণ। জ্বালামুখের ভেতরে কিছুটা প্রবেশ করা যায়। ফুজির প্রধান ক্রেটার চওড়ায় ৭৮০ মিটার, গভীরতায় ২৮০ মিটার। ক্রেটারের নীচের দিকটা চওড়া ১৩০ মিটার। ক্রেটারের পাশেই আবহাওয়া অফিস। চূড়ায় উঠার অনুভূতিটুকু অন্যরকম প্রশান্তি, অধ্যবসায়জনিত কষ্টের পর অর্জনের তৃপ্তি। ফুজির চুড়া থেকে উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব আর পশ্চিম, চারিদিকের দৃশ্য অভূতপূর্ব। অভূতপূর্ব এ কারণে, এ দৃশ্য দেখতে হলে স্থির লক্ষ্যে প্রণীত পরিকল্পনা আর বাস্তবায়নে অধ্যবসায়ের এক সাধনাকাল পেরিয়ে তারপর দেখার পালা। প্রকৃতির বিশালত্ব উপলব্ধির জায়গাটি যখন ফুজি পর্বতের চূড়া, অনুভূতির মাত্রাটি অন্যরকমই হওয়াই তো উচিত। ফুজির চারপাশের লেকগুলির ভিউ, দক্ষিণে প্রশান্ত মহাসাগরে দিগন্ত রেখা, উত্তরপূর্বে মেগা সিটি টোকিও’র হাতছানি, মাথার উপর উড়তে থাকা যাত্রীবাহী বিমানের কিংবা সামরিক জেটের অপেক্ষাকৃত বড় আকৃতি আর শব্দ, মাথার উপর সূর্যের প্রখরতার মাত্রা এসবের ব্যাতিক্রমি উপলব্ধিটা ভিন্ন মোড়কে কেবল ফুজির চূড়া থেকেই অনুভুত হবে, সমুদ্রপৃষ্ট থেকে অল্প উচ্চতায় সমান্তরাল পৃথিবী থেকে নয়। একই প্রকৃতি, শুধু দেখবার অবস্থানের পার্থক্যের কারণে দৃশ্যপটটুকু একেবারেই পাল্টে যায়। আমাদের জীবনের দুঃখ বেদনা আর সুখের দৃশ্যপটটুকু সম্ভবত এরকমই, একেক স্তরে একেকরকম, নানা বাঁকে, নানা রূপে সাদামাটা থেকে ঐশ্বর্যময়।

ভূপৃষ্ঠ থেকে ১২ হাজার ৩৭৫ ফুট উচ্চতায় নিজের দুটো পায়ের উপর নির্ভর করে বেয়ে উঠে ফুজির চূড়ায় বেশ কিছুক্ষণ বিশুদ্ধ বাতাসে প্রাণভরে নিঃশ্বাস নিয়ে প্রকৃতির অপরূপ শুভা আকণ্ঠ উপভোগের পর এবার ফুজি থেকে ফেরার পালা।নীচে নেমে ষষ্ঠ স্টেশনে অপেক্ষারত সহযাত্রীকে সাথে নিয়ে প্রত্যেককে তাঁদের বাসায় নামিয়ে অতপর আমার বাসায় ফেরা মানে ক্লান্ত দেহে প্রায় দুইশত কিলোমিটার ড্রাইভিং এর পালা। ধারণা ছিল নামাটা সহজ কিন্তু বাস্তবে এই সহজ বিষয়টি কতটা কষ্টকর হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিলাম। হ্যাঁ, উঠার চেয়ে নামার কষ্ট হয়তো কম, তবে ছিল বেশ জটিল আর বিড়ম্বনাবহুল। অভিকর্ষের টান কষ্টটা কমিয়ে দিলেও, রক্তাক্ত বেদনাটা সংরক্ষিত ছিল অন্য জায়গায়। অভিকর্ষের টানে চাপটা পড়ছিল পায়ের আঙ্গুলের আগায় ছোট ছোট পাথরের আঘাতে। ব্যাথার পাশাপাশি রক্তাক্ত হতে শুরু করল পায়ের আঙ্গুলের মাথায় নখের নীচের অংশ। অভিকর্ষের টান সামলানোর জন্যে হাঁটার গতিতে নিয়ন্ত্রণ আনতে হচ্ছিল। অভিকর্ষের টানে ছোট ছোট পাথরে বা বালুর মধ্যে বেশ জোরে জুতার অগ্রভাগের আঘাতে পায়ের আঙ্গুলের ডগা রক্তাক্ত হবার মূল কারণ। নামার রাস্তাটি ভিন্ন হলেও ফুজি ইয়োশিদা ট্রেইলের ষষ্ট স্টেশনে উঠা-নামা দুটো পথই মিলিত হয় এবং সেখানে আমাদের জন্যে দীর্ঘ প্রতীক্ষায় ছিল চূড়ায় উঠতে রাজি না হওয়া বন্ধুটি। মাঝ রাত বারোটায় যাত্রা শুরু করে চূড়ায় উঠে আবার পঞ্চম স্টেশনের পার্কিং লটে পৌছতে বিকেল ৪টা বেজে যায়। নামার সময় দেখেছি বেশ বয়স্ক জাপানীরা কাঁধে নাতি-নাত্নি নিয়ে ফুজি থেকে নেমে আসছে আমাদের চেয়ে অনেক দ্রুত গতিতে। অভ্যাস মানুষকে অভিজ্ঞ আর সময়াশ্রয়ী করে তুলে, ফলে অভিজ্ঞ আরোহীরা আমাদের অর্ধেক সময়ে ফুজি পর্বতারোহণ করছে। বেশ কয়েকজন আরোহীর সাথে কথা হল যারা প্রতি সপ্তাহে নিয়মিত ফুজিতে উঠছেন। ষষ্ট স্টেশন থেকে পঞ্চম স্টেশনে ফেরার পথে অশ্বারোহীদের চোখে পড়ল যারা নিয়মিত এই এলাকায় বিচরণ করেন। হর্স রেস জাপানে জনপ্রিয়, রেসিং ঘোড়া পরিচর্চায় অনেক সুবিধে আছে ফুজির পাদদেশে। পঞ্চম স্টেশন থেকে ক্লান্ত দেহে ড্রাইভিং করে ফেরার পালা। স্টিয়ারিং ধরা অবস্থায় ঘুম চলে আসা সুইসাইডাল ড্রাইভিং। জীবনের এতটা পথ পাড়ি দিয়ে তিনটি মহাদেশের বিভিন্ন দেশে লক্ষ লক্ষ মাইল ড্রাইভ করে এসেও ঐ দিনকার ঘুমঘুম চোখে ক্লান্ত দেহে দুই শত মাইলের বিপদজনক ড্রাইভিং এর কথা আজো ভুলতে পারিনি। ইয়ামানাশি আর নাগানো প্রিফেকচারের পাহাড়ি রাস্তায় রাতের অন্ধকারে এরকম ক্লান্ত দেহে ড্রাইভিং এর বিষয়টা ছিল জীবন-মৃত্যুর জুয়া খেলার মত। আমাদের উচিত ছিল বিপজনক ড্রাইভিং এর ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি এড়াতে আশাপাশের কোন হোটেলে রাত্রিযাপন করা।

১৯৯৯ সালে মাউন্ট ফুজি আরোহণের সময়টায় আমার ছেলে আসাহী ছিল টোডলার। জাপানে বেড়ে উঠা আসাহীর জাপানের প্রতি রয়েছে অন্যরকম টান। মন্ট্রিয়লের ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত আসাহী ২০১৮ সালে জাপানে কর্পোরেট সামার ইন্টার্ন করার সুযোগে জাপানে তার বাল্যবন্ধু তোমোইয়াকে নিয়ে ক্লাইম্বিং করতে যায় মাউন্ট ফুজি। আসাহীর আরোহণ ট্রেইল অবশ্য আমার থেকে ভিন্ন ছিল। ইয়ামানাশি প্রিফেকচারের ফুজি ইয়োশিদা ট্রেইলের বদলে আসাহী উঠেছিল শিজুওকা প্রিফেকচারের সুবাশিরি ট্রেইলের পঞ্চম স্টেশনের ২০০০ মিটার উচ্চতা থেকে। ভিন্ন জেনারেশনে ভিন্ন সময়ে হলেও বাপ-বেটার ফুজি আরোহণের ঘটনাটিকে ফ্রেমে ধরে রাখবার জন্যে ফুজির চূড়ার স্বাগত তোরণের যে স্থানে বাপ এসে এলিয়ে দিয়েছিল ক্লান্ত দেহ, ছেলে আসাহীও মেমোরি পিকচার তুলেছে সেই একই স্থান থেকে। বাপ আর ভাইয়ের পথ ধরে জাপানে জন্ম নেওয়া আর বর্তমানে মন্ট্রিয়লের ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত আমার মেয়ে রুরিও ভাবছে নিকট আগামীতে ফুজির চূড়ায় উঠে পরিবারের ফুজি আরোহণ প্রিয়তায় পূর্ণতা আনবার জন্যে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত