প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

‘দুঃশাসনের’ অবসানে ‘বিকল্পের’ অপরিহার্যতা

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের ফেসবুক থেকে:

[১ বছর আগের লেখা। আবার পড়ে দেখতে পারেন]

দেশবাসী ‘সুশাসন’ চায়। ‘জাতিগত স্বশাসন’ অর্জিত হলে ‘সুশাসন’ পাওয়া যাবে বলে তারা আশা করেছিল। সে জন্য তারা মুক্তিযুদ্ধ করেছিল। কিন্তু একাত্তরে ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে ‘জাতিগত স্বশাসন’ অর্জন করতে পারলেও তারা ‘সুশাসন’ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। স্বাধীনতার ৪৭ বছরেও তারা ‘সুশাসনের’ মুখ আজও দেখতে পায়নি। এ কথা মনে রাখা প্রয়োজন যে, জনগণের নিজস্ব-শাসনই কেবল সুশাসন নিশ্চিত করতে পারে। দেশের সংবিধানে লেখা আছে – ‘প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ।’ কিন্তু সে কথা শুধু লেখাই আছে, বাস্তবে মালিকানা তো দূরের কথা, প্রজাতন্ত্রের ওপর তাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাবই নেই। ফলে দেশে কোনো ‘সুশাসন’ নেই।

স্বাধীনতার পর পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন সরকার ক্ষমতায় এসেছে। সব সরকারই নিজেদের শাসনামলে ‘সুশাসনের অভাবের’ কথা স্বীকার করেছে। বঙ্গবন্ধু বলতেন, ‘সবাই পায় সোনার খনি আর আমি পেয়েছি চোরের খনি।’ বলতেন, ‘যেদিকে তাকাই সেদিকেই দেখি কেবল চাটার দল’ ইত্যাদি। পরবর্তী সরকারগুলোর আমলে এই ‘সুশাসনের অভাব’ দূর হওয়ার বদলে তা ক্রমাগত আরও বেড়েছে। সব সরকারই তাদের ব্যর্থতার জন্য ‘সুশাসনের অভাব’কে দায়ী করে কৃত অপরাধের দায় থেকে পার পাওয়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু তারা কেউই নিজেদের শাসনামলকে ‘দুঃশাসন’ বলে আখ্যায়িত করতে রাজি হয়নি। অথচ ‘সুশাসনের অভাবের’ পরিস্থিতির অর্থই হলো ‘দুঃশাসন’।

এভাবে ‘দুঃশাসনের’ অভিশাপ দেশে অনেকটা স্থায়ী আসন গেড়ে বসেছে। চলতে থাকা এই ‘দুঃশাসনের’ ধারাবাহিকতার হাত থেকে পরিত্রাণের জন্য দেশবাসী যুগের পর যুগ ধরে সংগ্রাম করে চলেছে। কিন্তু ‘সুশাসনের’ স্থায়ী প্রতিষ্ঠা আজও তারা ঘটাতে পারেনি। তার একটি অন্যতম বড় কারণ হলো, ‘দুঃশাসনের’ স্থায়ী অবসানের পথ এখনো তারা সঠিকভাবে ও স্পষ্ট করে চিনে উঠতে পারেনি।

দেশের খেটে খাওয়া মানুষ ও মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্ত সাধারণ মানুষের জীবনে সমস্যা-সংকটের শেষ নেই। অনেকে এমন বুঝ দেয়ার চেষ্টা করে থাকেন যে, দেশের অর্থনীতি, সমাজব্যবস্থা ইত্যাদি সবই ঠিক পথেই আছে। সমস্যা শুধু ‘সুশাসনের অনুপস্থিতি।’ একথাটিি সঠিক নয়। কারণ ‘সুশাসনের’ বিষয়টি মূলত একটি রাজনৈতিক বিষয় হলেও ‘রাজনীতি হলো অর্থনীতিরই ঘনীভ‚ত প্রকাশ।’ ‘সুশাসনের’ প্রসঙ্গেও এ কথাটি সত্য। আমাদের দেশে বহু যুগ ধরে ‘লুটপাটের অর্থনীতি’ চালু রয়েছে। লুটপাটের সেই অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এখন আরও জোরদার হয়েছে। এ কারণেই দেখা যাচ্ছে, ‘লুটপাটের অর্থনীতি’ জন্ম দিয়েছে ‘লুটপাটের রাজনীতি’র। এটিই হলো ‘দুঃশাসনের’ উৎস। ‘লুটপাটের অর্থনীতি’ এখন আরও জোরদার হয়েছে। তাই ‘দুঃশাসনের’ ভিত্তিও বর্তমানে আরও পোক্ত হয়েছে। ‘দুঃশাসনের’ বাহ্যিক প্রধান উপাদান হলো রাষ্ট্র পরিচালনা ও রাজনীতির কাঠামোগত ব্যবস্থাগুলো। তথা, বাক-ব্যক্তি স্বাধীনতা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, আইনের শাসন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ইত্যাদি। কিন্তু এসবের পাশাপাশি ‘দুঃশাসনের’ রয়েছে নিজস্ব অর্থনৈতিক ভিত্তি। ‘সুশাসন’ ও ‘দুঃশাসন’ কিংবা ‘উদার গণতন্ত্র’ ও ‘স্বৈরতন্ত্রের’ অর্থনৈতিক ভিত্তি, একেকটার হলো একেকরকম। উপযুক্ত অর্থনৈতিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠা ছাড়া ‘সুশাসন’ প্রতিষ্ঠা করা বা তা প্রতিষ্ঠা করলেও রক্ষা করা সম্ভব হয় না।

দেশে নানা ধরনের দ্বন্দ্ব-সংঘাত, বিবাদ-হানাহানির কোনো শেষ নেই। কিন্তু সেসবের দুটি প্রধান রকমফের আছে। একটি হলো লুটপাটের ভাগবাটোয়ারা নিয়ে শোষকশ্রেণির মধ্যকার অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-বিবাদ। অপরটি হলো শোষকশ্রেণি বনাম শোষিত-বঞ্চিত ব্যাপক জনগণের মধ্যকার দ্বন্দ্ব-বিবাদ। সামান্য খোঁজ নিলেই জানা যায়, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যকার পারস্পরিক দ্ব›দ্ব-বিবাদ, এমনকি বিভিন্নরূপে প্রকাশিত এ দুটি দলের ভেতরে ক্রমাগত চলতে থাকা গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব-সংঘাত – এসবেরই প্রধান উৎস হলো লুটপাটের ভাগবাটোয়ারা নিয়ে বিবাদ। আমাদের সমাজে নয়া-উদারবাদী বাজার অর্থনীতির নামে লুটপাটের ব্যবস্থাকে লালন করছে সাম্রাজ্যবাদ-আধিপত্যবাদ ও দেশি-বিদেশি লুটেরা ধনিক শ্রেণি। এরাই দেশের প্রকৃত শাসকগোষ্ঠী। লুটপাটের শোষণব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার প্রয়োজনে তারা নানা কায়দায় দেশকে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি – এই দুটি দলকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা দ্বি-দলীয় মেরুকরণভিত্তিক কাঠামোর মধ্যে আটকে ফেলেছে। কখনো শাসক দল, আবার কখনো বিরোধী দল – এভাবে চক্রাকারে পালাবদলের মাধ্যমে রাজনীতির তথাকথিত মূলধারা হিসেবে এই দল দুটিকে অধিষ্ঠিত করে রাখা হয়েছে। দেশবাসীর সামনে ‘নৌকা বনাম ধানের শীষের’ দ্বন্দ্বকে রাজনীতির কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা ও টিকিয়ে রাখা হয়েছে। এই দ্বন্দ্ব হলো মূলত লুটেরা বুর্জোয়াদের তথা দেশি-বিদেশি শাসকশ্রেণির মধ্যকার গোষ্ঠীগত বিরোধ থেকে উৎসারিত। অথচ সমাজের মৌলিক দ্বন্দ্বটি হলো শাসকশ্রেণি বনাম ৯৫% জনগণের মধ্যকার দ্বন্দ্ব-বিরোধ। এই মৌলিক দ্বন্দ্বটি সামনে চলে এলে তা শাসকগোষ্ঠীর জন্য হয়ে উঠবে মহাবিপদ। ‘নৌকা-ধানের শীষের’ দ্বন্দ্বের সীমার মধ্যে জনগণের মনোযোগ আবদ্ধ রাখতে পারায়, সমাজের এই মৌলিক দ্বন্দ্বটিকে শাসকগোষ্ঠী আড়াল করে রাখতে সক্ষম হচ্ছে।

শাসকশ্রেণির সঙ্গে জনগণের দ্বন্দ্বে র মৌলিক এজেন্ডাটিকে সামনে এনে গণশক্তির বিজয় নিশ্চিত করতে পারার ওপরই ‘দুঃশাসনের’ যুগের অবসান ঘটানো সম্ভব হতে পারে। এটি করতে হলে, আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে ভিত্তি করে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রতিষ্ঠা পাওয়া লুটেরা ধনিকদের আধিপত্যের অবসান ঘটানো একান্ত আবশ্যক। এ বিবেচনা থেকে, বর্তমান আওয়ামী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে দৃঢ়তা, সাহস ও বীরত্বের সঙ্গে জনগণের সংগ্রামের চ্যাম্পিয়ন হওয়া যেমন একটি কর্তব্য, তেমনি সমান গুরুত্ববহ আরেকটি কর্তব্য হলো দুঃশাসনের নবরূপে পুনরাবির্ভাব সম্পর্কে সচেতন ও সতর্ক থেকে তা রোধ করার জন্য কাজ করা। প্রয়োজন জনগণকে ‘দুঃশাসনের’ দ্বিদলীয় বৃত্তের চক্রে আটকে পড়ে থাকার বিপদ সম্পর্কে সজাগ করা। এ কাজটি করতে হলে ‘দুঃশাসনের’ বিরুদ্ধে দৃঢ় সংগ্রাম চালানোর পাশাপাশি ‘বিকল্প’ গড়ে তোলার লক্ষ্যকে একই সঙ্গে এগিয়ে নেওয়া অত্যাবশ্যক। এ দুটি হলো সংগ্রামের একই পর্বের যুগপৎ কর্তব্য। একটি কাজ আগে শেষ করে নেওয়ার কথা বলে অপর কাজটিকে স্থগিত রাখা হবে ভুল। ‘বিকল্প’ শক্তিকে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করে ‘বিকল্প’ নীতিতে দেশ পরিচালনা ছাড়া ‘দুঃশাসনের’ অবসান ঘটিয়ে ‘সুশাসন’ প্রতিষ্ঠা করা কখনই সম্ভব হবে না। এ কথা বাস্তব অভিজ্ঞতায় প্রমাণিত।

বিকল্প নিয়ে নানা মহল বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করে থাকেন। ‘বিকল্পের’ প্রকৃত মর্মকথা আসলে কী? অনেকে যুক্তি দেন যে, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি হলো পরস্পরের কার্যকর (effective) বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি। পালাক্রমে পাল্টাপাল্টিভাবে একটি দল অপর দলটিকে ক্ষমতায় ‘প্রতিস্থাপন’ করে চলেছে। তাই এই ‘দুটি মেরুকরণের’ বাইরে অন্য কোনো বিকল্পের কথা তোলাটি অপ্রয়োজনীয় ও অবাস্তব। কিন্তু এ কথা বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে, কোনো শক্তি কেবল ‘প্রতিস্থাপকের’ যোগ্যতাসম্পন্ন হলেই তাকে ‘বিকল্প’ হিসেবে আখ্যায়িত করা যায় না। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি পরস্পর পরস্পরের ‘প্রতিস্থাপক’ হলেও – এই দুই শক্তি অর্থনৈতিক-সামাজিক দর্শন ও শ্রেণিচরিত্রের বিচারে মোটা দাগে ‘সমমনা’ হওয়ায় তারা একে অপরের ‘বিকল্প’ হিসেবে নিজেদের দাবি করতে পারে না। তারা উভয়েই উভয়ের, কারো মতে উৎকৃষ্ট আর কারো মতে নিকৃষ্ট, ‘নবসংস্করণ’ মাত্র। ‘বিকল্প’ আর ‘নবসংস্করণ’ এক জিনিস নয়। একটি দল যে নীতিতে দেশ চালিয়েছে, আরেকটি দল তার স্থলাভিষিক্ত হয়ে সেই নীতিরই কিছুটা হেরফের, উন্নতি-অবনতি, সংযোজন-বিয়োজন করে শাসন চরিত্রের নতুন একটি সংস্করণের সূচনা করলে তার দ্বারা দেশকে ‘বিকল্প’ ধারায় পরিচালনা করা বোঝায় না! দেশ বর্তমানে মূলত একই ধারার শাসন প্রক্রিয়ার (বিশেষত অর্থনৈতিক-সামাজিক দর্শন, রাজনৈতিক সংস্কৃতি ইত্যাদি প্রধান দিকগুলোর ক্ষেত্রে) ‘দুই প্রতিদ্ব›দ্বী সংস্করণের’ চক্রে আটকা পড়ে আছে।

অনেকে বলার চেষ্টা করেন, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এই দ্বিমাত্রিক মেরুকরণের ব্যবস্থার গন্ডির বাইরে অবস্থানকারী সব শক্তি মিলে এক হয়ে দাঁড়াতে পারলেই তাতে এই দুটি দলের সমমাপের একটি ‘তৃতীয় শক্তি’ প্রতিষ্ঠা করা যায়। সেটিই ‘বিকল্প’। কিন্তু এ ব্যাখ্যাও ‘বিকল্পের’ প্রকৃত মর্মকথাকে তুলে ধরে না। আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে ভিত্তি করে গড়ে ওঠা দুই প্রধান মেরুকরণের বাইরে ‘এ টু জেড’ অন্য সব দল মিলে দ্বিদলীয় মেরুকরণের পাল্টা শক্তি-সমাবেশ গড়ে তোলাটাকেই ‘বিকল্প’ বলে চিহ্নিত করা যায় না। কারণ বিএনপি-আওয়ামী লীগের ক্ষমতার মিউজিক্যাল চেয়ারের চক্র ভেঙে কোনো শক্তি অথবা শক্তি সমাবেশ ক্ষমতায় আসতে পারলেও তারা যদি মূলত একই নীতি-দর্শনকে ভিত্তি করে শাসন কাজ পরিচালনা করে, তা হলে সেটাকে কোনোভাবেই প্রকৃত বিকল্প বলা যেতে পারে না। এটাকে ‘বিকল্প’ না বলে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকেন্দ্রিক শক্তি সমাবেশের বাইরে ‘তৃতীয় শক্তি’ নামে আখ্যায়িত করা যেতে পারে মাত্র। ‘তৃতীয় শক্তি’ হলেই তা ‘বিকল্প’ হবে, এমন কথা মোটেও সত্য নয়। তাই এ ধরনের ‘তৃতীয় শক্তি’ ক্ষমতায় আসতে পারলেও তার দ্বারা ‘দুঃশাসন’ দূর হয়ে ‘সুশাসন’ প্রতিষ্ঠা হবে – এমন কথা বলা যায় না। প্রয়োজন প্রকৃত ‘বিকল্প’। তা হলে প্রশ্ন থেকে যায়, ‘বিকল্প’ বলতে তবে আমরা কী বুঝব?

প্রকৃত ‘বিকল্প’ কী, সে কথা বুঝতে হলে দেশের অর্থনীতিক-সামাজিক ব্যবস্থার প্রসঙ্গটির প্রতি দৃষ্টি দিতে হবে। সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকা ও দেশের সার্বিক ভালো-মন্দের বিষয়গুলো শেষ বিচারে নির্ভর করে প্রচলিত আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার ওপর। ক্ষমতায় কে আছে সেই বিবেচনা নির্বিশেষে যা কিনা ‘দুঃশাসনের’ পর্যায়ক্রমিকভাবে অব্যাহত থাকার জন্য দায়ী, সেই চলতি ‘ব্যবস্থার’ প্রগতিশীল-গণমুখীন ধারায় দিক-পরিবর্তন ছাড়া ‘দুঃশাসনের’ ভিত্তি দূর করা যাবে না। বিদ্যমান আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থা বহাল রেখে, তার গায়ে কিছু মলম বা স্নো-পাউডারের প্রলেপ লাগিয়ে তার একটি আপাত ‘উন্নত’ ‘নবসংস্করণ’ প্রতিস্থাপন দ্বারা সাধারণ মানুষের অবস্থার উন্নতি ঘটানো যাবে না। ‘ব্যবস্থা’ বদলের মৌলিক কর্তব্যটিই হলো একটি প্রকৃত ‘বিকল্প’ স্থাপন করার ক্ষেত্রে কেন্দ্রিক ও অপরিহার্য উপাদান। ‘উন্নত নবসংস্করণের’ তাৎপর্য হলো মূলত ততটুকুই যতটুকু তা ‘ব্যবস্থা বদলের’ সংগ্রাম এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে সহায়ক হয়। এ কথা মনে রেখেই উল্লিখিত মৌলিক সংগ্রাম এগিয়ে নেয়ার পাশাপাশি চলতি ব্যবস্থার অনুক‚ল সংস্কারের জন্যও সংগ্রাম চালানো গুরুত্বপূর্ণ একটি কর্তব্য।

সা¤প্রতিককালে (বর্তমান মহাজোট সরকারের আমলেও) ‘অবাধ পুঁজিবাদ ও মুক্তবাজার অর্থনীতি’র নীতি-দর্শন ও ব্যবস্থার ভিত্তিতে আমাদের দেশের শাসন কাজ পরিচালিত হচ্ছে। এই নীতি-ব্যবস্থার অবশ্যম্ভাবী অনুষঙ্গ যেহেতু ‘দুঃশাসন’, তাই এ ক্ষেত্রে তার আমূল রূপান্তর ঘটানো ছাড়া ‘সুশাসন’ প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে না। যে শক্তির পক্ষে এ কাজটি করা সম্ভব তাকেই কেবল প্রকৃত ‘বিকল্প’ হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে। কাঁঠালের আমসত্ত¡ যেমন অলীক, ঠিক তেমনি ‘সাম্রাজ্যবাদনির্ভর লুটেরা পুঁজিবাদী ব্যবস্থা’ বহাল রেখে দেশ ও দেশের আপামর জনগণের অবস্থার ক্ষেত্রে মৌলিক অগ্রগতি সাধন ও প্রগতির ধারায় দেশের অগ্রযাত্রার ক্ষেত্রে কোনো তাৎপর্যপূর্ণ ‘ব্রেক থ্রূ’ আশা করাটা হবে অলীক। বিগত কয়েক দশকে বেশ কয়েকবার ক্ষমতার হাতবদল হলেও দেশের আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার কোনো পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব হয়নি। আওয়ামী লীগ আর বিএনপির মধ্যে প্রায় তিন দশক ধরে ক্ষমতার হাতবদল হয়ে চলেছে। মাঝে দুবছরের তত্ত¡াবধায়ক সরকারও রাজত্ব করেছে। তার আগে পঁচাত্তরের পর জিয়া ও এরশাদের সামরিক সরকারও ক্ষমতায় থেকেছে। কিন্তু আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার নীতি-দর্শন কখনই পরিবর্তিত হয়নি। গদি বদলের মধ্য দিয়ে দেশ ও জনগণ ‘ফুটন্ত কড়াই’ থেকে ‘জ্বলন্ত উনুনে’ কিংবা ‘জ্বলন্ত উনুন’ থেকে ‘ফুটন্ত কড়াইয়ে’ নিক্ষিপ্ত হয়েছে। এই চক্র থেকে দেশকে বের করে আনার কর্তব্যই কেবল ‘বিকল্প’ গড়ার সংগ্রামের মৌলিক ও প্রকৃত লক্ষ্য বলে গণ্য হতে পারে।

তাই ‘দুঃশাসনের’ ভিত্তি দূর করে ‘সুশাসনের’ আর্থ-সামাজিক পটভ‚মি রচনার জন্য মূল ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি হলো, যে ব্যবস্থা অনুসরণের ফলে দেশের এই হাল তৈরি হয়েছে সেই ব্যবস্থা থেকে দেশকে বের করে আনা। ‘দুঃশাসনের’ পরিস্থিতি উদ্ভবের জন্য যে নীতি-ব্যবস্থা দায়ী তারই অব্যাহত অনুসরণ কিংবা তার ব্যবস্থাপনায় উন্নতি সাধনের চেষ্টার দ্বারা ‘দুঃশাসন’ অবসানের ক্ষেত্রে কোনো বড় ধরনের মৌলিক সুফল আসবে না। এ বিষয়ে স্থায়ী সুফল আনতে হলে শাসন কাঠামোতে অবক্ষয়-অধোগতির উৎস যে ‘নীতি-ব্যবস্থা’ তা পরিবর্তন করে তার জায়গায় ‘বিকল্প নীতি-ব্যবস্থা’ প্রবর্তন ও অনুসরণ করতে হবে। এটি একটি রেডিক্যাল কাজ। বিকল্প গড়ার গোটা বিষয়টি তাই সামগ্রিকভাবে ‘ব্যবস্থা’ বদলে ফেলার একটি রেডিক্যাল কর্তব্যকে নির্দেশ করে।

লেখক সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ