অধ্যাপক মমতাজউদদীন আহমদ আমাদের কাল ও শিল্প-সংস্কৃতির প্রাজ্ঞ-অভিভাবক। মুক্তিযুদ্ধের মহান চেতনার বিরামহীন ধারক, মানুষের জাগতিক ও আত্মিক মুক্তির লাগাতার সংগ্রামে নিয়োজিত শৈল্পিক সৈনিক এবং সাহসের অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। নিউইয়র্কে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনে কর্মরত থাকার সময় ২০১১সালের। ওই বছরের ফেব্রুয়ারিতে সাপ্তাহিক আজকালের জন্য আমাকে দেওয়া একসাক্ষাৎকারে অনেক আন্তরিক আলাপ করেন। সে আলোচনায় কয়েকটি বিষয়ে তার তাৎক্ষণিক দৃষ্টিভঙ্গি ও অভিমত প্রকাশ পেয়েছে।
প্রশ্ন : বাংলাদেশের সাহিত্য-সংস্কৃতির ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আপনার পর্যবেক্ষণ কী ?
উত্তর : বলে রাখি আমার জন্মভূমি বাংলাদেশ সম্পর্কে আমার অন্ধ আবেগ আছে। মায়ের মতো জানি আমার দেশকে। বাংলা সাহিত্যের রচনার ইতিহাস হাজার বছরের দীর্ঘ। বিচিত্র বিষয়ে ও অনুভবের সাহিত্য বাংলা। মধ্যযুগের বৈষ্ণব পদাবলীর আধুনিক শিল্পবোধ ও মানবিক চেতনাবোধ আমাকে বিস্মিত করে। বাংলার সংস্কৃতি ও দীর্ঘ আচরণের ফসল। নানাভাবে একটি জাতির সাংস্কৃতিক স্বরূপ বিকশিত ও প্রকাশিত হয়ে উঠে। এর সংগে প্রতিদিনের খাদ্য, জলবায়ু, প্রকৃতি, রাজনীতি ধর্ম এবং অর্থনৈতিক উত্থান ও পতনের নিবিড় যোগাযোগ। এতদিনের আচরণ ও লোকাচারে ঋদ্ধ বাঙালি জাতি। নিত্য প্রবহমান সঞ্চরণশীল জাতির মধ্যেই প্রাণের সঞ্চার। তাতেই জীবনের বেঁচে থাকার লক্ষণ।
বাঙালি ভোগবাদী, ত্যাগবাদী, নৈরাশ্যবাদী আবার প্রচন্ডভাবে আশাবাদী। এমন স্বভাবের জাতির সাহিত্য-সংস্কৃতি কি অনড় অচল হতে পারে?
প্রশ্ন : যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পর্কে আপনারার অভিমত ?
উত্তর : কেবল যুদ্ধকালীন অপরাধ নয়, সকল অপরাধের বিচার হওয়া বাঞ্ছনীয়। যুদ্ধ তো মুক্তিযুদ্ধ। বাঙালি স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছে। যুদ্ধের রক্তপাত আর লাঞ্ছনার মধ্যে বাঙালি পুনরায় তার শক্তিকে খুঁজে পেয়েছে। স্বাধীনতা অর্জন এ তো সহ¯্র বছরের শ্রেষ্ঠ অর্জন। পাকিস্তানিরা তো তাদের মোহের আর ক্ষমতার লালসা সহজে ছেড়ে দিতে চায়নি। মরিয়া হয়ে বাঙালি নিধন করেছে। কিন্তু অবশেষে পরাজিত হয়ে মাথা নিচু করে পালিয়ে বেঁচেছে। আরা তো এদেশের আঁতিপাঁতি কিছুই জানতো না। তারা যে ঘরে-ঘরে ঢুকে মানুষ হত্যা করেছে, নারী নির্যাতন করেছে আর তাদেরকে যেসব কুলাঙ্গার স্বদেশী উপযাজক হয়ে বা স্বার্থসিদ্ধির জন্য সাহায্য করেছে বা তাদের নৃশংসতার কাজে সহায়ক হয়েছে তারাই যুদ্ধাপরাধী। এমন সব অপরাধ করেছিল জার্মানের কিছু নাগরিক। তারা নির্বিচারে ইহুদি হত্যা করেছে বা ইহুদি নিধনের আয়োজন করেছিল। সুবিবেচনায় তারাই পরবর্তীকালে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। যত দূরেই পালিয়ে যাক, যত দীর্ঘদিন আত্মগোপন করে থাক, তাদের ধরে আনা হয়েছে, দরকারে তাদের ফাঁসি হয়েছে বা কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এমন হয়েছে কম্বোডিয়ায়, হয়েছে বুয়াবায়।
বাংলাদেশেও এরকম বহু নরখাদক আছে। তাদের কাজ ছিল মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলার নিরীহ নিরপরাধ মানুষ হত্যার কাজে সহায়তা করা। তারা নারী নির্যাতনের সহায়ক, অগ্নি সংযোগে ও সম্পত্তি বিনাশ করার কাজে তারা ছিল উদ্যোগী। এতদিন তাদের বিচার হয়নি