প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সংবাদ-সাহিত্যের বরপুত্র আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

এম.নজরুল ইসলাম : তার নামের সঙ্গে পরিচয় শৈশবে, যখন থেকে একুশের প্রভাতফেরিতে যাচ্ছি, তখন থেকেই। তাকে চিনি কলেজ-জীবন থেকে। চিনি বলতে দূর থেকে দেখেছি। সামনে গিয়ে দাঁড়ানোর সুযোগ কিংবা সাহস হয়নি কখনও। তখন তিনি দূরের নক্ষত্র। সামনাসামনি জানাশোনা আমার প্রবাস জীবনের শুরু থেকে। গেল শতাব্দীর আটের দশকের শেষার্ধে শুরু আমার প্রবাস জীবন। তখন থেকেই তার সান্নিধ্য পেয়ে আসছি। তিনি তখন থাকেন লন্ডনে, আমি ভিয়েনায়। ব্রিটেন ও অস্ট্রিয়া, ইউরোপের দুই দেশের মধ্যে দূরত্ব যতই থাক না কেন, অপরিচয়ের দূরত্ব ঘুচে যাওয়ার পর থেকেই দিনে দিনে নৈকট্য বেড়েছে আমাদের। একুশের প্রভাতফেরির গানের রচয়িতা, খ্যাতিমান সাহিত্যিক-সাংবাদিক আবদুল গাফ্ফার চৌধুুরী, যাকে এক সময় খুব দূরের নক্ষত্র বলে মনে হতো, তিনি আমাকে কাছে টেনে নিয়েছেন অপত্য স্নেহে। তার স্নেহ-সাহচর্যে আমি ঋদ্ধ। আজ এত বছর পর পেছনে ফিরে তাকালে দেখতে পাই, আমাদের গাফ্ফার ভাই সহজ-সরল একজন মানুষ, যিনি সবাইকে আপন করে নেওয়ার অসামান্য ক্ষমতা রাখেন। তার সঙ্গে দেশের ভালো-মন্দ, রাজনীতির বর্তমান-ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা হয়, এ আমার অনেক বড় পাওয়া। লন্ডনে গেলে তার সঙ্গে দেখা করা আমার নিত্য রুটিন। বিদেশেও অনেক জায়গাতে গিয়েছি তার সঙ্গে। ভিয়েনাতে এসেছেন তিনি। আমার আতিথ্য গ্রহণ করেছেন, এ আমার অনেক বড় পাওয়া। মনে আছে, ‘পলাশী থেকে ধানমন্ডি’ নাটকের প্রদর্শনী হয়েছিল ভিয়েনায়। হলভর্তি বিষ্ময়-বিমুগ্ধ দর্শক উপভোগ করেছিল নাটকটি। বোধ হয় সেটাই ছিল লন্ডনের বাইরে ‘পলাশী থেকে ধানমন্ডি’ নাটকের প্রথম প্রদর্শনী। ইতিহাসের সাক্ষী আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, সঙ্গীও। ব্রিটিশ, ভারত থেকে পাকিস্তান হয়ে বাংলাদেশের জন্মÑ এই ইতিহাসের ধারাবাহিকতার অনেক কিছুরই সাক্ষী তিনি।

জন্মেছিলেন বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার উলানিয়া গ্রামে, ১৯৩৪ সালের ১২ ডিসেম্বর। বিখ্যাত রাজনীতিবিদ, অবিভক্ত বাংলার কংগ্রেস কমিটি ও খেলাফত কমিটির বরিশাল জেলা শাখার সভাপতি প্রয়াত হাজী ওয়াহেদ রেজা চৌধুরী তার বাবা, মা জোহরা খাতুন। উলানিয়া জুনিয়র মাদ্রাসা ও উলানিয়া করোনেশন হাই ইংলিশ স্কুলে লেখাপড়া করেছেন। ঢাকা কলেজের ছাত্র ছিলেন। পড়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে। স্কুলজীবনেই নিয়েছিলেন রাজনীতির পাঠ। লেখালেখিতে হাতেখড়িও ছাত্রজীবনেই। মোহাম্মদ নাসিরউদ্দিন সম্পাদিত মাসিক সওগাত পত্রিকায় তার গল্প প্রকাশিত হয় ১৯৪৯ সালে। ১৯৫২ সালে সাময়িকপত্রে প্রকাশিত হয় তার প্রথম উপন্যাস ‘চন্দ্রদ্বীপের উপাখ্যান’। আবদুল গাফফার চৌধুরীর সাংবাদিকতায় হাতেখড়িও ছাত্রজীবনে। ঢাকা কলেজের ছাত্র থাকাকালীন যোগ দেন দৈনিক ইনসাফ পত্রিকায়। ১৯৫১ সালে যোগ দেন খায়রুল কবীর সম্পাদিত দৈনিক সংবাদের বার্তা বিভাগে। তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া সম্পাদিত দৈনিক ইত্তেফাকে যোগ দেন ১৯৫৬ সালে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী অবতীর্ণ হন কলমযোদ্ধার ভ‚মিকায়। জয়বাংলা পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে মডারেটরের ভ‚মিকাও পালন করেছেন। স্বাধীনতার পর ঢাকা থেকে প্রকাশিত দৈনিক জনপদের প্রধান সম্পাদক ছিলেন তিনি। আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী বাংলাদেশের ইতিহাসের অংশ। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে তিনি ছিলেন সক্রিয়। লিখেছিলেন সেই বিখ্যাত কবিতা, ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রæয়ারি/ আমি কি ভুলিতে পারি’। এই কবিতাটিতেই প্রথমে সুর দেন আবদুল লতিফ, পরে অমর সুরকার আলতাফ মাহমুদ। সেই কবিতাটি আজ গীত হয় বিশ্ব জুড়ে একুশের প্রভাতফেরির গান হিসেবে। যতদিন একুশে ফেব্রæয়ারি থাকবে, ২১ ফেব্রæয়ারিতে প্রভাতফেরি হবে, বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতি যতদিন থাকবে, ততদিন এই গানটির ভেতর দিয়ে স্মরণ করা হবে তাকে। আজ সারা বিশ্বে গানটি গাওয়া হয়। বিশ্বের নানা ভাষায় অনুদিত হয়েছে গানটি। গাওয়া হয়েছে। বেরিয়েছে রেকর্ড। বাঙালি ও বাংলা ভাষার জন্য এ এক অনন্য সম্মান।

বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতিকে এই অনন্য সম্মান এনে দিয়েছেন আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী। বাংলাদেশে সেলিব্রিটি সাংবাদিকের সংখ্যা হাতেগোনা। আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী সেই স্বল্পসংখ্যক সাংবাদিকের একজন, যার কলামের অপেক্ষায় থাকে দেশের সিংহভাগ পাঠক। আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী কলামে যে মত প্রকাশ করেন, তার সঙ্গে অনেক পাঠকেরই হয়ত মতের মিল হবে না। কিন্তু তিনি কী লিখছেন, কী ভাবছেন, তা জানার আগ্রহ পাঠকদের আছে। এমনকি তার বিরুদ্ধ রাজনৈতিক মতবাদের মানুষও আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর কলাম পড়েন সমান আগ্রহে। কিন্তু আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীকে শুধুই একজন সাংবাদিক কিংবা কলাম লেখকের পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করে ফেলা যাবে না। নন্দিত কথাশিল্পীও তিনি। একাধারে লিখেছেন, ছোটগল্প, উপন্যাস। লিখেছেন গান ও কবিতা। তার পাঠকনন্দিত ছোটগল্পের বই ‘সম্রাটের ছবি’। পেয়েছেন ইউনেস্কো পুরস্কার। ভ‚ষিত হয়েছেন, বাংলা একাডেমি পুরস্কারেও। পেয়েছেন একুশে পদক ও স্বাধীনতা পুরস্কার। আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর সবচেয়ে বড় পুরস্কার তার পাঠকপ্রিয়তা। অসাধারণ এক কথক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী। শব্দ বয়নের অসামান্য দক্ষতায় তিনি পাঠককে টেনে নিয়ে যান। সূ² পর্যবেক্ষণে সঠিক দিক-নির্দেশনা দিতে তার জুড়ি মেলা ভার। কেবলই পেশাগত দায় নয়, লেখালেখিকে অর্পিত দায়িত্ব হিসেবে মনে করেন তিনি। পাঠকের প্রতি তঁাঁর দায়বদ্ধতা থেকেই লেখার অনুপ্রেরণা পান, এ কথা সবসময় বলেন। প্রতিদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে নিয়ম করে লিখতে বসেন। লেখা তার কাছে পুরোপুরি সাধনার মতো। লেখার আগে ঢাকা ও অন্যান্য স্থানে ফোন করে জেনে নেন, সর্বশেষ খবরটি। যে কারণে বিদেশে থাকলেও তার কলামে দেশের সর্বশেষ পরিস্থিতির চুলচেরা বিশ্লেষণ পাওয়া যায়। আর এভাবেই সাংবাদিক আবদুল গাফ্্ফার চৌধুরী পৌঁছে যান পাঠকের তন্ত্রীতে। প্রথম পাঠকও তাকে চিনে যায় অনায়াসে। আবার এ প্রশ্নও করা যায়, তাকে চেনে না কে? যে শিশুটি কাল প্রথম স্কুলে যাবে, সে-ও তাকে জানে। বিশ্ববিদ্যালয়ের গÐি পার হচ্ছে যে তরুণ, তার কাছেও নামটি অতি পরিচিতি। দেশের প্রগতিশীল রাজনীতির সঙ্গে জড়িত মানুষদের কাছে অতি পরিচিত তার নাম। প্রতিক্রিয়াশীলদেরও জানা, এই মানুষটি যেকোনো মুহূর্তে গর্জে উঠতে পারেন। বাংলা সাহিত্যে তার অবদান উপেক্ষা করার নয়। সাংবাদিকতা জগতের উজ্জ্বল নক্ষত্র তিনি। কলামের প্রতিটি শব্দে অসম্ভব চৌম্বক শক্তি। পাঠককে ধরে রাখার অসম্ভব ক্ষমতা আর কার আছে? আইন পেশায় একটা কথা আছে, ‘ক্যারি দ্য কোর্ট’Ñ পাঠককে টেনে রাখার অসম্ভব শক্তি তার কলমে। প্রযুক্তি এগিয়েছে, কিন্তু লেখার ব্যাপারে তিনি এখানও প্রাচীনপন্থি, হাতে লেখেন। মুক্তার মতো স্বচ্ছ হাতের লেখা। টানা লিখে যান পাতার পর পাতা। কোথাও কাটাকুটি নেই। নির্মেদ গদ্যে যেন সময়ের ছবি আঁকেন অসমান্য দক্ষতায়।

সংবাদ সাহিত্যের এক অসামান্য শিল্পী আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী পাঠকের মধ্যে ছড়িয়ে দেন তার নির্মোহ দৃষ্টিভঙ্গি।
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী সৃজনশীলতার যে শাখায় হাত দিয়েছেন, সেখানেই সোনা ফলেছে। তার গান কালের সীমা ছাড়িয়েছেন। সামান্য তার কবিতা ও কথাসাহিত্য। সাহিত্যে বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেয়েছেন। প্রতিটি কলামে তো হারিয়ে যাওয়া সেই কথাকারকে নতুন করে খুঁজে পাওয়া যায়। অসুস্থতার কারণে কখনও কখনও আশি পেরিয়ে আসা আবদুল গাফ্্ফার চৌধুরীর লেখালেখিতে ছেদ পড়ে। শারীরিক অসুস্থতা তার চিন্তুা ও চেতনার জগৎকে গ্রাস করতে পারেনি। বঙ্গবন্ধুর অসাম্প্রদায়িক সোনার বাংলা দেখে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন তিনি। কাজ করেন সেই লক্ষ্য সামনে রেখে। আজকের প্রজন্মের সাংবাদিক ও লেখকদের কাছে আবদুল গাফ্্ফার চৌধুরী এক অনুকরণীয় ও অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব। তার দীর্ঘয়ু কামনা করি। তিনি বেঁচে থাকুন দেশের ও দেশের মানুষের স্বার্থে। ধর্মান্ধ, প্রগতিবিরোধী, প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতির বিরুদ্ধে সচল-সক্রিয় থাক তার কলম।

সভাপতি, সর্ব ইউরোপিয়ান আওয়ামী লীগ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত