প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

শবে বরাতে হালুয়া-রুটির প্রচলন ১৯ শতকে

ডেস্ক রিপোর্ট : মুসলমানদের জন্য ‘অতি পবিত্র রজনী’ হিসেবে পরিচিত শবেবরাত। বাংলাদেশে শবেবরাতের রাতে ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের অনেকেই মসজিদে প্রার্থনা করবেন।

এর সাথে আরেকটি বহুল প্রচলিত এবং গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হচ্ছে, বাড়িতে হালুয়া-রুটি তৈরি এবং প্রতিবেশীদের মাঝে সেটি বিতরণ।

এদেশের সমাজে শবেবরাতের প্রসঙ্গ এলেই অবধারিতভাবে হালুয়া-রুটি তৈরির বিষয়টি চলে আসে।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, হালুয়া-রুটি তৈরির এ সংস্কৃতি বাংলাদেশ ভূখন্ডে কীভাবে চালু হয়েছে?

ইসলামের ইতিহাস যারা বিশ্লেষণ করেন, তাদের অনেকেই মনে করেন যে বাংলাদেশের সমাজ বৃহত্তর মুসলিম উম্মাহর অংশ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতির অধ্যাপক মুহাম্মদ ইব্রাহিম বলেন, ত্রয়োদশ শতাব্দীতে ভারতের দিলিস্নতে ইসলাম রাজনৈতিকভাবে আসে। সে সময় তৎকালীন বাংলাদেশ ভূখন্ডেও ইসলাম ধর্মের আবির্ভাব হয়।

অধ্যাপক মুহাম্মদ ইব্রাহিম বলেন, ‘রসুলউলস্নাহ সা. সাহাবাদের যুগেও এ উপমহাদেশে তাঁর ঘনিষ্ঠজনরা সুদূর আরব থেকে ইসলাম যে বিভিন্ন দেশে এসেছে, এগুলোর সাথে কিছু কিছু দেশজ উপাদান যুক্ত হয়েছে। আমরা জানি যে রসুলউলস্নাহ সা. মিষ্টি খুব পছন্দ করতেন। তাঁর পছন্দের জিনিসকে উম্মতরা পছন্দ করবে সেটাও তাকে পছন্দ করার একটি ধরন। ফলে মিষ্টির একটা জনপ্রিয়তা মুসলিম সমাজে আছে।’

তিনি মনে করেন, ‘শবেবরাতের সময় হালুয়া-রুটি বানানো এবং

বিতরণ করার সাথে আনন্দ ভাগ করে নেয়ার একটি সম্পর্ক আছে। আনন্দের ভাগটা অন্যদের দেয়ার জন্যই বিতরণ করার রেওয়াজটা হয়েছে। এর সাথে ধর্মীয় অনুভূতি এবং সামাজিকতা রক্ষা- দুটো বিষয় জড়িত আছে।

যেহেতু হালুয়া বানানোর উপাদান বাংলাদেশে আছে সেজন্য সেটি এসেছে। মূলত মিষ্টি অর্থেই হালুয়ার প্রচলন হয়েছিল।

বাংলাদেশ ভূখন্ডে শবেবরাত পালনের ব্যাপক প্রচলন শুরু হয় ১৯শ শতকের শেষের দিকে।

তখন ঢাকার নবাবরা বেশ ঘটা করেই শবেবরাত পালন করতেন, বলছেন ইতিহাসবিদ অধ্যাপক মুনতাসির মামুন।

তিনি বলেন, সে সময়ে ঢাকার নবাবরা শবেবরাতের সময় আলোকসজ্জা করতেন। এর পাশাপাশি মিষ্টি বিতরণ করতেন।

ইতিহাসবিদদের মতে সে সময়ে যেহেতু মিষ্টির দোকান খুব একটা প্রচলিত ছিল না, সেজন্য মিষ্টি জাতীয় খাদ্য বানানোর উপাদান দিয়ে বাড়িতে হালুয়া তৈরির প্রচলন শুরু হয়। ধীরে ধীরে এর বিস্তার ঘটতে থাকে।

ঢাকার ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করেছেন অধ্যাপক মুনতাসির মামুন।

তিনি বলেন, সে সময়ে হিন্দুদের আধিপত্য থাকার কারণে সেটিকে মোকাবিলা জন্য ঢাকার নবাবরা শবেবরাতের জন্য অনেক বড় আয়োজন করতেন।

এতে ঢাকার নবাবদের মুসলমান পরিচয় এবং আধিপত্য- এ দুটো বিষয় একসাথে তুলে ধরার প্রয়াস দেখা যেত।

অধ্যাপক মামুন বলেন, ‘নবাবরা যেহেতু মুসলিম ছিলেন এবং ঢাকাকে তারা নিয়ন্ত্রণ করতেন, সেজন্য উৎসবগুলোকে তারা গুরুত্ব দিতেন। এর মাধ্যমে নবাবদের আধিপত্য, মুসলমানদের আধিপত্য এবং ধর্ম পালন- এই তিনটি বিষয় একসাথে প্রকাশ হতো।’

১৯শ শতকের শেষের দিকে ঢাকায় শবেবরাত পালন মুসলিম পরিচয় প্রকাশের বিষয় হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। এমনটাই বলছেন অধ্যাপক মামুন।

সেই ধারাবাহিকতায় শবেবরাত একটি বড় ধরনের উৎসবে পরিণত হয়েছে।

পাকিস্তান আমলে এর সাথে সরকারি ছুটি যুক্ত হওয়ায় সেটি পালনের ব্যাপকতা আরও বেড়েছে বলে অধ্যাপক মামুন উলেস্নখ করেন।

তিনি বলেন, একটা সময় ছিল যখন ঢাকায় শবেবরাত পালনের বিষয়টি ছিল সুন্নি মুসলমানদের মধ্যে।

ইতিহাসবিদদের মতে, বর্তমান বাংলাদেশে শবেবরাত পালন ধর্ম এবং সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে।

ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের অনেকেই মনে করেন, শবেবরাতের রাতে পরবর্তী এক বছরের ভাগ্য নির্ধারিত হয়।

তার মতে শবেবরাত নিয়ে অনেক ধারণা প্রচলিত আছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো খাওয়াদাওয়া।

বাংলাদেশের সমাজে অনেকেই মনে করেন, শবেবরাতের রাতে হালুয়া এবং রুটি তৈরি বাধ্যতামূলক।

এছাড়া খাবারে মাছ কিংবা মাংস পরিবেশন করাকে অনেকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ আব্দুল লতিফ বলেন, ভারতীয় উপমহাদেশে হালুয়া-রুটির সংস্কৃতি চলে আসছে।

কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে এটি খাওয়ার সাথে শবেবরাতের জন্য বাধ্যতামূলক নয় বলে তিনি উলেস্নখ করেন।
সূত্র : যায়যায় দিন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত