প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

স্বাধীনতার সুফল, বৈষম্য এবং অন্য প্রসঙ্গ

বিভুরঞ্জন সরকার : স্বাধীনতা দিবসের আগের দিন স্বাধীনতা পদক প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘স্বাধীনতার সুফল’ সব মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ার অঙ্গীকার করেছেন এবং এ জন্য সবাইকে এক হয়ে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর অঙ্গীকার ও আহ্বানের সঙ্গে সহমত পোষণ করে দুএকটি কথা বলা যেতে পারে।

প্রথমেই একটি গল্প, না, গল্পের মতো মনে হলেও এটা সত্য ঘটনা। আশির দশকের মধ্য ভাগ। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় ১৫-দলীয় জোটের একটি সভা হচ্ছিলো সাবেক ছাত্র নেতা নূরে আলম সিদ্দিকীর বাসভবনে। স্বাধীন বাংলা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নেতৃত্ব দেয়া এই নেতা ততোদিনে বিপুল ধনসম্পদের মালিক হয়েছেন। খুব সক্রিয় না হলেও তিনি আওয়ামী লীগের সঙ্গেই ছিলেন। বিভিন্ন জনের বাসা-বাড়িতেই সেসময় রাজনৈতিক দল ও জোটের বৈঠক হতো। সম্ভবত নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করেই এটা করা হতো। তো, নূরে আলম সিদ্দিকীর বাসায় বৈঠক চলাকালে প্রবীণ সাংবাদিক ও কৃষক শ্রমিক সমাজবাদী দলের নেতা নির্মল সেন ওয়াশরুমে যান এবং ফিরে এসে কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদের কানে কানে বলেন, ‘ফরহাদ সাহেব, স্বাধীনতার সুফল ঘরে ঘরে পৌঁছেনি এই ভাষণ আর দেয়া যাবে না’। কমরেড ফরহাদ বিস্ময়ের সঙ্গে জানতে চান, ‘ কেন দাদা, সমস্যা কি’? নির্মল সেনের জবাব : ‘দেখে আসুন, স্বাধীনতার সুফল নূরে আলম সিদ্দিকীর বাথরুম পর্যন্ত পৌঁছে গেছে’!
আশা করি গল্পটির তাৎপর্য আর ব্যাখ্যা করতে হবে না।

স্বাধীনতার স্বপ্ন বলে একটি কথা আমরা প্রায়ই উচ্চারণ করে থাকি। স্বাধীনতার সুফল কথাটাও বহুল প্রচলিত। প্রশ্ন হলো, স্বাধীনতার স্বপ্ন বলতে আমরা কি বুঝি? কিংবা স্বাধীনতার সুফল বিষয়টিই বা কি? পাকিস্তান রাষ্ট্র থেকে কেন বাঙালি জাতি বেরিয়ে এলো? কেন স্বাধীনতার জন্য এতো জীবন দান, এতো ত্যাগ-তিতিক্ষা? এক কথায় এসব প্রশ্নের জবাব হলো, পাকিস্তান রাষ্ট্রটি বাঙালির তথা এই ভূখ-ের জনগোষ্ঠীর আশা-আকাক্সক্ষা পূরণ করতে পারছিলো না। রাষ্ট্রটি ছিলো নিপীড়ক এবং বৈষম্যমূলক। সব মানুষের সমান অধিকারের বিষয়টি ছিলো পাকিস্তানে অনুপস্থিত। রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের মতামতের কোনো তোয়াক্কা করা হতো না। কারণ পাকিস্তানে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ছিলো না। তার মানে পাকিস্তান রাষ্ট্রে কতোগুলো মৌলিক বিষয়ের ঘাটতি বা অভাব ছিলো। অভাবগুলোকে সংক্ষেপে এভাবে চিহ্নিত করা যায়- ১. গণতন্ত্রের অভাব, ২.উদারতার অভাব এবং ৩. সাম্যের অভাব। এই অভাবগুলো দূর করার প্রত্যাশা থেকেই বাঙালির মধ্যে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বৈরী মনোভাব তৈরি হয়। পাকিস্তানের কাঠামোর মধ্যে থেকে কোনো পরিবর্তন হওয়া সম্ভব নয় – এটা বাঙালির মনে জাগিয়ে তোলেন শেখ মুজিবুর রহমান, বঙ্গবন্ধু, জাতির জনক। বাঙালি জাতি শেখ মুজিবের মধ্যে তাদের আশা বা স্বপ্নপূরণের প্রতিচ্ছবি দেখে তার পেছনে সমবেত হয়েছিলো, ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলো।

তারা ধরে নিয়েছিলো বাংলাদেশ স্বাধীন হলে পাকিস্তানে যেসব জিনিসের অভাব ছিলো সেগুলো দূর হবে। পাকিস্তানে নাগরিকদের মর্যাদা নিরূপণের মাপকাঠি ছিলো ধর্ম। রাষ্ট্রচিন্তা ছিলো সাম্প্রদায়িক। তার মানে বাংলাদেশ হবে অসাম্প্রদায়িক। বৈষম্য ও গণতন্ত্রহীনতা ছিলো পাকিস্তানের ভিত্তি। বাংলাদেশ হওয়ার কথা ছিলো বৈষম্যমুক্ত এবং গণতান্ত্রিক।

স্বাধীনতা অর্জনের পর রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি হিসেবে এই বিষয়গুলো গুরুত্ব পেলেও টেকসই হয়নি। রাজনৈতিক নানা উত্থানপতনে অনেক কিছু এলোমেলো হয়ে গেছে। এখন স্বাধীন বাংলাদেশ অনেকটাই পাকিস্তানি ভাবধারায় প্রভাবিত। এখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়। কিন্তু সময়ের পরিবর্তন এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাস্তবতায় রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগেও ভাঙচুর হয়েছে, দলীয় নীতি-কৌশলেও পরিবর্তন এসেছে। বিএনপির মতো ক্ষমতার প্রয়োজনে হঠাৎ জন্ম নেয়া দলের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে আওয়ামী লীগের শরীরেও অচেনা হাওয়া লেগেছে।

আমরা এখন স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনের দ্বারপ্রান্তে। ৪৮ বছরে আমাদের যেমন অর্জন আছে, তেমনি হারানোর বেদনাও আছে। আমরা অসাম্প্রদায়িক হতে পারেনি। গণতন্ত্র শক্ত ভিত্তি পায়নি। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি বেড়েছে, একই সঙ্গে বেড়েছে প্রকট ধনবৈষম্য। স্বাধীনতার সুফল কারো ঘরে অনেক বেশি পৌঁছে গেছে। অনেকের দোরগোড়ায়ও যেতে পারেনি। তাহলে আমরা কি গর্ব করার অবস্থায় আছি? কিছু কিছু ক্ষেত্রে উন্নয়ন ও সাফল্যের জন্য আমরা নিশ্চয় গৌরব বা অহংকার করতে পারি। কিন্তু সামগ্রিকভাবে গৌরব করার জন্য আমাদের আরো এগিয়ে যেতে হবে, আরো কাজ করতে হবে এবং আরো ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে হবে অর্থনীতি ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায়।

একদিকে ধর্মীয় গোঁড়ামি বাড়ছে, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান বাড়ছে, অন্যদিকে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ঘুষ-দুর্নীতি-অনিয়ম-অসাদাচরণ। স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী আমরা এমনভাবে উদযাপন করতে যেন মুখ উঁচু করে বলতে পারি, হ্যাঁ, এমন স্বাধীনতাই আমরা চেয়েছিলাম। স্বাধীনতার সুফল যেন সব মানুষের ঘরে পৌঁছায় তার জন্য যেমন সুনির্দিষ্ট কর্ম-পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে, তেমনি কঠোর নজরদারির মধ্য দিয়ে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নও করতে হবে। কিছু মানুষের অনেক সম্পদ এবং বেশি মানুষ সম্পদহীন বা স্বল্প সম্পদের মালিক- এই অবস্থা বহাল রাখলে স্বাধীনতার স্বপ্ন পূরণ হবে না। পাঁচতলা আর গাছতলার ব্যবধান দূর করতে হবে। কেউ খাবে আর কেউ খাবে না-তা হবে না। সবার জন্য কাজ, শিক্ষা, মাথা গোঁজার ঠাঁই, চিকিৎসা সেবার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। রাজনীতি থেকে ধর্মকে আলাদা রাখতে হবে। উগ্রতা পরিহার করে উদারতার চর্চা বাড়াতে হবে। স্বাধীনতাহীনতায় যেমন কেউ বাঁচতে চায় না, তেমনি এমন স্বাধীনতাও কেউ চায় না – যে স্বাধীনতা মানুষের অগ্রযাত্রা তথা বিকাশের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। স্বাধীনতার সুফল সবার ঘরে পৌঁছতে হবে সুষমভাবে। এই স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্য নিয়েই উদযাপিত হোক স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী।

লেখক : গ্রুপ যুগ্ম সম্পাদক, আমাদের নতুন সময়

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত