প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

উপজেলার প্রার্থী নিয়ে কত কাহিনী

ডেস্ক রিপোর্ট : আসন্ন উপজেলা নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। ঢাকায় নেতাদের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরছেন তারা। অধিকাংশ উপজেলা থেকে প্রার্থী তালিকা কেন্দ্রে এলেও তার নেপথ্যে রয়েছে নানা নাটকীয়তা। মন্ত্রী-এমপি ও জেলা নেতারা তাদের পছন্দের প্রার্থীদের নাম যেমন তালিকায় রেখেছেন, তেমনি ব্যক্তি আক্রোশে যোগ্য ও শক্তিশালী প্রার্থীদের বাদ দিয়েছেন। এ নিয়ে তৃণমূলে তীব্র অসন্তোষ রয়েছে। কেন্দ্রে পাঠানো প্রার্থী তালিকায় ঠাঁই না পাওয়ায় মাঠের অনেক জনপ্রিয় প্রার্থী এখন ঢাকায় কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে ধরনা দিচ্ছেন। তৃণমূলে প্রার্থী বাছাইয়ে মন্ত্রী-এমপি ও জেলা-উপজেলা নেতাদের স্বজনপ্রীতির বিষয়টি কেন্দ্রীয় নেতাদের নজরে আনতে চাইছেন তারা। ঢাকার পার্শ্ববর্তী নরসিংদী জেলার এক এমপি উপজেলা চেয়ারম্যান পদে তার ভাইয়ের নাম দিয়েছেন। আরেকজন প্রভাবশালী এমপি দিয়েছেন ছেলের নাম। কুমিল্লার এক প্রভাবশালী এমপি ভাইস চেয়ারম্যান পদে শ্যালককে মনোনয়ন দেবেন বলে চূড়ান্ত করে রেখেছেন।

আসন্ন উপজেলা নির্বাচনে এমপি-মন্ত্রীদের স্বজনদের প্রার্থী না করার বিষয়ে দলীয় সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশ মানছেন না অনেক এমপি-মন্ত্রী। উপজেলা পরিষদকে নিজেদের কব্জায় নিতে তাদের অনেকের পছন্দের তালিকায় ভাই, বউ, শ্যালক, ভাতিজা, ভাগ্নে, নাতিসহ নিকট আত্মীয়রা। তৃণমূলকে ম্যানেজ করে অথবা লোক দেখানো ভোটের মাধ্যমে প্রার্থী তালিকা প্রস্তুত করে পাঠানো হয়েছে কেন্দ্রে। এতে বঞ্চিত হয়েছেন শক্তিশালী, যোগ্য ও ত্যাগী নেতারা। আবার কোথাও কোথাও স্বাধীনতাবিরোধী পরিবারের সন্তানদের নামও কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। আবার জেলা সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের ব্যক্তি আক্রোশের কারণেও তৃণমূলে ব্যাপক জনপ্রিয়তা থাকার পরও কেন্দ্রে নাম পাঠানো হয়নি অনেকের। সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও ধনপুর ইউনিয়নের দুবারের চেয়ারম্যান মো. রফিকুল ইসলাম তালুকদার বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আমি মহাজোট প্রার্থীর পক্ষে কাজ করি। সেখানে মহাজোট প্রার্থীর পক্ষে কাজ না করতে নিষেধ করেন জেলা সভাপতি মতিউর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক এনামুল কবির ইমন। কিন্তু আমি নেত্রীর নির্দেশে মহাজোট প্রার্থীর পক্ষে কাজ করায় তৃণমূলে ব্যাপক জনপ্রিয়তা থাকলেও আমাকে উপজেলা চেয়ারম্যান পদে প্রস্তাবিত প্রার্থী তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। নেত্রীর কাছে আমার আকুল আবেদন বিভিন্ন সংস্থার জরিপ দেখে মনোনয়ন দেওয়া হলে আমি জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকব। ত্যাগী, পরীক্ষিত ও যোগ্য কর্মীর মূল্যায়ন হবে। তবে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, এমপি, মন্ত্রী আর জেলা নেতাদের পাঠানো তালিকা এলেও তা চূড়ান্ত নয়। জনমত জরিপের কাজ শেষ হয়েছে। জরিপের ফলাফল বিবেচনা করেই দলের স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ড প্রার্থী চূড়ান্ত করবে। গ্রহণযোগ্য ও জনপ্রিয় ব্যক্তিকেই আমরা মনোনয়ন দেব। জানা যায়, আসন্ন উপজেলা নির্বাচন আগামী মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহে শুরু হবে। পাঁচ ধাপে এই নির্বাচনটি শেষ করবে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। উপজেলা পরিষদের তিনটি পদের নির্বাচনে দলীয় মনোনয়নের জন্য সর্বোচ্চ তিনজন করে নয়জন প্রার্থীর তালিকা পাঠাতে তৃণমূল কমিটিগুলোকে চিঠি দিয়েছিল আওয়ামী লীগ। উপজেলা চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান এবং নারী ভাইস চেয়ারম্যান-এ তিন পদে এ নির্বাচন হবে। গতকাল থেকে আওয়ামী লীগ দলীয় মনোনয়ন ফরম বিক্রি শুরু করেছে। তৃণমূল থেকে আসা নেতারা ব্যাপক উৎসাহ নিয়ে দলের মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করছেন। গতকাল দুপুরে ধানমন্ডিতে কথা হয় মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি মোহাম্মদ সেলিম মোল্লার সঙ্গে। তিনি বলেন, তৃণমূল থেকে আমার নাম পাঠানো হয়েছে। আশা করি দলীয় সভানেত্রী ও স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাকে মনোনয়ন দেবেন। জরিপের ভিত্তিতে তিনিই মনোনয়ন পাবেন বলে আশা প্রকাশ করেন। উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থিতার জন্য তৃণমূলকে দায়িত্ব দেয় দল। বেশ কয়েকটি উপজেলায় বর্ধিত সভার মাধ্যমে প্রার্থিতার তালিকা নিশ্চিত করা হলেও অভিযোগ রয়েছে কিছু কারসাজির। উপজেলা পর্যায়ে ভোটের মাধ্যমে উপজেলা চেয়ারম্যান প্রার্থী ঠিক করা হয় তৃণমূল পর্যায়ে। সেই ভোটেও মোটা অঙ্কের টাকার লেনদেন হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তাছাড়া বর্তমান সংসদ সদস্যের প্রভাবও রয়েছে এই তালিকায়। জেলা নেতারা একটি নাম নির্দিষ্ট করলেও এমপি কিংবা মন্ত্রীর কারণে একাধিক নাম দিতে হয়েছে কেন্দ্রে। এমনটাই জানিয়েছে কয়েকটি জেলার আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকরা। গতকাল আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের এক নেতার কাছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলা প্রার্থী তালিকায় এমপির স্বেচ্ছারিতা নিয়ে অভিযোগ করেন মনোনয়ন বঞ্চিত এক সাবেক ছাত্রনেতা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক নেতা এইচ এম আলামিন অভিযোগ করেন, উপজেলা ও জেলা আওয়ামী লীগ থেকে তার নাম প্রস্তাব করার কথা বললেও স্থানীয় এমপি তার নাম দেননি। এক প্রবাসীকে এমপি প্রার্থী করা হয়েছে। পাবনার ঈশ্বরদী পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ইসহাক মালিথা অভিযোগ করেন, স্থানীয় এমপি ও জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি একক ক্ষমতাবলে তার ভাইয়ের একক নাম কেন্দ্রে পাঠিয়েছেন। কারও মতামত গ্রহণ করা হয়নি। নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক এক জেলা নেতা বলেন, আমরা ভোটের মাধ্যমে প্রার্থী নিশ্চিত করে ছিলাম। কিন্তু কেন্দ্রের এক গুরুত্বপূর্ণ নেতা ও বর্তমান সংসদ সদস্য ভোটে তৃতীয় থাকা ব্যক্তির নাম দিতে বললেন। কেন জিজ্ঞাসা করা হলে, তিনি বলেন, ‘তুমি দিয়ে দাও, ওপরে যা করার দরকার আমি তা করব।’ এমপি সমর্থিত ব্যক্তি ৬০ ভোট পেয়েছিলেন। আর অন্যজন ১১২ ভোট পেয়ে প্রথম হয়েছেন। আমি দুজনের নামই কেন্দ্রে পাঠিয়েছি। এখন যা করার কেন্দ্র করবে।

ভাইস চেয়ারম্যান পদেও মনোনয়ন দেবে আওয়ামী লীগ : আসন্ন উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের শুরুতে শুধু চেয়ারম্যান পদে দলীয় মনোনয়ন দেওয়ার কথা জানালেও শেষ পর্যন্ত ভাইস চেয়ারম্যান ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদেও মনোনয়ন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। এ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী চেয়ারম্যানের পাশাপাশি ভাইস চেয়ারম্যান ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদেও নৌকা প্রতীকে একক প্রার্থী দেবে দলটি। গতকাল বিকালে দলটির দফতর সম্পাদক ড. আবদুস সোবাহান গোলাপ স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। ওই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সারা দেশে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে উপজেলা চেয়ারম্যান এবং উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ শুরু হয়েছে। উপজেলা চেয়ারম্যান এবং উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের আজ মঙ্গলবার থেকে আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি বিকাল ৫টার মধ্যে জেলা ও উপজেলা থেকে প্রেরিত নামের তালিকা অনুযায়ী আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার ধানমন্ডির রাজনৈতিক কার্যালয়ে দলীয় মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ এবং জমা দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানানো হয়। এতে আরও বলা হয়, আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্রের ২৮ (৪) ধারা মোতাবেক জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ নেতাদের পরামর্শ গ্রহণপূর্বক জেলা এবং উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের (৪ জন) স্বাক্ষরে উপজেলা চেয়ারম্যান এবং উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদের জন্য ঐকমত্যের ভিত্তিতে একক প্রার্থী অথবা অনধিক তিনজনের একটি প্রার্থী তালিকা আগামী ৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ তারিখের মধ্যে পাঠাতে হবে।
এর আগে, গত ৩০ জানুয়ারি গণমাধ্যমে পাঠানো আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদকের এক বার্তায় জানানো হয়, আওয়ামী লীগের সভানেত্রী ও স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ডের সভানেত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা অনুসারে আসন্ন উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে একক প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এতে আরও বলা হয়, উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে দলীয় প্রার্থী দেবে না মনোনয়ন বোর্ড।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত