প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

‘ইন্ডিয়া একা কখনো কোনো যুদ্ধে জেতেনি’!

অসীম সাহা : ‘দৈনিক আমাদের নতুন সময়’ পত্রিকায় কথাটি লিখেছেন জনৈক পিনাকী ভট্টাচার্য্য। লেখাটি তার ফেইসবুক স্ট্যাটাস থেকে সংগ্রহ করে পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। এই পিনাকী ভট্টাচার্য্যকে আমি চিনি না, জানিও না। তবে তার চরিত্র বুঝতে এই লোকটির লেখাটি আমাকে যথেষ্ট সাহায্য করেছে। বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না যে, লোকটি কারো না কারো ‘পেইড এজেন্ট’। সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি পাকিস্তানি আইএসআই-এর। পাকিস্তান বাংলাদেশ ও ভারতের চিরকালীন শত্রু। হঠাৎ তাদের পক্ষে সাফাই গাওয়ার তার এতো দরকার পড়লো কেন, তা বুঝতে সতর্কদের খুব বেশি কষ্ট করতে হবে না। আসলে পাকিস্তানিরা বাংলাদেশে জামাত-বিএনপি বাদেও নতুন দালাল খোঁজে। আর তা যদি ‘মালাউন’দের মধ্য থেকে পাওয়া যায়, তা হলে তো সোনায় সোহাগা। ব্রাহ্মণ্যবাদী এই ‘মালাউন’দের কোনো চরিত্র নেই। আদর্শ, নৈতিকতা ও দেশাত্মবোধ তো বহু দূর অস্ত। তারা চেনে শুধু মালকড়ি আর দালালির নজরানা। তা না হলে ইন্ডিয়া একা কখনো যুদ্ধে জিতেছে কী জেতেনি, সেদিকেই শুধু তার নজর পড়লো কেন? তিনি তো এটা বলেননি, পাকিস্তান কখনো একা কারো সঙ্গে কোনো যুদ্ধে জিতেছে কিনা? ১৯৬৫ সালের যুদ্ধে কি ভারতের সঙ্গে পাকিস্তান জিতেছিলো? তিনি চীনের উদাহরণ টেনে বলেছেন, সে-যুদ্ধে চীনের কাছে ভারতের শোচনীয় পরাজয় হয়েছিলো। পিনাকী এতোকিছু জনেন, তা হলে তো এটাও তার জানার কথা, চীনকে বন্ধু ভেবে চীনের প্রতি নেহেরুর অন্ধবিশ্বাস ভারতকে পরাজয়ের পথে ঠেলে দিয়েছিলো। তথাকথিত সমাজতান্ত্রিক আদর্শের ধ্বজাধারী চীন যে কখনো ভারতের বন্ধু ছিলো না, সেটা নেহেরু বুঝতে পারেননি। বরং দেশটির চিরকালীন সমর্থন ছিলো সন্ত্রাসী দেশ পাকিস্তানের প্রতি। এ-অঞ্চলে ভারতের আধিপত্য মেনে নেয়া চীনের পক্ষে অসম্ভব ছিলো। যে চীন আজ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঘোর শত্রু, তখন সেই মার্কিনীরা ভারত সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নের বন্ধু হওয়াতে, ভারতেরও প্রধান শত্রু ছিলো। এমনকি চীনের কাছেও সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিলো সংশোধনবাদী। তাই চীন একদিকে পাকিস্তানের মতো একটি সন্ত্রাসী রাষ্ট্রকে যেমন সমর্থন দিয়েছে, তেমনি সুযোগ পেলেই ভারতের সীমান্তে অযাচিত আক্রমণ চালাতে দ্বিধাবোধ করেনি। চীন ভারতের কাছ থেকে জোর করে তিব্বতকে ছিনিয়ে নিয়ে রাষ্ট্র হিশেবে সাম্রাজ্যবাদী ভূমিকায় অবতীর্ণ হতেও দ্বিধাবোধ করেনি! চীনের এই আগ্রাসী ভূমিকার ফলে ভারতকে নতুন করে তার সামরিক শক্তিবৃদ্ধির কথা চিন্তা করতে হয়েছে। চীন যখন ১৯৬৪ সালের যুদ্ধে ভারতের সঙ্গে জয়লাভ করে, তখন ভারত ছিলো সামরিক দিক থেকে অত্যন্ত দুর্বল। ভারতের সেই দুর্বলতা এবং চীনের বিশ্বাসঘাতকতার ফলে ভারতকে শোচনীয়ভাবে পরাজয় বরণ করতে হয়েছিলো। চীনের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী চৌএনলাইয়ের সঙ্গে নেহেরুর বন্ধুত্বপূর্ণ সামরিক চুক্তি সত্ত্বেও বিশ্বাসঘাতক চীন আকস্মিকভাবেই চুক্তিভঙ্গ করে ভারতের ওপর আক্রমণ চালায়। তাতে ভারত অপ্রস্তুত অবস্থায় হতচকিত হয়ে পরাজয় বরণ করে। এতে চীনকে বাহাদুর ভাবার কোনো কারণ খোঁজেন তারাই, যারা স্বদেশ এবং স্বজাতির সঙ্গে অনায়াসে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারেন। পিনাকী ভট্টাচার্য্য তাদেরই একজন।

পিনাকী ভট্টাচার্য্য তার লেখায় ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের ভূমিকাকেও গৌণ করে দেখাবার চেষ্টা করেছেন। তিনি হয়তো ভুলে গেছেন, তার সাধের চীন সেসময় পাকিস্তানকে সমর্থন দিয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মের বিরোধিতা করেছিলো; আর মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ সপ্তম নৌবহর পাঠিয়ে বাংলাদেশ যাতে যুদ্ধে জিততে না পারে, পাকিস্তানের পক্ষে সেই ব্যবস্থা করেছিলো। সে-সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী মহীয়সী নারী ইন্দিরা গান্ধী সহযোগিতা না করলে কি সোভিয়েত ইউনিয়ন মার্কিন সপ্তম নৌবহরকে প্রতিহত করতে সামরিক পাল্টা জাহাজ পাঠাতো? যদি না পাঠাতো, তা হলে বাংলাদেশের পক্ষে কি যুদ্ধে টিকে থাকা সম্ভব হতো?

সে-সময় বাংলাদেশের পাশে প্রধানতম বন্ধু ভারত এবং পরম সুহৃদ ইন্দিরা গান্ধী মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং, অস্ত্রশস্ত্র দান এবং এক কোটি শারণার্থীকে স্থান না দিলে বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বপ্ন কতোদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হতো, তা পিনাকী ভট্টাচার্র্য্যর না জানা থাকার কথা নয়। তার এও না জানা থাকার কথা নয়, ১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর ভারতীয় বাহিনী এবং বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধারা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করেই স্বাধীনতার সোনালি সূর্যকে ছিনিয়ে এনেছিলো। ত্রিশ লাখ শহিদের রক্তের সঙ্গে মিশে গিয়েছিলো ভারতের নিয়মিত সেনাবাহিনীর ১০ হাজার সৈন্যের রক্ত। সে-সব কথা না বলে পিনাকী ভট্টাচার্য্য ভারত যুদ্ধে কোথায় জিতলো, না হারলো, তা নিয়ে এই সন্দেহজনক লেখাটি এই মুহূর্তে কেন লিখলেন, তা বর্তমান ভারতবন্ধু সরকারকেই খুঁজে বের করতে হবে। বুঝতে অসুবিধে হবার কথা নয়, বাংলাদেশের দুই স্বাধীনতা-বিরোধী দেশের জন্য ‘মালাউন’ পিনাকীর এতো দরদ উথলে উঠলো কেন? কারণ কি এটা নয় যে, ‘ধর্মবার্দী’ কর্তৃক বিধর্মী ‘মালাউনের’ জন্য মালকড়ির ব্যবস্থা করা?

আসলে এই সব পাকি’ এজেন্ট এবং মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিধর্মী দালালরা জামাত কিংবা অন্যান্য স্বাধীনতাবিরোধীদের চেয়েও ভয়ংকর! টাকার জন্য, সুবিধা ও লোভের জন্য এরা মায়ের পেটেও ছুরি বসাতে দ্বিধা করে না! পাকিস্তান বাংলাদেশকে কখনো মেনে নেয়নি, নেবেও না। আর বাংলাদেশের স্রষ্টা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেও তারা ক্ষমতায় থাকতে দেবে না। সেজন্যে পাকিস্তানি ষড়যন্ত্র এখনো অব্যাহত আছে। তারই অংশ হিশেবে জামাত-বিএনপির সঙ্গে কিছু ‘মালাউন’ কুশীলবকেও অন্তর্ভুক্ত রাখতে পাকিস্তান এবং তাদের এদেশিয় দোসররা কাজ করে যাচ্ছেন। তাই তারা খুঁজে পেয়েছেন পিনাকী ভট্টাচার্য্যর মতো অজ্ঞাতকুলশীল লোককে, যারা তাদের হয়ে মাঠে নেমেছেন। তাই তারা এ-ধরনের লেখা লিখে দেশকে অস্থিতিশীল করতে এবং বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের বন্ধুত্বপূর্ণ অটুট সম্পর্ককে বিনষ্ট করতে চাইছে কিনা, বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থাকে তা অবিলম্বে খুঁজে বের করতে হবে। কারণ মনে রাখতে হবে, পচা পিনেই পা কাটে বেশি; আর তাতে কিন্তু গ্যাংগ্রিন হওয়ার সম্ভাবনাও থাকে আরো বেশি। অতএব সাধু সাবধান!

লেখক : কবি ও সংযুক্ত সম্পাদক, দৈনিক আমাদের নতুন সময়

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত