প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

প্রাচ্য-প্রতীচীর পথে-প্রান্তরে: এক অভিভাবকের গল্প

ড. শোয়েব সাঈদ, মন্ট্রিয়ল থেকে: জাপানের বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞান গবেষকদের ১২-১৬ ঘণ্টা ব্যয় করতে হয় গবেষণাগারে। গবেষণাগারে রাত পার করে দেওয়া কিংবা সুপারভাইজিং অধ্যাপকের অনেক রাত পর্যন্ত ল্যাবে থাকা কিংবা রাতবিরাতে অধ্যাপকদের ল্যাবে উঁকি দেবার কাহিনী সংশ্লিষ্টদের কম বেশি জানা। নন-জাপানী ছাত্র বা গবেষকদের টিকে থাকবার প্রয়াসে এই পরিস্থিতির সাথে খাপ খাওয়াতে হয় দ্রুত। আমিও এর ব্যতিক্রম ছিলাম না এবং বেশ রাত করেই ল্যাব থেকে ফিরতে হতো। বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘনফরেস্টের মাঝখান দিয়ে ৩০০ মিটারের বিশেষ করে রাতের বেলায় গাঁ ছমছমে রাস্তা পার হলেই আমার এপার্টমেন্ট। কাজ শেষে ক্লান্ত দেহে এপার্টমেন্টে ফিরবার পথে প্রিয় শিল্পী হেমন্ত মুখার্জির ভরাট গলায় চমৎকারভাবে ফুটে উঠা একটি রবীন্দ্র সঙ্গীত প্রায়ই কানে বাজতো।

“দিনের শেষে ঘুমের দেশে ঘোমটা-পরা ওই ছায়া
ভুলালো রে ভুলালো মোর প্রাণ।
ও পারেতে সোনার কূলে আঁধারমূলে কোন্ মায়া
গেয়ে গেল কাজ-ভাঙানো গান।”—

কাজ ভাঙানো শেষে বাসায় ফিরে সাহচর্যবিহীন একাকী জীবনে ডিনার, টিভি দেখা, ঘুমিয়ে যাওয়া ইত্যাদি রুটিন কাজের মধ্যেই সময় যাচ্ছিল। জাপানের প্রতিটি প্রিফেকচারে অন্তত একটি করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। স্কীর জন্যে বিখ্যাত নাগানো প্রিফেকচারে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম শিনশু বিশ্ববিদ্যালয়। নাগানোর আদি নাম শিনশু তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের নামকরণ শিনশু বিশ্ববিদ্যালয়। এই বিশ্ববিদ্যালয়টি মাল্টিক্যাম্পাস কনসেপ্টে একেকটি অনুষদ একেক শহরে। নাগানো শহরে ইঞ্জিনিয়ারিংসহ অনেক অনুষদ থাকলেও নাগানোর দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মাতসুমোতোতে রয়েছে মেডিক্যাল ফ্যাকাল্টিসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক দপ্তর। মাতসুমোতো থেকে ৫০ কিমি দূরত্বে ইনা শহরেবায়োটেক/কৃষি অনুষদ। নব্বই দশকের সূচনাতে ইনা শহরের বায়োটেক/কৃষি অনুষদে আমি একমাত্র বাংলাদেশী থাকলেও মাতসুমোতো শহরে বেশ কয়েকজন বাংলাদেশী ডাক্তারপিএইচডি করছিলেন। ওখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদেশী ছাত্রদের অনুষ্ঠান হত, সেই সূত্রে বা বাংলাদেশীদের ঘরোয়া আড্ডায় মাঝেমধ্যেই মাতসুমোতো শহরে যেতে হত। সেখানে একদিন জানতে পারি ইনা থেকে ১৫ কিমি দূরত্বে পাশের শহর কোমাগানেতে মুন্সী আজাদ নামে বাংলাদেশী এক ভদ্রলোক থাকেন। তাৎক্ষণিক ফোনে যোগাযোগের পরেরদিনেই আজাদ ভাই হাজির আমার এপার্টমেন্টে। সেই থেকে আজ পর্যন্ত ২৭ বছরের এই সম্পর্কটা নীরবে নিভৃতে রক্তের সম্পর্কেও অতিক্রম করে আত্মার সম্পর্কে কেন্দ্রীভূত হয়ে আছে।

আজাদ ভাই কাজ করতেন জেওসিভি(জাপান ওভারসিজ কোঅপারেশন ভলান্টিয়ার্স)তে। জেওসিভি হচ্ছে জাপান সরকারের জাইকা (জাপান ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশন এজেন্সি) এর একটি প্রতিষ্ঠান যারা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সেক্টরে উন্নয়ন সহায়তার জন্যে ভলান্টিয়ার্স পাঠায়। শিনশু বিশ্ববিদ্যালয়ের এগ্রিকালচার ফ্যাকাল্টি থেকে ১৫ কিমি দূরত্বে কোমাগানে শহরে এই জেওসিভির একটি ইন্সটিটিউট আছে যেখানে প্রায় চল্লিশটি ভাষার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় বা শেখানো হয়। জাপানি ভলান্টিয়ারগনযে দেশে কাজ করতে যাবেন সেই দেশের ভাষা শিখেন এই ইন্সটিটিউটে। এখানে বাংলাও শিখানো হয় এবংজেওসিভি/জাইকার যে সমস্ত ভলান্টিয়ার বাংলাদেশে যান তারা এখান থেকেই কয়েক মাস ব্যাপী একটি কোর্সের অধীনে বাংলা শিখে যান।এই ইন্সটিটিউটে বাংলার শিক্ষক ছিলেন আজাদ ভাই, অর্থাৎ জেওসিভির পাইনিয়ার ভলান্টিয়াররা যারাবাংলাদেশের শহর-গ্রামে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বিভিন্ন প্রোজেক্টের মাধ্যমে উন্নয়নের ভাগীদার হয়েছেন তাঁরা এই আজাদ ভাইয়ের কাছ থেকেই বাংলা শিখে বাংলাদেশে গিয়েছিলেন।এখানে উল্লেখ্য যে আজাদ ভাইয়ের একজন কৃতি ছাত্রNHK বাংলা বিভাগের প্রধান প্রোগ্রাম ডিরেক্টর কাজুহিরো ওয়াতানাবে বঙ্গবন্ধুর “অসমাপ্ত আত্মজীবনী” গ্রন্থটি জাপানিতে অনুবাদ করেছেন।আজাদ ভাইয়ের শত শত জাপানি ছাত্রছাত্রী ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন বাংলাদেশ, জাপান সহ বিশ্বের অনেক জায়গায়। এদের অনেকেই বাংলা ভাষার টানে, বাংলাদেশের প্রেমে বাঙ্গালী সংস্কৃতি আর বাংলাদেশটাকে নিজের আর পরিবারের কাছে আপন করে নিয়েছে। নানান অসুবিধে আর সীমাবদ্ধতার মাঝেও বাংলাদেশীদের শাশ্বত আতিথিয়তার মুগ্ধ তাকে উপেক্ষা করা কঠিনই বটে। আমাদের অনেক কিছুই ভিন দেশীদের বিকর্ষণ করলেও, পারিবারিক বন্ধন/আবেগ/আতিথিয়তা আর আন্তরিকতা জাপানিদের ভীষণ আকর্ষণ করে।

নব্বই দশকে শিনশুতে ছাত্র থাকাকালীন দেখেছি আজাদ ভাই কর্মসূত্রে থাকতেন নাগানোর কোমাগানেতে আর ভাবী টোকিওতে।সপ্তাহান্তে আজাদ ভাইয়ের টোকিওতে যাওয়া-আসা,এভাবেই ওনাদের জীবনের অনেকটা সময় কাটিয়েছেন। আজাদ ভাবী; মুন্সী আর সুলতানা ওরফে রেনু ভাবী টোকিওর বাংলা সংস্কৃতি অঙ্গনে শুরু থেকেই প্রবল সক্রিয়। টোকিওর একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করতেন। দুটো ছেলে সায়ন, সুসান টোকিওর নামকরা একটি ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে পড়ত। নিজের চাকুরী, বাচ্চাদের তদারকি, টোকিওর বাংলা সংস্কৃতির জগতে ব্যস্ততা, বাসায় প্রতিদিন কোন না কোন অতিথি আপ্যায়ন সব মিলিয়ে ৪-৫ ঘণ্টার বেশী ঘুমানোর সুযোগ পেয়েছেন কিনা সন্দেহ আছে। জাপানি, ইংরেজিতে পারফেক্ট বাচ্চা দুটোকে তৈরি করার চেষ্টা করেছেন বাঙালি ঘরানায়। সায়ন, সুসানকে বরাবরই দেখেছি বাঙালি অতিথিদের সাথে বাংলায় কথা বলার অভ্যাসটি মেনে চলতে। সায়ন, সুসানকে টোকিওর প্রেস্টিজিয়াস অতিব্যয়বহুল ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে পড়ানো সহ সত্যিকারের মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবার পেছনে আজাদ ভাই-ভাবীর নিরলস ত্যাগ, পরিশ্রম ছিল আর আট-দশটা অভিভাবকের চেয়ে অন্যরকম; সংগ্রামটা যেনএকেবারেই ভিন্ন ধাঁচের। সায়ন, সুসান দুজনেই গ্রাজুয়েশন করেছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে।সময়ের বহমানতার সায়ন যুক্তরাষ্ট্রে আর সুসান জাপানে নামকরা কর্পোরেটে এক্সেকিউটিভ হিসেবে কর্মরত; সর্বোপরি দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে উভয়ই সার্থক করেছে পিতামাতার প্রচেষ্টাকে।

ভাবীর মিষ্টি বানানোর খ্যাতি আর বাঙ্গালিদের অনুষ্ঠানের জন্যে রাত জেগে মিষ্টি বানানোর, পিঠা বানানোর কাহিনী টোকিওর বাঙালি সমাজে অজানা নয়। আজাদ ভাই-ভাবী টোকিও তথা জাপানে বাংলাদেশী কমিউনিটির পরিচিত মুখ। টোকিওর বাংলাদেশীদের কালচারাল সংঘটন স্বরলিপির জন্মলগ্ন থেকেই উনারা জড়িত। উত্তরণ আর স্বরলিপি; টোকিওর অতিপরিচিত দুটো সংগঠন, বাঙ্গালি সংস্কৃতি আর কৃষ্টির ধারক আর বাহক। সংগঠন দুটোর মধ্যে যোগাযোগ নিবিড়, রয়েছে সুস্থ প্রতিযোগিতা আর সহযোগিতা। আজাদ ভাই স্বরলিপির সভাপতি ছিলেন, উপদেষ্টা আর একনিষ্ঠ কর্মী হিসেবে এখনো জড়িয়ে আছেন। পশ্চিম জাপানের ওইতা থেকে বদলি হয়ে আমার টোকিওতে বেশ কয়েক বছর থাকাকালীন সময়ে আজাদ ভাইয়ের হাত ধরেই স্বরলিপিতে আসা, লেগে থাকা, নাটক পরিচালনা সহ অনুষ্ঠান করা। স্বরলিপি একাডেমী ধাঁচের; পারফর্মেন্স ছাড়াও বাচ্চাদের নাচ গান শেখানোর সাথে জড়িত। গুণী শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে আমার বাচ্চারাও গান আর নাচ শিখেছে স্বরলিপিতে।

আমায়িক, পরোপকারী এক কথায় পারফেক্ট জেন্টেলম্যান আজাদ ভাই, সুনিপুন রন্ধন-শিল্পী ভাবী আর এই পরিবারটিকে নিয়ে আমদের অনেক স্মৃতি। আমার ছাত্র জীবন, ব্যাচেলর জীবনের টার্মিনেশন, নতুন সংসার, অতপর আমার বাচ্চাদের কাছে আজাদ আঙ্কেল আর আন্টি বনে যাওয়া, জাপানে আমাদের অনুপস্থিতিজনিত কারণে জাপানিজ স্থায়ী রেসিডেন্সী বিষয়ে তদারকিসহ বিবিধ বিষয়ে এখনো জড়িয়ে আছি এই পরিবারটির সাথে। আজ ২০১৮ সালে এসেও সম্পর্কটি, আড্ডাটি সেইআগের মতনই, শুধু সবার বয়সটা বেড়েছে। আজ ১০ই নভেম্বর ২০১৮ সালে টোকিও থেকে মন্ট্রিয়লে ফিয়ে যাবার প্রাক্কালে দেখা করতে গেলাম আজাদ ভাই-ভাবীর সাথে।ভাবী আমার পছন্দের খাবারগুলো রান্না করে অপেক্ষা করছিলেন একসাথে খাবেন বলে। সম্পর্কের এই আবেগটুকু ভীষণ দামী, এর প্রাপ্য সন্মানটুকু না দিলেই যে নয়।

আজাদ ভাই একটা সময় নাগানো থেকে বদলি হয়ে যান ফুকুশিমা প্রিফেকচারে। একদিন মনে হল অনেকদিন আজাদ ভাইকে দেখিনা। ঘটনাটি ৯৪-৯৫ সালের দিকে। সারারাত লং ড্রাইভ করে আমি আর আমার স্ত্রী কনা হাজির আজাদ ভাইয়ের নতুন কর্মস্থলের বাসায়। শীতের গভীর রাতে জাপানিজ হাইওয়ে ধরে কয়েকশ কিলোমিটারের ড্রাইভটি মনে রাখার মত। ঐ সময় খুব ভাল স্কি করতাম আর তাই ফুকুশিমার স্কি রিসোর্টে স্কি করার সুযোগ হাতছাড়া করিনি। কনার জন্যে ছিল স্কি করার প্রথম অভিজ্ঞতা। ফুকুশিমাতে কিছুদিন চাকুরী করার পর আজাদ ভাই আবার ফিরে আসেন নাগানোতে। আজাদ ভাই অবসরে যাবার পর ভাবী কিছুদিন শিক্ষকতা করেছেন কোমাগানের জেওসিভির ইন্সটিটিউটে। ভাবীরও অসংখ্য জাপানী ছাত্র-ছাত্রীও বাংলাদেশের উন্নয়নের অংশীদার। ভাই-ভাবী এখন ওয়াসেদা বিশ্ববিদ্যালয় ফাউন্ডেশনের একটি প্রতিষ্ঠানে বাংলা পড়ান। ফাউন্ডেশনটির সহায়তায় কয়েকটি এশিয়ান ভাষা শেখানো হয় যার মধ্যে বাংলা অন্যতম।

এই অভিভাবকের গল্পটি ঘটনা সমূহের সালতামামী নয়, এটি ভরসার বচন, হৃদয়ের ভেতর থেকে উঠে আসা শ্রদ্ধা আর আস্থায় নিংড়ানো কথন। জীবনের এই অনেকটা পথ পাড়ি দিয়ে এসে নানাবিধ ঘটনার ঘাত-প্রতিঘাতে ঠেকে বা না ঠেকে শিখেছি, দেখেছি অনেক। সম্পর্কের ছলচাতুরী, চালবাজি, পরশ্রীকাতরতা, অকৃতজ্ঞতা, বিশ্বাসঘাতকতা আর কৃতঘ্নতায় কুষ্ঠাগ্রস্ত মানুষদের সৃষ্ট বিষণ্ণতায় আমরা আলোকিত মানুষ খুঁজি চারিপাশে জীবনটাকে অর্থবহ করার জন্যে। আজাদ ভাই ভাবী সেই আলোকিত মানুষদের প্রতিনিধিত্ব করে অন্তত আমার কাছে। শিনশুতে ছাত্রকালীন সময়ে দেখেছি আমাদের বাংলাদেশী ছাত্রদের কারো অসুখ বিসুখে বা দেশ থেকে কোন খারাপ খবর আসলে খবর পাওয়া মাত্রই ছুটে আসতেন আজাদ ভাই তা যত রাতই হোক না কেন। আজাদ ভাইয়ের টোকিওর বাসাটি ছিল বাঙ্গালিদের স্টপওভার আস্তানা। নারিতা হয়ে দেশে যেতে আসতে, কিংবা কোন মনবুশো স্কলারের নব পরিণীতাকে বরণ করার ক্ষেত্রে যাত্রা বিরতি থাকতো ঐ বাসাটিতে। কনফারেন্সে বা ভিসা/পাসপোর্টের কাজে টোকিও গেলে অনেক ছাত্র/গবেষকদের থাকার জায়গা ছিল ঐ বাসাটি। আজাদ ভাইকে কেন্দ্র করে শিনশুতে আমদের আড্ডা হত, পার্টি হত, লং ড্রাইভ হত, মাঝে মধ্যে টোকিও থেকে ভাবীও এসে যোগ দিতেন। অনেকের ক্ষেত্রেই পরবাসে বাচ্চা হবার মত ইমোশনাল আর জটিল সময়ে আজাদ ভাবী টোকিও থেকে ছুটে এসেছেন, সময় দিয়েছেন।আমার বোনের হাসবেন্ড ড. মাহতাব কর্পোরেট চাকুরীর সুবাদে একটা সময় কিয়োতো ছেড়ে কাগাওয়া প্রিফেকচারে থেকেছেন কিছুদিন।শিনশু থেকে হাজার মাইল দূরেশিকোকু আইল্যান্ডে এই কাগাওয়া প্রিফ্রেকচার। এক সামার ভেকেশনে আজাদ ভাইয়ের নেতৃত্বে আজাদ ভাবীসহ হাজার কিমি ড্রাইভ করে গাড়ীর বহর নিয়ে অসাধারণ এক অভিজ্ঞতায় সেতু নাইকাই বা সেতু ইনল্যান্ড সী এর উপর দিয়ে বহে যাওয়া প্রায়১৩ কিলোমিটার দীর্ঘ জাপানের বিখ্যাত “সেতু ওহাশি” ব্রিজ পার হয়ে চলে গেলাম কাগাওয়াতে বোনের বাসায়। এখানে উল্লেখ্য যে সেতু ওহাশি সড়ক আর রেল মিলিয়ে বিশ্বের দীর্ঘতম ডাবল ডেকার বা দোতলা ব্রীজ।

আজাদ ভাইয়ের সাথে জড়িয়ে থাকা আমাদের এরকম অসংখ্য ঘটনার ধারাবিবরনীকে সযত্নে এড়িয়ে এই লিখাটির আসল উদ্দেশ্য আজাদ ভাইয়ের ব্যক্তিত্বকে, একজন অভিভাবকের অভিভাবকত্বের মহিমাটিকে এড্রেস করা। টোকিওর বাঙালি কমিউনিটি অবহিত আছেন আজাদ ভাইয়ের স্বভাবজাত পরোপকারী গুনটি সম্পর্কে। মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক সরল রেখায় চলবে আশা করা বোধ হয় বাড়াবাড়ি। সারকথাটি হচ্ছে সরলরৈখিক হোক বা না হোক ভদ্রলোকদের মাঝে বহমান সম্পর্কটির দিনশেষে সারাংশটি বা পরিণতিটি কি? টোকিও বা জাপানে বসবাসরত অসংখ্য বাংলাদেশীরা জানেন শত ব্যস্ততার মাঝেও বিপদে আপদে আজাদ সাহেবকে পাওয়া যায় কি ব্যাক্তিগত, সামাজিক, সাংস্কৃতিক বা রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে। বাংলাদেশ দূতাবাস কর্তৃক জীবনভর অবদানের জন্যে আজীবন সন্মামনা সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন সময়ে সন্মান জানিয়েছেন আজাদ ভাইকে।

জেনারেশন বদল হচ্ছে, কিন্তু কোন বদল নেই আজাদ ভাইয়ের দায়িত্বশীলতার প্রতি আমাদের ভরসাটুকু, চলছে প্রজন্মান্তরে। আমাদের সন্তানদেরকাছে আজাদ ভাই-ভাবী পরিচিত “দাই আঙ্কেল আন্টি” হিসেবে। দাই জাপানী শব্দ, অর্থ হচ্ছে বড়। আমার মেয়ে রুরি কিংবা ছেলে আসাহী যখন কানাডা থেকে একাকী টোকিও বা জাপানে যায়, লোকাল গার্ডিয়ান হিসেবে বিপদে আপদে ভরসার জায়গাটি হচ্ছে ঐ “দাই আঙ্কেল আন্টি”। আমি জানি এটি শুধু আমার ক্ষেত্রে নয়, জাপানে একদা বসবাস করত এমন বহু বাংলাদেশীদের কাছে বিষয়টি একই রকম। আমার বাচ্চারা জাপানে যাবে দাই আঙ্কেল আন্টির সাথে দেখা হবে না এমনটি হবার নয়। বন্ধনের এই গাঁথুনি একদিনে তৈরি হয়নি, দীর্ঘদিনের পরিচর্চার ফলশ্রুতি।প্রবাসে জন্ম নেওয়া বা বড় হওয়া বাচ্চাগুলো মানুষে মানুষে সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুনগত মানটির বিচারের ওদের নিজেদের মনেনিজস্ব একটা মুল্যায়ন তৈরি করে নেয় যা আমাদের মত আবেগতাড়িত নয়।জেনারেশন গ্যাপের কারণে চিন্তা চেতনা আর মূল্যবোধে সন্তানদের সাথে আমাদের বেশ কিছুটা পার্থক্য অবধারিত। আজাদ ভাই-ভাবীর প্রতি আমাদের ভাল লাগার বিষয়টি জেনারেশন গ্যাপকে উপেক্ষা করেই সংক্রমিত হয়েছে আমাদের সন্তানদের মধ্যে। এর পেছনের কারণটি হচ্ছে আজাদ ভাইদের আন্তরিকতায় নিষ্ঠাচারিতা। আমাদের ভালবাসাটুকু সেই নিষ্ঠাচারের প্রতি কৃতজ্ঞতা।

আজ ১০ই নভেম্বর যখন হানেদা থেকে টরেন্টো পর্যন্ত এয়ার কানাডার বোয়িং ৭৭৭-৩০০ এর এসি ০২ ফ্লাইটের প্রায় ১২ ঘণ্টার উড়ার সময়টিতে অভিভাবকের এই গল্পটি লিখছি, কম্পিউটারের কি বোর্ডটি যেন একটি জায়গায় এসে একটি ইচ্ছায় লিখাটির ইতি টানতে চাচ্ছে আর সেই ইচ্ছেটি হচ্ছে-এরকম অভিভাবকদের আলোকিত অন্তরের ছোঁয়ায় আমরা আলোকিত থাকতে চাই আজীবন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে। আজাদ ভাই-ভাবী; দীর্ঘজীবী হওন, ভাল থাকুন, সুস্থ থাকুন আর আলোকিত রাখুন আপনাদের চারপাশ।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত