প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সর্বস্বহারাদের ঠাঁই মিলছে না কোথাও

কালের কন্ঠ :  বাবা মারণব্যাধি ক্যান্সারে আক্রান্ত। মা যখন এ পৃথিবীর মায়া ছেড়ে যান, ছোট দুই বোন আর অসুস্থ বাবার দায়িত্ব এসে পড়ে ষোড়শী মিনার (ছদ্মনাম) কাঁধে। কী করবে বুঝে উঠতে পারছিল না সে। সংকটের ওই সময়ে স্থানীয় দালাল মাহফুজ আলমের মাধ্যমে মেলে সৌদি আরবে যাওয়ার সুযোগ। বয়স ১০ বছর বাড়িয়ে বানানো হয় ২৬। করা হয় পাসপোর্ট, ভিসা। ফ্রিতে সৌদি যাওয়ার নিয়ম থাকলেও দালালকে দিতে হয় ৪০ হাজার টাকা। তাতেও ভাগ্যের চাকা ঘোরেনি মিনার পরিবারের। উল্টো বর্বর নির্যাতনের ক্ষত নিয়ে দেশে ফিরতে হয় ৯ মাস পর। তাতেও সংকট কাটে না। দেশে ফিরে এখন নিজের জন্মভিটায় যাওয়ার সাহস পাচ্ছে না মিনা। চক্ষুলজ্জা আর এলাকার মানুষের কাছে মান-সম্মানের ভয়ে জন্মভিটায় না ফিরে আশ্রয় হয়েছে সাভারে এক নারী কর্মীর ঠিকানায়।

সৌদি আরবে গৃহকর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে বয়স ২৫ থেকে ৩৫ বছর বাধ্যতামূলক হলেও ১৬ বছরের মিনাকে দেখানো হয় ২৬ বছর বয়সী। সিলেটের ঠিকানার পরিবর্তে লেখা হয় নারায়ণগঞ্জ। সৌদি আরবে পৌঁছে কাজে যোগ দেওয়ার পর ঠিকমতো খাবার দেওয়া হতো না মিনাকে। উল্টো অকথ্য যৌন ও শারীরিক নির্যাতন চলত তার ওপর। বেতন এক হাজার রিয়াল দেওয়ার কথা থাকলেও তা-ও দেওয়া হতো না। অথচ দিনের পর দিন অব্যাহত ছিল অমানুষিক নির্যাতন। সৌদি আরবে যে বাসায় কাজ করত তার মালিক ও ছেলেরা বেল্ট ও কারেন্টের তার দিয়ে পেটাত মিনাকে। বর্বর এই নির্যাতন সইতে না পেরে কৌশলে ওই বাড়ি থেকে পালিয়ে এক প্রবাসী ভারতীয় কর্মীর সহযোগিতায় বাংলাদেশ দূতাবাসে যায় মিনা। সেখানে ২৫ দিন অবস্থানের পর দেশে ফিরে আসে। মিনা বলে, ‘আমার জীবনটা ওলটপালট করে দিয়েছে দালালরা। ঘর থাকতেও এখন বাড়ি যেতে পারি না। অন্যের দয়ায় ঢাকায় পড়ে আছি। যাদের মুখে হাসি ফোটাতে সৌদি আরব গিয়েছিলাম, তাদের মুখের হাসি ফুটাব কী, নিজের মুখেই হাসি নাই! কোন মুখ নিয়ে বাড়ি যাব? কী বলব পরিবারকে?’

সৌদি আরবে তার ওপর নির্যাতন প্রসঙ্গে মিনা বলে, ‘আল্লাহর ঘর যেখানে আছে, মনে করেছিলাম সেখানকার মানুষগুলো হয়তো অনেক ভালো। গিয়ে দেখলাম, ওদের মনে মায়াদয়া নাই। ওরা আমার জীবনটাই শেষ করে দিল!’ বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়ে মিনা।

পাসপোর্টে লেখা বয়স ও ঠিকানা সম্পর্কে জানতে চাইলে মিনা বলে, ‘বয়স বাড়ানো এবং ঠিকানা পরিবর্তনের বিষয়ে আমাকে কিছু জানানো হয়নি। পরে বিষয়টি টের পেয়েছি। দালালদের প্রতারণায় পড়ে যেন আর কোনো বোন সৌদি আরব না যায়। সেখানে যাওয়ার চেয়ে নিজ দেশে কষ্ট করে বেঁচে থাকা অনেক ভালো।’

মিনা একা নয়। সৌদি আরবে এমন নির্যাতিত গৃহকর্মীর তালিকা বেশ দীর্ঘ। তাদের আরেকজন নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার মকবুল হোসেনের মেয়ে শাকিলা আক্তার (ছদ্মনাম)। ১৫ বছরের এই কিশোরীর বয়স ১০ বছর বাড়িয়ে পাসপোর্ট করে দালাল। ২০০২ সালে শাকিলার জন্ম হলেও পাসপোর্টে দেখানো হয় ১৯৯২ সাল। জালিয়াতি করে বয়স বাড়িয়ে তাকে সৌদি আরবে পাঠায় দালাল। সেখানে ভয়ংকর নির্যাতনের পর অসুস্থ হয়ে দেশে ফিরে আসে শাকিলা। বিমানবন্দরে পৌঁছার পরপরই তাকে নিউরোসায়েন্স হাসপাতালে নিয়ে দেওয়া হয় চিকিৎসা। বর্তমানে পুরান ঢাকায় বোনের সঙ্গে থাকে। দিনে তিন বেলা ওষুধ খেতে হয় তাকে।

শাকিলার বড় বোন ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন, ‘আমার বোনটির জীবন ধ্বংস করে দিয়েছে। মাথার যন্ত্রণায় ও এখন দিনরাত কাতরায়। ওষুধ খাওয়ার পর কিছুক্ষণ ভালো থাকে। পরে আবার শুরু হয় যন্ত্রণা। ভাল কম্পানির ভিসার কথা বলে দালালরা বয়স বাড়িয়ে প্রতারণা করে বোনটিকে সৌদি আরবে পাঠায়। সেখানে নেওয়ার পর চলে অকথ্য নির্যাতন। বহু কষ্টের পর দেশে ফেরত আনা হয় তাকে।’

মিনা আর শাকিলার মতো আরো অনেক কিশোরীকে জালিয়াতির মাধ্যমে গৃহকর্মীর কাজে সৌদি আরব পাঠাচ্ছে দালালরা। গৃহকর্মীর ভিসায় নারী কর্মীরা সৌদি আরবে গিয়ে শিকার হচ্ছে যৌন ও শারীরিক নির্যাতনের। গ্রামের সহজ-সরল কিংবা দরিদ্র পরিবারের কিশোরী মেয়েদের মোটা অঙ্কের বেতনের প্রলোভন দেখিয়ে সৌদি আরবে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বয়স ১০ থেকে ১২ বছর বাড়িয়ে জালিয়াতির মাধ্যমে পাসপোর্ট করে এসব কিশোরীকে সৌদি আরবে পাঠানো হয়। সৌদি আরব পৌঁছে এসব কিশোরী নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। কেউ কেউ অন্তঃসত্ত্বা হয়ে ফিরে আসছে দেশে। দেশে ফিরে এলেও অনেকের পরিবার তাদের আর নিতে চায় না। সমাজের মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে তারা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে চলতি বছর শুধু সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরেছে এক হাজার ১২২ জন নারী কর্মী। এর মধ্যে গত মে মাসে ফিরেছে ২৬০ জন, জুন মাসে ১৮০ জন, জুলাই মাসে ১৫৩ জন, আগস্ট মাসে ১৩২ জন, সেপ্টেম্বর মাসে ৩০৬ জন এবং অক্টোবর মাসে ফিরেছে ৯১ জন। আর এরই মধ্যে প্রায় সাত হাজার নারী কর্মী দেশে ফেরত এসেছে, যাদের বেশির ভাগ শারীরিক, মানসিক, যৌন নির্যাতনসহ ভয়ংকর নির্যাতনের শিকার। ব্র্যাকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ওয়েজ আর্নাস কল্যাণ বোর্ডের সহযোগিতায় চলতি বছর ১২৮ জন নারী কর্মীকে দেশে ফেরত আনা হয়েছে।

সৌদি আরবফেরত নারী কর্মীদের নিয়ে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করছেন ইলিয়াস হাওলাদার ও ইসহাক ফরাজী। দুজনই কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রতি মাসেই সৌদি আরব থেকে নারী কর্মীরা নানা নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরছে। এদের অনেকের বয়স ১৫ থেকে ২২ বছরের মধ্যে। বয়স জালিয়াতি করে দালালরা পাসপোর্ট করছে বলে অভিযোগ নির্যাতিত পরিবারগুলোর। দালালদের এই প্রতারণা বন্ধ করতে না পারলে অনেক মেয়েই কিশোরী বয়সে শারীরিক ও মানসিক বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়ে যাচ্ছে।’

মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে অথই সাগরে ভাসছে ওরা

পঞ্চাশোর্ধ্ব মাজেদা খাতুনের পাঁচ সন্তানের মধ্যে রূপালী আক্তার (২৫) সবার বড়। ১০ বছর আগে সন্তানদের ফেলে চলে যান মাজেদার স্বামী তোফাজ্জল হোসেন। ছোট ছোট ছেলে-মেয়েকে নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েন মাজেদা বেগম। নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে সেলাইয়ের কাজ করে পাঁচ সন্তানকে নিয়ে চলতে থাকে তাঁর অভাবের সংসার। এরই মধ্যে রূপালী আক্তার (ছদ্মনাম) গার্মেন্টে কাজ শুরু করেন। সেখানে চার বছর কাজ করার পর স্থানীয় এক যুবক জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে বিয়ে হয় তাঁর। কিন্তু বিয়ের কয়েক মাস পরেই তাঁর স্বপ্ন গুড়ে বালি। মাদকের টাকার জন্য রূপালীর ওপর চলতে শুরু করে স্বামীর অকথ্য নির্যাতন। নির্যাতন সইতে না পেরে পাঁচ বছর পর ডিভোর্স দেন জাহাঙ্গীরকে। আবার গার্মেন্টে কাজ শুরু করেন। এই সময় পরিচয় হয় দালাল শফিকের সঙ্গে। দালালের প্রলোভনে পড়ে রূপালী যান সৌদি আরব। সেখানে যাওয়ার কয়েক মাসের মধ্যে চরম নির্যাতনে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন রূপালী। মাথা ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে রয়েছে তাঁর নির্যাতনের চিহ্ন। দেশে ফিরে রূপালীর ঠাঁই হয় রাজধানীর শেরেবাংলানগরের মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে। চিকিৎসা শেষে এখন মায়ের সঙ্গে আছেন রূপালী।

সরেজমিনে গেলে মেয়ের শরীরে আঘাতের চিহ্ন দেখিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে মাজেদা খাতুন বলেন, ‘শরীরের প্রতিটি জায়গায় মারধরের চিহ্ন। মাথায় আঘাতের স্থানে সেলাই করা হয়েছে। ভালো মেয়েটি গেল বিদেশে, ফিরে এলো পাগল হয়ে। আর যেন কোনো মায়ের সন্তান সৌদি আরব না যায়।’

আরো কয়েকজনের কষ্টের কথা

ফরিদপুরের কোতোয়ালি এলাকার মৃত আব্দুল আলীর স্ত্রী তাছলিমা খাতুন। আট বছর আগে স্বামীর মৃত্যুর পর অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করে তিন সন্তানের খাবারের সংস্থান করছিলেন। এক ছেলে ও দুই মেয়ে তাঁর। কোনোমতে চলছিল অভাবের সংসারে। ছেলে-মেয়েদের নিয়ে আরেকটু সুখে থাকতে তাম্বুলখানা গ্রামের স্থানীয় দালাল সানজিদা আক্তারের মাধ্যমে সৌদি আরব যান তাছলিমা খাতুন। ২০ হাজার টাকা বেতন আর মালিকের বাসায় থাকা-খাওয়ার কথা বলে পাঠানো হয় তাঁকে সৌদি আরবে। কিন্তু সেখানে যাওয়ার পর ঠিকমতো খাওয়াদাওয়া পাননি। এক মাসের মধ্যে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে দেশে ফেরত আসেন তিনি। দেশে ফেরত আসার পর ফরিদপুরের মানসিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন তিনি। মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে প্রথমে কাউকে চিনতে পারছিলেন না। চিৎসাির পর বর্তমানে কিছুটা ভালো আছেন। তাছলিমা খাতুনের বড় ছেলে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘নির্যাতনের কথা কী বলব, সুদের ওপর ৫০ হাজার টাকা এনে চিকিৎসা করাতে হচ্ছে। মা আমাদের মুখে হাসি ফোটাতে গিয়েছিল সৌদি আরব, আর সেই মায়ের মুখেই এখন হাসি নেই।’

সাতক্ষীরার কলারোয়ার আব্দুর রাজ্জাকের মেয়ে দিলতাজ বেগম। স্বামী পরিত্যক্তা দিলতাজের রয়েছে এক বছর বয়সী একটি ছেলে। ছেলের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে পাঁচনল গ্রামের স্থানীয় দালাল আব্দুল আলীর মাধ্যমে সৌদি আরব যান তিনি। বিনিময়ে তাঁর কাছ থেকে নেওয়া হয় ৮০ হাজার টাকা। তিনিও বেশি দিন টিকতে পারেননি সৌদি আরবে। খাবারের কষ্ট আর নির্যাতনে একপর্যায়ে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে দেশে ফেরত আসেন। ঢাকার মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে কিছুদিন চিকিৎসার পর সাতক্ষীরায় বাবার বাড়িতে ফিরে গেছেন তিনি।

মানিকগঞ্জের সিংগাইরের সবুর মুন্সির মেয়ে আয়েশা বেগম (৩০)। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে গৃহকর্মীর কাজ নিয়ে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন। কিন্তু গৃহকর্তার নির্যাতন আর খাবারের কষ্ট সইতে পারেননি তিনি। পালিয়ে আশ্রয় নেন সৌদি আরবে বাংলাদেশি আশ্রয়কেন্দ্রে। গত ২০ মে দেশে ফিরেছেন আয়েশা। তবে সুস্থ নন, মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে। দেশে ফেরার পর বিমানবন্দর থেকে ব্র্যাকের সহায়তায় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট হাসপাতালে ভর্তি করা হয় তাঁকে। চার দিন চিকিৎসার পর তাঁর এক খালাতো ভাইয়ের কাছে তুলে দেওয়া হয় তাঁকে। এখন কিছুটা সুস্থ হওয়ার পথে তিনি।

বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রগ্রামের প্রধান শরিফুল হাসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রতি মাসেই নারী কর্মীরা বিদেশ থেকে ফেরত আসছে। তাদের অনেকেই বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়ে ফেরত আসছে। চলতি বছরেই ১ হাজারের বেশি নারী কর্মী ফেরত এসেছে। খাওয়ার কষ্ট, শারীরিক নির্যাতন, বেতন না দেওয়া ও যৌন নির্যাতনের শিকার—এই চারটি অভিযোগ করে প্রবাস থেকে ফেরত আসছে নারী কর্মীরা। এসব অসহায় নারী কর্মীর জন্য জরুরি সহায়তা কর্মসূচি চালু করেছি আমরা।’

বাংলাদেশি অভিবাসী মহিলা শ্রমিক অ্যাসোসিয়েশনের (বোমসা) পরিচালক সুমাইয়া ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নারী কর্মীদের ওপর যে ধরনের নির্যাতন হচ্ছে, এটাকে আমরা মানবিক বিপর্যয় হিসেবেই দেখি। যেখানে স্পষ্ট করে বলা আছে, ২৫ বছরের নিচে নারী যেতে পারবে না, সেখানে কিশোরীদের বয়স বাড়িয়ে পাঠানো হচ্ছে। নারী কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া ঢেলে সাজানো উচিত। যেসব নির্যাতিত নারী কর্মী দেশে ফেরত এসেছে তাদের পাশে দাঁড়ানো উচিত সরকারের।’

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ