প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বিক্ষিপ্ত চিন্তা

ড. এমদাদুল হক

অহং কিংবা ব্যক্তিস্বার্থে আঘাত লাগলে প্রায় প্রত্যেকেই প্রথমে ক্ষিপ্ত ও পরে বিক্ষিপ্ত হয়। কিছু বিক্ষিপ্ত চিন্তা আসে বাহ্যজগৎ থেকে, যা প্রেরণ করে নিন্দুকরাÑগ্রহণ করে অসতর্ক গ্রাহকরা। মনে বিক্ষিপ্ত চিন্তার উদয় হলে, তা ধরতে বেশি সময় লাগে না। হৃদস্পন্দনের গতি ও অস্বস্তি ভাবই জানিয়ে দেয় বিক্ষিপ্ত চিন্তার উপস্থিতি। বিক্ষিপ্ত চিন্তা উদিত হওয়ার সঙ্গে-সঙ্গেই দ্রুত ঘুরিয়ে দেয়া চাই চিন্তার গতিপথ। অন্যথায়, এগুলো জমাট বেঁধে শুরু করে দেয় অনিষ্ট। ধীর, স্থির, শান্ত চিন্তা যেমন সৃজনশীলতা বৃদ্ধি করে তেমনি ক্ষিপ্ত, বিক্ষিপ্ত চিন্তাগুলো বিধ্বংসিতা বৃদ্ধি করে। স্বার্থরক্ষার অনুবন্ধী বিক্ষিপ্ত চিন্তাগুলোও পরিণামে স্বার্থহানির কারণ হয়। প্রতিটি শান্ত ও নিঃস্বার্থ চিন্তায় মিশ্রিত থাকে নন্দনকাননের স্নিগ্ধ বীজন। এগুলো আসে নন্দনকানন থেকে। প্রেরণ করে নন্দের নন্দন। প্রত্যেক মানুষ এক জীবন্ত বেতার। যার এন্টেনা যেদিকে ঘোরানো থাকে তার এন্টেনায় তাই ধরা পড়ে। যারা সর্বদা এন্টেনা নন্দনকাননের দিকে ঘুরিয়ে রাখে তাদের কাছে শুধু নন্দনচিন্তাই ধরা দেয়। নন্দনচিন্তায় থাকে স্বাস্থ্য, নিরাময়, আশীর্বাদ। নিন্দনচিন্তায় থাকে রোগ, বিদারণ, অভিশাপ। নিন্দনচিন্তা আসতেই থাকবে, হিংসুক অহিংস হতে পারে কিন্তু হিংসা কখনো থামবে না। তাই যতক্ষণ আছে প্রৌঢ, নিন্দনে ইন্দন দিলে চলবে না। নিন্দনকে প্রতিহত করা চাই নন্দন দ্বারা। অগ্নিতে ঘৃতাহুতি না দিয়ে জল ঢেলে দেওয়া দুর্বলতা নয়কো।এন্টিনা ঘুরিয়ে রাখি নন্দের দিকে। নন্দন চিন্তা করি, তাহলে দ্রুতই অন্তর্জগতে ভারসাম্য আসবেÑচিৎ অনাবৃত হবে, সৎ জেগে উঠবে। সৎ-চিৎ-ই তখন নিয়ন্ত্রণ করবে বাহ্যজগতের হিংসা। চিন্তাবিশ্বাস, কথাবিশ্বাস, কর্মবিশ্বাস তথা আত্মবিশ্বাস ছাড়া শান্তির আর কোনো মার্গ নেই। যতদিন পর্যন্ত মানুষ নিজের চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ না করতে পারবে ততদিন পর্যন্ত সে নিয়ন্ত্রিত হতেই থাকবে বিক্ষিপ্ত চিন্তা দ্বারা। এবং ধীরে ধীরে সৃষ্টির সেরা হয়েও সে ইঁদুরের মতো ক্ষুদ্র হয়ে যাবে।

মানুষ তার ক্ষুদ্র দুটি চোখ দিয়েও দেখতে পায় আকাশের অসীমতা, ইঁদুর আকাশের দিকে তাকালেও দেখে বিড়াল; শত্রুতা ঘৃণা, সন্দেহ, ঈর্ষা তাকে ক্ষুদ্র করে রাখে; তার সঞ্চয় বৃদ্ধি পায় কিন্তু ভয় কাটে না। যতদিন পর্যন্ত মানুষ তার চিন্তা নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম না হবে, ততদিন পর্যন্ত অবশ্যই তার সুখ-দুঃখ নির্ভর করবে বাহ্যজগতের উপর। পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রক না হয়ে সে পরিস্থিতির ক্রীড়নক হয়ে থাকবে। যার চিন্তা বিক্ষিপ্ত তার কাছে সবকিছুই সন্দেহজনক। কাউকে সে বিশ্বাস করতে পারে না। সবাই তার কাছে মেকি ও প্রতারক হিসেবে প্রতিভাত হয়। নিজের কোনো যোগ্যতা না থাকায় সে কারোর মধ্যে যোগ্যতা দেখে না। নিজের মধ্যে সত্য না থাকায় সে কারোর মধ্যে সত্যতা দেখে না। যে বিক্ষিপ্ত চিন্তা করে তার ঈশ্বর চিন্তাও হয় বিক্ষিপ্ত। সে কল্পনা করে এমন এক ভয়ঙ্কর শাস্তিদাতা ঈশ্বরের যে পৃথিবীর অগ্নি থেকে ৭০ গুণ উত্তপ্ত অগ্নিতে তার প্রিয় সৃষ্টিকে প্রজ্বলিত করে, খেতে দেয় গলিত পুঁজ, পান করতে দেয় ফুটন্ত পানি, নিষ্করুণ প্রহার করতে থাকে নিরবধি। যার চিন্তা শান্ত তার ঈশ্বর পরম দয়াময়, প্রেমময়, জ্ঞানময়। যার চিন্তা শান্ত, তার জগৎ শান্ত। যার চিন্তা সত্য, তার জগৎ সত্য। যার চিন্তা স্পষ্ট, তার কাছে জীবনের রহস্য উন্মোচিত। বিক্ষিপ্ত চিন্তা ছত্রভঙ্গ; এর উন্মন্থন ডেকে আনে ধ্বংসাত্মক পরিণতি। নিষ্ঠুর পরিবেশ, দূষিত সঙ্গ, অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা, বিরোধিতা, পরনিন্দা, পরচর্চা, তর্ক ইত্যাদিও চিন্তাকে বিক্ষিপ্ত করে তোলে। বিক্ষিপ্ত চিন্তা থেকে আসে ভয়, অস্থিরতা, সন্দেহ, ক্রোধ।

অজ্ঞতার ভিত্তিও বিক্ষিপ্ত চিন্তা। পক্ষান্তরে, লক্ষমুখী চিন্তাগুলো সুবিন্যস্ত ও নির্ভুলভাবে পরিচালিত। দেহনিয়ন্ত্রণের ভিত্তি হলো চিন্তানিয়ন্ত্রণ। আসলে চোখ দেখে না, কান শোনে না, জিহ্বা কথা বলে না। এসব অঙ্গ দেখা, শোনা কিংবা বলার মাধ্যম মাত্র। মানবদেহ একটা রথের মতো, রথের ঘোড়াগুলো হলো ইন্দ্রিয়, রথী হলো চিন্তা। রথী যে পথে চালায় রথ সে পথে চলে। তাই চিন্তা অশুদ্ধ হলে কর্ম অশুদ্ধ হয়Ñচিন্তা শুদ্ধ হলে কর্ম শুদ্ধ হয়। লেখক : সভাপতি, জীবনযোগ ফাউন্ডেশন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ