প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

‘হুমায়ূন আহমেদের রচনা কালজয়ী’

শিমুল জাবালি : জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের ৬ষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী আজ। দিনব্যাপী নানা কর্মসূচীর মাধ্যমে পালিত হবে দিনটি। হুমায়ুন আহমেদ স্মরণে, ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, ‘হুমায়ূন বাংলা সাহিত্যের বড় লেখক। আমি মনে করি হুমায়ূন আহমেদের রচনা কালজয়ী’।

হুমায়ূন আহমেদ স্মরণে নুহাশ পল্লীতে কোরানখানি, মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। নুহাশ পল্লীর আশপাশের মাদ্রাসা ও এতিমখানার ছাত্র, পরিবারের সদস্য এবং হুমায়ুন আহমেদের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন লেখকসহ প্রায় ৬ শ জনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে এ মিলাদ ও দোয়া মাহফিলে।

নুহাশ পল্লীর ব্যবস্থাপক সাইফুল ইসলাম বুলবুল জানান, আজ সকাল থেকে আশপাশের কয়েকটি মাদ্রাসা ও এতিমখানার ছাত্ররা নুহাশ পল্লীতে কোরআন তেলাওয়াত করবে। পরে তারা কবর জিয়ারত ও দোয়ায় অংশ নেবে। ওই দিনের কর্মসূচিতে অংশ নিতে হুমায়ূন আহমেদের দুই সন্তান নিষাদ ও নিনিতসহ স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওন আজ সকালে নুহাশ পল্লীতে আসবেন। এছাড়া কথা সাহিত্যিকের পরিবারের লোকজন, ভক্ত, বন্ধুরা কবর জিয়ারত ও মিলাদে যোগ দেবেন। এছাড়া বিভিন্ন সাহিত্য সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠনগুলো নানা কর্মসূচীর মাধ্যমে হুমায়ূন আহমেদকে স্মরণ করবে। তরুণদের জনপ্রিয় সংগঠন ‘হিমু পরিবহন’ থেকে নানা কর্মসূচীর আয়োজন করার কথা জানান সমন্বয়কারী আসলাম হোসেন। দেশব্যাপী বই পড়া কর্মসূচী, বৃক্ষরোপন, ক্যাম্পিং, হুমায়ূন উৎসব করবে সংগঠনটি।

হুমায়ুন আহমেদ স্মরণে, ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, ‘হুমায়ূন বাংলা সাহিত্যের বড় লেখক। তিনি প্রচুর লিখেছেন, কিন্তু সে লেখার প্রাচুর্য্য, অসামান্য জনপ্রিয়তার কারণ এটা নয়। তাঁর রচনা উচ্চমান সম্পন্ন। আমি মনে করি হুমায়ূন আহমেদের রচনা কালজয়ী। তাঁর সৃষ্টি চরিত্র বাংলা সাহিত্যের উল্লেখযোগ্য চরিত্র হয়ে উঠেছে। হুমায়ূন আহমেদ পাঠ করার জন্য ইংরেজি মাধ্যমের ছাত্রছাত্রীরা বাংলা শিখতে আগ্রহী হয়েছে।’ নাট্যকার মামুনুর রশিদ বলেন, ‘জনপ্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুতে বাংলা সাহিত্য এবং নাটকের অনেক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে।’

হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্যের মূল্যায়ন করতে গিয়ে ঔপন্যাসিক আনিসুল হক বলেন, ‘ হুমায়ূন আহমেদের রচনার মান নিয়ে যে প্রশ্ন ছিলো তা অযৌক্তিক। তাঁর মৃত্যুর পর এ অভিযোগ উতরে গেছে, পাঠক নতুন হুমায়ূনকে আবিস্কার করেছে। হুমায়ূন আহমেদ একজন শিল্পী ছিলেন, তিনি মৌলিক ছিলেন। তাঁর যে নিজস্ব ভাষা, স্বকীয়তা রয়েছে তা নেতিবাচক না দেখে ইতিবাচকভাবে দেখতে হবে আমাদের।’

হুমায়ূন আহমেদ স্মরণে টিভি অভিনেতা ডা. এজাজুল ইসলাম বলেন, ‘হুমায়ূন স্যার অনন্য ছিলেন, তিনি ছিলেন কাজে মনোযোগী, এখনকার প্রায় পরিচালক, প্রযোজকদের মতো অর্থলোভী ছিলেন না। স্যারের নাটক ২-৩ মাসে একটি করলেও তৃপ্তি লাগতো, দর্শক দেখতো, উৎফুল্ল হতাম। এখন আর পাই না। স্যারের মৃত্যুতে বাংলা নাটকের যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে তা কোনদিনও পূরণ হবে না।’

হুমায়ূন আহমেদ বিংশ শতাব্দীর জনপ্রিয় বাঙালি কথাসাহিত্যিকদের মধ্যে অন্যতম। তাঁকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তী শ্রেষ্ঠ লেখক গণ্য করা হয়। বলা হয় আধুনিক বাংলা কল্পবিজ্ঞান সাহিত্যের তিনি পথিকৃৎ। নাটক ও চলচ্চিত্র পরিচালক হিসাবেও তিনি সমাদৃত। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ৩শতাধিক। বাংলা কথাসাহিত্যে তিনি সংলাপপ্রধান নতুন শৈলীর জনক। তাঁর বেশ কিছু গ্রন্থ পৃথিবীর নানা ভাষায় অনূদিত হয়েছে, বেশ কিছু গ্রন্থ স্কুল-কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচীর অন্তর্ভুক্ত।

হুমায়ূন আহমেদ ১৯৪৮ সালে নেত্রকোনা জেলায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ২০১২ সালের ১৯ জুলাই দূরারোগ্য ক্যান্সারে মৃত্যুবরণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক হিসাবে দীর্ঘকাল কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে লেখালেখি এবং চলচ্চিত্র নির্মাণের স্বার্থে অধ্যাপনা ছেড়ে দেন। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী তাঁকে আটক করে এবং নির্যাতনের পর হত্যার জন্য গুলি চালায়। তিনি অলৌকিকভাবে বেঁচে যান।

হুমায়ূন আহমেদ রচিত প্রথম উপন্যাস নন্দিত নরকে, এটি ১৯৭২ সালে প্রকাশিত হয়। সত্তর দশকের এই সময় থেকে শুরু করে মৃত্যু অবধি তিনি ছিলেন বাংলা গল্প-উপন্যাসের অপ্রতিদ্বন্দ্বী কারিগর। এই কালপর্বে তাঁর গল্প-উপন্যাসের জনপ্রিয়তা ছিল তুলনারহিত। তাঁর সৃষ্ট হিমু এবং মিসির আলি ও শুভ্র চরিত্রগুলি বাংলাদেশের যুবকশ্রেণীকে গভীরভাবে উদ্বেলিত করেছে। বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীও তাঁর সৃষ্টিকর্মের অন্তর্গত। ধরা হয় বাংলাদেশের প্রথম বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী তিনিই লিখেছেন, এবং এর জনপ্রিয়তাও তার হাত দিয়ে শুরু হয়। তাঁর রচিত প্রথম সায়েন্স ফিকশন ‘তোমাদের জন্য ভালোবাসা।’ তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্রসমূহ পেয়েছে অসামান্য দর্শকপ্রিয়তা। তবে তাঁর টেলিভিশন নাটকগুলি ছিল সর্বাধিক জনপ্রিয়। সংখ্যায় বেশি না হলেও তাঁর রচিত গানগুলোও জনপ্রিয়তা লাভ করে। তাঁর অন্যতম উপন্যাস হলো মধ্যাহ্ন, জোছনা ও জননীর গল্প, মাতাল হাওয়া, লীলাবতী, কবি, বাদশাহ নামদার ইত্যাদি। বাংলা সাহিত্যের উপন্যাস শাখায় অবদানের জন্য তিনি ১৯৮১ সালে বাংলা একাডেমি প্রদত্ত বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়া বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে তাঁর অবদানের জন্য ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে একুশে পদকে ভূষিত করে।

হুমায়ূন আহমেদ নির্মিত কয়েকটি চলচ্চিত্রগুলো সমাদৃত হয়। তাঁর নির্মিত প্রথম চলচ্চিত্র হল বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধভিত্তিক আগুনের পরশমণি (১৯৯৪)। ছবিটি শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ আটটি পুরস্কার লাভ করে। তাঁর নির্মিত অন্যান্য সমাদৃত চলচ্চিত্রগুলো হলো শ্রাবণ মেঘের দিন (১৯৯৯), দুই দুয়ারী (২০০০), শ্যামল ছায়া (২০০৪), ও ঘেটু পুত্র কমলা (২০১২)। শ্যামল ছায়া ও ঘেটু পুত্র কমলা চলচ্চিত্র দুটি বাংলাদেশ থেকে বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র বিভাগে অস্কারের জন্য নিবেদন করা হয়েছিল। এছাড়া ‘ঘেটুপুত্র কমলা’ চলচ্চিত্র পরিচালনার জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ পরিচালনা বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন।

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত