প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

adv 468x65

শ্বাসকষ্ট নিয়েই নিপুণ শিল্প বোনেন পাদুকা শ্রমিকরা

ডেস্ক রিপোর্ট: দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে চট্টগ্রামের একটি পাদুকা তৈরির কারখানায় কাজ করছেন মানিকগঞ্জের বাবুল মিয়া। এর মধ্যে ১০ বছরের বেশি সময় ধরেই ভুগছেন শ্বাসকষ্টে। পাদুকা শিল্পের দক্ষ এ কারিগর জানান, আগে তার শ্বাসকষ্টের সমস্যা ছিল না। এ পেশায় আসার পর পাদুকা কারখানায় ব্যবহূত নানা ধরনের রাসায়নিকের সংস্পর্শে এ রোগ বাঁধিয়েছেন তিনি। এখন ওষুধের পেছনে চলে যায় তার আয়ের বড় একটা অংশ।

চট্টগ্রামের পূর্ব মাদারবাড়ী এলাকার দিপালী সুজ কারখানায় কাজ করেন মো. হাফিজুর রহমান। ১৩ বছর ধরে এ পেশায় যুক্ত হাফিজুরও ভুগছেন একই সমস্যায়। নিয়মিত শ্বাসকষ্ট লেগে থাকায় অনেক সময় কারখানায় আসতে পারেন না তিনি।

কেবল বাবুল মিয়া বা হাফিজুর নন, একই সমস্যায় ভুগছেন পাদুকা শিল্পের শত শত শ্রমিক ও কারিগর। অথচ তাদের দক্ষ হাতের নিপুণ কাজেই তৈরি হয় নানা নকশার পাদুকা, যা দিয়ে মেটে দেশের পাদুকার অভ্যন্তরীণ চাহিদার বড় অংশ।

সম্প্রতি চট্টগ্রামের পূর্ব মাদারবাড়ী ও পশ্চিম মাদারবাড়ী এলাকায় বেশ কয়েকটি জুতো তৈরির কারখানায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, সেখানে বস্তির কয়েক ঘর ভাড়া নিয়েই চলছে পাদুকা তৈরির কাজ। অধিকাংশ ক্ষেত্রে কোনো ভবনের বেজমেন্ট, নিচতলার ফ্লোর ভাড়া নিয়ে একাধিক কোম্পানির কারখানা করা হয়েছে। কর্মরত শ্রমিকদের অধিকাংশেরই স্বাস্থ্য রুগ্ণ। কাজে নিমগ্ন এসব শ্রমিক স্বীকারও করেছেন, প্রত্যেক দিনই কোনো না কোনো শ্রমিক শ্বাসকষ্ট, জ্বরে ভোগেন। হাঁপানিসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে অনেকেই মাঝবয়সে এ পেশা ছেড়েও দিচ্ছেন।

পাদুকা শিল্পে শ্রমিক-কারিগরদের শ্বাসকষ্টজনিত রোগে ভোগার সবচেয়ে বড় কারণ কারখানার অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং পাদুকা তৈরিতে নানা ধরনের রাসায়নিকের ব্যবহার। সংশ্লিষ্টরা জানান, সনাতনী পদ্ধতির পাদুকা কারখানায় নিম্নমানের রাসায়নিক ও উপকরণ ব্যবহার করা হয়। চীন থেকে আসা এসব উপকরণ ব্যবহারে সুরক্ষামূলক কোনো পদ্ধতিই অনুসরণ করা হয় না। মূলত তিন ধরনের কেমিক্যাল বা রেজিন ব্যবহার হয় পাদুকা তৈরিতে। এর মধ্যে রয়েছে— পিও গাম, দুদ গাম ও এলকো গাম। রেক্সিন, সিনথেটিক লেদার, চামড়া, জুতোর মোটা কাপড় ও রাবারের মধ্যে জুতোর সংযুক্তিতে ব্যবহার করা হয় এসব গাম। গাম ব্যবহারের পর ইলেকট্রিক ভাল্বের কুণ্ডলীতে তাপ দিয়ে জোড়া দেয়া হয়। এজন্য প্রতিটি ছোট আকৃতির কারখানায় প্রায় ১০ থেকে ১৫ জন শ্রমিক এক সঙ্গে কাজ করেন। যার কারণে কারখানার অভ্যন্তরীণ পরিবেশ ভয়ানকভাবে দূষিত থাকে। ফলে শ্বাসকষ্ট-জাতীয় রোগ ছাড়াও অনেকে হূদরোগের ঝুঁকিতে থাকেন।

পাদুকা শিল্পের শ্রমিকদের স্বাস্থ্যগত ঝুঁকির বিষয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক অনুপম বড়ুয়া বণিক বার্তাকে বলেন, শ্বাসকষ্টজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে চমেক হাসপাতালে জুতো কারখানার অনেক শ্রমিক চিকিৎসা নিতে আসেন। তবে নির্দিষ্ট করে কতজন শ্রমিক রোগাক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন তার কোনো হিসাব নেই। মূলত পাদুকা শিল্পে রেজিন জাতীয় কেমিক্যাল কোনো ধরনের প্রস্তুতি ছাড়াই ব্যবহারের ফলে শ্বাসকষ্ট জাতীয় রোগে আক্রান্ত হন শ্রমিকরা। ধীরে ধীরে এ সমস্যা ক্রনিক ব্রংকাইটিসে রূপান্তর ঘটে। পাদুকা শিল্পে দীর্ঘদিন কাজ করা শ্রমিকরা সিওপিডি-জাতীয় হাঁপানি রোগ ছাড়াও হূদরোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতেও থাকেন বলে জানান এ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক।

দেশের ক্ষুদ্র পাদুকা শিল্পের গোড়াপত্তন মূলত কিশোরগঞ্জের ভৈরবে। ভৈরবে কয়েক হাজার ক্ষুদ্র পাদুকা কারখানায় তৈরি জুতো সারা দেশে সরবরাহ করা হয়। এমনকি বিদেশেও রফতানি হয়। সারা দেশে ক্ষুদ্র পাদুকা শিল্পে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ কাজ করে, যার মধ্যে ১২ থেকে ১৫ হাজারই কাজ করেন চট্টগ্রামে। চট্টগ্রাম ক্ষুদ্র পাদুকা শিল্প মালিক গ্রুপের সদস্য সংখ্যা পাঁচ শতাধিক। এর বাইরেও প্রায় ৩০০ কারখানা রয়েছে নগরীর বিভিন্ন এলাকায়। এক সময় ভৈরব থেকেই দক্ষ কারিগররা এসে এখানকার পাদুকা শিল্পের হাল ধরলেও বর্তমানে স্বাস্থ্য সমস্যা ও আয় কমে যাওয়ায় শ্রমিক সংকট তীব্র হচ্ছে। ফলে অনেক কারখানা মালিকই উৎপাদন বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। চট্টগ্রামের সংগঠনটি চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সদস্য হিসেবে বিভিন্ন সভা-সমাবেশে এ শিল্পের কারিগরদের প্রশিক্ষণসহ বিশেষায়িত জোনের দাবি জানালেও এ ধরনের কোনো উদ্যোগ এখন পর্যন্ত নেয়া হয়নি বলে অভিযোগ উদ্যোক্তাদের।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম ক্ষুদ্র পাদুকা শিল্প মালিক গ্রুপের সহসভাপতি মঞ্জুর খান বলেন, পাদুকা শিল্প দেশের অর্থনীতির একটি আদি ও গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। সাম্প্রতিক সময়ে বৃহৎ কিছু শিল্প-কারখানা গড়ে উঠলেও দেশের সিংহভাগ মানুষের চাহিদা পূরণ করে ক্ষুদ্র কারখানাগুলো। কিন্তু এ খাতের জন্য বিশেষায়িত কোনো প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেই। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরাও নিজ উদ্যোগে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে পারছে না। ফলে শ্রমিকদের নানা অসুখ-বিসুখ লেগে থাকে। এর ফলে মালিকদের কাঙ্ক্ষিত উৎপাদনের মাধ্যমে লাভের ধারায় থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কার্যক্রমের আওতায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের (এসএমই) বিকাশে যে ঋণ নীতিমালা তৈরি করেছে তার অধীনে ভৈরব, ঢাকা ও চট্টগ্রামের বেশকিছু কারখানা মালিককে স্বল্প সুদে ঋণ দেয়া হচ্ছে। কিন্তু কারখানার অনুপাতে ঋণের পরিমাণ কম হওয়ায় অধিকাংশ সময়ই ক্ষুদ্র ঋণ কিংবা চড়া সুদের ঋণের ওপর কারখানা পরিচালনা করতে হয়। এতে করে কারখানার মানোন্নয়ন করতে হিমশিম খেতে হয় মালিকদের। বাধ্য হয়ে ছোট্ট ঝুপড়ি ঘরের মধ্যেও কাঠের পাটাতন দিয়ে দুই স্তরে চলে জুতো তৈরির কাজ। অধিকাংশ কারখানার ভেতরে প্রচণ্ড গরম থাকায় গ্রীষ্মকালীন মৌসুমে জ্বর-সর্দিসহ নানা ধরনের অসুখের মধ্যে পড়তে হয় শ্রমিকদের।

চট্টগ্রামের পূর্ব মাদারবাড়ী এলাকার ক্ষুদ্র পাদুকা শিল্পপল্লীর রাকিব সুর স্বত্বাধিকারী মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ভৈরবের পর ঢাকা ও চট্টগ্রামের পাদুকা শিল্প সবচেয়ে সমৃদ্ধ। কিন্তু বিশেষায়িত শিল্প জোন না থাকায় শ্রমঘন ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে শ্রমিকদের কাজ করতে হয়। এতে শ্রমিকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরির হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। শ্রমিকদের প্রশিক্ষণের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় সচেতনতার অভাবে প্রায়ই শ্রমিকরা বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। আমাদের পক্ষ থেকে চেম্বারের মাধ্যমে ক্ষুদ্র পাদুকা শিল্পের জন্য একটি জমি দেয়ার দাবি জানানো হয়েছে। সরকার চাইলে লিজ কিংবা এককালীনভাবে জমি ক্রয় করতে পাদুকা শিল্প মালিকরা প্রস্তুত বলে জানান তিনি। সূত্র: বণিক বার্তা

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত