প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ক্রসফায়ার ও অন্তহীন ভাবনা

আফজাল হোসাইন মিয়াজী : ডিজিটাল বাংলাদেশ অবক্ষয়ের অন্যতম কারণ মাদক। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিষধর সাপের মত ছড়িয়ে পড়েছে জীবন বিনাশি নীল নেশা মাদকদ্রব্য। মাদকের সাথে সম্পৃক্ত লোকটিও এই চরম সত্যটি হয়তো জানে, কিন্তু মাদকের সংস্পর্শে এসে জ্ঞানশূন্য হয়ে পশুত্বের কাতারে শামিল হয়েছে। আগেও মাদকবিরোধী আইন ছিল কিন্তু সেটার প্রয়োগ খুব একটা পরিলক্ষিত হয়নি। হঠাৎ করেই সরকার পর্যবেক্ষণ করলেন মাদকসক্ত হয়ে এই জাতি জীবনীশক্তিতে পচন ধরেছে। পচনরোধে সরকার কঠোর হস্তে পরিচালনা করছে মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযান। আমি এই সিদ্ধান্তের সাথে একাত্মতা পোষণ করেই আমাদের ভাবনার বিষয়টি উপস্থাপন করছি। যে বিষয়টি ভাবিয়ে তুলছে ক্রসফায়ারই কি একমাত্র সমাধান?

গত ১১ দিনে মাদকবিরোধী অভিযানে নিহত হয়েছে ৬৩ জন। এভাবেই কি সমাধান সম্ভব? যদি সমাধান সম্ভব হতো তাহলে মাদকবিরোধী এত সাঁড়াশি অভিযানের পরও যদি পত্রিকার শিরোনাম হয়- ‘অভিযানের মধ্যেও আসছে ইয়াবা’, ‘কড়াকড়িতে কৌশল বদলে মাদক বিক্রি’- এখান থেকে বুঝা যায়, মূল জায়গায় কাজ করতে হবে। বিকল্প কোন উপায় অবলম্বন করা যায় কিনা? এটাই এখন ভাবনার বিষয়। কোন ব্যক্তি মাদকাসক্ত হলেও প্রতিটি ব্যক্তির সাথে পরিবার জড়িত। এভাবে চলতে থাকলে অসংখ্য পরিবার সংকটাপন্ন হয়ে পড়বে। হয়তো আমরা এরকম মত উপস্থাপন করতে পারি যে, মাদক ব্যবসায়ীদের ব্যাপারে কিসের এত ভাবনা! কারণ ব্যক্তি নিয়েই তো জাতি, ব্যক্তি ব্যতিরেকে তো  কোন জাতির চিন্তা করা যায় না। এমন তো হতে পারে, একটি সংকট মোকাবিলায় বিকল্প সংকট সামনে এসে যেতে পারে! তাহলে মাদকের রুট কোথায়?

মাদক কোথা থেকে আসছে? কিভাবে আসছে? কারা মূল হোতা? কিংবা এখানে প্রশাসনিক কোনো ব্যক্তির সম্পৃক্ততা আছে কিনা? এগুলো চিহ্নিত করেই মূল কাজ করতে হবে। নচেৎ গোড়ায় পানি ঢেলে শাখা-প্রশাখা কাটার মতো হবে। মনে রাখতে হবে, এটা কোন লৌকিকতার নাম নয়। তাহলে এটা কি জাতির জীবনীশক্তি পচনরোধের কাজ! মানবাধিকার ব্যক্তিত্ব সুলতানা কামাল বলেছেন, ‘মানুষের জীবন কেড়ে নেয়ার অধিকার কারো নেই।’ সরকারি জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এ হত্যাকা-ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক বলেন, ‘মাদকবিরোধী অভিযানের সময় মানবাধিকারের বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাথায় রাখতে হবে।’ কমিশন বলেছে, ‘বিচারবহির্ভূত কোনো হত্যাকা- তারা সমর্থন করে না।’

মাদক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ‘বন্দুকযুদ্ধে’র মাধ্যমে হত্যাকা- ঘটিয়ে মাদকের ব্যবহার নির্মূল করা সম্ভব নয়। যদিও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অনুরূপ মত পোষণ করেন, তবুও কার্যক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাচ্ছি এর ব্যতিক্রম। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গ্রেফতার ও কারাদ- দিচ্ছে; কিন্তু অভিযানদৃষ্টে মনে হচ্ছে, তারা মাদক ব্যবহারকারী ও বিক্রয়কারী মূলহোতাদের ছেড়ে চুনোপুঁটিদের হত্যা করা হচ্ছে। এটা কি এমন যে চুনোপুঁটিদের নিকট গডফাদারদের ঠিকানা আছে! খুচরা বিক্রেতার নিকট আড়তদারদের ঠিকানা অবস্থান থাকতেই পারে।

অভিযানের গতিতে আপাতত অভিযান চলুুক, আমাদের ভাবতে হবে বিকল্প সমাধান গডফাদার ও তাদের দোসরদের আইনের আওতায় নিয়ে এসে দন্ড দিয়ে শোধরানোর পথ বের করতে হবে। পাশাপাশি সাধারণ কোন মানুষের প্রাণহানি ও হয়রানি না হয় সেদিকে অবশ্যই দৃষ্টিপাত করতে হবে। সর্বসাকুল্যে বলতে চাই, সভ্যতার বিনির্মাণে যাদের ভূমিকা পিতা-মাতা, শিক্ষক, অভিভাবক ও গণমাধ্যমকে এগিয়ে এসে কাউন্সিলিং শুরু করতে হবে। যতদিন না আমাদের চিন্তা চেতনার পরিবর্তন হচ্ছে ততদিন মাদক নির্মূল হচ্ছে না।

লেখক: সাংবাদিক ও সহ-সভাপতি সার্ক মানবাধিকার ফাউন্ডেশন, কুমিল্লা/সম্পাদনা : জাফরুল আলম

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত