প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

এরশাদ নাটক আর কত!

নিজস্ব প্রতিবেদক : ৫৮ দলের ঢাউস এক জোট করে আলাদাভাবে নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি বছরখানেক আগে। আবার ক’দিন আগেই রংপুরে বলেছেন, ৭০ আসন ও ১২টি মন্ত্রণালয় পেলে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটেই থেকে যাবেন। বার বার অবস্থান বদলের জন্য আলোচিত-সমালোচিত জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ভোটের বছর শেষ পর্যন্ত কী করবেন, কেউ জানে না।

তবে তার কাছের নেতারা নিশ্চিত করেছেন, ক্ষমতার কাছাকাছি থাকতে ২০১৩ সালের মতো এবারও সব দিকেই যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদ। গত সপ্তাহেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন তিনি। এককভাবে নির্বাচন, নয়ত আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপির সঙ্গে জোট- এ তিন বিকল্পই রয়েছে জাপার ঝুলিতে।

২০০১ সালে এককভাবে নির্বাচন করে জাতীয় পার্টি মাত্র ১৪টি আসন পেয়েছিল- এত কম আসন জাপা এর আগে কখনই পায়নি। ভোটের মাঠে জাপার ‘সেই দিন’ নেই। সন্দেহ নেই, মহাজোট কিংবা ২০ দলীয় ঐক্যজোটকে বাদ দিয়ে নির্বাচনে গেলে এবার দলটির আসন একেবারেই কমে আসবে। উপজেলা ও পৌরসভায় মাত্র দুটি করে পদে জয় পেয়েছে সংসদের বিরোধী দল জাপা। আসন্ন গাজীপুর সিটি নির্বাচনে মেয়র পদে দলটি প্রার্থী দিতে পারেনি। খুলনায় প্রার্থী দিলেও ফল যে অনুকূলে আসবে না, সে সম্পর্কে দলটিও নিশ্চিত। নেতারা নিশ্চিত করেছেন, এ বাস্তবতায় অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে এককভাবে যাবেন না এরশাদ। জাপার নেতৃত্বাধীন ৫৮ দলের সম্মিলিত জাতীয় জোটের ব্যানারেও নয়।

বাকি থাকে দুটি বিকল্প- আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপির সঙ্গে জোট করা। বছর পাঁচেক আগেও জাপায় আওয়ামীপন্থি ও বিএনপিপন্থিরা সমানে সমান ছিল। কাজী জাফর আহমেদ অনুসারীদের নিয়ে দল ছেড়ে যাওয়ার পর জাপার বিএনপিপন্থিরা ‘নিশ্চিহ্ন’। অবশিষ্ট যারা তারাও ভোল পাল্টে আওয়ামীপন্থি হয়ে গেছেন। তারপরও বিএনপির সঙ্গে জোট গঠনকে অসম্ভব মনে করছেন না জাপার দায়িত্বশীল নেতারা। তারা বলেছেন, বিএনপির সঙ্গে জোটের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না; কিন্তু সম্ভাবনা নাকচ করাও যাচ্ছে না।

জাপা মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদারের দাবি, কারও সঙ্গে জোটের কথা তারা ভাবছেন না। এককভাবে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। শেষ পর্যন্ত জোট হবে কি-না সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন দলের চেয়ারম্যান। মহাজোটে এরশাদের ৭০ আসন চাওয়ার বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি।

বিএনপিবিহীন ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে রওশন এরশাদকে সামনে রেখে আওয়ামীপন্থিদের নেতৃত্বে জাপার একাংশ আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতা করে নির্বাচনে অংশ নেয়। জাপার পাওয়া ৩৪ আসনের ৩৩টিতেই আওয়ামী লীগের প্রার্থী ছিল না। এবার জাপা নেতাদের মূল্যায়ন হচ্ছে, গতবারের মতো নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা নেই। এবার বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ভোটে অংশ নেবেই। সে অনুযায়ী ভোটের কৌশল নির্ধারণ করতে হবে।

জাপার কোনো নেতাই এ প্রশ্নের পরিস্কার জবাব দিতে পারছেন না যে, বিএনপিসহ গতবারের বর্জনকারী দলগুলো ভোটে অংশ নিলে দলটি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোটে শেষ পর্যন্ত থাকবে কি-না। এরশাদের অনুজ জাপা কো-চেয়ারম্যান জিএম কাদের বলেছেন, সময়ই এর জবাব দেবে। কার সঙ্গে জোট হবে, তা জানেন না বলে দাবি করেন মহাজোট সরকারের সাবেক এই মন্ত্রী। তার মতে, অন্য দলগুলোর স্বতন্ত্র অস্তিত্ব থাকলেও আওয়ামী লীগ ও বিএনপির রাজনীতি সবাইকে প্রভাবিত করে। ভোটের হিসাব-নিকাশের কারণে বড় দুই দলের একেকটিকে একেক সময় বেছে নিতে হয়।

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগকে সরকার গঠনে সমর্থন দিয়েছিলেন কারাবন্দি এরশাদ। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ঐকমত্যের সরকারে জাপাও ছিল। ১৯৯৯ সালে এরশাদ যোগ দেন বিএনপি নেতৃত্বাধীন চার দলে। পরের বছর চার দল ছাড়েন তিনি। ২০০৬ সালে মহাজোটে যোগ দেন এরশাদ এবং ২০০৮ সালে জোটবদ্ধ নির্বাচন করে যোগ দেয় সরকারে। ২০১৩ সালের অক্টোবরে মহাজোট ছাড়ার ঘোষণা দেন এরশাদ; কিন্তু এক মাস পরেই আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ‘নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় সরকারে’ যোগ দেয় জাপা। ঘোষণা দেন ভোটে অংশ নেওয়ার। পরের মাসেই আবার নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে আচমকা ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ‘বর্জন’ করেন জাপা চেয়ারম্যান। এরশাদ বর্জন করলেও তার পত্নী রওশনের নেতৃত্বে জাপা ভোটে অংশ নেয়। প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসেও যোগ দেয় মন্ত্রিসভায়। নির্বাচন বর্জনকারী এরশাদ হয়ে যান মন্ত্রী পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত।

গত চার বছর ধরে এরশাদ কখনও সরকারের সমালোচনা করছেন, কখনও প্রশংসা করছেন। কখনও বিএনপির কড়া নিন্দা করছেন। ‘সত্যিকারের’ বিরোধী দল হতে বহুবার মন্ত্রিসভা ছাড়ার কথাও বলেছেন। গত মাসের শুরুতে এরশাদ বলেছিলেন, মন্ত্রিসভা ছাড়া সময়ের ব্যাপার। এসব ঘোষণাকে ‘কথার কথা’ ছাড়া কিছুই মনে করেন না জাপার নেতারা।

কিন্তু হঠাৎ করে আওয়ামী লীগের কাছে ৭০ আসন ও ১২ মন্ত্রণালয় দাবি করার বিষয়কে গুরুত্ব দিয়েই দেখছেন জাপার নেতারা। এরশাদের সঙ্গে সদ্য সমাপ্ত রংপুর সফরে থাকা এক নেতা বলেছেন, নির্বাচনের তফসিল আর মাত্র ছয় মাস দূরে। দরকষাকষি শুরুর এখনই সময়। এরশাদ তাই করছেন। আওয়ামী লীগের কাছে কাঙ্ক্ষিত সংখ্যক আসন না পেলে অন্য পথ ধরতে পারে জাপা।

গত নির্বাচনের আগেও কাজী জাফর আহমেদের মাধ্যমে বিএনপির সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন এরশাদ। দাবি ছিল ৭০ আসনের। বিএনপি নির্বাচন বর্জন করায় সেই আলোচনা ভেস্তে যায়। বর্তমানে দলে একচেটিয়া প্রভাবে আওয়ামীপন্থিরা। তবে কাজী জাফরের সঙ্গে জাপা ছেড়ে যাওয়া কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটে রয়েছেন। এরশাদের সাবেক এই ঘনিষ্ঠ নেতারা যোগাযোগের ক্ষেত্রে হয়তো ভূমিকা রাখতে পারেন। তবে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাগারে থাকায় যোগাযোগ কতটা এগোবে, তা নিশ্চিত করে বলতে পারেনি জাপা সূত্র।

জাপায় এক সময় বিএনপিপন্থি হিসেবে পরিচিত ছিলেন দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদ। জাপা ও বিএনপির ঐক্যের সম্ভাব্যতা সম্পর্কে তিনি বলেন, এসব সমীকরণের ফল নির্ভর করছে বিএনপি ভোটে আসতে পারবে কি-না তার ওপর।

কিছুদিন আগেও জাপা চেয়ারম্যানের ঘনিষ্ঠ ছিলেন এমন একজন উপদেষ্টার মূল্যায়ন অনুযায়ী, বিএনপির ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা সৃষ্টি হলে জাপা সেদিকেই যাবে। যদি আওয়ামী লীগেরই ক্ষমতায় থাকার প্রবল সম্ভাবনা থাকে, তা হলে এরশাদ মহাজোটেই থাকবেন। শেষ পর্যন্ত কী হবে, তা নিশ্চিত হতে তাই নির্বাচনের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। কারণ জাপা ক্ষমতার কাছাকাছিই থাকতে আগ্রহী। সূত্র : সমকাল

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত