শিরোনাম
◈ তারেক রহমানের সম্ভাব্য সফর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে: সাবেক কূটনীতিক ◈ সড়ক আইন ভাঙলে যাত্রী-পথচারীকেও জরিমানা, আসছে নতুন আইন ◈ শুক্রবার থেকে এমপিও শিক্ষকদের বদলির আবেদন, চলবে ২৭ আগস্ট পর্যন্ত ◈ অবৈধ অভিবাসন ঠেকাতে নতুন উদ্যোগ, বাংলাদেশ থেকে বিদেশে কর্মী পাঠানোর পুরো প্রক্রিয়া অনলাইনে করার উদ্যোগ ◈ চোরাচালান ও আটক পণ্য নিষ্পত্তিতে এনবিআরের নতুন আদেশ জারি ◈ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেননি কেউ, ভোট বৃহস্পতিবার: ইসি সচিব ◈ সমাজের সবাই এগিয়ে এলে অনেক বড় সমস্যার সমাধান করা সম্ভব: প্রধানমন্ত্রী ◈ সরকার কেন পাল্টালো অর্থবছরের সময়কাল, কি সুবিধা মিলবে? ◈ সরকারি চাকরি জনগণের সেবা করার গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ: আইনমন্ত্রী ◈ কোন-কোন রুটে চলবে পিংক বাস, ভাড়া কত

প্রকাশিত : ১৯ মার্চ, ২০১৮, ০৭:৫৪ সকাল
আপডেট : ১৯ মার্চ, ২০১৮, ০৭:৫৪ সকাল

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

জয়বাংলার লোক জয়বাংলা রোগ

ডেস্ক রিপোর্ট : 'জয়বাংলার লোক- ঢেলা ঢেলা চোখ/আতপ চালের ভাত খেয়ে ক্যাম্পে গিয়ে ঢোক।' ৪২ বছরের হিরণ্ময়ীকে একটি বাচ্চা ছেলে এই দুই লাইনের ছড়া বলে খ্যাপাচ্ছে। হিরণ্ময়ী জয়বাংলার লোক। বাচ্চাটি কলকাতার। সময় ১৯৭১ সালের অক্টোবর মাস। পাকিস্তানিদের অত্যাচারে হিরণ্ময়ীর পরিবার ভারতে আশ্রয় নিয়েছে। আসার পথে কয়েকদিন হরিণাঘাটা শরণার্থী ক্যাম্পে ছিলেন। সেখান থেকে কলকাতায় এসে আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। যে ছেলেটি ছড়া বলছে, সেও হিরণ্ময়ীর আত্মীয়। অল্প বয়সী ছেলে, তেমন কিছু না বুঝে মজা করছে, হিরণ্ময়ীও হাসছেন। হাসতে হাসতেই তার মাথায় তীব্র জ্বালা শুরু হয়ে গেল। ছড়ার শব্দগুলো তিনি আর সহ্য করতে পারছেন না। তারা এখন শরণার্থী, অন্যের শরণে আছেন। তাদের কষ্টের জীবনকে কটাক্ষ করে ছড়া বানাচ্ছে কেউ না কেউ এবং তাদের কাছ থেকেই বাচ্চাটা শিখেছে।

হিরণ্ময়ী দেবীর শরণার্থী জীবনের বেদনার সেই গল্পটা লিখেছেন তার দৌহিত্র, এথেন্সে বাংলাদেশ দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি সুজন দেবনাথ। একান্ত ব্যক্তিগত ছোট্ট ওই লেখা থেকেই শরণার্থীদের প্রতি ভারতের জনগণের মনোভাব বুঝতে পারা যায়। সমকালের সঙ্গে আলাপে সুজন জানালেন, ঠাকুরমা নেই। মারা গেছেন ১৯৯৫ সালে। ঠাকুরমা মারা যাওয়ার সময় সুজন বেশ ছোট ছিলেন। তবু এমন অনেক গল্প তার মনে আছে। সুজনদের গ্রামের বাড়ি শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলার সাজনপুরে।

ছোট্ট ছেলের বিদ্রূপাত্মক ছড়াটি হিরণ্ময়ী দেবীকে এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত কয়েক মাসের কষ্টের চেয়েও সামনের দিনে অপমানের আশঙ্কায় বেশি আতঙ্কিত করে তুলেছিল বলে তিনি তার দৌহিত্রের কাছে গল্প করেছিলেন। দেশে যে বাড়িঘর হিরণ্ময়ীরা ফেলে এসেছেন, সেই তুলনায় কলকাতার এসব বাড়িঘর একেবারেই খুপরি, বস্তির মতো। তবু এখানে তিনি শরণার্থী, তাই তাকে অপমান সইতেই হবে। জীবন বাঁচানোর মতো আশ্রয় পেয়েই কৃতজ্ঞ তিনি। সেই আশ্রয় নিয়ে কটাক্ষ চলতে থাকলে তা সহ্য করা কঠিন হবে। তখন আর বেশিদিন কৃতজ্ঞতা থাকবে না। ছেলেটি বলে চলেছে- 'জয়বাংলার লোক- ঢ্যালা ঢ্যালা চোখ,/আতপ চালের ভাত খেয়ে ক্যাম্পে গিয়ে ঢোক।' হঠাৎ হিরণ্ময়ী চিৎকার করে উঠলেন, 'ইন্ডিয়ার লোক, ফুলা ফুলা চোখ,/আলা চাউলের ভাত খাইয়া খুপরিতে গিয়া ঢোক।'

শরণার্থীদের নামই 'জয়বাংলার লোক' হয়ে গিয়েছিল বলে জানালেন মুক্তিযুদ্ধের বিদেশি বন্ধু জুলিয়ান ফ্রান্সিস। মুক্তিযুদ্ধের সময় অক্সফামের ত্রাণ কার্যক্রমের সমন্বয়ক হিসেবে ৫০টির বেশি শরণার্থী শিবিরের দায়িত্ব ছিল তার।  আলাপে জুলিয়ান বলেন, 'শরণার্থীদের অসুখের নামও হয়ে গিয়েছিল জয়বাংলা। শিবিরগুলোতে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছিল কনজাঙ্কটিভাইটিস মানে চোখ ওঠা রোগ। যুক্তরাজ্য থেকে অক্সফামের চেষ্টায় মিলিয়ন মিলিয়ন টিউব ওষুধ আনা হয়েছে তখন। প্রাথমিকভাবে অক্সফাম এক কোটির মধ্যে পাঁচ লাখ শরণার্থীকে সেবা দিয়েছিল। ত্রিপুরা, মেঘালয়, আসাম, কোচবিহার, শিলিগুড়ি, জলপাইগুড়ি, পশ্চিম দিনাজপুর, বালুরঘাট, বনগাঁও ও বারাসাতে অক্সফাম এই সেবা দেয়। নভেম্বরের শেষের দিকে সেই সংখ্যাটা ছয় লাখে উন্নীত হয়।'

জয়বাংলা শব্দের এমন ব্যবহার বাংলাদেশ থেকে ভারতে আশ্রিত শরণার্থীদের যে কিছুটা বিব্রত করেছে, তা আহমদ ছফার উপন্যাস 'অলাতচক্র' থেকে জানা যায়- 'বোধ হয় আমাকে খুশি করার জন্যই বলল, জানেন দাদা, আমাদের ওয়ার্ডে আপনাদের জয়বাংলার একটি ফিমেল পেশেন্ট ভর্তি হয়েছে। লোকটা এ পর্যন্ত দু-দু'বার জয়বাংলা শব্দটি উচ্চারণ করল। কলকাতা শহরের লোকদের মুখে ইদানীং জয়বাংলা শব্দটি শুনলে আমার অস্তিত্বটা যেন কুঁকড়ে আসতে চায়। শেয়ালদার মোড়ে মোড়ে সবচে সস্তা, সবচে ঠুনকো স্পঞ্জের স্যান্ডেলের নাম জয়বাংলা স্যান্ডেল। এক হপ্তার মধ্যে যে গেঞ্জি শরীরের মায়া ত্যাগ করে তার নাম জয়বাংলা গেঞ্জি। জয়বাংলা সাবান, জয়বাংলা ছাতা কতকিছু জিনিস বাজারে বাজারে ছেড়েছে কলকাতার ব্যবসায়ীরা। দামে সস্তা, টেকার বেলায়ও তেমন। বাংলাদেশের উদ্বাস্তুদের ট্যাঁকের দিকে নজর রেখে এ সকল পণ্য বাজারে ছাড়া হয়েছে। কিছুদিন আগে যে চোখ ওঠা রোগটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল, কলকাতার মানুষ মমতাবশত তারও নামকরণ করেছিল জয়বাংলা। এই সকল কারণে খুব ভদ্র অর্থেও কেউ যখন আমাদের জয়বাংলার মানুষ বলে চিহ্নিত করে অল্পস্বল্প বিব্রত না হয়ে উপায় থাকে না।'

আহমদ ছফার 'মমতাবশত' বলার মধ্যেও যে বিদ্রুপ আছে তা পশ্চিমবঙ্গের কৃষ্ণনগরের ধুবুলিয়া গ্রামের শিবশঙ্কর দাসের লেখা থেকে বোঝা যায়। 'আনন্দবাজার পত্রিকা'য় একাত্তরের স্মৃতিচারণ করে ২০১৫ সালে তিনি লিখেছেন, 'কেউ কেউ গান গেয়ে ভিক্ষা করত, ইয়াহিয়া খাঁ মারছে ঠেলা/বসেছে জয়বাংলার মেলা!' তার লেখাতেই হিরণ্ময়ী দেবী যে ছড়াটি শুনে উত্ত্যক্ত হয়েছিলেন, তার একটু অন্যরূপের কথাও পাওয়া গেল, 'জয়বাংলার লোক- ঢেলা ঢেলা চোখ/ভাতের দিকে যেমন-তেমন মাছের দিকে ঝোঁক।' এতকাল পর এসেও শিবশঙ্কর দাসের লেখায় সূক্ষ্ণ বিদ্রুপ ধ্বনিত হয়েছে, 'সে সময় জয়বাংলার লোকেরা দুটো জিনিস বোধহয় সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিল। এক. চোখের রোগ। দুই. মাছ। তখন থেকেই কনজাঙ্কটিভাইটিসের নাম হলো 'জয়বাংলা'। তখন আমাদের সবার চোখে জয়বাংলা হলো। আর জয়বাংলারা জলে হাত দিলেই যেন মাছ উঠে আসত। ওরা নদী খাল বিল থেকে প্রচুর মাছ ধরে নিয়ে আসত। নিজেরা খেত, আর রাস্তায় যেখানে-সেখানে বসে বিক্রি করত।'

ত্রাণ হিসেবে যে চাল-ডাল পাওয়া যেত, তা খাওয়া ছিল বেশ কঠিন। তাই শুধু ত্রাণের ওপর নির্ভর করতে হলে অর্ধাহারে দিন কাটত বলে শরণার্থীদের অনেকেই নিজেরা কিছু আয়রোজগারের চেষ্টা করতেন। মাছ ধরা ও মাছ বিক্রি করা এ রকমই একটা চেষ্টা বলে জানালেন একাত্তরে পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরায় শরণার্থী হিসেবে দিন কাটাতে হয়েছে এমন দুই সাংবাদিক। তাদেরই একজন কুড়িগ্রামের পরিমল মজুমদার জানান, তাদের পরিবারটি প্রথমে পশ্চিম দিনাজপুরে রায়গঞ্জে এবং পরে বালুরঘাট শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিয়েছিল। তার বড়ভাইদের একজন মালদহের গাজল বলে একটা এলাকায় গিয়ে গ্রাম ডাক্তারের কাজ করে কিছু রোজগারের ব্যবস্থা করেছিলেন। অন্য ভাইয়েরা মিলে বালুরঘাটেই পানের দোকান দিয়েছিলেন। একটি বন্ধ দোকানের সামনে ছিল তাদের পানের দোকান। পরে ওই বন্ধ দোকানটির মালিক নিজের দোকানটি খুলে দিয়েছিলেন এবং ওখানে তারা দোকান করেছিলেন। যুদ্ধের সময় পরিমল ছিলেন সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। তিনি বলেন, 'জয়বাংলার লোকদের নিয়ে ভারতীয়রা যেমন ব্যঙ্গবিদ্রুপ করত, তেমনি সাহায্যের হাতও বাড়িয়ে দিত। যেমন দিয়েছিলেন বন্ধ দোকানের ওই মালিক। আমরা অসহায় ছিলাম বলেই হয়তো বিদ্রুপে একটু বেশি আহত বোধ করতাম।'

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ইংরেজি দৈনিক 'দ্য ডেইলি ফ্রন্টিয়ার' সম্পাদক দেলোয়ার আহমেদ বলেন, 'আমরা যাওয়ার পর ত্রিপুরার জনসংখ্যা দ্বিগুণের বেশি হয়ে পড়েছিল। যুদ্ধ কতদিন চলবে, কবে জয়বাংলার লোকগুলো নিজের দেশে ফিরে যাবে, তা কারোরই জানা ছিল না। সর্বোপরি আমরা শুধু আশ্রয় নিইনি, আশ্রয়দাতাদের ওপর নানান চাপ তৈরি করেছি।' দেলোয়ার তখন কলেজে দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন। গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর থেকে এপ্রিলের শেষে গিয়ে পৌঁছেছিলেন আগরতলায় এবং ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত সেখানেই ছিলেন। তিনি আশ্রয়দাতাদের শরণার্থীরা যেভাবে উত্ত্যক্ত করত, তার একটি উদাহরণ দিতে গিয়ে বলেন, 'আগরতলার যে পুকুরটিতে আমরা গোসল করতাম, স্থানীয় লোকজনের সেই পুকুরে নামা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। পুকুরের পাশ দিয়ে মেয়েরা গেলে পানি ছিটিয়ে তাদের ভিজিয়ে দেওয়ার ঘটনা নিজের চোখে দেখেছি আমি।'

শরণার্থীদের জন্য ভারত সরকারের চেষ্টার পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান এবং দরদি বহু লোকের চেষ্টার কথাও গোলাম মুরশিদ তার 'যখন পলাতক :মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলি' বইয়ে তুলে ধরেছেন। প্রাবন্ধিক ও সাহিত্য সমালোচক গোলাম মুরশিদ পশ্চিমবঙ্গের লেখক মৈত্রেয়ী দেবীর কাছে টেলিফোন করতে গিয়ে একজন অপারেটরের কাছ থেকে যে সহযোগিতা পেয়েছেন, তার বিবরণ দিয়ে লিখেছেন, 'ভদ্রলোক চোখে বিস্ময় আর মুখে হাসি ফুটিয়ে বললেন, আপনারা জয়বাংলা থেকে এসেছেন? জয়বাংলা মানে বাংলাদেশ। পশ্চিম বাংলায় সে বারে বাংলাদেশের জনপ্রিয় নাম হয়েছিল জয়বাংলা। যাঁদের মুখে একেবারে প্রথম দিকে এই নামটা শুনেছিলাম, বহরমপুরের ডাক বিভাগের এই কর্মচারী তাঁদের একজন। মৈত্রেয়ী দেবীর সঙ্গে কথা বলার সময়েই তিনি লক্ষ্য করেছিলেন আমি কোথা থেকে এসেছিলাম। তবু বললাম, হ্যাঁ। ভদ্রলোক বললেন. না, না পয়সা লাগবে না। আমি হতবাক। পূর্ব বাংলা থেকে পালিয়ে আসা উদ্বাস্তুদের সাহায্য করার অফুরন্ত শুভেচ্ছা তখন সবার মধ্যেই দেখেছিলাম। ভদ্রলোক পয়সা না চেয়ে তারই অভ্রান্ত পরিচয় দিয়েছিলেন, যদিও সরকারি পয়সা ছেড়ে দেয়ার অধিকার তাঁর ছিল না।'

ভারত সরকার শরণার্থীদের জন্য সরকারি পয়সার অনেক ছাড় দিয়েছিল বলে জানালেন দিনাজপুরের সারদেশ্বরী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষক ছায়া আকবর। শরণার্থী জীবনে আশ্রয় খুঁজতে গিয়ে তাদের এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় ছুটে বেড়াতে হয়েছিল এবং বাস-ট্রেনে ভাড়া দিতে হলে তা তারা পারতেন না। তিনি বলেন, 'বাসে ওঠার সময় হেলপার বলত, এই জয়বাংলার দিদিকে বসতে দাও। আমার বর যখন কলকাতায় গিয়ে প্রবাসী সরকারের চাকরি পেলেন তখন আমাকেই শান্তিপুরে সংসার চালাতে হয়েছে। পাড়ার ছেলেমেয়েরা রেশন আনতে যাওয়ার সময় আমাকে সহযোগিতা করত। ডাকঘরপাড়ায় যে বাড়িটিতে আমরা ছিলাম, তার মালিক জমাত আলী নামমাত্র ভাড়ায় আমাদের তার ঘরে থাকতে দিয়েছিলেন।' সূত্র : সমকাল

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়