প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

স্ফুলিঙ্গ হয়ে জ্বলে ওঠে ক্ষোভ

ডেস্ক রিপোর্ট  : একাত্তর-পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনীতিতে পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যে তুলনামূলক বিচারে পূর্ব পাকিস্তান ছিল চরম বৈষম্যের শিকার। এ অঞ্চলের মানুষের মধ্যে এ নিয়ে প্রবল ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছিল। উপরন্তু পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের মাতৃভাষা বাংলার ওপর আঘাত আসার পর সেই ক্ষোভ স্ফুলিঙ্গের মতো জ্বলে উঠেছিল। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি যা চূড়ান্ত পরিণতি লাভ করে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ও বিশিষ্ট গবেষক ড. আতিউর রহমানের সম্পাদনায় ‘ভাষা আন্দোলনের আর্থ সামাজিক পটভূমি’ শীর্ষক গবেষণামূলক গ্রন্থ থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। ভাষা আন্দোলনের পটভূমি শীর্ষক একটি প্রকল্পের আওতায় ঐতিহাসিক এই গবেষণাকর্মে ড. আতিউর রহমানের নেতৃত্বে যুক্ত ছিলেন ড. হুমায়ুন আজাদ, এমএম আকাশ, সৈয়দ হাশেমী ও লেনিন আজাদ। গবেষণা কর্মটি ১৯৯০ সালে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়।

তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে কীভাবে পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী অর্থনৈতিক শোষণ চালিয়েছেÑ গবেষণায় তার বিশদ বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে। ওই গবেষণা প্রতিবেদন থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ১৯৫১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্যা ছিল ৫৬ শতাংশ। পূর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্যা ছিল ৪ কোটি ২০ লাখ ৬৩ হাজার আর পশ্চিম পাকিস্তানের ৩ কোটি ৩৭ লাখ ৭৯ হাজার জন। পূর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্যা বেশি হলেও মোট বাজেটের খুব অল্প পরিমাণই এই অঞ্চলের জন্য বরাদ্দ হতো। ১৯৪৮-৪৯ অর্থবছরে রাজস্ব ও কর বাবদ পূর্ব পাকিস্তান থেকে ১৬ কোটি ২৩ লাখ রুপি সংগ্রহ করা হলেও ব্যয় করা হয়েছিল মাত্র ৩ কোটি ১৯ লাখ রুপি। অন্যদিকে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ৪৪ কোটি ৭৩ লাখ রুপি সংগ্রহ হলেও ব্যয় হয়েছিল ৭৯ কোটি ৫১ লাখ রুপি। এর পরের বছর অর্থাৎ ১৯৪৯-৫০ অর্থবছরে পূর্ব পাকিস্তান থেকে ২১ কোটি ৫২ লাখ রুপি রাজস্ব সংগ্রহ করা হলেও ব্যয় হয় মাত্র ১ কোটি ২০ লাখ রুপি। অন্যদিকে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ৫৮ কোটি ৬৩ লাখ রুপি সংগ্রহ হলেও ব্যয় হয়েছিল ১৩৬ কোটি ৫৬ লাখ রুপি, যা মোট আয়ের তুলনায় ৭৭ কোটি ৯৩ লাখ রুপি বেশি ব্যয়।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এমএম আকাশ বলেন, তৎকালীন সময়ে বাঙালিরা এমনিতেই ছিল নিপীড়িত। চাকরি, ব্যবসা ও অন্যান্য ক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে ছিল। এর মধ্যে ভাষার ওপর আঘাত আসার কারণে জ্বলে উঠেছিল পুরো পূর্ব পাকিস্তান। সেই আন্দোলনকে পরবর্তীতে ধাপে ধাপে বাঙালিদের নিজস্ব জাতিসত্তার ব্যাপারে প্রতিবাদী হতে উদ্বুদ্ধ করেছে। তিনি বলেন, সেই সময়ে ভাষার পরিবর্তন হলে সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সব দিক থেকে পিছিয়ে পড়ত বাঙালিরা।

ভাষা আন্দোলনের আর্থ সামাজিক পটভূমি শীর্ষক ওই গবেষণা গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে, পুরো পাকিস্তানে সাক্ষরতার হার ছিল ১৪ দশমিক ৭৬ শতাংশ। এর মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানে ছিল ১৬ শতাংশ আর পশ্চিম পাকিস্তানে ১৩ দশমিক ২ শতাংশ। পূর্ব পাকিস্তানে সাক্ষরতার হার বেশি হওয়ার পরও বিভিন্ন চাকরি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ ছিল উপেক্ষিত। এসব ক্ষেত্রে পশ্চিম পাকিস্তানিদেরই প্রাধান্য ছিল।

১৯৫০ সালে দাঙ্গার কারণে পূর্ব পাকিস্তান থেকে হিন্দু ব্যবসায়ী ও পেশাজীবীদের একটি বড় অংশ তাদের সব পুঁজি নিয়ে ভারতে চলে যান। ১৯৫১-৫২ অর্থবছরে পশ্চিম পাকিস্তানের উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের জন্য বরাদ্দ ছিল ৬ কোটি ৬৯ লাখ ৮৫ হাজার রুপি আর পূর্ব পাকিস্তানের জন্য ২ লাখ ৫৪ হাজার রুপি। মোট বরাদ্দের মধ্যে মাত্র ০.৩৭ শতাংশ ছিল পূর্ব পাকিস্তানের জন্য। দেশ বিভাগের কারণে পূর্ব পাকিস্তান থেকে নিবন্ধিত ২৭০ কোটি রুপি ভারতে পাচার হয়ে যায়। এর বিপরীতে ভারত থেকে তেমন কোনো মুদ্রা বাংলাদেশে আসেনি। পশ্চিম পাকিস্তানে প্রায় ৫ কোটি ৫০ লাখ রুপি আসার তথ্য পাওয়া যায়। অর্থাৎ ভারত থেকে পুঁজি ফিরিয়ে আনার বিষয়ে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি পশ্চিম পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত শাসকগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে।

সিপিডির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারপারসন অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেন, বাংলাদেশের ব্যবসার অধিকাংশই ছিল হিন্দুদের মালিকানায়। দেশ বিভাগের পর হিন্দুরা স্থানান্তরিত হলে দেশে পুঁজির সংকট দেখা দেয়। যার কারণে এখানে সাধারণ ব্যবসায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কোনো ইঙ্গিত হিসেবে কাজ করেনি। এ ছাড়া এ দেশে শিল্প প্রতিষ্ঠানের প্রসার না ঘটার ফলে পুঁজিরও সম্প্রসারণ হয়নি। ফলে পাকিস্তানের শুরু থেকেই অর্থনৈতিক বৈষম্যের শিকার ছিল এই অঞ্চলের মানুষ। এ কারণে যে কোনো স্বাধিকার আন্দোলনে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ ব্যাপকভাবে সাড়া দিয়েছে।

১৯৪৯-৫০ অর্থবছরের হিসাব অনুসারে পকিস্তানের মোট কৃষিজমি ছিল ৬ কোটি ৫৪ লাখ ৩২ হাজার একর। এর মধ্যে পশ্চিম পাকিস্তানে ছিল ৩ কোটি ৭৮ লাখ একর আর পূর্ব পাকিস্তানে ছিল ২ কোটি ৭৬ লাখ ২৪ হাজার একর। পশ্চিম পাকিস্তানে কৃষিকাজে ১৯৫০ সাল থেকেই পাওয়ার টিলার, ছোট কলের লাঙল ও ট্রাক্টরের ব্যবহার শুরু হলেও পূর্ব পাকিস্তানের দিকে শাসকগোষ্ঠীর সেই দৃষ্টি ছিল না। পূর্ব পাকিস্তানে ১৯৫৩ সালে স্রেফ প্রদর্শনীর জন্য কিছু পাওয়ারটিলার, কলের লাঙল ও ট্রাক্টর পাঠানো হয়; কৃষিকাজে ব্যবহারের জন্য নয়।

পাকিস্তান গঠনের পর বৃহৎ ৮টি মুসলিম ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৭টি ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে। এ ছাড়া মাল পরিবহনের ক্ষমতার ৯৯.৬ শতাংশ ছিল করাচি বন্দরের। চট্টগ্রামে ছিল মাত্র ০.৪ শতাংশ।

সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় নির্মিত পাকিস্তানের ১৭টি বস্ত্র ও সুতার কারখানার মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানে ছিল মাত্র ৩টি। বাকি ১৪টি ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে। এ ছাড়া মোট ৩৭টি বড় কারখানা ছিল পাকিস্তানে, যার মাত্র ২টি ছিল পূর্ব পাকিস্তানে।

১৯৪৮ সালে ৫টি সিমেন্ট কারখানার ৪টি ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে আর পূর্ব পাকিস্তানের ছাতকে একটি মাত্র সিমেন্ট কারখানা গড়ে তোলা হয়। আর সিমেন্টের টালি নির্মাণের ৭টি কারখানার সবকটিই ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে।

১৯৪৭ সালে পাকিস্তানে বিদ্যুৎ সরবরাহের পরিমাণ ছিল ৭১ হাজার ৩৫৮ কিলোওয়াট। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের জন্য বরাদ্দ ছিল সাকল্যে মাত্র ৭ হাজার ২৮৬ কিলোওয়াট, যা মোট সরবরাহের মাত্র ১০ দশমিক ২১ শতাংশ।

পাকিস্তানে উন্নত সড়কের দৈর্ঘ্য ছিল ৮ হাজার ৩৫২ মাইল যার মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানে ছিল মাত্র ৭৫৭ মাইল।

আমদানি ও রপ্তানির ক্ষেত্রেও ছিল চরম বৈষম্য। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে কৃষিকাজ, পাট ও অন্যান্য কাঁচামালের উৎপাদন বেশি হতো। আর এগুলো বাইরে রপ্তানি করে যে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হতো এর বেশিরভাগই ব্যবহৃত হতো পশ্চিম পাকিস্তানের উন্নয়ন কাজে। এর বিপরীতে পশ্চিম পাকিস্তানে শিল্প কারখানার প্রসারের জন্য আমদানির পরিমাণ ছিল বেশি।

১৯৪৮ থেকে ৫২ অর্থবছরে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে রপ্তানি হয়েছে ৩৮০ কোটি রুপি আর পূর্ব পাকিস্তান থেকে রপ্তানি হয়েছে ৪৬৪ কোটি রুপির পণ্য। যা মোট রপ্তানির ৫৪ শতাংশ।

১৯৪৮-৪৯ অর্থবছরে পশ্চিম পাকিস্তানে আমদানি হয়েছিল ৪০৪ কোটি রুপি আর পূর্ব পাকিস্তানে আমদানি হয়েছে ১৬১ কোটি রুপির পণ্য, যা মোট আমদানির মাত্র ২৮ শতাংশ।

১৯৪৭ সালের পূর্বে পূর্ব পাকিস্তানে কোনো শিল্পনগরীই হয়নি। পাকিস্তানের ১৭টি সুতি ও বস্ত্রশিল্প কারখানার মধ্যে সবে ৩টি ছিল পূর্ব পাকিস্তানে। এ ছাড়া অন্যান্য ৩৭টি বৃহৎ শিল্প কারখানার মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানে ছিল মাত্র ২টি।

উৎসঃ আামদের সময়

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত