প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

জায়গা পাচ্ছেনা দেশি সুগন্ধি চাল : নামি-দামি হোটেলে বিদেশি বাসমতি

মতিনুজ্জামান মিটু : দেশি অতি উন্নতমানের সুগন্ধি চালের পরিবর্তে নামি-দামি হোটেলে ব্যবহৃত হচ্ছে বিদেশি বাসমতি। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কৃষি তথ্য সার্ভিসের ফার্ম ব্রডকাস্টিং অফিসার মোহাম্মদ গোলাম মাওলা জানান, ধারণা ও প্রচারণার অভাবে বিরুপ এই পরিস্থিতির মুখে পড়েছে আমাদের জনপ্রিয় ও ঐতিহ্যবাহী সুগন্ধি ধানের জাতগুলো। হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের গৌরব। বিশেষ জাতের ধান থেকে সুগন্ধি চাল তৈরি হয়। বাংলাদেশের আবহাওয়া ও পরিবেশে বোরো ও আমন মৌসুমে সুগন্ধি ধান চাষ করা সম্ভব। বাংলাদেশে এলাকাভিত্তিক প্রচুর সুগন্ধি ধান আবাদের প্রচলন আছে।

বাংলাদেশের মধ্যে প্রধানত দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, নওগাঁ, পঞ্চগড়, রাজশাহী জেলায় সুগন্ধি ধান উৎপাদিত হয়। দেশে আমন মৌসুমে সুগন্ধি ধানের আবাদী আধুনিক জাতের মধ্যে ব্রি ধান৩৪, ব্রি ধান৩৭, ব্রি ধান৩৮, ব্রি ধান৭০, বিনাধান-৯ ও বিনাধান-১৩ এবং স্থানীয় জাতের মধ্যে কাটারিভোগ, কালিজিরা, চিনিগুড়া, চিনি আতপ, বাদশাভোগ, খাসকানী, বেগুনবিচি, তুলসীমালা উল্লেখযোগ্য। কাটারিভোগ ধানের আতপ চালের পোলাও জনপ্রিয়তার শীর্ষে। কাটারিভোগ ধানের চিঁড়া হয় হালকা ধবধবে সাদা ও এতে আছে মিষ্টি সুগন্ধ। আদিকাল থেকে সুগন্ধি চাল অভিজাত শ্রেণির আচার অনুষ্ঠানে স্থান পায়।

আজও দিনাজপুরের কাটারিভোগ সুগন্ধি চাল দেশি-বিদেশি অতিথি আপ্যায়নে সুনাম বজায় রেখেছে। সুগন্ধি চালের পোলাও ছাড়া পিঠা-পুলি, বিরিয়ানি, জর্দা, পায়েশ ও ফিরনি বেশ চমৎকার ও সুস্বাদু-যা জিভে জল আনে। এখনও দিনাজপুরের কৃষকরা লক্ষ্মী-নারায়ণ পূজায় এবং মসজিদে মিলাদে এই চাল ব্যবহার করে থাকে। ব্রি ধান৩৪ স্থানীয় পোলাও জাতের ধান চিনিগুড়া বা কালিজিরার মতই সুগন্ধিযুক্ত অথচ ফলন প্রায় দ্বিগুণ। কৃষকেরা এ ধানের আবাদ করে আর্থিকভাবে লাভবান হতে পারেন। তাছাড়া আলোক সংবেদনশীল হওয়ায় আমনে বন্যাপ্রবণ এলাকায় নাবীতে রোপণ উপযোগী। ব্রি ধান৭০ আমন মৌসুমে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট উদ্ভাবিত সর্বশেষ উচ্চ ফলনশীল সুগন্ধি ধান। যার ফলন কাটারিভোগ ধানের চেয়ে দ্বিগুণ। এ ধানের চাল দিনাজপুরের ঐতিহ্যবাহী কাটারিভোগের চাইতে আরো লম্বা। সুগন্ধিও ভালো, খেতেও সুস্বাদু। আর বোরো মৌসুমের একমাত্র সুগন্ধি আধুনিক জাত হচ্ছে ব্রি ধান৫০। এ জাতের জনপ্রিয় নাম বাংলামতি এবং চালের মান বাসমতির মতই। হেক্টর প্রতি ফলন ৬ মেট্রিক টন। তবে চাউল তৈরির ক্ষেত্রে বিশেষ পদ্ধতি এবং সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

ফুল আসা থেকে পরিপক্কতা পর্যন্ত যথাযথ সুগন্ধি –শস্য দানার জন্য প্রয়োজন সামান্য আর্দ্রতা, মৃদু বাতাস, শীতল রাত্রি অর্থাৎ ২০-২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা এবং রৌদ্্রজ্জ¦ল আলোকিত দিন অর্থাৎ ২৫-৩২ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা। সব ধরণের মাটিতেই সুগন্ধি ধানের চাষ করা যায় তবে দো-আঁশ ও পলি দো-আঁশ মাটি উত্তম।

বোরো মৌসুমে ডিসেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে এবং রোপা আমন মৌসুমে ১৫ জুন থেকে ১৫ জুলাই পর্যন্ত বীজতলায় বীজ বপনের উপযুক্ত সময়। বীজতলায় বীজ ফেলা থেকে শুরু করে ধান ঘরে তোলা পর্যন্ত বিভিন্ন পরিচর্যা স্বাভাবিক ধান চাষের মতই। সুগন্ধি ধানের জমিতে প্রতি বিঘা বা ৩৩ শতকে আমনে আধুনিক জাত ব্রি ধান৩৪, ব্রি ধান৭০ বা বিনাধান-১৩ এর ক্ষেত্রে ইউরিয়া ১৮-২০ কেজি, টিএসপি ১০-১২ কেজি, এমওপি ৯-১০ কেজি, জিপসাম ৮ কেজি, দস্তা ১ কেজি হারে প্রয়োগ করতে হয়। আমনে স্থানীয় জাত যেমন- কাটারিভোগ, কালিজিরা ইত্যাদি জাতের ক্ষেত্রে ইউরিয়া ১০ কেজি, টিএসপি ৬ কেজি, এমওপি ৬ কেজি, জিপসাম ৩ কেজি, দস্তা আধা কেজি হারে প্রয়োগ করতে হয়। আর বোরো মৌসুমে বাংলামতি জাতের ক্ষেত্রে ইউরিয়া ৩০-৩৫ কেজি, টিএসপি ৭-১০ কেজি, এমওপি ৯-১০ কেজি, জিপসাম ৮-১০ কেজি, দস্তা ১ কেজি হারে প্রয়োগ করতে হয়। মাটির উর্বরতাভেদে সার ও তার পরিমাণ কম বেশি হতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে জৈব সারের ব্যবহার ধানের সুগন্ধ রক্ষা করে। তাই জমিতে পর্যাপ্ত জৈব সার ব্যবহার করতে হবে।

বিজ্ঞানীদের গবেষণার ফলে সুগন্ধি চালের উৎপাদনও অনেকাংশে বেড়ে গেছে। তবে শুধু রাসায়নিক সার দিয়ে চাষ করলে আধুনিক জাতে স্থানীয় জাতের ধানের মতো সুগন্ধিযুক্ত হয় না। তাই প্রচুর জৈব সার ব্যবহারের মাধ্যমে চাষাবাদ করা হলে সুগন্ধি চাল তার নিজস্ব সুঘ্রাণ ধরে রাখতে সক্ষম হয়।

ধান পরিপক্ক হলে অর্থাৎ অধিকাংশ ধানের ছড়ায় শতকরা ৮০ ভাগ ধান পেকে গেলে ধান কাটতে হবে। ড্রামে পিটিয়ে বা পেডেল থ্রেসারে ধান মাড়াই করা যায়। মাড়াইয়ের পর ধান কয়েক বার রোদে শুকিয়ে নিতে হবে যেন আর্দ্রতা ১২ ভাগের নিচে থাকে। কাক্সিক্ষত আর্দ্রতায় শুকানো ধান দাঁতের নিচে চাঁপ দিলে কট কট শব্দ হবে। লম্বা আকারের সুগন্ধি ধান থেকে আস্ত চাল পেতে হলে রাবার রোলার মেশিন ব্যবহার করা প্রয়োজন। রোপা আমন মৌসুমে জাত ও পরিচর্যাভেদে হেক্টর প্রতি ২.০-৪.৫ টন এবং বোরো মৌসুমে ৪-৬ টন ধান উৎপাদন করা যায়।

অনেক ক্ষেত্রে এ দেশি অতি উন্নতমানের সুগন্ধি চালের জাতগুলো সম্পর্কে ধারণা ও প্রচারণার অভাব থাকায় নামি-দামি হোটেলে আমাদের জনপ্রিয় সুগন্ধি ধানের পরিবর্তে বিদেশি বাসমতি জাতের চাল ব্যবহার প্রচলন দেখা যায়। বর্তমান সরকার সুগন্ধি ধান রপ্তানিতে বিভিন্ন ধরণের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। সুগন্ধি চালের দেশীয় বাজার চাহিদা বাড়ালে কৃষকের সুগন্ধি চালের উৎপাদন ও এর ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। উচ্চ ফলন ও যথোপযুক্ত প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে সুগন্ধি চাল রপ্তানি করে আরো অধিক লাভজনক করা যেতে পারে। এতে সুগন্ধি ধানের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আসবে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত