প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ইউপি নির্বাচন : ভোটারদের বোবা কান্না

শাহাজাদা এমরান, কুমিল্লা: কুমিল্লা জেলার নাঙ্গলকোট উপজেলার আদ্রা দক্ষিণ ইউনিয়নের একটি কেন্দ্রের নাম কাকৈরতলা নুরানী মাদ্রাসা। ভুলুইন এলাকা অতিক্রম করে কাকৈরতলা নুরানী মাদ্রাসা কেন্দ্রের দিকে মোড় নিতেই দেখা গেল রাস্তার পাশে ১৫/২০ জন নারী পুরুষের জটলা। সাংবাদিক স্টিকার লেখা গাড়ি দেখেই এক সাথে সবাই চলে এল গাড়ির সামনে। এত গুলো মানুষ গাড়ির সামনে আসতে দেখে প্রথমে কিছুটা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে যাই। গাড়ি থেকে প্রথমেই আমি নেমে আসি। পরে দৈনিক কালের কন্ঠের আবদুর রহমান ও দৈনিক নয়া দিগন্তের হাবিবুর রহমান চৌধুরী নেমে আসে। জানতে চাইলাম,আপনারা কি চান ?

সবাই এক সাথে জানাল, আমরা ভোট দিতে চাই। আমাদের পুলিশের সামনে বড় বড় রামদা দেখিয়ে কেন্দ্র থেকে বের করে দিয়েছে। প্রিসাইডিং অফিসারের কাছে বিচার চেয়েও পাইনি। তিনি নিজেও নৌকা মার্কায় সিল মারার কাজে ব্যস্ত। আপনারা সাংবাদিক। আমরা সাংবাদিকদের গাড়ি এ দিক দিয়ে যায় কি না অপেক্ষা করছিলাম।

লক্ষ্য করলাম, এখানে মো. আবদুর রউফের মত ষাট বছর বয়সের বৃদ্ধ যেমন আছেন, তেমনি আছে কলেজ পড়–য়া শিবলী,নোমান, জাহাঙ্গীরের মত টকবগে তরুণরাও। হঠাৎ করে কলেজ পড়–য়া শিবলীর গলা চড়া হয়ে উঠল। চিৎকার করে বলতে লাগল, ভাই, আমি নিজে ছাত্রলীগ করি। আমরা সমর্থন দিয়েছি আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার বোরহান উদ্দিনকে। এ জন্য আমাদেরও কেন্দ্রের সামনেও যেতে দিচেছ না।

আমাদের প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, তিনি ভোটের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য সংগ্রাম করছেন। বর্তমান সিইসি বলছেন, তিনি সুষ্ঠু নির্বাচন করতে বদ্ধপরিকর। আদ্রা ইউনিয়নের অধিকাংশ কেন্দ্রই রাতের বেলায় অসংখ্য ব্যালট পেপারে সিল মারা হয়েছে। এটা কি ভোটের অধিকার রক্ষা করার নমুনা। তার কথা থামিয়ে বললাম, এবার আমাদের গাড়ির পেছনে পেছনে আসেন। এ সময় প্রায় ২০/২৫ জন ভোটার আমাদের গাড়ি অনুসরণ করে হাটতে লাগল। কিছুক্ষণ যাওয়ার পর দেখি প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ জন ১৮ থেকে ২৫ বছরের যুবকের হাতে বড় বড় রাম দা, লাঠিসহ নানা রকম দেশীয় অস্ত্র । অস্ত্র হাতে যুবকরা ধর বলতেই আমাদের গাড়ি অনুসরণকরা ভোটাররা যে যেদিকে পারছে দিয়েছে ভোঁ দৌঁড়।

আমাদের গাড়ির চালক সাঈদকে বললাম, গাড়ি থামাবে না। তুমি দ্রুত চালাও। কেন্দ্রের সামনে যাও। দীর্ঘদিন ধরে পেশাগত দায়িত্বের কারণে নির্বাচন পর্যবেক্ষন করে আসলেও আজকের (২৮ ডিসেম্বর ২০১৭) মত কোন কেন্দ্রের সামনে এত গুলো বড় বড় রামদা এক সাথে দেখিনি। ফলে প্রথমে কিছুটা যে ভীত হয়নি, তা বলা যাবে না। কেন্দ্রে গিয়ে শুনি অস্ত্র হাতে থাকা যুবকগুলো সবে মাত্র এই কেন্দ্রের বিভিন্ন বুথে অবস্থানরত অপর প্রতিদ্ধন্ধি ৪ চেয়ারম্যান প্রার্থীর এজন্টদের মেরে বের করে দিয়ে ইচেছমত নৌকায় সিল মেরেছে। স্ট্রাইকিং ফোর্স আসছে এই খবরে কয়েকটি ব্যালট ও সিল নিয়ে দৌঁড় দিয়েছে।

প্রিজাইডিং অফিসার বেলায়েত হোসেনের সামনেই বিএনপি, আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী , ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীর এজেন্টরা জানাচ্ছে, স্থানীয় নৌকার সমর্থক ফারুক, জুয়েল, খোকন মেম্বার, বাবর ও মজিল হকসহ সন্ত্রাসীরা কয়েকটি ব্যালট বই ও সিল নিয়ে গেছে। কিন্তু তিনি কোন ভুমিকা নিচ্ছে না। উপস্থিত পুলিশের দায়িত্বরত অফিসারের সাথে কথা বলে সন্তুষ্টজনক উত্তর না পেয়ে এখানে নিজেদের উপস্থিতি নিরাপদবোধ মনে না হওয়ায় দ্রুত করে চলে আসি । পরে যাই অপর কেন্দ্র ৮নং ওয়ার্ডের ভুলুইন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে। হায় আল্লাহ্ । এখানে এসে দেখি আরেক বিপদ।

খোদ স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও দলের বিদ্রোহী প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার বোরহান উদ্দিন ভুইয়া উপস্থিত সাংবাদিকদের জানালেন, ভাই, এটি আমার কেন্দ্র। আমি এবং আমার পরিবার সারাজীবন আওয়ামী লীগ করেছি। অথচ দলের অগণতান্ত্রিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রার্থী হওয়ায় আজ আমার নিজের ভোটটি পর্যন্ত তারা দিতে দিচেছ না। একই কথা বলেছে, বিএনপি প্রার্থী মো. মাইন উদ্দিন, ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের প্রার্থী নাছির উদ্দিন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ও জামায়াত নেতা সাইফুল্লাহ। বেলা ১২টার কিছু আগে এই তিন প্রার্থী সংবাদ সম্মেলন করে আনুষ্ঠানিক ভাবে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেয়।

৬নং আদ্রা দক্ষিণ ইউনিয়নের প্রতিটি কেন্দ্র ঘুরে জানা গেছে, সকালের দিকে, প্রতিটি কেন্দ্রেই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্ধিতা করা ৫জন চেয়ারম্যান প্রার্থীরই এখানে এজেন্ট ছিল। কিন্তু বেলা বাড়ার সাথে সাথে প্রতিটি কেন্দ্র থেকেই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থী নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করা মো. আবদুল ওহাবের কর্মী সমর্থকরা তাদের লাঞ্চিত করে বের করে কেন্দ্র দায়িত্বরত প্রশাসনের সহায়তায় তারা দখলে নিয়ে সিল মারার উৎসবে মেতে উঠে।

৮নং ওয়ার্ডের ভুলুইন কেন্দ্রে ধানের শীষ প্রতীকের এজেন্টের দায়িত্ব পালন করা মো. রুবেল সাংবাদিক ও উপস্থিত পুলিশ সদস্যদের সামনে প্রায়ই কেঁদেই ফেলেন। বলেন, এজেন্ট হওয়া আমার জীবনে সখ ছিল। এবারই প্রথম ভোটার হয়ে এজেন্ট হয়েছি। কিন্তু কেন্দ্রে গিয়ে বসার আধা ঘন্টার মধ্যে নৌকার লোকজন আমাদের বের করে দেয়। এই চিত্র শুধু এই ইউনিয়নেই নয়। এটা গতকাল ২৮ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত কুমিল্লা জেলার ৪টি উপজেলার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া ১৫টি ইউনিয়নেরই চিত্র।
জানা গেছে, লাকসাম উপজেলার ৩টি ইউনিয়নের অবস্থা নাকি ছিল আরো খারাপ। ভোটের আগের রাতেই ভোটের অধিকার রক্ষাকারী বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের সৈনিকেরা ব্যালট পেপারে সিল মেরে ভোট বাক্সে ভরে অত্যান্ত যোগ্যতা,দক্ষতা এবং অভিজ্ঞতার (!) সাথে ভোটের অধিকার হরণ করে রেখেছে। আর অবশিষ্ট কাজটি করেছে ভোটের দিন।

আদ্রা উত্তর ইউনিয়নের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করে এক তরুণ শিক্ষক দু:খ করে বলেন, মনে করেছিলাম, নতুন সিইসির অধীনে নির্বাচন অবাধ এবং সুষ্ঠু হবে। কিন্তু আমাদের দূর্ভাগ্য, ভোটারদের ভোট কেন্দ্র গিয়ে ভোট না দিতে পারার যে সংস্কৃতি ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি শুরু করেছিল সরকার, এবারও সেই সংস্কৃতি থেকে বের হওয়া গেল না।

গতকাল ২৮ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার লাকসাম ও নাঙ্গলকোটের বেশ কয়েকটি ইউনিয়ন ঘুরে যে অভিজ্ঞতাটি হলো, তা হলো, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্পন্ন করার ইচ্ছে প্রশাসনের রয়েছে কিনা সেই প্রশ্নটি আবারো সামনে আসছে। কারণ, আমাদের মত দেশের প্রতিটি ক্ষমতাসীন দলই চাইবে, যে কোন নির্বাচনে ক্ষমতার প্রভাব দেখাতে। কিন্তু জনগনের টাকায় পরিচালিত প্রশাসন সেই প্রভাব থেকে কতটুকু মুক্ত থাকতে পারবে তার উপরই নির্ভর করছে নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়া না হওয়া নিয়ে।

লেখাটি শেষ করতে চাই, আদ্রা দক্ষিণ ইউনিয়নের নাম নাম প্রকাশ না করা ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের ২ জন সম্মানিত ব্যক্তির বক্তব্য উল্লেখ করে। একজন গ্রাম্য মাতাব্বর টাইপের আরেকজন পেশায় ব্যবসায়ী। কেন্দ্রের পাশে দাঁড়িয়ে যখন নানা প্রসঙ্গে তাদের সাথে কথা বলতে ছিলাম তখন তারা কথা বলার এক পর্যায়ে একটি অমোঘ সত্য কথা বলে ফেললেন। আর সেই কথাটি হলো এমন, জনগণকে ভোট না দিতে দেওয়ার যে কালচার আমরা শুরু করলাম এর মাশুল হয়তো দীর্ঘদিন গুনতে হবে বঙ্গবন্ধুর সৃষ্টি প্রিয় সোনার বাংলাদেশকে। তাদের কাছে শুনলাম, ভোটের দুই দিন আগেও না-কি আওয়ামীলীগের সিদ্ধান্ত ছিল, আদ্রায় নির্বাচন সুষ্ঠু করবে। ফলে বিজয়ী যেই হোক কোন সমস্যা নেই। কিন্তু হাইব্রিড ও নব্য অতি উৎসাহী আওয়ামীলীগারদের কারণে কেন্দ্র দখলের কলংক থেকে মুক্ত করা গেল না আদ্রাকে। এজন্য তারা খুবই ব্যাথিত বলে মনে হল।

লক্ষ্য করলাম, ভোট দিতে না পারার অব্যক্ত কষ্ট শুধু যে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে রয়েছে তা নয়, এর বোবা কান্না রয়েছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের সাধারণ নেতা কর্মীদের মধ্যেও। যারা চায় স্থানীয় নির্বাচনে পছন্দসই যোগ্য প্রার্থীকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করতে। কিন্তু তাদের সেই বোবা কান্না হারিয়ে যায় তখনি, যখন তাদের দলেরই ভোট হরণকারীরা প্রকাশ্যে অস্ত্র উচিয়ে ভোট কেন্দ্র দখল করে। জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকারকে গলাটিপে হত্যা করে। আমাদের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান নিশ্চয়ই এমন বাংলাদেশ চাননি, যে বাংলাদেশে ভোট দেওয়ার জন্য ভোটারদের রাস্তায় দাঁড়িয়ে কাঁদতে হয়।

লেখক :সাধারণ সম্পাদক,বাংলাদেশ সাংবাদিক সমিতি কুমিল্লা জেলা শাখা। ০১৭১১-৩৮৮৩০৮।ংধযধলধফধধসৎধহ@ুধযড়ড়.পড়স. ২৮/১২/২০১৭

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত