প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

দ্বিতীয় শ্রেণির প্রশ্নও ফাঁস, হেরে যাচ্ছে সুন্দরতম সমাজ নির্মাণের প্রয়াস

কাকন রেজা : বিবিসি বাংলার শিরোনাম ছিল, ‘বাংলাদেশে দ্বিতীয় শ্রেণির প্রশ্নও ফাঁস : শতাধিক স্কুলের পরীক্ষা বাতিল’। কদিন আগে লেখলাম পিইসি’র কথা। বললাম প্রাথমিকেই আমাদের বাচ্চাদের সততার সমাপনী চলছে। কদিনও যেতে দিল না, বিবিসি’র শিরোনামে উঠে এলো দ্বিতীয় শ্রেণি। প্রশ্ন করতে পারেন, প্রাক প্রাথমিক ধরতে আর কত দেরি পাঞ্জেরি? গেয়ে উঠতে পারেন, ‘বেশ বেশ বেশ, সাবাশ বাংলাদেশ’।

গণমাধ্যমের ভাষ্য অনুযায়ী দুদক চেয়ারম্যান ও শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যে দুই রকমের টোন। ১৭ ডিসেম্বর দুদকের সাথে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক সভায় দুদকের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নাসির উদ্দিন আহমেদ বলেছেন, প্রশ্নফাঁসের জন্য দায়ী সরকারি কর্মচারীরা। শিক্ষা মন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ দায়ী করেছেন শিক্ষকদের। অবশ্য এমন বাহাস নতুন নয়। প্রথমে প্রশ্নফাঁসের কথায় দোষ দেওয়া হলো গণমাধ্যমকে। বলা হলো, বাড়িয়ে বলছে, আসলে প্রশ্নফাঁস হয়নি, হয়েছে প্রশ্নের মতন গড়নগাড়নের ‘সাজেশান’। প্রশ্ন দেখানোর পর বলা হলো, ভুয়া প্রশ্ন। যখন মিলিয়ে দেওয়ার পর বললেন, এগুলো পরীক্ষার পরে ফাঁস হয়েছে। পরীক্ষার পর প্রশ্নফাঁসের থাকে কী, এমন জিজ্ঞাসা কৌতুহল এবং আনন্দের খোরাক হলেও, অজুহাতটা এমনি ছিল। ক্রমাগত চলতে থাকা প্রশ্নফাঁসের বিষয়টি এমনসব অদ্ভূত অজুহাতেই ঠেকানোর চেয়ে লুকানোর চেষ্টাই হয়েছে বেশি।

কিন্তু আর কত! উপায় না দেখে প্রথমে কিছু শিক্ষার্থীকে আটকানো হলো। এরপর শিক্ষক, বিজি প্রেসের কর্মচারী, সাম্প্রতিক সময়ে সরকারি কর্মকর্তারাও জালে ধরা পড়লেন। কিন্তু ডালপালা ছাটা হলেও গোড়া পর্যন্ত যে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি তার প্রমাণ হলো সাম্প্রতিকের বাহাস। দোষারোপের বর্ণচ্ছটায় প্রমাণ হয় এতদিন যা মনে হচ্ছিল তা অনেকটাই ভুল। ‘ডাল মে কুছ কালা’ নয় ডালের পুরোটাই কালা। সাদা থাকলেও তারা সংখ্যায় লঘু, কোনঠাসা। হোক, এতক্ষণ দোষ দিলাম যারা প্রশ্নফাঁসের সাথে জড়িত তাদের। কিন্তু যারা প্রশ্নফাঁসের সুবিধাভোগী তারা কী ধোয়া তুলসী পাতা! এই যে হঠাৎ গজিয়ে ওঠা এক নব্যধনিক শ্রেণি, যাদের কাছে অর্থ ছাড়া আর কোনো কিছু অর্থহীন। এরা নিজেদের কাঁচা পয়সায় নিজ সন্তানের কাঁচা মাথা চিবিয়ে খাবার জন্য প্রশ্নফাঁসের যজ্ঞে সামিল হয়েছেন। এদের টার্গেট করেই মূলত প্রশ্নফাঁসকারীরা ফাঁসকর্মে উৎসাহিত হয়ে এটাকে রীতিমত বানিজ্যে রূপ দিয়েছে। এই কাঁচা টাকাওয়ালাদের তথা নব্যধনিক শ্রেণির প্রয়োজন শুধু সার্টিফিকেট, শিক্ষা নয়। অর্থ প্রতিপত্তি সব দিয়েও যখন তারা একজন সত্যিকার বিদ্বান মানুষের সামনে দাঁড়াতে পারেন না, কুন্ঠিত হতে হয়। সেই কুন্ঠা পূরণে তারা নামেন সার্টিফিকেট শিকারে, শুরু হয় প্রশ্নফাঁসের বানিজ্য। দ্বিতীয় কেন প্রয়োজনে তারা প্রথম শ্রেণি থেকে প্রশ্ন পেতে আগ্রাসী। এভাবেই পিইসি, জেএসসি, এসএসসি এবং এইচএসসি, তারপর বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয় অথবা অন্য অর্থে ‘বানিজ্যালয়’ তো রয়েছেই। সুতরাং শিক্ষিত হতে বাঁধা কী! সামাজিক প্রাধান্য বিস্তারের সকল দরোজা উন্মুক্ত। শুধু এরা ভুলে যায়, শিক্ষিত হওয়া মানে বিদ্বান হওয়া নয়। সকল অর্থ, প্রতিপত্তি, প্রাবল্য আর সার্টিফিকেটের বিপরীতেও বিদ্বান হওয়া যায় না, সম্ভব নয়।

আমাদের দেশের নব্যরাজনীতিবিদ আর নব্যধনিক শ্রেণির লুটেরারা আজ ‘নিও-এলিট সিনড্রমে’ আক্রান্ত। এমন‘নিও-এলিট’রা অর্থনীতিতে এগিয়ে, রাজনীতিতে প্রবল, সমাজে প্রতিপত্তিশালী। সকল নীতি-নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে অর্থ ভা-ার সমৃদ্ধ করতে হবে, রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রাবল্য ধারণ করতে হবে, সামাজিক প্রতিপত্তিতে সবার আগে থাকতে হবে, এমন চিন্তাই হলো ‘নিও-এলিট সিনড্রম’। চারিদিকে চোখ তুলে তাকান, চারিদিকে এমন সিনড্রম আক্রান্তদের দেখতে পাবেন। যারা এই সিনড্রমে আক্রান্ত নন, যাদের আক্রান্ত হবার প্রয়োজন নেই, তারা ক্রমেই পিছিয়ে যাচ্ছেন এমন অসুস্থদের বিকারগ্রস্থ প্রতিযোগিতায়। ক্রমেই হেরে যাচ্ছেন সুস্থ সমাজ নির্মানের সুন্দরতম প্রয়াসে। ক্রমেই এগিয়ে আসছে ছোটবেলায় দাদা-দাদির রূপকথার গল্পের সেই ‘স্কন্ধহীন’ ভুতের দল, যাদের মাথা নেই, শুধু শরীর আছে। যাদের চিন্তা নেই, প্রবল শারীরিক ক্ষুধা আছে। সেই অশ্লীল ক্ষুধার প্রাবল্যে ক্রমাগত বিলীন হচ্ছে সত্য ও সুন্দরের পক্ষের সকল প্রচেষ্টা ও সমূহ প্রয়াস।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট
সম্পাদনা : মোহাম্মদ আবদুল অদুদ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত