শিরোনাম
◈ সরকার সংবাদপত্রের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করে না: আইনমন্ত্রী ◈ জনগণের আস্থা অর্জন করলে ভোট পাবেন: জনপ্রতিনিধিদের প্রধানমন্ত্রী ◈ ফিলিস্তিনের বিপক্ষে অপতথ্য ছড়ানো প্রতিরোধে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে হবে: তথ্য প্রতিমন্ত্রী ◈ পিলখানা মামলার বিচারে গাফিলতি নেই: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ◈ বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির তদন্ত প্রতিবেদন পেছাল ◈ মাতৃগর্ভের সন্তানের পরিচয় প্রকাশ করা যাবে না: হাইকোর্ট  ◈ গ্রামীণ টেলিকমসহ তার প্রতিষ্ঠানগুলোর লভ্যাংশ কাউকে দেয়া যায় না: ড. ইউনূস   ◈ মুখ খুলে মানুষ গণতন্ত্রের কথা বলতে পারছে না: ড. ইউনূস  ◈ স্বাস্থ্যসেবা বিকেন্দ্রীকরণ শুরু হয়েছে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী ◈ রমজানের আগেই দাম বাড়লো চিনি, ছোলা, ডাল ও সবজির

প্রকাশিত : ৩১ অক্টোবর, ২০২৩, ০৩:০৪ দুপুর
আপডেট : ৩১ অক্টোবর, ২০২৩, ০৩:০৪ দুপুর

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

প্রসঙ্গ: মা ও শিশু স্বাস্থ্য তথ্য বই

ডা. মুশতারী মিমি: যে স্বপ্নের ভিত্তিটা শুরু হয়েছিলো আমার কিশোর বয়সে,আমার মায়ের প্রসবকালীন জীবন সংগ্রাম জেনে। তখন থেকেই আমার অঙ্গীকার ছিল আজীবন আমি মা তথা এদেশের মানবিক সুবিধা বঞ্চিত নারীদের স্বপ্ন পূরণে আমার পেশাজীবনের সমস্ত জ্ঞান,অভিজ্ঞতা ও শিক্ষাকে প্রয়োগ করবো।  আমার মা ২৮ ঘন্টা জীবন মরণের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে অবর্ননীয় প্রসববেদনা সহ্য করে আমাকে পৃথিবীতে এনেছেন। আমার বাবার জন্মের সময় যে দাই আমার দাদিকে প্রসব করিয়েছিলেন সেই একই গ্রাম্য দাই আমার মায়ের প্রসবের দায়িত্ব পেয়েছিলেন। মার প্রসববেদনা উঠবার একদিন পার হবার পরে মাথার বদলে আমার ডান হাত যখন বাইরে বের হয়ে আসে, দাই  জানায় বাচ্চার মাথা অনেক ভিতরে  আটকে আছে, বাঁচানো যাবে না। বরং প্রসবকালীন জটিলতা থেকে প্রসূতি মাকে বাঁচাতে হলে বাচ্চার হাতটা কেটে তাড়াতাড়ি মরা বাচ্চা বের করা না হলে মাকেও হয়তো আর বাঁচানো যাবে না। সেই সময়ে দাইয়ের সিদ্ধান্তের বাহিরে প্রত্যন্ত গ্রামে কিছু করার কিছু ছিল না। কিন্তু আমার বাবা এর বিপক্ষে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন আমার স্ত্রীকে আমি শহরে ভাল কোন হাসপাতালে নিবো।এরপর আমার বাচ্চা বাঁচুক, মরুক আমি সেটা মেনে নিবো। আমার বাবার ওই সঠিক সিদ্ধান্তের জোরে সেদিন আমি প্রাণ নিয়ে পৃথিবীতে জন্ম নিয়েছিলাম।সেদিক বিবেচনায় আমার মতে আমার  জন্মের দিনেই আমার বোনাস জীবন শুরু হয়েছে।সেই কারণে আমার পিতার কাছে আমি বিশেষভাবে চিরঋণী।

বাল্যকালটা গ্রামে বেড়ে উঠার সুবাদে খুব ছোটবেলা থেকে আমি ধীরে ধীরে বুঝতে পেরেছি এটা শুধু আমার মায়ের প্রসব বা আমার জন্মের সংকটকালীন  ইতিহাস নয় , আমাদের দেশের ৮০ ভাগ নারীর ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভধারনের অভিজ্ঞতা এবং ভোগান্তির ইতিহাস মোটামুটি এইরকমই। সেটা নারীর অর্থনৈতিক সামাজিক অবস্থা যাই হোক না কেনো!

আমি প্রতিজ্ঞা করেছিলাম ডাক্তার হবার পর আমার এলাকার একটা মাকেও গর্ভ সংক্রান্ত জটিলতায় পড়তে দিবো না, প্রসূতিকালীন ঝুঁকির কারণে মরতে দিবো না। ইন্টার্নশীপ চলাকালীন সময়ে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে মনে হলো আমি একা আর কয়টা মানুষের দ্বায়িত্ব নিতে পারবো! তাই আমাকে এমন কিছু করতে হবে যেনো এক সঙ্গে অনেক প্রসূতি মায়ের জীবন রক্ষায় ভূমিকা রাখা যায়। প্রায়শই মনে হতো  এমন একটা কিছু করার বা কার্যকর ভূমিকা রাখবার যাতে একজন মা এবং তার পরিবার প্রসূতি মায়ের নিরাপদ গর্ভকাল নিশ্চিত করতে পারবে এবং সুস্থ সন্তান প্রসব করাতে সহজ উদ্যোগ গ্রহন করতে পারবে! এর প্রেক্ষাপটে প্রসূতি মায়ের গর্ভধারণ এবং প্রসবের পর নবজাতকের জন্য সবিস্তারে লিখিত একটা বাস্তবসম্মত লিখিত নিদিষ্ট নির্দেশিকার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করি। এটা এমন একটা বই যেটা পড়ে সে জানবে কখন, কেনো, কোন পরিস্থিতিতে তাকে কি করতে হবে, কখন কোন সময়ে হাসপাতাল যেতেই হবে, ডাক্তার দেখাতেই হবে।

আমি তখনও জানতাম না "মা ও শিশু স্বাস্থ্য তথ্যবই" নামে এরকম একটি বই পৃথিবীর প্রায় ৫৫ টা দেশে হেলথ প্রমোশনাল বই হিসেবে মায়েদেরকে ব্যবহারের জন্য সর্বজন স্বীকৃতভাবে কার্যকর আছে। বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত এই বইয়ের কার্যকর যাত্রা প্রথম শুরু হয় জাপানে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে। এতে গর্ভকালীন, প্রসবকালীন এবং প্রসব পরবর্তী সময়ে মা ও শিশুর যত্নে অবশ্য পালনীয় নিয়মসমূহের তথ্য ও করণীয়গুলোর সচিত্র সাবলীল বর্ণনা দেয়া থাকে, যা দেখে একজন গর্ভধারিনী কিংবা তার পরিবার নিরাপদ প্রসব ও সন্তান লালন পালনের কার্যকরী প্রস্তুতি নিতে পারে। শুধু তাই নয় বইটি একটি রেকর্ড কিপিং টুল ও। জাপান গর্ভবতীদেরকে বাধ্যতামূলক এই বইয়ের তথ্য ও রেকর্ড ব্যবহারের মাধ্যমে মাতৃ মৃত্যু ও শিশু মৃত্যুর হার বহুগুন কমিয়ে এনেছে যা গোটা পৃথিবীর জন্য একটা উদাহরণ। এই অভাবনীয় সাফল্য জাপানকে শুধু স্বাস্থ্য খাতকেই টেকসই করেনি, সাথে বৃদ্ধি করেছে নারীর ক্ষমতায়ন ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি।

বাংলাদেশে মা ও শিশু স্বাস্থ্য তথ্য বই প্রচলনের স্বপ্নদ্রষ্টা  আমার শিক্ষক ও মেন্টর টরোন্টো ইউনিভার্সিটির ক্লিনিকাল পাবলিক হেলথের অধ্যাপক ড. সাফি ভূঁইয়া ২০০২ সালে জাপানের ওসাকা ইউনিভার্সিটিতে অধ্যায়নরত অবস্থায় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় রাজধানীর আজিমপুর মা ও শিশু স্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ ইনিস্টিউটে স্বাস্থ্যসেবা নিতে আসা গর্ভবতী মায়েদের জন্য প্রথম পরীক্ষামূলক ভাবে "মা ও শিশু স্বাস্থ্য বইটি" চালু করেন । স্যারের উৎসাহ এবং কারিগরি নির্দেশনায় প্রায় ২০ বছর পর পুনরায় এবছর( ২০২৩) আমার সম্পাদনায় বইটির তৃতীয় সংস্করণ প্রকাশ করতে সক্ষম হই। এই বইটি রংপুর ও জয়পুরহাট জেলায় পাইলট গবেষণা প্রজেক্ট এবং পার্বত্য বান্দরবান জেলায় বাংলাদেশ সরকারের স্মার্ট গবেষণা প্রজেক্ট হিসেবে একইসঙ্গে যাত্রা শুরু করেছে। এমসিএইচ হ্যান্ড বুকের চলমান এই শিক্ষামূলক মাঠ প্রকল্পের ডাটা থেকে বিশ্বের বিভিন্ন ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরা থিসিস করছে। আমার পোষ্ট গ্রাজুয়েশনের থিসিস ও আমি এই তথ্য বই নিয়েই করেছি।

এই বইটি লিখতে গিয়ে, প্রকাশ করতে গিয়ে শত শত ঘন্টা প্রেসে সময় দিতে হয়েছে, অসংখ্য প্রতিকূলতার মধ্যে শত শত কিলোমিটার  জার্নি করতে হয়েছে ঢাকা-রংপুর-জয়পুরহাট-চট্রগ্রাম! কত নির্ঘুম রাত্রি, বিশ্রামহীন ক্লান্তিকর দিন গিয়েছে প্রজেক্টের কাজ গুছাতে। টরোন্ট ইউনিভার্সিটিতে অধ্যয়নরত ডাক্তারদের সামনে বইটার  উপযোগিতা নিয়ে কথা বলতে পেরে নিজেকে খুব সম্মানিত বোধ হচ্ছিলো। বাংলাদেশে থাকবার সময় হ্যান্ডবুকের কাজ নিয়ে ছোটাছোটির সেই দিনগুলোর কথা খুব মনে পড়ছিলো! স্বপ্ন  দেখি বিশ্বের অন্যান্য অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও একদিন মেয়েরা গর্ভবতী হলেই তাদের হাতে এই বইটি থাকবে। তারা পড়বে , তারা  নিজেদের করণীয় জানবে! ভুল তথ্য আর কুসংস্কার, অবহেলার বলি হয়ে কোন নারী গর্ভ ও প্রসব জটিলতায় ভুগবে না। সঠিক সিদ্ধান্তের অভাবে অকালে ঝরবে না মা ও শিশুর মূল্যবান জীবন।

ইউনিভার্সিটি অফ টরেন্টোতে বাংলাদেশী চিকিৎসকের মা ও শিশু স্বাস্হ্য উন্নয়নে এমসিএইচ হ্যান্ড বুকের ব্যবহার শীর্ষক সেমিনারে উপস্থাপিত প্রবন্ধ

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়