শিশুর মন সংবেদনশীল এক জগৎ। বড়দের বলা কথা, ব্যবহার কিংবা শিক্ষকদের শাসনের ধরন সরাসরি শিশুর মানসিক গঠনে প্রভাব ফেলে।
ভয় দেখিয়ে শাসন- অনেক সময় বড়দের কাছে সহজ সমাধান মনে হলেও এর প্রভাব শিশুমনের ভেতরে দীর্ঘদিন থেকে যায়। ভয় তখন শুধু নির্দিষ্ট মুহূর্তে সীমাবদ্ধ থাকে না, ধীরে ধীরে তা শিশুর আত্মবিশ্বাস, ভাবনা ও আচরণের অংশ হয়ে ওঠে।
বাড়িতে ভয় দেখানোর প্রভাব
“বাড়ি শিশুর জন্য সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় হওয়ার কথা। কিন্তু মা–বাবা বা অভিভাবক যদি পড়াশোনা, খাওয়া, ঘুম কিংবা আচরণ নিয়ে নিয়মিত ভয় দেখান, যেমন- মারধরের ভয়, বকা বা ত্যাগ করার হুমকি, তাহলে শিশুর মনে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়”- বলেন মনোবিদ নাদিয়া নাসরিন।
এমন হতে থাকলে শিশু ভাবতে শেখে, ভুল করলেই ভালোবাসা কমে যাবে। ফলে শিশুর মধ্যে লুকিয়ে থাকার প্রবণতা, মিথ্যা বলা কিংবা নিজের অনুভূতি প্রকাশ না করার অভ্যাস গড়ে ওঠে।
অনেক শিশু ভয়ের কারণে প্রশ্ন করতে অস্বস্তি বোধ করে, নতুন কিছু চেষ্টা করতে সাহস পায় না এবং ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাস হারায়। সে বড় ধরনের ট্রমায় পড়ে যায় বলেও জানান এই বিশেষজ্ঞ।
মা–বাবার ভূমিকায় মানসিক ছাপ
মা–বাবা শিশুর জীবনের প্রথম আদর্শ। তাদের কণ্ঠের রাগ, চোখের কঠোরতা কিংবা শাস্তির ভয় শিশুর মনে গভীর ছাপ ফেলে।
নিয়মিত ভয় দেখালে শিশু মনে করে সে যথেষ্ট ভালো নয়। এতে অপরাধবোধ, উদ্বেগ এবং নিজের ওপর রাগ জন্ম নেয়।
কিছু শিশু আবার অতিরিক্ত চুপচাপ হয়ে যায়, আবার কেউ কেউ ভেতরের ভয় চাপা দিতে আক্রমণাত্মক আচরণ শুরু করে।
স্কুলে ভয়ভীতির পরিবেশ
স্কুল শিশুর দ্বিতীয় বড় জগৎ। এখানে শিক্ষক ও শাসনের ধরন শিশুর মানসিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ।
ক্লাসে ভুল করলে অপমান, শাস্তি বা ভয় দেখানো হয়, শিক্ষকের কথা শুনতে না চাইলে বা দুষ্টামির শাস্তি হিসেবে যদি ভয় দেখানো হয় তাহলে শিশু শেখার আনন্দ হারিয়ে ফেলে। শিশুর মধ্যে গভীর ট্রমা তৈরি হয়। যা ঘুমের মধ্যেও শিশুর মনকে চাপে রাখে।
“এতে শিশু হয়তো ঘুমের মধ্যেই ‘আমাকে মেরো না, আমি আর করব না’- এ ধরনের কথাও বলে উঠতে পারে”- মন্তব্য করেন নাদিয়া নাসরিন।
এমন অবস্থায় পড়াশোনা তার আগ্রহের বিষয় না হয়ে ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ফলে শিশুর মনে পরীক্ষাভীতি, ক্লাসে কথা বলতে ভয় এবং সৃজনশীলতা কমে যাওয়ার প্রবণতা দেখা দেয়।
শিক্ষকের আচরণ ও শিশুমন
শিক্ষক যখন ভয় দেখিয়ে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে চান, তখন শিশুর কাছে শিক্ষক হয়ে ওঠেন শাস্তির প্রতীক। এতে শিশুর সঙ্গে শিক্ষকের সম্পর্ক দূরত্বপূর্ণ হয়ে যায়।
অনেক শিশু নিজের দুর্বলতা লুকিয়ে রাখে, সাহায্য চাইতে সংকোচ বোধ করে। দীর্ঘমেয়াদে এতে শেখার প্রতি অনীহা তৈরি হয় এবং স্কুলকে আনন্দের জায়গা নয়, চাপের জায়গা হিসেবে দেখার অভ্যাস গড়ে ওঠে।
ভয় থেকে জন্ম নেয় যে মানসিক সমস্যা
নাদিয়া নাসরিন বলেন, “দীর্ঘদিন ভয়ভীতির মধ্যে থাকা শিশুর মধ্যে উদ্বেগ, ঘুমের সমস্যা, মনোযোগের ঘাটতি ও আচরণগত জটিলতা দেখা দিতে পারে। কিছু শিশু একা থাকতে ভয় পায়, কিছু শিশুর মধ্যে অতিরিক্ত রাগ বা কান্নার প্রবণতা তৈরি হয়।”
ভয় তখন শুধু বাইরের পরিস্থিতিতে সীমাবদ্ধ থাকে না, শিশুর ভেতরের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠে।
ভয়ের বদলে নিরাপত্তা জরুরি
শিশু সবচেয়ে ভালো শেখে তখনই, যখন সে নিজেকে নিরাপদ মনে করে। ভালোবাসা, ধৈর্য ও বোঝাপড়ার পরিবেশে শিশু ভুল থেকে শেখার সাহস পায়।
মা–বাবা ও শিক্ষক যদি ভয় দেখানোর বদলে কথা শোনেন, ভুলের কারণ বোঝান এবং ইতিবাচকভাবে দিকনির্দেশনা দেন, তাহলে শিশু আত্মবিশ্বাসী ও দায়িত্বশীল হয়ে ওঠে- পরামর্শ দেন এই মনোবিদ।
সুস্থ মানসিক বিকাশের পথে
শিশুকে শাসন করা প্রয়োজন, তবে ভয় দিয়ে নয়। বাড়ি ও স্কুল— দুই জায়গাতেই যদি শিশুকে সম্মান ও নিরাপত্তার অনুভূতি দেওয়া যায়, তাহলে সে নিজের মতো করে বড় হতে পারে।
নাসরিন বলেন, “ভয়মুক্ত পরিবেশ শিশুর মনে সাহস, কৌতূহল ও মানবিকতা গড়ে তোলে।”