আন্তর্জাতিক ডেস্ক : অপারেশন 'এপিক ফিউরি' চলাকালে ইরানে ইতোমধ্যে ৬০০০ লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড। সেন্টকমের প্রকাশ করা নতুন তথ্য অনুযায়ী, এসব হামলার মধ্যে প্রায় ৬০টি জাহাজ এবং ৩০টি মাইন বসানোর নৌযান ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস করা হয়েছে।
এ ছাড়া হামলার লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ছিল কমান্ড সেন্টার, অস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্র, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি, সাবমেরিন এবং ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। -- বিবিসি বাংলা
ইসরায়েলের সেনাবাহিনী তেহরানে নতুন করে বিমান হামলার ঘোষণা দিয়েছে এবং সেখানকার অধিবাসীদের বরাত দিয়ে বিবিসি নিউজ ফার্সি জানিয়েছে, এসব হামলা ভোর প্রায় ৫টা পর্যন্ত তীব্রভাবে চলেছে। শুক্রবার সকালে আরাকে বিমান হামলার বহু ছবি প্রচারিত হয়েছে। কারাজ থেকেও একই ধরনের খবর সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
তেহরানের বাসিন্দারা জানান, শুক্রবার সকালের বিস্ফোরণগুলো এতটাই তীব্র ছিল যে বিস্ফোরণের স্থান থেকে অনেক দূরেও কম্পন অনুভূত হয়েছে।
বিপ্লবী গার্ডের ঘনিষ্ঠ তাসনিম নিউজ এজেন্সিও শুক্রবার সকালে বিমান হামলা ও বিস্ফোরণের শব্দের খবর প্রকাশ করেছে, বিশেষ করে "দক্ষিণ তেহরানে। এদিকে, ইরানে যুদ্ধ খুব দ্রুত এগোচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
হোয়াইট হাউসের এক অনুষ্ঠানে ইরান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি "খুব দ্রুত এগোচ্ছে" এবং "খুব ভালোভাবে চলছে"।
তিনি ইরানকে "সন্ত্রাস ও ঘৃণার জাতি" বলে উল্লেখ করেন এবং ইঙ্গিত দেন যে দেশটি "এখন বড় মাশুল দিচ্ছে। ট্রাম্প বারবার বলছেন যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ ইরান অভিযান স্বল্পমেয়াদি, তবে কখন এসব অভিযান শেষ হতে পারে সে বিষয়ে তিনি কোনো নির্দিষ্ট তারিখ জানাননি।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের একটি সামরিক বিমান ইরাকের পশ্চিমাঞ্চলে বিধ্বস্ত হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। এটি একটি কেসি-১৩৫ জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান ছিল। যদিও এর কারণ ও ক্ষতির পরিমাণ জানানো হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি পরিবহনকারী বিমান ইরাকে বিধ্বস্ত
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জানায়, একটি কেসি-১৩৫ জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান বিধ্বস্ত হয়েছে। এই ঘটনায় দুইটি বিমান জড়িত ছিল, যার মধ্যে একটি নিরাপদে অবতরণ করেছে।
ঘটনাটি "শত্রুপক্ষের হামলা" বা "ভুল করে চালানো গুলির" কারণে ঘটেনি বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড।
বিমানে কতজন ছিল এবং কেউ হতাহত হয়েছে কি না, ঠিক কী কারণে বিমানটি বিধ্বস্ত হয়েছে, ঘটনাটি ঠিক কখন ঘটেছে — এসব তথ্য জানানো হয়নি।
তবে বিবিসি নিউজ ফার্সির একটি খবরে বলা হয়েছে, ইরাকে মার্কিন জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান ভূপাতিত করার দাবি করেছে ইরানে সমর্থিত ইরাকি সশস্ত্র গোষ্ঠী ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স।
রয়টার্সের বরাতে জানা গেছে, ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স এক বিবৃতিতে বলেছে, তারা ইরাকের "জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও আকাশসীমা রক্ষার" অংশ হিসেবে মার্কিন কেসি-১৩৫ বিমানে হামলা চালিয়েছে।
আবার, সেন্টকম বিমানের বিধ্বস্ত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করার কয়েক মিনিটের মধ্যেই ইরানের সরকারি সংবাদমাধ্যমগুলোও দাবি করতে শুরু করে যে বিমানটিকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড বলেছে, ঘটনাটি ইরাকের আকাশে ঘটেছে, তবে এটি প্রতিবেশী ইরান থেকে কত দূরে ছিল — তা এখনো জানা যায়নি। কেসি-১৩৫ বিমানে সাধারণত তিনজন ক্রু থাকে — একজন পাইলট, একজন সহ-পাইলট এবং একজন বুম অপারেটর।
মার্কিন বিমান বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, এয়ার মোবিলিটি কমান্ডের বহরে প্রায় ৪০০-র মতো ট্যাংকার বিমান রয়েছে। জ্বালানি সরবরাহ অভিযানের সময় শত্রুপক্ষের নজর এড়াতে এই বিমানগুলোর আলো সম্পূর্ণ বন্ধও থাকতে পারে।
একজন ফরাসি সেনা নিহত
ইরাকের ইরবিল অঞ্চলে ড্রোন হামলায় এক ফরাসি সেনা নিহত হয়েছেন এবং বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে ঘোষণা করেছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ।
তিনি আরনো ফ্রিওঁ নামে এক প্রধান ওয়ারেন্ট অফিসারকে চিহ্নিত করেছেন, যিনি গত মাসের শেষদিকে ইরানে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে নিহত প্রথম ফরাসি সৈনিক।
"তার পরিবারকে, তার সহযোদ্ধাদের প্রতি আমি জাতির পক্ষ থেকে গভীর ভালোবাসা ও সংহতি জানাতে চাই," সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন ম্যাক্রোঁ। আমাদের বেশ কয়েকজন সৈনিক আহত হয়েছে। ফ্রান্স তাদের পাশে রয়েছে এবং তাদের পরিবারের সঙ্গেও রয়েছে।
এশিয়ায় স্থিতিশীল তেলের দাম
বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে এক সপ্তাহ ধরে তেলের দামে বড় ধরনের ওঠানামার পর আজ শুক্রবার সকালে এশিয়ায় তেলের দাম মোটামুটি স্থিতিশীল অবস্থায় এসে ঠেকেছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট তেলের দাম সামান্য কমে প্রতি ব্যারেল প্রায় ১০০ ডলারে নেমেছে। আর নাইমেক্স তেলের দাম কমে প্রায় ৯৫ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
ইরান যুদ্ধের ফলশ্রুতিতে হরমুজ প্রণালীতে একের পর এক জাহাজে হামলার ঘটনায় জ্বালানি সরবরাহ বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে এবং এই অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।
তবে এখন যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, চলার পথে রাশিয়ান তেল ও জ্বালানি পণ্য কিনতে পারবে অন্য দেশগুলো। এর আগে এ ক্ষেত্রে কঠোর নিষেধাজ্ঞা ছিল।
মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট বলেন, যুদ্ধের সময় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে স্থিতিশীলতা আনতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে রাশিয়ান তেল ও জ্বালানি কেনার এই অনুমতি আগামী ১১ই এপ্রিল পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।
জাহাজে লুকানোর কোনো জায়গা নেই
বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন চেকপয়েন্ট হরমুজ প্রণালী। শুধু তেল না, বৈশ্বিক নৌবাণিজ্যের জন্য এটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি পথ।
তবে ফেব্রুয়ারির শেষদিকে ইরানে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইরান হরমুজ প্রণালী প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে। তাই অনেক জাহাজ ও জাহাজে থাকা নাবিকরা সমুদ্রে আটকে পড়েছেন।
পানিতে বসে তারা দেখছেন, স্থলভাগে ও আকাশে একের পর এক হামলার ঘটনা ঘটছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে থাকা একটি তেলবাহী জাহাজের এক পাকিস্তানি নাবিক আমির বলেন, "আমি নীচ দিয়ে উড়ে যাওয়া ইরানের ড্রোন ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র দেখেছি। যুদ্ধবিমানগুলোর শব্দও শুনি, কিন্তু সেগুলো কোন দেশের তা বুঝতে পারি না আমরা।
সম্প্রতি উপসাগরীয় অঞ্চলে একের পর এক জাহাজে হামলার খবর পাওয়া যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জবাবে ইরান হুমকি দিয়েছে, যেসব জাহাজ হরমুজ প্রণালী পার হওয়ার চেষ্টা করবে, সেগুলোকে লক্ষ্য করে গুলি চালাবে তারা।
এদিকে, গতকাল বৃহস্পতিবার ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত দেশটির নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির যে বার্তা প্রচারিত হয়েছে তাতে বলা হয়, "'হরমুজ প্রণালী অবরোধ অব্যাহত" রাখবে ইরান। তিনি আরো বলেন যে ইরানের প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে "বন্ধুত্বের" নীতি রয়েছে, তবে এই দেশগুলোকে আমেরিকান ঘাঁটি বন্ধ করার পরামর্শ দেন। তিনি বলেছেন যে এসব ঘাঁটি ইরানের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে থাকবে।
এর আগে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট আনিয়েছিলেন, হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচল করা জাহাজগুলোকে নিরাপত্তা সহায়তা দেওয়া শুরু করবে যুক্তরাষ্ট্র।