ভারতে এমন একটি নতুন পেমেন্ট ব্যবস্থা চালুর প্রস্তুতি চলছে, যেখানে ব্যবহারকারীর প্রতিবার অনুমতি নেওয়া ছাড়াই এআই এজেন্ট নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে ছোট অংকের ডিজিটাল পেমেন্ট করতে পারবে। এ জন্য জনপ্রিয় ইউনিফায়েড পেমেন্টস ইন্টারফেস বা ইউপিআইয়ের ওপর ভিত্তি করে একটি নতুন কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
তিনটি সূত্রের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, আগামী সপ্তাহে মুম্বাইয়ে অনুষ্ঠিতব্য গ্লোবাল ফিনটেক ফেস্টে এই নতুন ব্যবস্থা বা ‘ইউনিফায়েড এজেন্ট প্রটোকল’ উন্মোচন করা হতে পারে। তবে বিষয়টি এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি।
ইউপিআই পরিচালনা করে ভারতের ন্যাশনাল পেমেন্টস করপোরেশন অব ইন্ডিয়া বা এনপিসিআই। ২০২৫ সালের আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের এক প্রতিবেদনে ইউপিআইকে লেনদেনের পরিমাণের দিক থেকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় খুচরা দ্রুত পেমেন্ট ব্যবস্থা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
গত আগস্টে ইউপিআইয়ের মাধ্যমে ২৪ দশমিক ৫১ বিলিয়ন লেনদেন হয়েছে, যার মোট মূল্য ছিল প্রায় ২৯ দশমিক ৮২ ট্রিলিয়ন ভারতীয় রুপি। মাসিক লেনদেনের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ করেছে গুগল পে ও ওয়ালমার্টের ফোনপে।
কীভাবে কাজ করবে এআই পেমেন্ট?
নতুন ব্যবস্থায় ব্যবহারকারী এআই এজেন্টকে নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম দিয়ে দিতে পারবেন। যেমন, কোন ধরনের পণ্য কেনা যাবে, সর্বোচ্চ কত টাকা খরচ করা যাবে কিংবা কোন পরিস্থিতিতে পেমেন্ট করা যাবে।
এর ফলে প্রতিবার কোনো পণ্য কেনার সময় ব্যবহারকারীকে নিজে গিয়ে পেমেন্ট অনুমোদন করতে হবে না। এআই এজেন্ট আগে থেকে নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় লেনদেন সম্পন্ন করতে পারবে।
প্রাথমিকভাবে মুদি পণ্যসহ নিয়মিত ও কম মূল্যের কেনাকাটাকে এই ব্যবস্থার সম্ভাব্য ব্যবহার হিসেবে দেখা হচ্ছে। ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোও এ ধরনের সেবার শুরুতেই সুবিধা নিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ভবিষ্যতে এর ব্যবহার আরও বাড়তে পারে। নির্দিষ্ট ছাড় বা অফার দেখলে এআই এজেন্ট নিজে থেকে পণ্য কেনার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এমনকি ব্যবহারকারীর নির্ধারিত দামের সীমার মধ্যে বিনিয়োগের মতো কাজও এজেন্টের মাধ্যমে করা সম্ভব হতে পারে।
নিরাপত্তায় থাকবে খরচের সীমা
এ ধরনের স্বয়ংক্রিয় পেমেন্ট ব্যবস্থায় নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন থাকায় বেশ কিছু নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা রাখার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। ব্যবহারকারী এআই এজেন্টের জন্য নির্দিষ্ট খরচের সীমা ঠিক করে দিতে পারবেন। পাশাপাশি প্রতিটি লেনদেনের হিসাব সংরক্ষণ, পরিচয় যাচাই এবং লেনদেন পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থাও থাকার কথা রয়েছে।
নতুন কাঠামোটি ইউপিআইয়ের দুটি বিদ্যমান সুবিধা থেকে ধারণা নিতে পারে। এর একটি হলো ইউপিআই সার্কেল, যার মাধ্যমে মূল হিসাবধারী অন্য কোনো ব্যক্তি বা এআই এজেন্টকে পেমেন্টের অনুমতি দিতে পারেন। অন্যটি হলো রিজার্ভ পে, যেখানে একাধিক লেনদেনের জন্য আগে থেকেই নির্দিষ্ট অর্থ আটকে রাখা যায়।
বর্তমানে ব্যাংকগুলো রিজার্ভ পের মাধ্যমে সর্বোচ্চ ১০ হাজার ভারতীয় রুপি পর্যন্ত অর্থ ৯০ দিনের জন্য আটকে রাখার সুযোগ দেয়। তবে এআই এজেন্টের ব্যবহারের ক্ষেত্রে এই সীমা ও সময়সীমা পরিবর্তন করা হতে পারে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
বিশ্বজুড়েই বাড়ছে এআই পেমেন্টের উদ্যোগ
শুধু ভারত নয়, বিশ্বজুড়েই এআই এজেন্টের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় কেনাকাটা ও পেমেন্টের ব্যবস্থা তৈরির চেষ্টা চলছে। মাস্টারকার্ড ও ভিসার মতো আন্তর্জাতিক পেমেন্ট প্রতিষ্ঠানও ভারতে এআইভিত্তিক পেমেন্ট ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করছে।
রয়টার্স জানিয়েছে, মাস্টারকার্ড গত জুনে নয়াদিল্লিতে ভারতের প্রথম অনুমোদিত এআইভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় লেনদেন সম্পন্ন করেছে। এ ছাড়া ফিনটেক প্রতিষ্ঠান পাইন ল্যাবসও তাদের নিজস্ব ‘পি৩পি’ ব্যবস্থা চালু করেছে, যার মাধ্যমে একবার অনুমতি দেওয়ার পর এআই এজেন্ট ইউপিআই পেমেন্ট সম্পন্ন করতে পারে।
তবে ইউপিআইয়ের মতো বড় জাতীয় পেমেন্ট নেটওয়ার্কে এআই এজেন্টকে সরাসরি লেনদেনের সুযোগ দেওয়া হলে নিরাপত্তা, দায়বদ্ধতা ও ব্যবহারকারীর নিয়ন্ত্রণের বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। তাই নতুন ব্যবস্থায় এসব বিষয়ে কী ধরনের নিয়ম থাকবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।