স্পোর্টস ডেস্ক : একটা দল চারবার বিশ্বকাপ জিতেছে, আরেকটা দলের ফিফা ব়্যাঙ্কিং ৮২। একটা দলের অতীত ঐশর্য বেকেনবাওয়ার, গার্ড মুলার, লোথার ম্যাতিউস, অলিভার কান, ইয়ুর্গেন ক্লিন্সম্যানের মতো বিশ্ব ফুটবল কিংবদন্তিরা, আরেক দলের খেলোয়াড় তো দূরের কথা, দল বা দেশটার নামই লোকে এই প্রথম শুনল। এমন দুই দলের লড়াই যে ডেভিড-গোলিয়াথ মার্কা হবে, তা বুঝতে ফুটবল বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই। ফুটবলপ্রেমী বাঙালি তবু টিভির সামনে বসেছিল দুই কৌতূহলে।
এক, কত গোলে জিতবে জার্মানি? এবং দুই, ফিফা ব়্যাঙ্কিংয়ে দশ নম্বরে থাকা মুসিয়ালাদের সামনে কতটা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারবে কুরাসাও? প্রথম ছ’মিনিটে বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে যায়— জার্মানরা গোলের বন্যা বওয়াতে নেমেছে, অন্যদিকে ‘কুরাসাওয়া এগারো’ জান লড়িয়ে তা বাঁচানোর চেষ্টা চালাবে নব্বই মিনিট। শেষতক হারবে। হারলোও। ২০২৬-এ ২০১৪ সালের স্মৃতি ফিরিয়ে। শেষতক ৭-১ ফয়সালা হল ম্যাচের।
হিউস্টন স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের ‘ই’ গ্রুপের ম্যাচে প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলতে আসা কুরাসাওকে ৭-১ গোলে উড়িয়ে দিয়েছে জার্মানি। ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে ৭৩ ধাপ এগিয়ে থাকা দলের বিপক্ষে প্রথামার্ধে ফেলিক্স এনমেচা, নিকো শ্লটারবেক, কাই হাভার্টজ। এরপর দ্বিতীয়ার্ধে ব্যবধান বাড়ান জামাল মুসিয়ালা, নাথানিয়াল ব্রাউন, দেনিজ উন্দাভ ও হাভার্টজের জোড়ায়। আর কুরাসাওয়ের হয়ে ঐতিহাসিক গোলটি আসে লিভানো কোমেনেনসিয়ার নৈপুণ্যে।
ম্যাচের সব পরিসংখ্যানই বার্তা দিচ্ছে দুই দলের ফারাক। ৬৫ শতাংশ বল দখলে রেখে ২৬টি শট নিয়ে ১২টি লক্ষ্যে রেখেছে জুলিয়ান নাগেলসম্যানের জার্মানি। যেখানে ৮টি শট নিয়ে দুটি লক্ষ্যে রাখে কুরাসাও।
ম্যাচের শুরু থেকেই আগ্রাসী ফুটবলে জার্মানি বুঝিয়ে দিয়েছিল, বড় জয়েই চোখ তাদের। ষষ্ঠ মিনিটেই তার সুফল পায় চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। ফ্লোরিয়ান ভির্টজের বাড়ানো বল থেকে দুর্দান্ত এক শটে জালের দেখা পান ফেলিক্স এনমেচা। এর আগে মুসিয়ালা শট নিলেও কুরাসাও গোলকিপারের কল্যাণে বেঁচে যায় বিশ্বকাপের সবচেয়ে ছোটো দলটি, কিন্তু এনমেচার নিখুঁত ফিনিশিংয়ে আর রক্ষা হয়নি। এই গোলের মাধ্যমে একটি ব্যক্তিগত রেকর্ডও গড়েছেন এনমেচা; বিশ্বকাপের অভিষেকে গোল করার তালিকায় নিজেকে নাম লেখালেন তিনি।
গোলের পর যেন আক্রমণের ধার আরও বাড়িয়ে দেয় জার্মানরা। জার্মানির শক্তিশালী আক্রমণের ঢেউ সামলাতে কুরাসাও তখন রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে। তবে দেড় লাখ মানুষের এই ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্রটি লড়াই জমানোর চেষ্টা করে সফল হয় ২১ মিনিটে। রূপকথার গল্পের শুরুটা যেন তখনই হলো! চমৎকার এক আক্রমণ থেকে বল পেয়ে যান লিভানো কোমেনেনসিয়া। তার বাঁ-পায়ের জোরালো শট জশুয়া কিমিচের গায়ে লেগে দিক পরিবর্তন করে পরাস্ত করল ম্যানুয়েল নয়্যারকে। বিশ্বকাপে নিজেদের ইতিহাসের প্রথম গোলটি পাওয়ার আনন্দ—যে মুহূর্ত হিউস্টনের গ্যালারিতে ‘নীল ঢেউ’য়ের গর্জন তুলে দিয়েছিল।
গোল হজমের পর কিছুটা ছন্দ হারিয়েছিল জার্মানি। তবে ৩৮ মিনিটে আবারও নিজেদের শক্তিমত্তা ফিরে পায় তারা। ব্রাউনের নেওয়া কর্নার থেকে আনমার্কড অবস্থায় থাকা শ্লটারবেকের হেড সরাসরি জড়ায় জালে। আবারও লিড নেয় জার্মানি।
প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ের তৃতীয় মিনিটে ব্যবধান বাড়ায় জার্মানরা। ডি-বক্সের ভেতর এনমেচাকে ফাউল করলে রেফারি পেনাল্টির বাঁশি বাজান। স্পট কিক থেকে নিখুঁতভাবে গোল করে জার্মানিকে ৩-১ গোলের স্বস্তিদায়ক লিড এনে দেন কাই হাভার্টজ।
বিরতির পর সেই চেনা জার্মানিকেই দেখা গেল। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই মুসিয়ালা ব্যবধান বাড়ান, এরপর একে একে লক্ষ্যভেদ করেন ব্রাউন ও উনদাভ। ম্যাচের শেষ দিকে হাভার্টজের দারুণ এক চিপে পূর্ণ হয় গোল উৎসব।