ফাহিম আশরাফের বলে তখন মাত্রই শূন্য রানে আউট হয়েছেন আব্দুল্লাহ আল মামুন। নতুন ব্যাটসম্যান সাইফ হাসান প্রথম বলেই ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে ব্যাট চালিয়ে দিলেন চাবুকের মতো। এক্সট্রা কাভারের ওপর দিয়ে বল ছাড়িয়ে গেল সীমানা। শট দেখে মনে হবে, আত্মবিশ্বাসে টইটম্বুর কোনো ব্যাটসম্যান বুঝি!
বাস্তবতা পুরো উল্টো। সাইফের ওই শট ছিল আসলে আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ার চেষ্টা। ব্যর্থতার বলয় ছিড়ে বেরিয়ে আসার চেষ্টা। ছন্দে ফেরার মরিয়া প্রচেষ্টা।
লাভ কিছু হয়নি। একটি পরেই তিনি বোল্ড হলে গেছেন নাহিদ রানার গতিময় এক ডেলিভারিতে।
বিপিএলে শনিবার নাহিদের ডেলিভারিটি অসাধারণ ছিল। প্রায় দেড়শ কিলোমিটার ছোঁয়া ডেলিভারিটিতে সেরা ফর্মের যে কোনো ব্যাটসম্যানও আউট হতে পারতেন। তবে সাইফকে আউট করতে এখন এমন অসাধারণ ডেলিভারি কিছু লাগছে না। সাধারণ ডেলিভারিতেও আউট হচ্ছেন নিয়মিত। সাম্প্রতিক সময়ে ব্যর্থতাই তার নিত্য সঙ্গী।
ঢাকা ক্যাপিটালসের হয়ে এ দিন রংপুর রাইডার্সের বিপক্ষে ১২ রান করে আউট সাইফ। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, এবারের বিপিএলে আট ইনিংস ব্যাট করে তার তৃতীয় সর্বোচ্চ ইনিংস এটি।
এবার তার সেরা ইনিংসটি ২২ রানের।
জাতীয় দলের হয়ে গত এশিয়া কাপে ও এর পরপরই আফগানিস্তানের বিপক্ষে সিরিজে পারফরম্যান্সে টি-টোয়েন্টি বাংলাদেশের নতুন আশার আলো হয়ে উঠেছিলেন তিনি। জাতীয় দলে এই সংস্করণের সহ-অধিনায়ক করা হয় তাকে। বিপিএলে নিলামের আগেই তাকে সরাসরি চুক্তিতে দলে নেয় ঢাকা ক্যাপিটালস।
সেই ক্যাপিটালসের বিদায় নিশ্চিত হয়ে গেল রংপুরের কাছে শনিবারের ম্যাচটি হেরে। সাইফের পারফরম্যান্স ৮ ইনিংসে ৬০ রান। ব্যাটিং গড় ৭.৫০, স্ট্রাইক রেট ৮৩.৩৩।
তিনি বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টি সহ-অধিনায়ক। কিন্তু সবশেষ ১৪ টি-টোয়েন্টিতে তার ফিফটি নেই।
গত এশিয়া কাপে দুটি আর আফগানদের বিপক্ষে সিরিজে একটি ফিফটি করার পর গত ১৮ নভেম্বর তাকে বাংলাদেশ টি-টোয়েন্টি দলের সহ-অধিনায়ক করা হয় তাকে। এত দ্রুতই তাকে এমন দায়িত্ব দেওয়ায় কিছু প্রশ্ন আর বিস্ময়ের জন্ম হয়েছিল। সময়ের সঙ্গে তা কেবল বেড়েছেই।
সহ-অধিনায়ক হওয়ার পর বাংলাদেশের হয়ে তিনটি আর বিপিএলে আটটি ইনিংস তিনি খেললেন। এই ১১ ইনিংস খেলে ব্যাটিং গড় ৯.৭২, স্ট্রাইক রেট ৯২.২৪।
সহ-অধিনায়ক হওয়ার ‘বিশাল চাপ’ তাকে কাবু করে ফেলেছে, এরকম কোনো ব্যাপার নিশ্চয়ই নেই। তবে ব্যাটিংয়ে নিজের কাজটুকু তিনি করতে পারছেন না নিশ্চিতভাবেই। সাইফের ব্যাটিংয়ে টেকনিক্যাল কিছু ঘাটতির জায়গা বয়সভিত্তিক ক্রিকেট থেকেই ছিল। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এসে সেজন্য ধুঁকেছেন। ঘরোয়া ক্রিকেটে ফিরেছেন। মাস পাঁচেক আগে জাতীয় দলে ফেরার পর তার ব্যাটিংয়ে কিছু উন্নতির ছাপ দেখা গেছে।
টেকনিকের কিছু মৌলিক জায়গায় ঘাটতি তখনও ছিল। তার পরও সেটুকু সামাল দিয়ে কিছু ম্যাচে তিনি পারফর্ম করেন। নিজেকে নতুন করে চেনানোর ইঙ্গিত দেন। কিন্তু সেই সময়টা দীর্ঘ হয়নি বেশি। শুরু হয়ে যায় রান খরা। তার পায়ের কাজ, তার মাথার অবস্থানের সেই পুরোনো দুর্বলতা প্রকাশ্য হতে থাকে আবার।
টানা ব্যর্থতায় বিপিএলের একটি ম্যাচে তাকে একাদশের বাইরে রাখে ঢাকা ক্যাপিটালস। অধিনায়ক মোহাম্মাদ মিঠুন তখন বলেছিলেন, বাদ নয়, বরং সাইফকে বিশ্রাম দেওয়া হয়েছে যেন মানসিকভাবে চনমনে হয়ে ফিরতে পারেন। কিন্তু লাভ হয়নি।
পরে আরেক দফায় সাইফকে নিয়ে প্রশ্নে মিঠুন বলেছিলেন, “ওকে পারফর্ম করানোর সবসময় চেষ্টাই আমরা করে যাচ্ছি। এজন্যই একটি ম্যাচে ওকে বিরতি দেওয়া হয়েছে, যাতে মানসিকভাবে ফ্রি হতে পারে। যেহেতু সামনে বিশ্বকাপ আছে, বাংলাদেশ দলের জন্যও আমরা চাই সাইফ রানে ফিরুক। যতভাবে সম্ভব আমরা ওকে সাপোর্ট করছি। আশা করি, রানে ফিরবে ও।”
সেই আশায় থেকে টুর্নামেন্টই প্রায় শেষ হতে চলল।
টবি র্যাডফোর্ডের বিদায়ের পর ঢাকা ক্যাপিটালসের প্রধান কোচের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন গোলাম মোর্তজা। বিসিবির এই কোচের কণ্ঠে সাইফকে নিয়ে হতাশাই ঝরল। পাশাপাশি আশাবাদও জানিয়ে রাখলেন তিনি।
“আমাদের অনুশীলন যখন হচ্ছে, তার শট কোয়ালিটি থেকে শুরু করে সবকিছু কিন্তু শতভাগ ভালো হচ্ছে। কালকেও যখন আমরা নেট করেছি, সবচেয়ে ভালো ব্যাট করেছে সাইফ হাসান। গত কয়েকটা সিরিজেও সে বাংলাদেশের হয়ে ভালো ক্রিকেট খেলেছে। কিন্তু এই টুর্নামেন্টে সফল হতে পারেনি।”
“সাইফ আমাদের দেশের একটা সম্পদ। আমাদের দলও ওকে এটা ভেবেই নিয়েছিল যে পারফর্ম করবে। কিন্তু ও করতে পারেনি আর কী। দোয়া করি, বিশ্বকাপে যেন ভালো ক্রিকেট খেলে।”
অধিনায়ক মিঠুনের মতো কোচও বললেন, তাদের দিক থেকে চেষ্টার কমতি নেই সাইফকে জাগিয়ে তুলতে।
“আমাদের দলের পক্ষ থেকে যথেষ্ট চেষ্টা করেছি যেন ঘুরে দাঁড়াতে পারে। আমাদের দলের যে অবস্থা ছিল, দল হয়তো প্লে-অফে না যাওয়ারই কথা, তবু আমরা চাচ্ছিলাম সাইফ রান করে বিশ্বকাপের আগে কিছু করুক। এটাই চেষ্টা করে যাচ্ছি। টানা আত্মবিশ্বাস দিয়ে যাচ্ছি ওকে।”
বিপিএলে ভালো কিছু করার আর একটি সুযোগই পাবেন সাইফ। টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিশ্চিত হওয়া ঢাকা ক্যাপিটালস শেষ ম্যাচটি খেলবে রোববার সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম রয়্যালসের বিপক্ষে।
সূত্র: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম