২০২৪ সালের ৫ আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে পতন হয় শেখ হাসিনা সরকারের। এরপর এটিই প্রথম জাতীয় নির্বাচন। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। যার ফলে জনসাধারণের কাছে এই নির্বাচন অন্যতম গুরুত্ব বহন করছে।
যদিও শেখ হাসিনার দল কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না। তবু দলটির সমর্থকরাই শেষ পর্যন্ত এই নির্বাচনে বিজয়ী নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।
ভোটের আর এক মাসেরও কম সময় বাকি থাকতে জনমত জরিপগুলো বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর জয়ের পূর্বাভাস দিচ্ছে। কিছু জরিপে বিএনপির বিপুল ব্যবধানে জয়ের ইঙ্গিত মিলেছে। একটি জরিপে দেখা গেছে, ৭০ শতাংশ উত্তরদাতা বিএনপিকে ভোট দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন। আর জামায়াতে ইসলামী অনেক পিছিয়ে ১৯ শতাংশে রয়েছে। আবার অন্য কিছু জরিপ বলছে, লড়াই বেশ হাড্ডাহাড্ডি হতে পারে এবং বিএনপি মাত্র কয়েক শতাংশ ভোটে এগিয়ে থাকবে।
আসন্ন নির্বাচন মূলত দুই শক্তির লড়াই। তারা হলো বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট বনাম জামায়াত নেতৃত্বাধীন ইসলামপন্থি জোট।
বিএনপি ও জামায়াত একসময় রাজনৈতিক মিত্র ছিল এবং এক সঙ্গে নির্বাচনেও অংশ নিয়েছে। ২০০১-২০০৬ সালের বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারে জামায়াতের নেতারা মন্ত্রিসভাতেও ছিলেন। শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের প্রতি অভিন্ন বৈরিতাই বিএনপি ও জামায়াতকে কয়েক দশক ধরে একসঙ্গে রেখেছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ গণঅভ্যুত্থানের মুখে রাজনৈতিক ময়দান থেকে পালিয়ে যাওয়ার পর সেই ‘আঁঠা’ আর নেই। গত এক বছরে সংবিধান সংস্কার, নির্বাচন আয়োজনের সময়সহ নানা ইস্যুতে দুই দলের মতবিরোধ প্রকাশ্যে চলে এসেছে।
নির্বাচন ঘনিয়ে আসা এবং ক্ষমতার লড়াই তীব্র হওয়ায় তাদের পথ আলাদা হয়ে যাওয়া ছিল প্রায় অনিবার্য। নির্বাচনে সংসদের ৩০০ আসনই দখলের লড়াই হবে। শুরু থেকেই বিএনপি এগিয়ে থাকা দল। কয়েক দশক ধরে তাদের সমর্থনের হার ৩০-৪০ শতাংশের মধ্যেই ঘোরাফেরা করছে।
জামায়াত দীর্ঘদিন উল্লেখযোগ্য নির্বাচনি সাফল্য না পেলেও এবার সেই চিত্র বদলাতে পারে। সাম্প্রতিক বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে জামায়াত ভালো ফল করেছে। তরুণদের মধ্যে তাদের সমর্থন কিছুটা বাড়ছে বলে মনে হচ্ছে। আওয়ামী লীগ দল হিসেবে নির্বাচন করতে না পারলেও তাদের কিছু নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। দশকের পর দশক ধরে আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংকও ৩০-৪০ শতাংশের মধ্যে ছিল; পতনের পর তা কমলেও এখনো উল্লেখযোগ্য।
তবে ছাত্র আন্দোলন থেকে উঠে আসা এনসিপির ধর্মনিরপেক্ষ অংশ ভেঙে যাওয়ায় তরুণ প্রগতিশীল ভোটার টানার আশা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
আওয়ামী লীগ সমর্থকরা বিএনপি না জামায়াত- কাকে বেছে নেবেন, তা নির্ভর করবে তারা অতীত ভুলতে পারবেন কি না- তার ওপর।
আওয়ামী লীগ সমর্থকরা ভাববেন- ভবিষ্যতের জন্য কোন দল তুলনামূলক ভালো বিকল্প। বিএনপির ‘নতুন দৃষ্টি’ হয়তো তাদের কাছে তুলনামূলক গ্রহণযোগ্য মনে হতে পারে। কিন্তু ভোটের দিন আওয়ামী সমর্থকরা সেই পুরোনো বৈরিতা ভুলে যেতে পারবে কি না- সেটাই দেখার বিষয়।
দীর্ঘদিন ধরে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ একে অন্যের সরকারকে অচল করেছে, রাজপথে রক্তক্ষয়ী সংঘাত করেছে। আজ সেই আওয়ামী লীগ সমর্থকরাই বিএনপির নির্বাচনি ভাগ্য বদলে দিতে পারেন। ভোটের দিনে তারা কি দলটিকে জয়ের সীমানা পার করিয়ে দেবেন- সেটা নির্বাচনের ফলই বলে দেবে।
দ্য ডিপ্লোম্যাট-এর দক্ষিণ এশিয়া সম্পাদক সুধা রামচন্দ্রনের লেখা থেকে আংশিক অনুদিত। সূত্র: যুগান্তর