ইসলামী আন্দোলনের প্রেসিডিয়াম সদস্য অধ্যাপক আশরাফ আলী আকন আসন সমঝোতার ব্যাপারে এখনো আশাবাদী। আসন সমঝোতার জন্য গঠিত লিয়াজোঁ কমিটির অন্যতম সদস্য আশরাফ আলী বলেন, আসন সমঝোতার আলোচনা চলমান। কিছু টানাপড়েন থাকলেও সেটা তেমন জটিল নয়। দু’একদিনের মধ্যেই আশাকরি আসন বণ্টন চূড়ান্ত হয়ে যাবে। সূত্র: মানবজমিন প্রতিবেদন
কিছুতেই সমমনাদের মন রক্ষা করতে পারছে না জামায়াতে ইসলামী। গত এক মাসে দফায় দফায় বৈঠক। দলের তরফে সর্বোচ্চ ছাড় দিয়েও চূড়ান্ত করতে পারেনি জোটের আসন সমঝোতা। আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে এমন গলদঘর্ম পরিস্থিতির মুখে পড়েছে দলটি। ইসলামী সমমনা দলগুলোর ভোট একবাক্সে নিতে দীর্ঘদিন ধরে একসঙ্গে কাজ করছে জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস সহ সমমনা আট দল। অতিসম্প্রতি যুক্ত হয়েছে এনসিপি, এলডিপি ও এবি পার্টি। তবে নির্বাচনের চূড়ান্ত প্রস্তুতির আগে আসন ভাগাভাগি নিয়ে ১১ দলীয় এই জোটে তৈরি হয়েছে নানামুখী টানাপড়েন। জন্ম নিয়েছে পারস্পরিক মান-অভিমান। এতে শেষ পর্যন্ত এই আসন সমঝোতা হবে কিনা, তা নিয়ে সংশয়ও আছে।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন আহমেদ বলেন, আমি এটাকে সংকট মনে করি না। আসন ভাগাভাগি হলে প্রত্যেক দলকে তাদের অবস্থান অনুযায়ী ন্যায্য অংশ পেতে হবে। তা হলে কোনো সংকট বা জটিলতা থাকবে না। জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, এখানে কোনো সংকট নেই। বিভিন্ন দল ভিন্ন ভিন্ন সময়ে জোটে যোগ দেয়ায় প্রক্রিয়াটি একটু সময় নিচ্ছে।
এদিকে সমঝোতা চূড়ান্ত না হওয়ায় জামায়াত ২৭৬ এবং ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীরা ২৭২টি আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। এনসিপি’র মনোনয়ন জমা দিয়েছেন ৪৭ জন প্রার্থী। অন্যদিকে এবি পার্টি ৭০টি, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন ১০টি, জাগপা ৩টি এবং বিডিপি ২টি আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছে। খেলাফত মজলিসের ৬৭ জন এবং বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির ১১ জন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন বলে জানা গেছে। মনোনয়নপত্র জমা দেয়া বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের ২৮ জন প্রার্থীর তালিকা পাওয়া গেছে।
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, ইসলামী আন্দোলনকে ৪০টি, এনসিপিকে ৩০টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসকে ১১টি, খেলাফত মজলিসকে ৩টি, এবি পার্টিকে ৩টি, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টিকে (এলডিপি) ২টি, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টিকে (বিডিপি) ২টি আসনে ছাড় দিতে চায় জামায়াত।
সূত্র বলছে, ইসলামী আন্দোলন শুরুতে ১৫০টি আসন চেয়েছিল। সেখান থেকে তারা ১২০টিতে নামে। পরে দাবিকৃত আসনসংখ্যা আরও কমাতে রাজি হয় তারা। তবে ৪০টি আসন নিয়ে তারা সন্তুষ্ট নয়। মূলত ইসলামী আন্দোলনের মধ্যেই আসন বণ্টন নিয়ে অসন্তোষ বেশি।
জোটের নেতাকর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, জামায়াত নিজের জন্য ১৮০ থেকে ১৮৫টি আসন রাখতে চায়। বাকি আসনগুলো জোটের শরিকদের মধ্যে বণ্টনের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। এই হিসাবে জামায়াতের পর সবচেয়ে বেশি আসন পাওয়ার কথা ইসলামী আন্দোলনের, এরপর জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি)। তবে চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন এই প্রস্তাবে সন্তুষ্ট নয়। বিশেষ করে সম্প্রতি জোটে আসা এনসিপিকে ৩০টি আসন দেয়ার সিদ্ধান্তে তারা ক্ষুব্ধ। তাদের মতে, এনসিপিকে অযথা অতিরিক্ত গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।
শুরুতে জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনসহ মোট আটটি দল আসন ভাগাভাগির আলোচনায় ছিল। তবে মনোনয়নপত্র জমার শেষ তারিখের একদিন আগে ২৮শে ডিসেম্বর, এনসিপি এবং অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল অলি আহমদের নেতৃত্বাধীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) জোটে যোগ দেয়। ওই রাতেই আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) যুক্ত হওয়ার খবর আসে। এতে জোটের শরিক দলের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১১টিতে।
ইসলামী আন্দোলন ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের শীর্ষ নেতারা জানান, এনসিপি, এলডিপি ও এবি পার্টিকে জোটে অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে তাদের মতামত যথাযথভাবে গুরুত্ব পায়নি। তাদের অভিযোগ, জামায়াতের একতরফা সিদ্ধান্ত গ্রহণই বর্তমান অসন্তোষের অন্যতম কারণ।
এ ছাড়া বরিশালের একটি আসনে জামায়াতের প্রার্থী দেয়ার কারণেও মনঃক্ষুণ্ন হয় ইসলামী আন্দোলন। তবে আসন সমঝোতার পর ওই আসনের জামায়াত প্রার্থী সরে দাঁড়াবেন বলে জনশ্রুতি আছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২৮শে ডিসেম্বর ১১ শরিক দলের মধ্যে সর্বশেষ দফার আলোচনা হয়। ওইদিন জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমান জানান, এনসিপি ও এলডিপি একযোগে আন্দোলনের অংশ হিসেবে জোটে যুক্ত হয়েছে। পরে এবি পার্টির যুক্ত হওয়ার খবর আসে।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য ও জামায়াতে ইসলামী আন্দোলন সূত্রে জানা গেছে, যে আসনগুলো ইসলামী আন্দোলনের জন্য ছেড়ে দেয়ার কথা ছিল, সেখানেও দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে জামায়াত প্রার্থীরা মনোনয়ন জমা দিয়েছেন। একইভাবে, হাতপাখা প্রতীকে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীরাও জামায়াতের জন্য নির্ধারিত আসনগুলোতে মনোনয়ন দিয়েছেন।
জামায়াত যে ২৪টি আসনে প্রার্থী দেয়নি, তার বেশির ভাগই নাকি এনসিপি’র জন্য ছেড়ে দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া জামায়াত ঢাকা-১৩ আসনে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর মামুনুল হক এবং কিশোরগঞ্জ-৬ আসনে দলটির যুগ্ম মহাসচিব আতাউল্লাহ আমীনের জন্য প্রার্থী প্রত্যাহার করেছে।
অন্যদিকে, ইসলামী আন্দোলনও যেসব আসন তাদের জন্য বরাদ্দ ছিল, সেখানে প্রার্থী রেখেছে। চরমোনাই পীরের ভাই ও দলের সিনিয়র নায়েবে আমীর সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম বরিশাল-৫ ও বরিশাল-৬ আসনে মনোনয়ন দিয়েছেন, যেখানে জামায়াতের প্রার্থীরাও আছেন।
এ ছাড়া বরিশাল-৪ থেকে সৈয়দ ইসহাক মুহাম্মদ আবুল খায়ের এবং ঢাকা-৪ থেকে মোসাদ্দেক বিল্লাহ আল-মাদানীও মনোনয়ন জমা দিয়েছেন। এই তিনটির মধ্যে দুটি আসন জামায়াত ছেড়ে দেয়ার কথা থাকলেও তারা সবগুলোতেই প্রার্থী দিয়েছে। দলীয় সূত্র জানায়, শুরুতে ইসলামী আন্দোলন ১৫০টি আসন দাবি করেছিল। পরে তা কমিয়ে ১২০-এ আনা হয়। বর্তমানে দলটি ৭০টির বেশি আসন চাইছে বলে জানা যায়।