একদল ব্যস্ত রাজনীতিসহ নির্বাচন নিয়ে। তাদের ভাবনার গোটা জগৎ রাজনীতিতে। অর্থনীতিতে হাহাকার। নাই-নাই রব। এর ফাঁকেই দেশে টাকা ঢুকছে সমানে। পাচারও হয়ে যাচ্ছে প্রচুর টাকা।
গরিব আরও গরিব হচ্ছে। ধনাঢ্য-বনেদি ব্যবসায়ীদের টেনে আনতে ছিঁড়ে যায় দশা। ব্যবসা টিকিয়ে রাখা দূরে থাক, কারও কারও অফিস চালানোই অসম্ভব হয়ে উঠেছে। এর মাঝে রহস্যজনকভাবে নতুন নতুন কোটিপতি গজিয়ে গেছে। পুরো বিষয়টিই রহস্যঘেরা। অর্থনীতির কোনো রীতিনীতি ব্যাকরণের সঙ্গে মিলছে না। সবই উল্টাপাল্টা।
দেশে দৃশ্যমানে বা তথ্য-প্রমাণে টাকা আসে রেমিট্যান্সের মাধ্যমে। আগের সব রেকর্ড ভেঙে ২০২৫ সালে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। ডলারের অবৈধ বাজার সংকুচিত হয়ে পড়ায় প্রবাসীরা কষ্টার্জিত অর্থ বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে পাঠানোর কারণে রেমিট্যান্সের হিসাব রাখা সম্ভব হচ্ছে। প্রথমবারের মতো একক বছরে ব্যাংকিং চ্যানেলে আসা রেমিট্যান্সের পরিমাণ ৩২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। এর আগে কোনো বছরই ৩০ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেনি। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বলছে, সদ্য বিদায়ী বছরে প্রবাসীরা মোট ৩২ দশমিক ৮২ বিলিয়ন বা ৩ হাজার ২৮২ কোটি ডলার সমপরিমাণ অর্থ দেশে পাঠিয়েছেন। ২০২৪ সালে এসেছিল ২ হাজার ৬৮৯ কোটি ডলার। সে হিসাবে এক বছরে রেমিট্যান্স বেড়েছে ৫৯৩ কোটি ডলার বা ২২ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর গত বছরের শেষ পাঁচ মাসে উচ্চ রেমিট্যান্স-প্রবাহের কারণে ২০২৪ সালেও বড় প্রবৃদ্ধি ছিল। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরাতে এ রেমিট্যান্সই ভরসা। এর বিপরীতে অদৃশ্য টাকার বেদম খেলা নির্বাচনের মাঠে। সমানে টাকা ছিটাচ্ছেন কথিত দুর্বল প্রার্থীরাও। তাদের দাখিলকৃত হলফনামায় দেওয়া সম্পদের বিবরণের সঙ্গে তা মিলছে না মোটেই। বিএনপি, জামায়াত, স্বতন্ত্র মিলিয়ে কিছু প্রার্থী নিজেদের কোটিপতি স্বীকার করলেও তাদের খরচপাতিতে আরও বেশি কিছুর নমুনা।
গত বছর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা মোটেও ভালো ছিল না। দারিদ্র্যের হারে ঊর্ধ্বগতি, নতুন কর্মসংস্থানের স্থবিরতা ও আয়বৈষম্যের ফলে দারিদ্র্যের হার বেড়েছে। দারিদ্র্যের হার বেড়ে ২৭ দশমিক ৯৩ শতাংশে পৌঁছে গেছে। বড় বড় ব্যবসায়ীরা বোবা কান্নায় ব্যস্ত। সুদের উচ্চহার, বিনিয়োগ স্থবিরতা, ভোক্তার চাহিদায় ধস, বেকারত্ব বৃদ্ধি, কাঁচামাল আমদানি কম, জ্বালানি সংকট শুধু ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগকে খাদে ফেলেনি, গোটা অর্থনীতিকেই খাদে ফেলেছে। এতে কোনোভাবে দম নিয়ে টিকে থাকাকেই প্রধান কাজ হিসেবে বেছে নিয়েছেন ব্যবসায়ী-বিনিয়োগকারীরা। আর অপেক্ষা করেছেন স্থিতিশীলতার। নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার ছাড়া রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক, সামাজিক স্থিতিশীলতা আসবে না, তা ধরে নিয়েই টিকে আছেন। আগামী মাসে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর একটি নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নিলে এই গুমট ভাব কাটবে বলে আশায় বুক বেঁধেছেন। এই টিকে থাকার পথেও গত এক বছরে ব্যবসা পরিচালনার খরচ বেড়েছে প্রায় ৩৫ শতাংশ। কিন্তু সেই অনুপাতে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়েনি। এতে পণ্যের বিক্রি কমেছে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ।
রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও জ্বালানির সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতির বাইরেও বেসরকারি খাতে নানা কাঠামোগত সমস্যায় জর্জরিত ব্যবসায়ীদের এখনকার ১ নম্বর প্রত্যাশা ও আগ্রহ একটি সুষ্ঠু-অবাধ নির্বাচনের। একটি নির্বাচনের অপেক্ষা ও অর্থনীতির এই বেহাল অবস্থার মধ্যেও অবিশ্বাস্যভাবে ফুলে-ফেঁপে ওঠা টাকাওয়ালা গজিয়েছে প্রচুর। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবেই এমন কঠিন সময়েও দেশে নতুন আরও ৯ হাজার কোটিপতি আমানতকারী সৃষ্টি হয়েছে। এক বছরে কোটিপতিদের অ্যাকাউন্টে ৫৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকার বেশি নতুন অর্থ জমা হয়েছে। যেখানে মধ্যবিত্তের সঞ্চয় ভাঙছে, নিম্নবিত্ত ঋণে ডুবছে, প্রতিষ্ঠিত বনেদি ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগ কমাচ্ছেন; সেখানে এত বিপুল টাকা জমালেন কারা? এ প্রশ্নের কিনারা মিলছে না। অর্থনীতির কোনো সংজ্ঞা-ব্যাকরণেও তা মিলছে না। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে দেশে কোটিপতি আমানতকারী ছিল মাত্র পাঁচটি। সময়ের সঙ্গে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়তে থাকায় এই সংখ্যা দ্রুত বাড়ে। ১৯৯০ সালে ছিল ৯৪৩টি, ২০০৮ সালে ১৯ হাজার ১৬৩টি। এরপর ২০২০ সালে ৯৩ হাজার ৮৯০টি এবং ২০২৪ সালে তা দাঁড়ায় ১ লাখ ২২ হাজার ৮১টিতে। সর্বশেষ সেপ্টেম্বর ২০২৫ শেষে এই সংখ্যাই বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২৮ হাজার। এর সমান্তরালে পাচারও বাড়ছে।
একদিকে পাচার হওয়া বিপুল অঙ্কের অর্থ উদ্ধারে তদন্তের জাল ফেলেছে, আরেক দিকে পাচার বাড়ছে। বিশ্বের ১৭৪টি দেশের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট- এফআইইউর কাছে বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থের খোঁজে তথ্য চাওয়া হয়েছে। এ-যাবৎকালে এতগুলো এফআইইউর কাছে সহায়তা চাওয়ার ঘটনা এটাই প্রথম। পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারিতে আছে প্রায় ১৩০০ মানি লন্ডারিংয়ের ঘটনা। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে প্রতিবেদন দিয়েছে শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি। সেখানে বলা হয়, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বিদেশে পাচার হয়েছে ২৮ লাখ কোটি টাকা। এই হিসাবে প্রতিবছর গড়ে ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে। শ্বেতপত্রে আরও বলা হয়, দুবাইয়ে বাংলাদেশিদের ৫৩২টি বাড়ি বা সম্পদ আছে, যার মূল্য সাড়ে ৩৭ কোটি ডলার। ২০২৪ সালের মার্চ পর্যন্ত ৩ হাজার ৬০০ বাংলাদেশি মালয়েশিয়ায় ‘সেকেন্ড হোম’ কর্মসূচিতে মনোনীত হয়েছেন।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে অর্থ পাচার, সন্দেহজনক লেনদেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে পাচারের ঘটনায় তদন্তের জন্য তথ্য প্রদান-সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। এই প্রতিবেদন তৈরি করতে ব্যাংক খাতের ৩ কোটি ১৩ লাখ টাকার নগদ লেনদেন বিশ্লেষণ করা হয়। এর মধ্যে সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত হয় ২০ হাজার ৫২০টি। সেখান থেকে প্রায় ১৩০০টি ঘটনা তদন্তের জন্য দেওয়া হয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে। অধিক তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ২০০টি ঘটনা গভীরভাবে পর্যালোচনা করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। মানি লন্ডারিংয়ের ঘটনায় এ সময় বিএফআইইউতে অভিযোগ জমা পড়েছে ৪৪৮টি।
এর আগে ২০২৩ সালের জুলাই থেকে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৮ মাসে ব্যাংক খাতে ২ কোটি ৫৬ লাখ ৯৬ হাজার ২২২টি সিটিআর লেনদেন শনাক্ত করা হয়। এর মধ্য থেকে বিশ্লেষণ করে ১০ হাজার ৮১৬টি সন্দেহজনক (এসটিআর) লেনদেন চিহ্নিত করা হয়। সন্দেহজনক গ্রাহকের হিসাবগুলোর মধ্যে ১৭৬টি ঘটনাকে অধিকতর তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে একটি গোয়েন্দা সংস্থাকে নির্দেশ দিয়েছে বিএফআইইউ। কিন্তু টাকা উদ্ধার বা ফেরত আনার তথ্যের বদলে উল্টো পাচার আরও বেড়ে যাওয়ার ফেরে বাংলাদেশ।