শিরোনাম
◈ ঐক্যবদ্ধ হয়ে গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করুন, স্বৈরাচার পতন দিবসে প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান ◈ মোহাম্মদ এ আরাফাতের নির্বাচনী কার্যালয়ে ককটেল হামলা, আহত এক ◈ জাতীয় পার্টির সঙ্গে আলোচনা করে হবে আসন ভাগাভাগি: আমু ◈ ৩৩ ওসির বদলির তালিকা নির্বাচন কমিশনে, ডিএমপিতে রাখার প্রস্তাব ◈ সমুদ্রবন্দরে তিন নম্বর সতর্কতা সংকেত ◈ জামিনে মুক্তি পেলেন বিএনপি নেতা দুলু ◈ ইসির নিবন্ধন পাচ্ছে আরো ২৯ পর্যবেক্ষক সংস্থা ◈ সৌদি বিনিয়োগ বিষয়ক উপ-মন্ত্রীসহ ৩১ সদস্যের প্রতিনিধি দল ঢাকায় ◈ দলীয় প্রার্থীরা আচরণবিধি লঙ্ঘন করলে ইসির শাস্তি মেনে নেবে আওয়ামী লীগ: ওবায়দুল কাদের    ◈ আদালত-বিচারকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে আইজিপি ও ডিএমপি কমিশনারকে চিঠি

প্রকাশিত : ০২ ডিসেম্বর, ২০২২, ০৩:১০ রাত
আপডেট : ০২ ডিসেম্বর, ২০২২, ০৩:১০ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

বিদ্বেষ কিংবা ধ্বংসাত্মক নয়, খেলাকে শুধু বিনোদন হিসেবে নিন

শরিফুল হাসান

শরিফুল হাসান: জানি না আপনারা খবরটা দেখেছেন কিনা। বিশ^কাপে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা নিয়ে বাকবিতণ্ডার জের ধরে চাঁদপুরে ব্রাজিল সমর্থক এক কিশোরকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করেছে এক আর্জেন্টাইন সমর্থক। নিহত কিশোরের নাম মেহেদী হাসান (১৭)। হত্যাকাণ্ডের পর তাঁর বন্ধু আর্জেন্টিনার সমর্থক আরেক কিশোর বরকত বেপারীকে আটক করেছে পুলিশ। গত সোমবার রাতে চাঁদপুর সদর উপজেলার বাগাদী ইউনিয়নের দক্ষিণ নানুপুর এলাকায় এ হত্যাকাণ্ডটি ঘটে। মেহেদীর বাবা হেলাল উদ্দিন থানায় মামলা করেছেন। ছেলে খুনির সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসির দাবিতে তিনি এখন আহাজারি করছেন।

আমি জানি না পৃথিবীর আর কোথাও খেলা নিয়ে এভাবে একজন মানুষের জীবন চলে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে কিনা? আচ্ছা, পুরো পৃথিবীর বিনিময়েও কি মেহেদী নামের ওই ছেলের জীবন ফিরে পাওয়া যাবে? তাহলে কেন এমন ঘটনা? কতো হাজার কিলোমিটার দূরে খেলা হচ্ছে সেই খেলাকে কেন্দ্র করে কেন এমন ঘটনা ঘটবে? এরপরেও আপনারা বলবেন খেলা নিয়ে আপনারা শুধুই মজা করেন? এরপরেও বলবেন, আমাদের কোনো দায় নেই? আমি তো মনে করি বছরের পর বছর ধরে  কী শিক্ষিত কী অশিক্ষত, সবাই মিলে এই আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল সমর্থন নিয়ে এই দেশে যা হচ্ছে সেটা ঘৃণা, গীবত আর নোংরামি ছাড়া আর কিছুই নয়। এই চর্চা বন্ধ হওয়া জরুরি। দুই ভাগে বিভক্ত এই দেশের বিশাল জনগোষ্ঠী যেভাবে বছরের পর বছর ধরে ঘৃণা ছড়াচ্ছে তার ভবিষ্যৎ শুধুই অন্ধকার।   

দেখেন বিশ্বকাপ শুরুর প্রথমদিনে ২০ নভেম্বর আমি লিখেছিলাম, আজ থেকে বিশ্বকাপ ফুটবল শুরু হচ্ছে। একই সাথে শুরু হবে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল সমর্থকদের পরস্পরকে আক্রমণ করার এক লড়াই। আসলে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার সমর্থন নিয়ে বাংলাদেশে যা হয় সেটাকে ঠিক উৎসব বা আনন্দ বলা যাবে না। বরং গীবত, পরশ্রীকাতরতা, হিংসা বিদ্বেষের আমাদের যে চরিত্র এ যেন তারই ব্রকাশ। আসলে আমরা যা ভালোবাসি সেটা নিয়ে আমাদের যতোটা ভালোলাগা কাজ করে তার চেয়ে বেশি আনন্দ আমরা পাই আরেকজনকে ঘৃণা করে, আরেকজনকে ছোট করে। 

ভেবে দেখুন, আপনি আজীবন সমর্থন করেন আর্জেন্টিনাকে কিন্তু আপনার ভালো লাগে ব্রাজিল সাত গোল খেলো সেটা নিয়ে কথা বলতে। আচ্ছা ব্রাজিল সাত না ৭০ গোল খেল তাতে আপনার এতো আনন্দ কেন? আচ্ছা, নেইমার পড়ে গেলে আপনার বিকৃত আনন্দ পেতেই হবে? আচ্ছা, আপনি আর্জেন্টিনা সমর্থন করেন মানে কি এই যে ব্রাজিলের খেলা ভালো বলা যাবে না। পেলে যুগের কথা বাদ দিলাম ৯৪ বা ২০০২ সালে এমনি এমনি কি ব্রাজিল কাপ পেলো?

আবার আপনি ধরেন সমর্থন করেন ব্রাজিল কিন্তু আপনার আনন্দের কারণ আর্জেন্টিনা ৩৬ বছরেও কাপ পায়নি। আচ্ছা, ৩৬ বছরে কাপ না পেলে আপনার কী? আপনাকে সারাক্ষণ আর্জেন্টিনাকে খেলোয়াড়দের কেন ছোট করতেই হবে? ম্যারাডোনার হাত দিয়ে গোল কিংবা মেসি যে কোন খেলোয়াড় না সেটা আপনাকে বলতেই হবে? কেন ব্রাজিল সমর্থন করেও কী মেসিকে ভালোবাসা যায় না? বহুবছর ধরে এই কথাগুলো বলছি। এই যে সবকিছুতে আমাদের ঘৃণা করার জন্য একটা প্রতিপক্ষ লাগে এইটা একটা ভয়াবহ সমস্যা। সবকিছুতে বিভক্তি না হলে আমাদের হয় না। ধরেন আপনি বিএনপি করেন কিন্তু সবসময় আপনাকে আওয়ামী লীগ বিরোধিতা করতে হবে, আওয়ামী লীগ করলে উল্টো। একইভাবে আপনাকে শেখ হাসিনার বিপরীতে খালেদা জিয়াকে আনতেই হবে, ভারতের বিপক্ষে পাকিস্তান, আবাহনীর বিরুদ্ধে মোহামেডান, আপনি কবি নজরুলকে ভালোবাসেন তাহলে রবীন্দ্রনাথকে গালি দিতেই হবে। কেন রে ভাই আরেকজনকে ঘৃণা না করে নিজের ভালোবাসা প্রকাশ যায় না? 

এই যে সবসময় ঘৃণা করা, ঘৃণা ছড়ানো তাতে কী হয়? আমরা বিশেষ করে আমাদের সন্তানেরা শেখে কেউ তাঁর দলের হারে কষ্ট পেলে তাকে সহমর্মিতার বদলে খোঁচাতে হয়। এই যে আমরা একজন আরেকজনের বিপদে হাসি, মজা নেই। দেখবেন কারও চেহারা খুব কালো হলে সেটা নিয়ে আমরা হাসাহাসি করি, কেউ মোটা হলে তাকে নিয়ে হাসি। একজন আরেকজনের বউ নিয়ে, জামাই নিয়ে, এমনকি অন্যের প্রন্ধকতা নিয়েও মজা করি।

কথাগুলো বলছি, কারণ এই যে ঘৃণা সেগুলো আমরা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে শিখছি। আমরা ভুলে যাই, আমাদের দেখে আমাদের বাচ্চারা এসব শেখে। আমরা হয়তো মনে করি ফান। অথচ ছোটরা এই ফান দেখতে দেখতে বড় হয়ে নিজেরাও বড় হয়ে একই কাজ করে। আমার ছোটবেলা থেকেই শিখি সবসময় আরেকজনকে ছোট করতে চায়। একটু গভীরভাবে চিন্তা করুন। দেখবেন, আমাদের বাঙালি মানসবচেয়ে বড় সমস্যা আমরা আরেকজনকে ছোট না করে নিজেরা বড় হতে পারি না। সবসময় গীবত ও পরশ্রীকাতরায় মেতে মেতে ক্রমশ বিভক্ত হয়ে যাই। সেই ঘৃণা এতো বেশি যে একই জেলার এক গ্রামের লোক আরেক গ্রামের লোককে এই একবিংশ শতাব্দীতেও মাছ ধরার টেটায় বিদ্ধ করতে পারি। 

ভেবে দেখেন, অফিস-আদালত-বাসা সবখানেই আরেকজনের গীবত নয়তো পরশ্রীকতারতা। অথচ আমরা যদি যদি অন্যের ভালো গুণ আর নিজের আত্মসমালোচনাটা করতে পারতাম! দেখতেন দেশটা বদলে যেত। আসুন নিজেদের সংশোধন করি। অন্তত আমাদের সন্তানদের কথা ভেবে। ভবিষ্যত প্রজন্মের কথা ভেবে। সারাক্ষণ পরশ্রীকাতরতা, আরেকজনকে ছোট করা, গীবত, ঘৃণা ছড়িয়ে মানুষ আনন্দ নিয়ে বাঁচতে পারে না। 

দেখেন একটা মানুষের জীবন চলে গেছে। আপনাদের দোহাই লাগে খেলা নিয়ে এই পাগলামি এই ঘৃণা ছড়ানো বন্ধ করুন।  এর চেয়ে বরং আসুন সবাইকে ভালোবাসি। সহমর্মিতা ছড়াই। ভিন্নতাকে শ্রদ্ধা করি। আমাদের শিশুরা আমাদের দেখে শিখুক কীভাবে মানুষে মানুষে সম্মান করতে হয়। আমরা যদি এখন থেকে এই চেষ্টা শুরু করি হয়তো দেরিতে হলেও এর সুফল আসবে। একটা ইতিবাচক সমাজ তৈচেষ্টা হবে। ভালো থাকুন সবাই। ভালো থাকুক প্রতিটি মানুষ। লেখক: অভিবাসন কর্মসূচি প্রধান, ব্র্যাক

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়