মনিরুল ইসলাম: নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনকে ঘিরে বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতার তৃতীয় দিনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস -এর বৈঠক এবং প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ ঘিরে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতির কথা তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও মুখপাত্র মাহ্দী আমিন।
বৃহস্পতিবার নিউইয়র্ক সময় সন্ধ্যা ৭টায় (বাংলাদেশ সময় শুক্রবার ভোর ৫টায়) ‘জাতিসংঘের সদর দপ্তরের মিডিয়া চত্বরে’ প্রেস ব্রিফিংয়ে মাহ্দী আমিন এসব কথা বলেন।
প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি জানান, একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন করায় প্রধানমন্ত্রীকে আন্তরিক অভিনন্দন জানিয়েছেন জাতিসংঘ মহাসচিব। বৈঠকের শুরুতেই এই শুভেচ্ছা বিনিময় হয় এবং উভয়পক্ষের মধ্যে অত্যন্ত ফলপ্রসূ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
মাহ্দী আমিন বলেন, প্রধানমন্ত্রী দীর্ঘদিন পর একটি গণতান্ত্রিক সরকারের প্রধান হিসেবে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে পারার অনুভূতি ব্যক্ত করেন। একই সঙ্গে তিনি স্মরণ করেন, তাঁর বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া অতীতে এই একই মঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন—যা তাঁর জন্য এক আবেগঘন মুহূর্ত।
এছাড়া বাংলাদেশ মন্ত্রিসভার পররাষ্ট্রমন্ত্রী এই সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্বে থাকা অবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ প্রদানকে এক গৌরবময় ঘটনা বলে তিনি বর্ণনা করেন।
বৈঠকে বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের প্রক্রিয়া নিয়েও আলোচনা হয়। বিশ্ব অর্থনীতির বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ বিবেচনায় এই উত্তরণের সময়সীমা কিছুটা বাড়ানোর জন্য জাতিসংঘ মহাসচিবের প্রতি অনুরোধ জানান প্রধানমন্ত্রী।
জাতিসংঘ মহাসচিব বাংলাদেশের বহুপাক্ষিক কূটনীতি, বিশ্বশান্তি রক্ষা এবং আন্তর্জাতিক সৌহার্দ্য বৃদ্ধিতে অবদানের প্রশংসা করেন বলেও জানান মুখপাত্র। তিনি বলেন, বাংলাদেশের নেতৃত্বে বৈশ্বিক সংহতি ও সহযোগিতার বার্তা আরও শক্তিশালী হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর জাতিসংঘে দেওয়া ভাষণকে “ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী” হিসেবে উল্লেখ করে মাহ্দী আমিন বলেন, এই ভাষণের মাধ্যমে একজন সরকারপ্রধান কীভাবে প্রকৃত রাষ্ট্রনায়ক হয়ে ওঠেন, তার প্রতিফলন দেখা গেছে। প্রধানমন্ত্রী কেবল জাতীয় বিষয়েই সীমাবদ্ধ থাকেননি; বরং বিশ্বশান্তি, ফিলিস্তিনের জনগণের অধিকার এবং জাতিসংঘের কার্যকর ভূমিকা নিয়ে সুস্পষ্ট রূপরেখা তুলে ধরেছেন।
তিনি জানান, ভাষণে গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও আইনের শাসনের প্রতি দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে একটি সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর ও জনকল্যাণমুখী বাংলাদেশ গড়ার পরিকল্পনা বিশ্ববাসীর সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা উপস্থিত অডিয়েন্স ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছে।
মাহ্দী আমিন বলেন, প্রধানমন্ত্রী দেশের সার্বিক উন্নয়নে অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতির কথা তুলে ধরেছেন। নারী, শিশু ও তরুণদের ক্ষমতায়নের পাশাপাশি ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, ই-হেলথ কার্ড এবং ভবিষ্যতে ইউনিভার্সাল কার্ড চালুর পরিকল্পনা উল্লেখ করা হয়। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি ও পরিবেশ—প্রতিটি খাতেই রূপান্তরমুখী উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর সফরের তৃতীয় দিনে মোট সাতটি কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়, যা দ্বিপাক্ষিক, বহুপাক্ষিক এবং উচ্চপর্যায়ের—এই তিন ভাগে বিভক্ত ছিল।
দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের মধ্যে পাকিস্তান ও থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা উল্লেখযোগ্য। এসব বৈঠকে আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার, ন্যায্যতা ও পারস্পরিক মর্যাদার ভিত্তিতে সম্পর্ক উন্নয়ন এবং জনগণের সঙ্গে জনগণের সংযোগ বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
উচ্চপর্যায়ের দুটি সম্মেলনে অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী পরিবেশ ও স্বাস্থ্য খাতে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেন। পরিবেশ সম্মেলনে আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ, ২০ হাজার কিলোমিটারের বেশি খাল খনন এবং পদ্মা ব্যারেজ ও তিস্তা মহাপরিকল্পনার বিষয় তুলে ধরা হয়। পাশাপাশি বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখার লক্ষ্যে চারটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দেন তিনি।
স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্মেলনে মা ও শিশুমৃত্যু কমাতে তৃণমূল পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়। এ লক্ষ্যে আগামী কয়েক বছরে ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে, যার মধ্যে ৮০ হাজারই নারী। পাশাপাশি মিডওয়াইফারি খাতে ২৫ হাজার নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী।
মাহ্দী আমিন বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সময় থেকে স্বাস্থ্য খাতে যে ভিত্তি তৈরি হয়েছিল, বর্তমান সরকার সেই ধারাবাহিকতাকে আরও শক্তিশালী করছে। বিশেষ করে নারী ও মাতৃস্বাস্থ্যের ওপর গুরুত্ব দিয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সংবাদ ব্রিফিংয়ে আরো উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির ও শামা ওবায়েদ ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী, অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন, জাতিসংঘে বাংলাদেশের উপ-স্থায়ী প্রতিনিধি একেএম ওয়াহিদুজ্জামান, প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনিসহ প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইংয়ের সদস্যবৃন্দ ও জাতিসংঘ মিশনের কর্মকর্তারা।