মনিরুল ইসলাম : জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্র সফরের প্রথম দিনেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ১০টি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেছেন। এসব কর্মসূচির মধ্য দিয়ে সরকারের “৩৬০ ডিগ্রি কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক কৌশল”-এর বাস্তব প্রতিফলন ঘটেছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও তাঁর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন।
মঙ্গলবার (স্থানীয় সময়) সন্ধ্যা ৭টায় নিউইয়র্কে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনের ডিপ্লোম্যাট সেন্টারে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এ কথা বলেন।
মাহ্দী আমিন জানান, চার দিনের সরকারি সফরের প্রথম দিনেই সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত টানা ব্যস্ত সময় পার করেন প্রধানমন্ত্রী। পূর্বনির্ধারিত ১২টি কর্মসূচির মধ্যে সময় স্বল্পতার কারণে দুটি বাদে বাকি ১০টিতে তিনি সরাসরি অংশ নেন।
দিনের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী তার সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমানকে সঙ্গে নিয়ে জাতিসংঘ মহাসচিবের আমন্ত্রণে আয়োজিত বিশেষ প্রাতরাশে অংশ নেন। এতে বিশ্বনেতা ও সরকারপ্রধানরা উপস্থিত ছিলেন। দিনশেষে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমন্ত্রণে নৈশভোজেও যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী।
একই দিনে তিনি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের প্লেনারি সেশনে অংশ নেন, যা মাহ্দী আমিন “ঐতিহাসিক মুহূর্ত” হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এর আগে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াও এই মঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। একই পরিবারের তিন সদস্যের এমন উপস্থিতি বিশ্ব ইতিহাসে বিরল।
প্রথম দিনেই ভুটানের প্রধানমন্ত্রী, মালদ্বীপের ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী। এসব বৈঠকে আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার, পর্যটন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে পারস্পরিক সম্পর্ক বৃদ্ধির বিষয়ে আলোচনা হয়।
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান প্রধানমন্ত্রীকে তার দেশের সফরের আমন্ত্রণ জানান এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও জোরদারের বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেন।
রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) এবং মিয়ানমারবিষয়ক বিশেষ দূতের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী। এতে বাংলাদেশে আশ্রিত ১০ লক্ষাধিক রোহিঙ্গার নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসনের ওপর জোর দেওয়া হয়।
মাহ্দী আমিন জানান, অতীতের সফল প্রত্যাবাসনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতায় মিয়ানমারে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ও গাম্বিয়ার যৌথ উদ্যোগে একটি সাইডলাইন ইভেন্ট আয়োজনের কথাও জানান তিনি।
প্রথম দিনেই বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে অংশ নেয় বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল। এতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, বাণিজ্য, অর্থনৈতিক উদারীকরণ এবং বাজেট সহায়তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। ভবিষ্যতে উন্নয়ন প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের ভূমিকা বাড়ানো এবং যৌথ অংশীদারিত্ব জোরদারের বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মেটার সঙ্গে নির্ধারিত বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী সরাসরি উপস্থিত থাকতে না পারলেও তাঁর মনোনীত প্রতিনিধিদল বৈঠক সম্পন্ন করে। এতে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের নিরাপত্তা, প্রযুক্তি উন্নয়ন ও ডিজিটালাইজেশন নিয়ে আলোচনা হয়।
হাইতির প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতা তুলে ধরা হয়। হাইতির চলমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সহায়তার সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানান মাহ্দী আমিন।
সামগ্রিক মূল্যায়ন
প্রথম দিনের কর্মসূচি মূল্যায়নে প্রধানমন্ত্রীর মুখপাত্র বলেন, “জনগণের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের মর্যাদা ও ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করাই সরকারের লক্ষ্য। সফরের সূচনাতেই সেই লক্ষ্য অর্জনের দৃঢ় ভিত্তি তৈরি হয়েছে।”
সংবাদ সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন, জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি আইরিন খান, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির ও শামা ওবায়েদ ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী, জাতিসংঘে বাংলাদেশের উপ-স্থায়ী প্রতিনিধি একেএম ওয়াহিদুজ্জামান, প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন, উপ-প্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনি ও সহকারী প্রেস সচিব কেএম নাজমুল হক খান।