মানবজমিনের প্রতিবেদন।। সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যা মামলার তদন্তে নতুন একটি তথ্য সামনে এসেছে। তদন্ত-সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের দাবি, ২০১২ সালে সংঘটিত এই হত্যাকাণ্ডের পরে তৎকালীন র্যাব কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের নির্দেশে র্যাবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক সেনাসদস্য রোকেয়া প্রাচীর বাসা থেকে দু’টি ডিস্ক নিয়ে এসেছিলেন। পরে ডিস্ক দু’টি জিয়াউল আহসানের কাছে হস্তান্তর করা হয়। তবে ওই ডিস্কে কী ধরনের তথ্য বা উপাত্ত ছিল, সেগুলোর সঙ্গে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের আদৌ কোনো সম্পর্ক রয়েছে কিনা কিংবা ডিস্ক দুটি গ্রহণে জিয়াউল আহসানের ভূমিকার উদ্দেশ্য কী ছিল এসব বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন তদন্ত-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্রটির ভাষ্য, তৎকালীন র্যাবে কর্মরত ওই সদস্য বর্তমানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে সৈনিক হিসেবে কর্মরত। সম্প্রতি তদন্ত সংস্থার জিজ্ঞাসাবাদে তিনি জিয়াউল আহসানের সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে তথ্য দেন। তার দেয়া তথ্যের ভিত্তিতেই ডিস্ক আনা ও হস্তান্তরের বিষয়টি তদন্তকারীদের সামনে আসে। সূত্রের দাবি, সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের আগে ওই সেনাসদস্যকে ডেকে জিয়াউল আহসান সতর্ক করে বলেছিলেন, আগামী দুইদিনের মধ্যে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ বা ‘বড় কিছু’ ঘটতে পারে এবং তাকে প্রস্তুত থাকতে। এর দুই দিন পর সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড ঘটে। পরে ওই সদস্যকে রোকেয়া প্রাচীর বাসায় পাঠিয়ে দুটি ডিস্ক নিয়ে আসতে বলা হয়। তিনি সেখান থেকে ডিস্ক দুটি এনে জিয়াউল আহসানের কাছে পৌঁছে দেন বলে তদন্তকারীদের জানিয়েছেন।
তবে জিয়াউল আহসান যে ‘বড় ঘটনা’র কথা বলেছিলেন, সেটি সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডকেই নির্দেশ করেছিল বলে জিজ্ঞাসাবাদে দৃঢ়ভাবে জানিয়েছেন এই সৈনিক। কিন্তু ডিস্ক দু’টির সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের সরাসরি কোনো যোগসূত্র ছিল কিনা, সেটিও এখনো প্রমাণিত হয়নি। এমনকি ডিস্ক দুটিতে সাগর ও রুনির ছবি, হত্যাকাণ্ডের তথ্য কিংবা ঘটনাটির সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো নির্দিষ্ট উপাত্ত ছিল এমন দাবির পক্ষে এখনো বিস্তারিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সূত্রটির ভাষ্য, তদন্তে পাওয়া সম্ভাব্য কোনো তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের আগেই প্রকাশ্যে চলে এলে সংশ্লিষ্ট সাক্ষী, তথ্যদাতা এবং সম্ভাব্য তদন্ত-লিড ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ কারণে বিষয়টি নিয়ে তদন্তকারীরা সতর্কতার সঙ্গে এগোচ্ছেন।
রোকেয়া প্রাচীর ভূমিকা নিয়েও তদন্ত: তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, রোকেয়া প্রাচীর একটি বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার হয়ে কাজ করার বিষয়ে বিশ্বাসযোগ্য তথ্য রয়েছে। তিনি বাংলাদেশে ওই সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ ইনফর্মার বা এজেন্ট হিসেবে কাজ করেছেন এমন বিশ্বাসযোগ্য তথ্যও রয়েছে। তবে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে রোকেয়া প্রাচীর সুনির্দিষ্ট সম্পৃক্ততা কী, সে বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি। এ ছাড়া তদন্তকারীদের কাছে বর্তমানে এমন কোনো নিশ্চিত তথ্য নেই যে, ওই সেনাসদস্য সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন। একইভাবে জিয়াউল আহসান ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন এমন প্রমাণও এখনো পাওয়া যায়নি।
গুমের মামলার তদন্তে জিয়াউল আহসানকে অন্তত তিন দফা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে বলে তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তবে তিনি কোনো অপরাধের সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেননি। সাগর-রুনি হত্যা মামলায় অবশ্য জিয়াউল আহসানকে এখনো জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি। নতুন তথ্যটি সম্প্রতি সামনে আসায় বিষয়টি যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। যেহেতু এটি গুমের মামলার তদন্তে পাওয়া একটি নতুন লিড এবং সাগর-রুনি হত্যা মামলার মূল তদন্তের অংশ নয়, তাই তথ্যগুলো মামলার তদন্তকারী সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) জানানো হচ্ছে। পরবর্তী সময়ে পিবিআই প্রয়োজন মনে করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারে।
কল রেকর্ড নিয়েও প্রশ্ন: সাগর-রুনি হত্যা তদন্তের ২০১২ সালের কল রেকর্ড বা সিডিআর বিশ্লেষণ করে রোকেয়া প্রাচীর নাম পাওয়া গেছে এমন একটি দাবিও সম্প্রতি আলোচনায় এসেছে। তবে তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্রটি এই দাবির বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছে। সূত্রটির দাবি, কোনো ফরেনসিক বিশ্লেষণ থেকে রোকেয়া প্রাচীর নাম পাওয়া গেছে এমন তথ্য তার জানা নেই। কল রেকর্ড বা সিডিআর-সংক্রান্ত দাবিগুলোও যথাযথভাবে যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তদন্তকারীরা। তাদের মতে, তদন্তে পাওয়া সম্ভাব্য লিড অতিরিক্তভাবে গণমাধ্যমে প্রচারিত হলে সেটি দ্রুত ‘হাইপ’-এর মধ্যে হারিয়ে যেতে পারে। একইসঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সতর্ক হয়ে গেলে তদন্তকারীদের জন্য ওই লিড অনুসরণ করাও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
তথ্যদাতা সেনাসদস্যের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ: দুটি ডিস্ক আনার বিষয়ে তদন্তকারীদের তথ্য দেয়া ওই সেনাসদস্য বর্তমানে নিরাপত্তা ও চাকরি নিয়ে উদ্বেগে রয়েছেন বলে জানা গেছে। তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে এ বিষয়ে সংবাদ প্রকাশের পর গত রোববার তিনি তদন্ত-সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তাকে ফোন করে নিজের নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কার কথা জানান। তার আশঙ্কা, বিষয়টি প্রকাশ্যে আসায় তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তার পাশাপাশি চাকরিও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। নিরাপত্তাজনিত কারণে ওই সেনাসদস্যের পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।
সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, এখনই সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই: সাগর-রুনি হত্যা মামলার সঙ্গে দুটি ডিস্কের সম্পর্ক এবং জিয়াউল আহসানের সম্ভাব্য সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ও গুমের মামলার তদন্তের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যারিস্টার শাইখ মাহাদী মানবজমিনকে বলেন, ডিস্ক দু’টির সঙ্গে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের সম্পর্ক থাকার একটি সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে মাত্র। ওই সম্ভাবনাকে প্রমাণে রূপ দিতে আরও তদন্ত ও তথ্য যাচাই প্রয়োজন। তার মতে, তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনো সম্ভাব্য তথ্যকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করলে তদন্তের পাশাপাশি সম্ভাব্য সাক্ষীদের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
তিনি বলেন, জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে ডিস্ক দু’টি গ্রহণ, সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততা কিংবা হত্যাকাণ্ডের ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকার বিষয়ে এখন পর্যন্ত নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া গেছে এমন দাবি করার সুযোগ নেই। তদন্তকারীদের হাতে থাকা নতুন লিডগুলো যাচাই-বাছাইয়ের পরই বিষয়টি আরও পরিষ্কার হতে পারে। সার্বিকভাবে, রোকেয়া প্রাচীর বাসা থেকে দুটি ডিস্ক আনা, সেগুলো জিয়াউল আহসানের কাছে পৌঁছে দেয়া এবং হত্যাকাণ্ডের আগে ‘বড় কিছু’ ঘটার ইঙ্গিত দেয়ার বিষয়টি তদন্তে একটি নতুন সূত্র হিসেবে সামনে এসেছে। তবে এসব তথ্যের মধ্যে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি যোগসূত্র এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ফলে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
এদিকে সাবেক চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, আমি ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর থাকাকালীন সময়েই সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের একটি ক্লু পেয়েছি। তদন্তে এটি পাওয়ার পরে যেহেতু বিষয়টি ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ারের আওতায় কোনো ক্ষমতা না তাই সাগর-রুনির হত্যা মামলাটি তদন্ত করছে যারা তাদের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছি। কিন্তু এখন তদন্ত সম্পন্ন না হতেই সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের বা কোনো সাংবাদিকের নাম জড়িয়ে মিডিয়ায় বক্তব্য দেয়া সমীচিন নয়। এতে তদন্তে বাধাগ্রস্ত হতে পারে।