শিরোনাম
◈ সংকটের প্রকৃত কারণ জনগণকে জানাতে এমপিদের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর ◈ বারবার প্রতিশ্রুতি, তবু থামছে না সীমান্ত হত্যা : প্রতিমাসে একজন করে মারা যায় গুলিতে ◈ লা লিগায় টানা দ্বিতীয় জয় পে‌লো বার্সেলোনা ◈ দীর্ঘ হচ্ছে এলএনজি সংকট, মহেশখালীর দুই টার্মিনালে কমেছে গ্যাস সরবরাহ ◈ সৌদি আরবও ফিফা সভাপ‌তি ইনফা‌ন্তি‌নো‌কে নিয়ে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করলো  ◈ তিব্বতে একের পর এক দুর্যোগ : বন্যার পর এবার আঘাত হানল ভূমিকম্প ◈ বিরোধী দলের ওয়াকআউট পরিকল্পিত, আইন প্রণয়নে সহযোগিতা করছে না: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ◈ অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজ, ১৭ ব্যাংক দেবে ৪১ হাজার কোটি ◈ আগস্টের ২৬ দিনে রেমিট্যান্স বেড়েছে ২২.৩ শতাংশ ◈ ‘মক্কা চুক্তি’ নিয়ে আলোচনার মধ্যেই সৌদি যুবরাজকে প্রধানমন্ত্রীর চিঠি

প্রকাশিত : ২৮ আগস্ট, ২০২৬, ১০:১৮ দুপুর
আপডেট : ২৮ আগস্ট, ২০২৬, ১০:২০ দুপুর

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

বারবার প্রতিশ্রুতি, তবু থামছে না সীমান্ত হত্যা : প্রতিমাসে একজন করে মারা যায় গুলিতে

সীমান্তে প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার বন্ধ এবং হত্যাকাণ্ড শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার বিষয়ে ভারত বারবার প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) গুলিতে প্রাণহানির ঘটনা ঘটছেই। তথ্যমতে, প্রতিমাসেই সীমান্তে গুলিতে একজন করে প্রাণ হারাচ্ছেন। মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, অনুপ্রবেশ বা সীমান্ত অপরাধের অভিযোগ থাকলেও তার প্রতিকারে প্রাণঘাতী শক্তির ব্যবহার কোনোভাবেই নিয়মে পরিণত হতে পারে না।

সর্বশেষ গত ৮ আগস্ট মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার পৃথিমপাশা ইউনিয়নের মাগুরুলি সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে তারা মিয়া (২০) নামে এক বাংলাদেশি তরুণ নিহত হন। ১০ আগস্ট চাতলাপুর ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট এলাকায় দুই দেশের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে তার মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। তারা মিয়া কর্মধা ইউনিয়নের মুরইছড়া বস্তি এলাকার আবদুল মালেকের ছেলে।

এর আগে ১২ জুন একই উপজেলার শরীফপুর ইউনিয়নের দত্তগ্রাম সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে নিহত হন মুজিব আলী (২০)। ১৪ মে লালমনিরহাটের হাতীবান্ধার আমঝোল সীমান্তে খাদেমুল হক (২৫) নামে এক যুবক এবং ৮ মে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার পাথারিয়াদ্বার সীমান্তে দুই বাংলাদেশি নিহত হন বিএসএফের গুলিতে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিএসএফের হাতে ৩৪ বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে গুলিতে ২৪ এবং শারীরিক নির্যাতনে ১০ জনের মৃত্যু হয়। ২০২৪ সালে সীমান্তে নিহত হন ৩০ জন, ২০২৩ সালে ৩১, ২০২২ সালে ২৩ এবং ২০২১ সালে ১৮ জন।

সাত মাসে নিহত সাত জন

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সীমান্ত এলাকায় গুলিতে সাত জন এবং নির্যাতনে আরও তিন জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন অন্তত ১০ জন। আগস্টে তারা মিয়ার মৃত্যুর ঘটনায় সেই তালিকা আরও দীর্ঘ হয়েছে। গড়ে প্রতি মাসে একজন করে বাংলাদেশি খুন হচ্ছেন ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হাতে।

দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে এসব প্রাণহানিতে উদ্বেগ জানিয়ে আসছে। নিহতদের পরিবারের সদস্যদের দাবিও হচ্ছে, কেউ সীমান্ত আইন ভাঙলে তার বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হোক, গুলি কিংবা নির্যাতন করে হত্যা করা হবে কেন?

বারবার বৈঠক হলেও হত্যা কমছে না

সীমান্তে পুশইন ঠেকানোসহ হত্যা বন্ধে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ ও ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) বৈঠক এবং প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও সীমান্তে হত্যাকাণ্ড ঘটছেই।

সর্বশেষ ১৭ আগস্ট পুশইনের চেষ্টা, মাদক চোরাচালান ও সীমান্ত হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনতে ফেনীর বিলোনিয়া জিরো পয়েন্টে মুখোমুখি বৈঠক করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)।

বৈঠক শেষে বিজিবি ফেনী ব্যাটালিয়ন অধিনায়ক লে. কর্নেল এমএম জিল্লুর রহমান জানান, নিয়মিত সূচির অংশ হিসেবে এ বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে সীমান্তের নানা বিষয়ে উভয়পক্ষের মধ্যে আলোচনা ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতার কথা হয়েছে। পুশইন বন্ধের বিষয়েও তাদের বলা হয়েছে। তাদের পক্ষ থেকে ইতিবাচক সাড়া এসেছে।

এছাড়া গত ২৯ জুলাই নীলফামারী সীমান্তে বিজিবি ও বিএসএফের অধিনায়ক পর্যায়ে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে সীমান্তে কোনও ধরনের পুশইন না করা এবং নিরীহ-নিরস্ত্র ব্যক্তিদের ওপর গুলি চালানো থেকে বিরত থাকতে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) প্রতি আহ্বান জানায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।

সেইসঙ্গে মাদকসহ সব ধরনের চোরাচালান প্রতিরোধে উভয় বাহিনীর যৌথ উদ্যোগ জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয় বৈঠকে।

সীমান্ত হত্যা নিয়ে সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

এদিকে ১৭ জুন জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘‘প্রাণঘাতীর পরিবর্তে ‘নন-লিথাল’ অস্ত্র ব্যবহারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বিএসএফ।’’ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনের (বাজেট) নবম দিনে কয়েকজন সংসদ সদস্যের তারকাচিহ্নিত ও লিখিত প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এমন তথ্য তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, ‘‘সীমান্তে বিএসএফের হাতে নিরীহ বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হওয়ার ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং এটি মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।’’

‘‘ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কর্তৃক সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিক হত্যা মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন’’ উল্লেখ করে এ বিষয়ে জোরালো প্রতিবাদ অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি জানান, প্রাণঘাতী অস্ত্রের পরিবর্তে ‘নন-লিথাল’ বা অমরণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়ে একাধিকবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বিএসএফ।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, ‘‘সীমান্ত হত্যার ঘটনা কমাতে ঝুঁকিপূর্ণ ও সংবেদনশীল সীমান্ত এলাকায় বিজিবি ও বিএসএফের যৌথ নৈশ টহল বাড়ানো হয়েছে। সীমান্তে যেকোনও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে কোম্পানি বা ব্যাটালিয়ন কমান্ডার পর্যায়ে দ্রুত পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা হয়েছে।’’

সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আব্দুল মালেকের প্রশ্নের লিখিত জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘‘বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের সম্মেলনসহ বিভিন্ন পর্যায়ের পতাকা বৈঠকে সীমান্ত হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনার প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে।’’

মানবাধিকার কর্মী আবু আহমেদ ফয়জুল কবির বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে প্রায় প্রতি মাসেই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং কোনোভাবেই একটি স্বাভাবিক সীমান্ত-নিরাপত্তা পরিস্থিতি হিসেবে মেনে নেওয়া যায় না।’’

তিনি বলেন, ‘‘সীমান্তে অনুপ্রবেশ বা অপরাধের অভিযোগ থাকলেও তার প্রতিকারে প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগই যেন নিয়ম হয়ে না দাঁড়ায়। বারবার হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটলেও যদি কার্যকর তদন্ত, জবাবদিহি ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত না হয়, তাহলে দায়মুক্তির একটি সংস্কৃতি তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে।’’

এই মানবাধিকার কর্মী আরও বলেন, ‘‘এ পরিস্থিতি বন্ধ করতে বাংলাদেশকে প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও জবাবদিহির দাবি আরও জোরালোভাবে তুলে ধরতে হবে। একইসঙ্গে বিজিবি-বিএসএফের নিয়মিত সমন্বয় ও উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় সীমান্তে প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার বন্ধের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। নিঃসন্দেহে সীমান্ত নিরাপত্তা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু মানুষের জীবন তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ।’’

সংশ্লিষ্টদের মতে, বারবার প্রতিশ্রুতির পরও প্রাণহানি অব্যাহত থাকায় এখন মূল প্রশ্ন হয়ে উঠেছে—সীমান্ত হত্যা শূন্যে নামানোর অঙ্গীকার বাস্তবায়নে কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত হবে কবে?

সীমান্ত হত্যা নিয়ে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) বক্তব্য জানতে চাইলেও এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষ কোনও বক্তব্য দেবে না বলে জানিয়েছেন বিজিবির জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. শরীফুল ইসলাম।

সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন 

  • সর্বশেষ