শিরোনাম
◈ মাত্র তিন মাসে কোটি টাকার হিসাবের বড় উল্লম্ফন ◈ কর্মসংস্থানে আসছে ১৪ লাখ বেকার ◈ সংসদে ইংরেজিতে বক্তব্য রাখলেন জেবা আমিন, স্পিকারের রসিকতা: ‘আগামী বছরের জন্য প্র্যাকটিস করতে থাকেন’(ভিডিও) ◈ আমার সাথে যা হয়েছে, এখন প্রতিশোধ নিলে সেটা ফেরত পাব না: প্রধানমন্ত্রী ◈ কলকাতায় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের তোপের মুখে মোশাররফ করিম দম্পতি! ◈ এস আলমের বৈশ্বিক সাম্রাজ্য নিয়ে বাড়ছে নজরদারি, স্পটলাইটে রেনেসাঁ ও ফোর পয়েন্টস কেএল ◈ নিউইয়‌র্কে আর্জেন্টিনা ও আলজেরিয়ার সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ, পুলি‌শের হস্ত‌ক্ষে‌পে প‌রি‌স্থি‌তি শান্ত ◈ বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য ও সহযোগিতা সম্প্রসারণে আগ্রহী জার্মানি ◈ যখন-তখন দাঁড়িয়ে বক্তব্য দেওয়া সংসদীয় রীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়: স্পিকার ◈ দেশের আকাশে মহররমের চাঁদ দেখা গেছে, ২৬ জুন পবিত্র আশুরা

প্রকাশিত : ১৭ জুন, ২০২৬, ১২:০০ রাত
আপডেট : ১৭ জুন, ২০২৬, ০২:০৪ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

বেনজীর আহমেদ সংযুক্ত আরব আমিরাতে জামিন চাইলে কী হতে পারে?

বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন।। সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) সঙ্গে বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ (এক্সট্রাডিশন) চুক্তি না থাকায় সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে দুবাইয়ে গ্রেপ্তারের পর তাকে কী প্রক্রিয়ায় দেশে ফিরিয়ে আনা হবে, তা নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তাকে ইউএইর আদালতে হাজির করা হতে পারে এবং সেখানে তিনি জামিনের আবেদনও করতে পারেন।

সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক সংবাদমাধ্যম গালফ নিউজ-এর সাবেক অ্যাসোসিয়েট এডিটর এবং দ্য অ্যারাবিয়ান পোস্ট-এর এক্সিকিউটিভ এডিটর সাইফুর রহমান বিবিসি বাংলাকে জানান, সরকারি ছুটি শেষে মঙ্গলবার দেশটির আদালত ও সরকারি কার্যক্রম স্বাভাবিক হয়েছে। এ অবস্থায় বেনজীর আহমেদকে আদালতে হাজির করা হলে তিনি জামিন চাইতে পারেন।

তিনি বলেন, “সম্ভবত তার আইনজীবীরা জামিনের জন্য আবেদন করবেন। আদালত হয়তো ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা (ট্রাভেল ব্যান) বা অনুরূপ কোনো শর্ত আরোপ করে তাকে দেশেই অবস্থান করতে বলতে পারে। বাংলাদেশ সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপরই অনেকটা তার ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে।”

তবে মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত এ বিষয়ে ইউএই কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

সাইফুর রহমানের ভাষ্য অনুযায়ী, বেনজীর আহমেদকে দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে নয়, বরং দুবাই মল এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি দুবাইয়ে বসবাস করতেন এবং সেখানে বৈধ আবাসিক মর্যাদা (রেসিডেন্সি) ছিল বলেও জানা গেছে।

তিনি আরও জানান, বেনজীর আহমেদ সংযুক্ত আরব আমিরাতে একজন বিনিয়োগকারী হিসেবেও অবস্থান করছিলেন। যদিও এ বিষয়ে ইউএই কর্তৃপক্ষ কিংবা বেনজীর আহমেদের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সাইফুর রহমান বলেন, “দুবাইয়ের ১০ বছর মেয়াদি ‘গোল্ডেন ভিসা’ বা ‘গোল্ড কার্ড’ কর্মসূচির আওতায় নির্দিষ্ট শর্ত পূরণকারী বিদেশি বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘমেয়াদি বসবাসের অনুমতি দেওয়া হয়।”

তবে কী প্রক্রিয়ায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, সে বিষয়ে এখনো দুবাই পুলিশ কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেয়নি।

প্রত্যর্পণ নির্ভর করবে চারটি বিষয়ের ওপর

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বেনজীর আহমেদকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়টি মূলত চারটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতে আইন পেশায় নিয়োজিত বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ওলরা আফরিন বিবিসি বাংলাকে বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে ইউএইর প্রত্যর্পণ চুক্তি না থাকলেও দেশটির আইন, আদালত, কূটনৈতিক তৎপরতা এবং যথাযথ নথিপত্রের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

তিনি বলেন, “ইন্টারপোলের রেড নোটিশ কোনো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা নয়; এটি কেবল একটি সতর্কতামূলক নোটিশ। ইউএই আদালত প্রথমে দেখবে, যেসব অভিযোগের ভিত্তিতে রেড নোটিশ জারি হয়েছে, সেগুলো তাদের আইনেও অপরাধ হিসেবে বিবেচিত কি না।”

যেভাবে বেনজীরকে দেশে ফেরানো হতে পারে

ওলরা আফরিন জানান, বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নাকি প্রকৃত অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট—সেটিও আদালত বিবেচনা করবে।

আইনজ্ঞদের মতে, তাকে ফেরানোর জন্য বাংলাদেশকে ইউএই আদালতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নথি জমা দিতে হবে। এর মধ্যে থাকবে—

  • গ্রেপ্তারি পরোয়ানার কপি,
  • মামলার এজাহার ও তদন্ত-সংক্রান্ত নথি,
  • অভিযোগের সমর্থনে প্রমাণাদি,
  • বাংলাদেশের আদালতের আদেশের কপি।

ওলরা আফরিন বলেন, “সব নথি ইউএইর আইন অনুযায়ী যথাযথভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে কি না, আদালত সেটিও যাচাই করবে।”

চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ইউএই আদালতের ওপরই নির্ভর করবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

বর্তমানে বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ছয়টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে একটি মামলায় অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করা হয়েছে এবং আরেকটির বিচার চলছে। এছাড়া পাসপোর্ট জালিয়াতিসহ আরও কয়েকটি মামলার তদন্ত চলছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালেও তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে তদন্ত চলছে।

ওলরা আফরিনের মতে, কূটনৈতিক ও আইনি—দুই পথেই সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।

তিনি বলেন, “মূলত কূটনৈতিক যোগাযোগই এখানে বেশি কার্যকর হবে। সঠিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হলে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসতে প্রায় ৩০ দিনের মতো সময় লাগতে পারে।”

দুদকের অবস্থান

দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা আকতারুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে জানান, জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের মামলায় বেনজীর আহমেদকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

তিনি বলেন, “এই মামলা এবং পাসপোর্ট জালিয়াতির মামলায় ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশ জারির জন্য আবেদন করা হয়েছিল।”

তার ভাষ্য অনুযায়ী, বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্র প্রস্তুত করা হয়েছে। এসব নথি পুলিশ সদর দপ্তরের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) হয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। পরে তা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ইউএই সরকারের কাছে পাঠানো হবে।

কখন জটিল হতে পারে প্রত্যর্পণ?

বিশ্বের অনেক দেশে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য তুলনামূলক শিথিল নীতিমালা রয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতেও এমন কিছু সুবিধা রয়েছে।

সাইফুর রহমান বলেন, বেনজীর আহমেদ যদি বৈধ আবাসিক মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি হন এবং ইউএইতে তার বিরুদ্ধে কোনো অপরাধের অভিযোগ না থাকে, তাহলে তার আইনজীবীরা এ বিষয়টি আদালতে তুলে ধরতে পারেন।

তবে ওলরা আফরিন মনে করেন, বিনিয়োগকারী হওয়ার কারণে বিশেষ আইনি সুবিধা পাওয়া যাবে—এমনটি নিশ্চিত নয়। বরং বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি ২০২৩ সালে দুবাইয়ে অবস্থানকারী স্বর্ণ ব্যবসায়ী রবিউল ইসলাম ওরফে আরাভ খানের উদাহরণ টেনে বলেন, অন্য দেশের নাগরিকত্ব বা পাসপোর্ট থাকলে প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া জটিল হতে পারে।

“বেনজীর আহমেদের যদি অন্য কোনো দেশের নাগরিকত্ব থাকে, তাহলে সেই দেশের সঙ্গে ইউএইর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ও আইনি কাঠামোও বিবেচনায় আসতে পারে,” বলেন তিনি।

সরকার কী করছে?

রোববার জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, বেনজীর আহমেদকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, “কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে তাকে দেশে ফেরানোর জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাঠানো হবে।”

অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, ট্রাইব্যুনালের জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা পুলিশের এনসিবির কাছে পাঠানো হয়েছে।

তিনি বলেন, “ইন্টারপোলের কাছে ওয়ারেন্টের কপি পাঠানো হবে। বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে তাকে ফেরত চেয়ে আবেদন করেছে।”

আমিনুল ইসলামের মতে, ইউএইতে প্রত্যর্পণ চুক্তি না থাকলেও দেশটির আইন অনুযায়ী আদালতের অনুমোদন সাপেক্ষে অভিযুক্তকে ফেরত পাঠানো সম্ভব।

রেড নোটিশে প্রত্যর্পণের আগের নজির

ইন্টারপোলের ওয়েবসাইটে প্রকাশ্য রেড নোটিশ তালিকায় বেনজীর আহমেদের নাম দেখা না গেলেও বাংলাদেশের ৫৯ জন নাগরিকের নাম রয়েছে।

অতীতে বাংলাদেশের আবেদনে শীর্ষ সন্ত্রাসী, হত্যা মামলার আসামি এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যা মামলার দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি করা হয়েছিল। তবে অনেক ক্ষেত্রেই তাদের দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি।

উল্লেখযোগ্যভাবে, বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার দণ্ডপ্রাপ্ত নূর চৌধুরী ও রাশেদ চৌধুরীকে এখনও দেশে ফেরানো যায়নি। সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আশঙ্কা এ ক্ষেত্রে বড় বাধা হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

তবে বাংলাদেশ ও ইউএইর মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের স্থানান্তর-সংক্রান্ত দুটি চুক্তি রয়েছে।

এসব চুক্তির আওতায় অতীতে দুবাই থেকে কয়েকজন আসামিকে দেশে ফিরিয়ে আনার নজির রয়েছে। এর মধ্যে নরসিংদীর শিবপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান হারুনুর রশিদ খান হত্যা মামলার আসামি মহসিন মিয়াকে ২০২৩ সালে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়।

এছাড়া চলতি বছরের ৬ মে ওই মামলার প্রধান আসামি আরিফ সরকারকেও দুবাই থেকে দেশে ফিরিয়ে আনে বাংলাদেশ পুলিশ।

একইভাবে, নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারের আব্রাহাম খান হত্যা মামলার প্রধান আসামি মোবারক মণ্ডলকে কাতার থেকে ইন্টারপোলের রেড নোটিশের মাধ্যমে শনাক্ত করে গত ২৭ মে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়