শিরোনাম
◈ যুক্তরাষ্ট্রের ৬০ শতাংশ মানুষ ডোনাল্ড ট্রাম্পের পদত্যাগ চান ◈ কবে থেকে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ করা হবে, জানাগেল তারিখ ◈ চাঁদাবাজি বন্ধ না হলে ব্যবসা বন্ধ করে চলে যাব: ডিসিসিআইয়ের সংবাদ সম্মেলন ◈ মেয়াদ যেখানে শেষ হবে সেখানে আগে সিটি নির্বাচন হবে : মির্জা ফখরুল ◈ রা‌তে টি-‌টো‌য়ে‌ন্টি বিশ্বকা‌পে ইংল্যান্ডের বিরু‌দ্ধে লড়াই‌য়ে নাম‌বে পাকিস্তান ◈ প্রায় ২ কোটি টাকা ক্ষতির পর বাংলাদেশি পর্যটকদের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে শিলিগুড়ির হোটেল ব্যবসায়ীরা! ◈ মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুর মার্চে ঢাকায় আসছেন ◈ স্পিকার-ডেপুটি স্পিকার নেই, সংসদে প্রথম অধিবেশনে স্পিকার নির্বাচন হবে যেভাবে ◈ সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যের শপথ নিয়ে বিতর্ক ◈ বাংলা‌দে‌শের মুস্তাফিজ এই মুহুর্তে সেরা ডেথ ওভার স্পেশালিস্টদের একজন: সামিন রানা

প্রকাশিত : ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১১:২২ দুপুর
আপডেট : ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১২:৪০ দুপুর

প্রতিবেদক : মহসিন কবির

সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যের শপথ নিয়ে বিতর্ক

মহসিন কবির: নির্বাচনের পর সংসদ সদস্যদের শপথের তারিখ ঘোষণার পর থেকেই রাজনৈতিক অঙ্গনে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছিল সংবিধান সংস্কার পরিষদ, বিশেষ করে বিএনপি এই পরিষদের সদস্য হিসেবে। শেষ পর্যন্ত বিএনপি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যদের শপথ না নিলেও জামায়াত জোট নিয়েছে। এটা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনসহ বিশেষজ্ঞ মহলে বিতর্ক চলছে। 

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নির্বাচিতদের সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার বিষয়ে সংবিধানে উল্লেখ রয়েছে। তবে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথের বিষয়টি সংবিধানে নেই। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সংবিধান সংস্কারের লক্ষ্যে রাষ্ট্রপতির নামে জারিকৃত একটি আদেশে এ পরিষদের সদস্যদের শপথ নিতে বলা হয়েছে। 

এর আলোকেই সংসদ নির্বাচনের দিন অনুষ্ঠিত হয় গণভোটও। তবে রাষ্ট্রপতির সেই আদেশ আইনসিদ্ধ নয় বলে মনে করছেন সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও আইনজীবীরা। তারা বলছেন, সংবিধান সংস্কারের ক্ষমতা নির্বাচিত সংসদের হাতে। গণভোটের রায়ের বদৌলতে যদি জুলাই আদেশ বাস্তবায়নযোগ্য হয়েই যায়, তাহলে সংবিধান সংস্কার পরিষদের প্রয়োজনীয়তা থাকে না। সেক্ষেত্রে যেসব সদস্য শপথ নিয়েছেন, তারাই তো জুলাই আদেশ অনুযায়ী নিজেরা সংবিধান বানিয়ে ফেলতে পারেন!

জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ পরিষদের গঠন সম্পর্কে বলা হয়েছে, নির্বাচিত প্রতিনিধিরা একই সাথে জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসাবে দায়িত্ব পালন করবেন। এতে আরও বলা হয়েছে, প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ থেকে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে জুলাই জাতীয় সনদ এবং গণভোটের ফলাফল অনুসারে সংবিধান সংস্কার সম্পন্ন করবে সংবিধান সংস্কার পরিষদ এবং তা সম্পন্ন হওয়ার পর পরিষদের কার্যক্রম সমাপ্ত হবে।

এ বিষয়ে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক গণমাধ্যমকে বলেছেন, সংবিধান সংস্কার করার জন্য নতুন পরিষদ করার দরকার নেই। সংসদের ক্ষমতাবলে এ পর্যন্ত আমাদের সংবিধান ১৮ বার সংশোধন হয়েছে। জুলাই সনদের মাধ্যমে তারা সংবিধানে যা কিছু যোগ-বিয়োগের কথা বলছে, এটা তো সংসদই করতে পারে।

সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথগ্রহণ ও গণভোটের ফলাফলের ভবিষ্যৎ প্রসঙ্গে দেশখ্যাত এই আইনজ্ঞ বলেন, এটা নিয়ে কেউ আইনি চ্যালেঞ্জ করলে সেটি টেকা মুশকিল হতে পারে। বিএনপি শপথ না নেওয়ায় কার্যত এটি করার আর সুযোগ নেই। যে ৭৭ জন শপথ (সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে) নিয়েছেন, তারা জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে পারেন সেই আদেশ বলে। কিন্তু তেমন কিছু করার জন্য সংঘাতময় পরিস্থিতি তৈরি করতে চাইলে সেটি আর জনগণের সমর্থন পাবে না।

ড. শাহদীন মালিক আরও বলেন, জুলাই আদেশ অনুযায়ী গণভোটে জেতার কারণেই যদি এটি বাস্তবায়নযোগ্য হয়ে যায়, তাহলে এমনিতেও আর সংবিধান সংস্কার পরিষদের প্রয়োজন হয় না। তবে এ নিয়ে রাজনৈতিক সংকট তৈরির চেষ্টা আর সফল হবে না, কারণ এখন সবাই স্থিতিশীলতা চান।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের বর্তমান সাংবিধানিক ব্যবস্থা মোতাবেক সংসদ বহাল না থাকা অবস্থায় রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ বা নতুন আইন জারি করা হলে তা সংসদ চালু হওয়ার পর উত্থাপনের ৩০ দিনের মধ্যে অনুমোদন করতে হয়। নয়তো সেটি বাতিল হয়ে যায়। কিন্তু রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ জারি করে জুলাই বাস্তবায়ন আদেশের যে গণভোট হয়েছে, সেক্ষেত্রে কী হবে, সেটি পুরোপুরি পরিষ্কার নয়।

এ বিষয়ে সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ গণমাধ্যমকে বলেছেন, গণভোট হয়েছে রাষ্ট্রপতির নামে জারি করা একটি আদেশের ওপর নির্ভর করে। এভাবে অধ্যাদেশ হতে পারে কিনা, সেটি নিয়েও আইনি প্রশ্ন রয়েছে। আবার সেই অধ্যাদেশকে বা গণভোটকে বৈধতা দিতে হলে সংসদে উত্থাপন করে পাস করাতে হবে। বিএনপি এখন সেটা সংসদে তুলবে কিনা, সেটা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ জারি করার ক্ষেত্রে সংবিধান কিছু সীমাবদ্ধতা বেঁধে দিয়েছে। সংবিধানে যা নেই অর্থাৎ সংসদ যে বিষয়ে আইন করতে পারে না বা সংবিধানের কোনো বিধান যদি পরিবর্তিত হয়ে যায়, সেসব বিষয়ে রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন না। সংবিধানে যেহেতু গণভোটের বিধান নেই, তাই এ বিষয়ে অধ্যাদেশ জারি করার এখতিয়ার রাষ্ট্রপতির নেই। ফলে এসব বিষয় নিয়ে আইনি প্রশ্ন উঠতেই পারে, বলেন তিনি।

সিনিয়র এই আইনজীবী আরও বলেন, কিছু লোককে বুঝিয়ে গেল যে, তোমরা এভাবে নতুন করে সংবিধান করবে। সংবিধানের বাইরে সেভাবে একটা শপথেরও ব্যবস্থা করে দিল। সংবিধান পরিবর্তনের ক্ষমতা সংসদ সদস্যদের। এখানে জোর করে চাপিয়ে দেওয়ার কিছু নেই। গণতন্ত্র হলো— সংবিধানে যেটা পাস করবে, সেটাই আইন। আর বিএনপি স্পষ্টভাবে বলছে যে, তারা জুলাই সনদের অধিকাংশ বিষয়েই একমত এবং সেগুলো সংসদে পাস করবেন।

এর পরও যারা বলছেন— জনগণের সঙ্গে বিএনপি একটা বেইমানি করেছে, তাদের বলব— জনগণকে বিএনপি একটা আইনের শাসনের পথ দেখাল। আমি মনে করি, বিএনপির সংসদ সদস্যদের শপথগ্রহণ (সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে) করাটা জনগণের সঙ্গে প্রতারণা হতো। দেশ এখন সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় চলে এসেছে। প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভা ও এমপিদের শপথ হয়েছে সংবিধান অনুযায়ী।

সুপ্রিমকোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল গণমাধ্যমকে বলেছেন, বিএনপির সংসদ সদস্যরা বিদ্যমান সংবিধান মেনে শপথগ্রহণ করেছেন। সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সংবিধানে এগুলো সন্নিবেশিত হওয়ার পর যখন তফসিলে অন্তর্ভুক্ত হবে, তখন কে শপথ পড়াবেন, এসব বিষয় ঠিকঠাক হওয়ার পর তারা হয়তো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তারা কখনও বলেননি যে, এটা করবেন না। সুতরাং এটা হচ্ছে একটা পদ্ধতিগত দিক। মূলত সংবিধানের বিধানকে মানা, না মানার বিষয়। বিএনপি সংবিধান মেনে এগিয়ে যাচ্ছে।

রাষ্ট্রপতির জারি করা জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বিজয়ী হলে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা একই সঙ্গে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও কাজ করবেন। ৬০ সদস্যের কোরাম হলেই এই পরিষদ কাজ করতে পারবে। ওই আদেশের ভিত্তিতে গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়লাভ করেছে। এরপর গত ১৭ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত গণভোটের বৈধতা চ্যালেঞ্জ এবং ১৩ ফেব্রুয়ারি ঘোষিত গণভোটের ফল বাতিল চেয়ে হাইকোর্টে রিট করা হয়েছে।

এদিকে ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ প্রসঙ্গে সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অনেক আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। সেগুলো কার্যকর করা হয়েছে রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে। কিন্তু জুলাই সনদ স্বাক্ষরের পর এ সনদের বাস্তবায়ন আদেশ বলে একটি আদেশ পরে দেওয়া হয়েছে যেটা রাষ্ট্রপতির একমাত্র আদেশ।

এই যে আদেশটা তিনি দিলেন, এই আদেশ দেওয়ার কোনো এখতিয়ার রাষ্ট্রপতির আদৌ আছে কিনা? তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্রপতি যে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ জারি করেছেন, সেই আদেশের সবশেষে তফসিল-১ এ আরেকটি শপথ যুক্ত করা হয়েছে। কন্সটিটিউশনকে আপনি আলাদা আরেকটা অর্ডার দিয়ে কি সাবস্টিটিউট করতে পারবেন? এই সংবিধানের ভেতরে আপনি অর্ডারের মাধ্যমে সংবিধানের মৌলিক পরিবর্তন করে শপথ ঢুকাবেন? এটা কোন আইনে পেলেন আপনারা? প্রশ্ন রাখেন তিনি। বলেন, আমি তো এ আদেশের কোনো আইনসিদ্ধতাই পাইনি। এ আদেশটাই তো অবৈধ আদেশ। এটি আইনগতভাবে টিকবে না। ওনার তো এখতিয়ার নেই সংবিধানের মৌলিক পরিবর্তন করে ফেলার।

জ্যোতির্ময় বড়ুয়া আরও বলেন, আরেকটা বিষয় হচ্ছে নির্বাচিত সংসদকে বাধ্য করা। একটা সংসদ কি পারে তাদের কোনো কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে পরবর্তী সংসদকে কোনো বিষয়ে বাধ্য করতে? কোনো সুযোগই নেই বাধ্য করার। কারণ তাতে তো সংসদের সার্বভৌমত্বের পুরো আইডিয়াটাই নষ্ট হয়ে যায়।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়